জিহাদ ও সন্ত্রাসের ব্যবধান

প্রথমত, মৌলিক বিবেচনা মতে,
কোনো মুসলমানের বিরুদ্ধে মুসলমানের পরিচালিত আক্রমণ জিহাদ হতে পরে না। দ্বিতীয়ত, কোনো অমুসলিম ব্যক্তি বা শক্তির বিরুদ্ধে জিহাদ পরিচালনা করতে হলে
সেক্ষেত্রে ইসলামী জিহাদের শর্ত হচ্ছে, তা পরিচালিত হতে হবে বৈধ রাষ্ট্রীয়
কর্তৃপক্ষের অধীনে

মানুষ সামাজিক জীব। সামাজিক বন্ধনের বাইরে একাকী বসবাস করে কোনো মানুষ পরিপূর্ণ সুস্থ থাকতে পারে না, তার মানবিক গুণাবলির যথাযথ বহিঃপ্রকাশ ঘটে না। এ অবস্থায় কোনো ব্যক্তি হয়তো নিজে সামাজিক বহুবিধ কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হন অথবা সমাজকে বঞ্চিত করে থাকেন। অবশ্য এটি অনস্বীকার্য যে, ওই সমাজটি যখন জঙ্গিবাদমুক্ত ও সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ হবে, তখনই উক্তরূপ প্রত্যাশা ও কল্যাণ ফলপ্রসূ হবে। যে কারণে সত্য, সঠিক ও সর্বশেষ ঐশী ধর্ম ইসলামে একদিকে সমাজবদ্ধ ও দলবদ্ধভাবে সামাজিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করার প্রতি সবিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে, অন্যদিকে সমাজকে সুস্থ, সুন্দর, শান্তিপূর্ণ, সহযোগিতাপূর্ণ, অস্থিরতামুক্ত, জঙ্গিবাদমুক্ত ও সন্ত্রাসমুক্ত রাখতে বিভিন্নভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে। মহান আল্লাহ এরশাদ করেনÑ ১. ‘তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।’ (সূরা আলে ইমরান : ১০৩)। ২. ‘তোমরা নিজেদের মধ্যে পরস্পর বিবাদ করবে না; করলে তোমরা সাহস হারাবে (কাপুরুষ হয়ে যাবে) এবং তোমাদের শক্তি বিলুপ্ত হবে।’ (সূরা আনফাল : ৪৬)। ৩. ‘তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা তাদের কাছে স্পষ্ট নিদর্শন আসার পর বিচ্ছিন্ন হয়েছে ও নিজেদের মধ্যে মতান্তর সৃষ্টি করেছে।’ (সূরা আলে ইমরান : ১০৫)।
প্রিয় নবী (সা.) এরশাদ করেন, ‘জামাতবদ্ধ বা সমাজবদ্ধদের ওপর মহান আল্লাহর সাহায্য থাকে।’ এছাড়া তিনি বলেন, ‘যে দল ত্যাগ করল বা সমাজবিচ্ছিন্ন হয়ে গেল, সে দোজখে নিক্ষিপ্ত হবে।’
ওইসব আয়াত ও হাদিসে ঐক্যবদ্ধ, সমাজবদ্ধ বা দলবদ্ধ থাকতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, উৎসাহ ও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। অপরদিকে প্রিয় নবী (সা.) এরশাদ করেন, ‘মুসলমান ওই ব্যক্তি, যার মুখ ও হাত (এর সন্ত্রাস বা অনিষ্ট) থেকে অপরাপর মুসলমানরা নিরাপদে থাকে।’ (বোখারি ও মুসলিম)। আরেকটি হাদিসে মহানবী (সা.) বলেন, ‘এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই। সে তার (ভাইয়ের) ওপর জুলুম করবে না, তাকে অপদস্থ করবে না এবং হেয় করবে না। একজন মানুষের মন্দ বা সন্ত্রাসী হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, সে তার ভাইকে হেয় করে। প্রত্যেক মুসলমানের ওপর অপর প্রত্যেক মুসলমানের জানমাল ও ইজ্জত-আবরু হারাম।’ (মুসলিম : খ-৭, পৃ. ৯৯; ইফা)।
উপরোক্ত হাদিস এবং অনুরূপ আরও অসংখ্য হাদিসে ও কোরআনের বাণীতে, মুসলমানদের সমাজের মুসলিম-অমুসলিম প্রতিবেশীদের, নারী-শিশুদের, দুর্বল-অসহায়দের, এমনকি সৃষ্টি জীবজন্তু-প্রাণীদেরও ক্ষতি না করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, ইসলামী জিহাদ ও বর্তমানকার জঙ্গিবাদী ও সন্ত্রাসীদের ইসলামের নামে উদ্দেশ্যমূলকভাবে পরিচালিত বিভিন্নমুখী আক্রমণ যাতে অযোদ্ধা, নিরপরাধ ব্যক্তি, সাধারণ জনগণ, এমনকি নারী-শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে, তা আদৌ ইসলাম বা ইসলামী জিহাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। তার কারণ প্রথমত, মৌলিক বিবেচনা মতে, কোনো মুসলমানের বিরুদ্ধে মুসলমানের পরিচালিত আক্রমণ জিহাদ হতে পরে না। দ্বিতীয়ত, কোনো অমুসলিম ব্যক্তি বা শক্তির বিরুদ্ধে জিহাদ পরিচালনা করতে হলে সেক্ষেত্রে ইসলামী জিহাদের শর্ত হচ্ছে, তা পরিচালিত হতে হবে বৈধ রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের অধীনে, ‘যা রাষ্ট্র বিধি মোতাবেক সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শসাপেক্ষে, কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে নিশ্চিত হয়ে গৃহীত সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে, জারীকৃত নির্দেশের মাধ্যমে হয়ে থাকবে। তা-ই হবে ইসলামী জিহাদ।’ কোনো ব্যক্তি বা দলবিশেষের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য যত মহৎই হোক না কেন, জিহাদের নামে জঙ্গি তৎপরতা ও সন্ত্রাসী কর্মকা-ের সুযোগ ইসলামী শরিয়ত কখনও দেয়নি।
প্রিয় পাঠক! ইসলামী পরিভাষায় জিহাদ কোনো ব্যক্তিগত বা সামাজিক ইবাদত নয়। এটি হচ্ছে রাষ্ট্রীয় যৌথ ইবাদত, যা রাষ্ট্র কর্তৃক আদিষ্ট না হওয়া পর্যন্ত ব্যক্তি বা সমাজ পালন করতে বাধ্য নয়; পালন করতে পারেও না। আর কেউ তেমনটি করতে গেলে তা জিহাদ হবে না, ইবাদতও হবে না; বরং তা হবে ফেতনা বা সন্ত্রাস। যেমন ইহুদিবাদের চক্রান্তের শিকার খারেজি সম্প্রদায় হিজরি প্রথম শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে জিহাদের নামে, আল্লাহর বিধান ও কোরআন প্রতিষ্ঠার নামে মুসলিম খলিফাদের বিরুদ্ধে, সাধারণ মুসলমানদের বিরুদ্ধে জিহাদ শুরু করেছিল। অথচ তখন প্রিয় নবীর অনেক সাহাবি বেঁচে ছিলেন। তারা খারেজিদের বিভিন্নভাবে বুঝিয়ে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেছিলেন এবং খারেজিদের ধ্যানধারণা মতে কোরআনে উল্লিখিত ফেতনা-সন্ত্রাস দূরীকরণার্থে তাদের পরিচালিত জিহাদই যে প্রকৃত অর্থে জিহাদ নয়, বরং সন্ত্রাসী কর্মকা-, তা বোঝানোর প্রয়াস চালিয়েছিলেন তৎকালীন সাহাবিরা। যার অনেক প্রমাণ বোখারি ও মুসলিমসহ ইত্যাদি গ্রন্থে এবং সাহাবাদের জীবনী-ইতিহাসে রয়েছে।
উদাহরণত, তাবেঈ নাফে (রহ.) বলেন, খারেজি নেতা ইবনুল আরজাক আবদুুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) কাছে এসে বলল, হে আবু আবদুর রহমান, কী কারণে আপনি এক বছর হজ করেন আরেক বছর ওমরা করেন এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ পরিত্যাগ করেন? অথচ আপনি জানেন, আল্লাহ জিহাদের জন্য কী পরিমাণ উৎসাহ ও প্রেরণা দিয়েছেন? তখন তিনি জবাব দিলেন, ‘ভাতিজা! ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পাঁচটি বিষয়ের ওপরÑ আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, রমজানের রোজা, জাকাত দান ও বায়তুল্লাহর হজ।’ লোকটি বলল, হে আবু আবদুর রহমান! আল্লাহ তাঁর কিতাবে কী উল্লেখ করেছেন তা কি আপনি শুনছেন না? … এবং তোমরা তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে থাকবে, যতক্ষণ ফেতনা দূরীভূত না হয় এবং আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠিত না হয়। (সূরা আল বারাকা : ১৯৩)। তখন ইবনে ওমর বলেন, আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.) এর যুগে তা করেছিলাম। ইসলাম দুর্বল ও মুসলমানের সংখ্যা কম ছিল, এতে মুসলিম ব্যক্তি তার ধর্ম পালনে ফেতনার সম্মুখীন হতেন। কাফেররা তাকে হত্যা করত বা তার ওপর অত্যাচার করত। যখন ইসলাম বিস্তৃত হয়ে গেল বা বিজয়ী হয়ে গেল, তখন তো আর ফেতনা থাকল না।’
খারেজি নেতার উদ্দেশ্য ছিল, তার কোরআন বোঝা ও ব্যাখ্যা মতে বিশিষ্ট সাহাবি কেন জিহাদ এড়িয়ে চলেছেন তার জবাব নেয়া এবং তাদের পরিচালিত জিহাদের সমর্থন আদায় করা। বিজ্ঞ সাহাবি তার জবাবে বুঝিয়ে দিলেনÑ ১. মুসলমানে মুসলমানে জিহাদ ঠিক নয়। ২. জিহাদের উদ্দেশ্যে যে ফেতনা দূর করা অর্থাৎ ইসলামের মৌলিক পঞ্চস্তম্ভ পালনে বাধা দূর করা, তা এর আগে প্রিয় নবীর জীবদ্দশায় আমরা করেছি। সেই ফেতনা এখন আর নেই। কেননা এখন আমরা স্বাধীনভাবে ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো পালন করতে বাধার সম্মুখীন হচ্ছি না। ৩. ওই পঞ্চস্তম্ভের বাইরে ধর্মীয় বিষয়গুলো তথা জিহাদ, দাওয়াত, সৎকাজে আদেশ, অসৎকাজে নিষেধ, পুরো দ্বীন প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি ইবাদতের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। তবে এসব ‘আরকানে খামসার’ মতো সবার ওপর ফরজে আইন বা অত্যাবশ্যকীয় ফরজ নয়। এগুলোতে শর্ত আছে, সুবিধা-অসুবিধায় ছাড় আছে, স্থান-কাল-পাত্রের বিবেচনায় ব্যাখ্যা আছে। ৪. নিজের বুদ্ধি-বিবেক দ্বারা কোরআন বোঝা এবং সেই আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, কোরআনের অপব্যাখ্যার শামিল। কোরআন বুঝতে হবে প্রিয় নবীর সুন্নতের মাপকাঠিতে এবং সাহাবাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী। কেননা কোরআন অবতীর্ণ হয়েছিল এবং বাস্তবে রূপায়িত হয়েছিল সাহাবিদের চোখের সামনে। ৫. শুধু আবেগের নাম ইসলাম নয়, বরং কোরআন ও সুন্নাহর মাপকাঠিতে নিয়ন্ত্রিত আবেগেরই মূল্যায়ন আছে ইসলাম ধর্মে।
লেখক : মুফতি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *