আজ : মঙ্গলবার: ৮ ফাল্গুন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ | ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ইং | ২ জমাদিউস-সানি ১৪৩৯ হিজরী | ভোর ৫:৫৫
fevro
শিরোনাম
aa5

নবীর শিক্ষা করো না ভিক্ষা

Badal-nj | ২৯ জুন, ২০১৭ | ৮:১৯ অপরাহ্ণ

ইসলাম ভিক্ষাবৃত্তি বা পরজীবী জীবনকে পছন্দ করে না, বরং শ্রমজীবী জীবনই ইসলামের কাম্য। হাদিসে বর্ণিত আছে, এক আনসারি ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.) এর কাছে ভিক্ষার হাত প্রসারিত করলে তিনি তাকে বাজার থেকে কুড়াল খরিদ করে নিয়ে আসার পরামর্শ দেন। অতঃপর সে কুড়ালে নবীজি (সা.) নিজ হাতে হাতল লাগিয়ে দিয়ে বলেন, জঙ্গল থেকে কাঠ কেটে বাজারে বিক্রি করো এবং বলে দিলেন, ১৫ দিন পর্যন্ত যেন আমি তোমাকে না দেখি। ১৫ দিন পর সেই সাহাবি ১০টি দিরহাম নিয়ে রাসুলের দরবারে উপস্থিত হলে তিনি তার ব্যবসায়িক সাফল্যে খুশি হয়ে বললেন, ‘মানুষের কাছে হাত পাতার চেয়ে এটি অনেক উত্তম।’ (আবু দাউদ : ১৬৪১)।

ইসলামের দৃষ্টিতে যারা সবল, উপার্জনে সক্ষম তাদের জন্য কারো কাছে হাত পাতা বা চাওয়া বৈধ নয়। রাসুল (সা.) বলেন, ‘ধনী ও সুস্থ-সবল ব্যক্তির জন্য সদকা হালাল নয়।’ (আবু দাউদ : ১৬৩৬)। রাসুলল্লাহ (সা.) অলস ও বেকারের জন্য দান-সদকার অনুমতি দেননি, যাতে মানুষ হালাল পন্থায় উপার্জনের প্রতি উদ্বুদ্ধ হয়। অনুরূপভাবে ভিক্ষাবৃত্তি সম্পর্কে তিনি কঠোর মনোভাব প্রদর্শন করেছেন এবং এ ব্যাপারে মানুষকে সতর্ক করেছেন। বোখারির বর্ণনায় এসেছে, রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি অব্যাহতভাবে মানুষের কাছে ভিক্ষা প্রার্থনা করে কেয়ামতের দিন তার মুখম-ল মাংসশূন্য হবে।’ (বোখারি ও মুসলিম)। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘সকালে বের হয়ে পিঠে লাকড়ি সংগ্রহ করে সদকা করা অথবা মানুষের কাছে হাত পাতার চেয়ে নিজেকে রক্ষা করা (দান করুক বা না করুক) অন্যের কাছে চাওয়ার চেয়ে অনেক উত্তম।’ (তিরমিজি : ৬৭৫)।
ইসলামের দৃষ্টিতে হালাল পথের কোনো পেশাই হীন বা অপমানকর নয়; বরং ইসলাম হালাল পন্থায় উপার্জনকে অতি উচ্চমর্যাদায় মূল্যায়ন করেছে। এ প্রসঙ্গে নবীজি (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘মানুষের স্বহস্তে উপার্জিত খাবারের চেয়ে উত্তম খাবার কিছুই হতে পারে না। আল্লাহর নবী দাউদ (আ.) স্বহস্তে উপার্জন করে আহার করতেন।’ (বোখারি : ২০৭২)। নিজের হাতের উপার্জনকে সর্বোত্তম আখ্যায়িত করে ইসলাম শ্রমের মর্যাদাকে বৃদ্ধি করে দিয়েছে। কোনো শ্রমকেই কেউ যেন ঘৃণার চোখে না দেখে, সেজন্য আল্লাহ তায়ালা তার নবীদের দ্বারা সমাজের দৃষ্টিতে নিম্নমানের শ্রমগুলো বাস্তবায়িত করে সমাজের ভুল ধারণা ভেঙে দিতে চেয়েছেন। বিভিন্ন হাদিসের বর্ণনা থেকে জানা যায়, আদম (আ.) কৃষি কাজ করেছেন। ইদ্রিস (আ.) দর্জির কাজ করেছেন। নুহ (আ.) ছিলেন কাঠমিস্ত্রি। দাউদ (আ.) ছিলেন কর্মকার, মুসা (আ.) ছিলেন রাখাল। খোদ দোজাহানের সরদার আমাদের প্রিয় নবী (সা.) ইহুদিদের বাড়িতে শ্রম দিয়ে এবং মক্কাবাসীর রাখালি করে শ্রমের মর্যাদাকে বহুগুণে বৃদ্ধি করে দিয়েছেন। এমনকি মানুষের কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট যে কাজ অর্থাৎ জুতা সেলাই করা, তিনি তা নিজ হাতে করে এহেন কাজের প্রতি মানুষের অহেতুক ঘৃণাবোধ দূর করার চেষ্টা করেছেন। এতে যে শুধু শ্রমের প্রতি মানুষের ঘৃণাবোধ দূর করার প্রচেষ্টা হয়েছে তা-ই নয়, বরং এর দ্বারা শ্রমিকের প্রতি ঘৃণাবোধকে করারও অভিনব প্রয়াস নিহিত রয়েছে। নবীজির সাহাবিদের মধ্যে বেলাল, আম্মার, সালমান, খাব্বাব, সুহাইব, যায়েদ, ইকরামা প্রমুখ ছিলেন আজাদকৃত দাস ও শ্রমিক। কিন্তু তাদের সামাজিক মর্যাদা ছিল অন্য অনেক সাহাবির উপরে। খলিফা ওমর (রা.) হজরত বেলাল (রা.) কে নেতা বলে সম্বোধন করতেন।
রাসুল (সা.) ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপারে সাহাবাদের উৎসাহ দিতেন। কেউ ব্যবসায় মুনাফা অর্জন করেছে শুনতে পেলে অত্যন্ত খুশি হতেন। উরওয়া বারেকি (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) আমাকে এক দিনার দিয়ে একটি বকরি কেনার নির্দেশ দেন। আমি সেই দিনার দিয়ে দুইটি বকরি খরিদ করি। তারপর এ দুইটি বকরি থেকে একটিকে দ্বিগুণ মূল্যে বিক্রি করে দেই। অতঃপর নগদ এক দিনার এবং একটি বকরি নিয়ে রাসুলের খেদমতে পেশ করলাম। রাসুল (সা.) তা দেখে অত্যন্ত আনন্দিত হন এবং উরওয়ার জন্য বরকতের দোয়া করেন।’ (তিরমিজি : ১২৫৮)।
একবার রাসুল (সা.) কে জিজ্ঞেস করা হলো, কোন কোন উপার্জন অত্যন্ত পবিত্র ও উত্তম? তিনি বললেন, নিজের হাতের কাজ এবং সততাপূর্ণ ব্যবসা-বাণিজ্য। (মুসনাদে আহমদ)। ইসলামের চার খলিফার মধ্যে হজরত আবুবকর (রা.) ব্যবসায়ী ছিলেন, ওমর (রা.) রাখাল ছিলেন, আর হজরত আলী (রা.) ছিলেন দিনমজুর। তিনি ইহুদির ক্ষেতেও মজুরির কাজ করেছেন। অধিক হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবি আবু হুরায়রাও (রা.) ছিলেন একজন বেতনভুক্ত শ্রমিক।
ইসলামের ইতিহাসে এমন অনেক ক্ষণজন্মা ব্যক্তি গত হয়েছেন, যাদের কৃতিত্বের সাক্ষর বহন করে রচিত হয়েছে গবেষণাধর্মী বহু গ্রন্থ। আমরা তাদের নামের সঙ্গে তাদের পেশার নামও দেখতে পাই। যে পেশার মাধ্যমে তারা জীবিকা নির্বাহ করতেন। যেমনÑ বাজ্জাজ (কাপড় ব্যবসায়ী), জাসসাস (কাঁচ প্রস্তুতকারক), খাব্বাজ (রুটি তৈরিকারী), খাইয়াত (দর্জি), হাজ্জা (জুতা সেলাইকারী), হাদ্দাদ (কর্মকার), কাত্তান (তুলা উৎপাদনকারী) ইত্যাদি পেশাভিত্তিক পরিচয়ে ইতিহাসে অনেক বরেণ্য আলেম, বিশিষ্ট জ্ঞানী, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও ফেকাহবিদ ছিলেন। তারা নিজেদের এসব পেশায় পরিচয় দিতে সামান্য লজ্জাবোধ করেননি বা হীনম্মন্যতায় আক্রান্ত হননি।
ইসলামে জীবিকা নির্বাহকে ফরজ ইবাদত হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘হালাল পন্থায় জীবিকা অন্বেষণ করা দ্বিতীয় স্তরের ফরজ।’ (মিশকাত : ২৭৮১)। পবিত্র কোরআনে জীবিকা উপার্জনসংক্রান্ত বহু আয়াত রয়েছে। এবং বিশ্বনবী (সা.) হাদিসে এ ব্যাপারে জোড় তাগিদ প্রদান করেছেন। এমনকি জীবিকার অন্বেষণে দেশ ভ্রমণ ও স্বদেশ ত্যাগের প্রতিও উৎসাহ প্রদান করেছেন। তিনি বলেন, ‘সফর করো সুস্থ থাকবে, জিহাদে বের হও, ধনী হয়ে যাবে।’ (মুসনাদে আহমদ : ৮৯৪৫)। জীবিকা উপার্জনসংক্রান্ত আয়াত ও হাদিসের অনুপ্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রথম যুগের মুসলমানরা পৃথিবীর অলিগলি চষে বেড়িয়েছেন। রিজিক অন্বেষণ করেছেন ও ধর্মপ্রচার করেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *