আজ : মঙ্গলবার: ৮ ফাল্গুন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ | ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ইং | ২ জমাদিউস-সানি ১৪৩৯ হিজরী | ভোর ৫:৫৫
fevro
শিরোনাম
dilli1

ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় মহানবী (সা.)

Badal-nj | ২৯ জুন, ২০১৭ | ৮:১৮ অপরাহ্ণ

ইসলাম অত্যাচার-অনাচার, হানাহানি-দলাদলি এবং অশুভ আচরণ থেকে মানুষকে শুদ্ধতার দিকে ধাবিত করে। আবদ্ধ করে একে-অপরকে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে, সৃষ্টি করে আদর্শে নিবেদিত, ধর্মানুরাগী, খোদাভীরু, সংযমী ও মিথ্যার সঙ্গে আপসহীন একটি সুন্দর মানবসমাজ। নৈতিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করার মাধ্যমে মানুষের মনে সততার বিকাশ ঘটায়। আমাদের প্রিয় নবীজি ছিলেন পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববন্ধন সৃষ্টিতে সফলকাম এক মহাপুরুষ। তিনি আরব সমাজ থেকে সব ধরনের হানাহানি, মারামারি, কাটাকাটি, জুলুম, অত্যাচার ও নির্যাতনের অবসান ঘটিয়ে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে সবাইকে আবদ্ধ করেন। বিশ্ববাসীকে উপহার দেন এক আদর্শ সমাজ। ইসলামের দৃষ্টিতে মোমিনরা একে অপরের ভাই। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেন, ‘মোমিনরা তো পরস্পরের ভাই।’ (সূরা হুজুরাত)। প্রকৃত প্রস্তাবে ইসলাম পরস্পরের মধ্যে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং কল্যাণকর কর্মে একে-অপরকে সহায়তা করাকে কর্তব্য হিসেবে ধার্য করেছে।

ঐতিহাসিক বালাজুরী তার অন্যতম গ্রন্থ আনসাব আল-আশরাফে বর্ণনা করেন, মুহাম্মদ (সা.) হিজরতের আগে মক্কায় ইসলাম ধর্মের প্রতি আনুগত্য ও পারস্পরিক সাহায্যের ভিত্তিতে মুসলমানের মাঝে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন গড়ে তোলেন। তিনি হামজা ও জায়েদ ইবনে হারেস, আবু বকর ও ওমর, উসমান ইবনে আফফান ও আবদুর রাহমান ইবনে আওয়াফ, আল জুবায়ের ইবনে আল আওয়াম ও আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ এবং নিজের ও আলী ইবনে আবি তালিবের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক স্থাপন করেন।
মহান আল্লাহর নির্দেশক্রমে ইসলাম প্রচার-প্রসারের নিমিত্তে মক্কা থেকে রাসুলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবীরা মদিনায় হিজরত করেন। সেখানে পৌঁছে সাহাবিরা নানাবিধ সমস্যাÑ বিশেষ করে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত সমস্যার সম্মুখীন হন। কেননা মুহাজিররা তাদের পরিবার-পরিজন এবং অধিকাংশ সহায়-সম্পদ মক্কায় ফেলে রেখে মদিনায় চলে আসেন। মদিনার অর্থনীতি কৃষি ও হস্তশিল্পের ওপর নির্ভরশীল ছিল। মুহাজিররা ব্যবসা-বাণিজ্যে দক্ষ হলেও কৃষি ও হস্তশিল্পে তেমন পারদর্শী ছিলেন না। তদুপরি ব্যবসার জন্য প্রয়োজন মূলধনের। এ মূলধনের অভাবে কোরাইশরা নতুন সমাজ মদিনায় সহজে নিজস্ব জীবিকার উপায় অবলম্বনে সক্ষম হচ্ছিলেন না। অন্যদিকে নবগঠিত ইসলামী রাষ্ট্র তাদের জীবিকার নির্বাহের সুযোগ সৃষ্টিতে হিমশিম খাচ্ছিল। কেননা মদিনার নবসমাজের সঙ্গে মুহাজিরদের সম্পর্কের শুভসূচনা হয়েছিল মাত্র। মুহাজিররা মক্কায় পরিবার-পরিজন ও বন্ধুবান্ধব রেখে চলে আসেন এবং তাদের সঙ্গে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এর ফলে একদিকে যেমন মুহাজির সম্প্রদায় একাকিত্ববোধ করেন, অন্যদিকে মাতৃভূমি মক্কার জন্য ব্যাকুলতা অনুভব করেন।
এছাড়া মক্কা ও মদিনার আবহাওয়াও ছিল ভিন্ন প্রকৃতির। ফলে মুহাজিররা অনেকে জ্বরে আক্রান্ত হন। এ অবস্থায় মুহাজিরদের প্রতি সজাগ দৃষ্টি নিক্ষেপ করা এবং চরম আতিথেয়তা প্রদর্শন করা অতীব জরুরি হয়ে পড়ে মদিনাবাসী আনসারদের ওপর। আনসাররা নিঃসংকোচে তাদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। আনসাররা ত্যাগ ও নিঃস্বার্থ মেহমানদারির মাধ্যমে এমন এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল ঘটনা। আনসারদের দয়া, মহানুভবতা ও উদারতা এতই মহৎ ছিল, তারা নিজেদের খেজুর বৃক্ষগুলো মুহাজির ভাইদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেয়ার জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) এর কাছে অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। যদিও তাদের জীবন-জীবিকার একমাত্র মাধ্যম ছিল খেজুর। মদিনাবাসী আনসারদের এরূপ মহৎ আচরণ ও মহানুভবতায় মুহাজিররা অত্যন্ত খুশি হন এবং খোলামনে আনসারদের এ উদারতার ভূয়সী প্রশংসা করেন। মদিনাবাসী মুসলিমদের ত্যাগ ও উদারতা সত্ত্বেও আইনের মাধ্যমে মুহাজিরদের সুন্দর জীবনযাপনের গ্যারান্টি দেয়ার জন্য বিধান প্রণয়ের প্রয়োজন থেকেই যায়। বিশেষ করে মুহাজিরদের গৌরব ও মর্যাদার স্বাভাবিক দাবি ছিল যে, তাদের সমস্যা এমনভাবে সমাধান করা হোক যাতে তারা সে আনসারদের ওপর নির্ভরশীল এ কথা তাদের ভাবতে না হয়। যে কারণে ভ্রাতৃত্বের বিধান প্রণীত হয়েছিল।
ঐতিহাসিক ইবনে সাআদ তার আল তাবাকাত গ্রন্থের প্রথম খ-ে বর্ণনা করেন, হিজরতের পরে এবং বদর যুদ্ধের আগে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন প্রবর্তন করা হয়। মহানবী (সা.) উভয় পক্ষ হতে একজন করে নিয়ে দুইজনের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন স্থাপন করেন। ইবনে সাদের মতে ৯০ জনের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন স্থাপিত হয়। তন্মধ্যে অর্ধেক ছিলেন মুহাজিরদের মধ্য থেকে আর অর্ধেক আনসারদের মধ্য থেকে।
মূল কথা হলো, মদিনায় যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সৃষ্টি করা হয়েছিল তা আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে। পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের বিধান প্রণয়নের ফলে ভ্রাতৃত্ববন্ধনে আবদ্ধ দুই ব্যক্তির মাঝে সাহায্য-সহযোগিতার মতো বিশেষ অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং উভয়ের মধ্যে সৌহার্দপূর্ণ মনোভাব গড়ে ওঠে। বলাবাহুল্য, এ সহযোগিতা কোনো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল না; জীবনের সার্বিক সমস্যা সমাধানের জন্য সব ধরনের বস্তুগত সাহায্য ও সহযোগিতার সর্বব্যাপী ব্যবস্থা ছিল, যদিও সেটা ছিল সাহায্য দান বা পরিচর্যা করা, উপদেশ প্রদান, পারস্পরিক মেহমানদারী ও ভালোবাসা ইত্যাদি। মুহাজির ও আনসারদের মাঝে এমন উচ্চতর ভ্রাতৃত্বের বন্ধন রচনা হয়েছিল, যার দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বিরল। মদিনাবাসী মুসলিমরা মক্কাবাসী মুহাজির ভাইদের জন্য ত্যাগের বিশেষ সুযোগ পেয়ে এতই আনন্দিত হয়েছিলেন যা বর্ণনাতীত। বিভিন্ন রেওয়াতে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের বিধানের প্রতি তাদের গভীর আস্থা এবং তা কার্যকর করার ক্ষেত্রে তাদের ত্যাগের অবিস্মরণীয় চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব বন্ধনের এক অনুপম দৃষ্টান্ত হলো মদিনাবাসী আনসার সাদ ইবনে আল বার এবং মক্কাবাসী মুহাজির আবদুুর রহমান ইবনে আউফ মধ্যকার ভ্রাতৃত্বের বন্ধন। সাদ (রা.) আবদুর রহমান আউফকে বললেন, ‘আমার যে সম্পত্তি রয়েছে আমি তা আমাদের দুইজনের মধ্যে ভাগ করে নিতে চাই। আমার দুইজন স্ত্রী আছে, আপনি তাদের যাকে পছন্দ হয়, তাকে আমি তালাক দিব, যাতে আপনি যথা সময়ে তাকে বিবাহ করতে পারেন।’ তখন আবদুর রাহমান প্রত্যুত্তরে বললেন, ‘আল্লাহ আপনার স্ত্রী ও সম্পদকে আপনার জন্য রহমতে রূপান্তরিত করুক।’ আপনি আমাকে বাজারের দিকে নিয়ে চলেন। ফেরার সময় তিনি বিশুদ্ধ মাখন ও ঘরে তৈরি পনির নিয়ে আসেন। তিনি যে ব্যবসা করলেন এটি ছিল তার মুনাফা। আবদুর রাহমান বললেন, রাসুল (সা.) আমার গায়ে হলুদ বর্ণ দেখে বললেন, কী ব্যাপার? আমি বললাম, আমি একজন আনসার রমণীকে বিয়ে করেছি। তিনি বললেন, একটি বকরি হলেও ওলিমার ব্যবস্থা করো। গভীর ভ্রাতৃত্ব ও পারস্পরিক স্বার্থ ত্যাগের এ অপূর্ব দৃশ দেখে যে কেউ বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়বেন, তাতে কোন সন্দেহ নেই। আমরা অন্য কোনো জাতির ইতিহাসে কখনও এমন ঘটনার নজির দেখতে পাইনি।
তাই আসুন, আমরা আমাদের মাঝে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন গড়ে তুলি। আর পরস্পরের মাঝে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিই, তাহলেই আমাদের মধ্যে শান্তির ধারা নেমে আসবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *