আজ : মঙ্গলবার: ৮ ফাল্গুন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ | ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ইং | ২ জমাদিউস-সানি ১৪৩৯ হিজরী | ভোর ৫:৫৬
fevro
শিরোনাম
manobkantha.com_-176

বাজার হারানোর উচ্চ ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

Badal-nj | ০১ ডিসেম্বর, ২০১৭ | ১০:৩০ পূর্বাহ্ণ

রফতানি বাণিজ্যে গতিশীলতা আনতে রফতানি বহুমুখীকরণ নীতি গ্রহণ করেছে সরকার। শুধু তাই নয়, প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ব বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সুসংহত করতে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সুদৃঢ় ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। সেই লক্ষ্যে চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা রফতানি সক্ষমতা বাড়াতে নীতি তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। সম্প্রতি অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এই নীতি অনুমোদন দিয়েছে।

এই নীতির উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, রফতানিকারকরা ১৬.৫ শতাংশ হারে তাদের বার্ষিক রাফতানি আয়ের বিপরীতে প্রণোদনা পাবে। এই প্রণোদনা ২০২১ সাল নাগাদ কোনো পরিবর্তন হবে না। এর পাশাপাশি ৬০ কোটি টাকার একটি তহবিল গঠন করা হবে। যে তহবিল দিয়ে একটি সর্বাধুনিক মানের ডিজাইন সেন্টার তৈরি করা হবে। চামড়া খাতে রফতানি আয় বর্তমানে ১.১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই খাতে বিগত ৫ বছরের গড় প্রবৃদ্ধি ২০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। চামড়া খাত বর্তমানে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রফতানি আয়ের খাত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। যা মোট রফতানি আয়ের ৩.৪ শতাংশ আর জিডিপিতে এর অবদান বর্তমানে ১ শতাংশের ওপর দাঁড়িয়েছে। এই খাতে বর্তমানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১০ লাখের বেশি শ্রমিক কাজ করছে। বিগত কয়েক বছরে চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা রফতানি অভাবনীয় মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। চামড়াজাত পণ্যের রফতানির পরিমাণ মোট রফতানির ৩৩.৪৩ শতাংশ। আর পাদুকা রফতানি হচ্ছে মোট রফতানির ৪২.৬২ শতাংশ। জাতীয় লক্ষমাত্রা অনুযায়ী ২০২১ সাল নাগাদ রফতানি আয় হবে ৬০ বিলিয়ন ডলার।

চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা রফতানি সক্ষমতা বৃদ্ধি সংক্রান্ত নীতিতে রফতানি নির্ভর প্রবৃদ্ধির বর্তমান অবস্থা, তৈরি পোশাক শিল্পের সফলতা, রফতানি বহুমুখীকরণ, কর্মসংস্থান, প্রবৃদ্ধি, রফতানির লক্ষ্যমাত্রা, কাঠামোগত পরিবর্তন, চামড়াজাত পণ্যের সম্ভাবনা, মূল সমস্যা, সমস্যার কারণ, সমস্যার প্রভাবসহ বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করা হয়েছে। এই সঙ্গে কর্মপরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।

জানা গেছে, পরিবেশক বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো ও হাজারিবাগের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও দূষণ চামড়া শিল্পের ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুতর হুমকি তৈরি করেছে। যে কারণে হাজারী বাগ থেকে প্রায় ১৫০টি চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা অর্থাৎ ট্যানারি সাভারে স্থানান্তর করার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। চামড়াসহ চামড়াজাত পণ্য খাতে রফতানি বর্তমানে ১.১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৯ সালের মধ্যে ২৪৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার উন্নীত হবে। আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে ভারত ও ভিয়েতনামের চামড়া খাত থেকে রফতানি হয় অনেক বেশি। ভারত থেকে হয় ১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, আর ভিয়েতনাম থেকে হয় ১৪.৮৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশ একই ধরনের পণ্যের বাজারে ভারত, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান ও কম্বোডিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আমেরিকা ও জাপান অতি গুরুত্বপূর্ণ তিনটি বাজারে আমাদের সকল প্রতিযোগী উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।

নীতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের চামড়াজাত পণ্য শিল্প বিকশিত। একই সঙ্গে বৈচিত্রপূর্ণ হওয়ার অপার সুযোগ সুবিধা রয়েছে। বাংলাদেশের চামড়াজাত পণ্যের গতানুগতি বাজারগুলো হচ্ছে-জাপান, জার্মানি, ইতালি, যুক্তরাজ্য, বেলজিয়াম, স্পেন, ফ্রান্স, পোল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা। তবে পশ্চিমা বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দার কারণে রফতানিকারকদের নতুন ক্ষেত্র ও বিকাশমান বাজার খুঁজতে হচ্ছে। বিকাশমান বাজারগুলোর মধ্যে রয়েছে- তুরস্ক, দক্ষিণ কোরিয়া, ব্রাজিল, মেক্সিকো, দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া, চীন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।

বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের বিকশিত হওয়ার অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও, শিল্পটি একটি সংকটপূর্ণ সময়ে রয়েছে বলে নীতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এক দিকে হাজারিবাগ ট্যানারী স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ বিলম্বের কারণে শিল্পটি পরিবেশগত ভাবমূর্তি সংকটে রয়েছে। অন্যদিকে শিল্পটি শ্রমের নিম্ন উৎপাদনশীলতা, ব্যবসায় উচ্চ ব্যয়, জ্বালানির অভাব, কারখানার জন্য সহজে জমি পাওয়াসহ আরো অন্যান্য সমস্যা রয়েছে। দ্বিতীয় বৃহত্তম রফতানি আয় অর্জনকারী খাত হওয়া সত্ত্বেও, এই খাতে বড় ধরনের ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ আসছে না। বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও পাদুকা চামড়াজাত পণ্যের রফতানি বাজার হারানোর উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। অনিশ্চিত রাজস্ব নির্ধারণ ও অসামঞ্জস্য নীতিমালার কারণে চামড়া খাতের প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। প্রতিযোগীতা সক্ষমতায় বেশ কয়েকটি উপাদান সবচেয়ে বেশি জটিল করে তুলেছে। যার প্রভাব প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপরেও প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে বাণিজ্যিক লেনদেন প্রক্রিয়ায় উচ্চ ব্যয়। এর পাশাপাশি বাংলাদেশে ও বাংলাদেশ থেকে পণ্য চালানে দীর্ঘ সময় নিচ্ছে।

এ ছাড়াও রয়েছে দক্ষতার তীব্র স্বল্পতা ও অদক্ষ শ্রমিক। সমস্যার মধ্যে আরো রয়েছে দেশি ও বৈদেশিক বিনিয়োগের স্বল্পতা। আর স্বল্পতার জন্য বেশ কিছু কারণও রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বড় ও দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের জন্য বেশ কিছু ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা ও দুর্বল প্রণোদনা। তবে এই নীতি তৈরি করার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, সপ্তম পঞ্চ বার্ষিকী পরিকল্পনা অনুসারে চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা খাতে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। যা রফতানির উচ্চতর বহুমুখীকরণ নিশ্চিত করবে।

জানা গেছে, নীতিতে ২০১৫ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত অতিরিক্ত প্রণোদনা ছাড়া চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা খাতের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। ২০১৫ সালে রফতানি ১১৬১.০ মার্কিন মিলিয়ন ডলার, ২০১৬ সালে রফতানি ১৩১১.৮ মার্কিন মিলিয়ন ডলার, ২০১৭ সালে ১৫৬৩.২ মার্কিন মিলিয়ন ডলার, ২০১৮ সালে ১৮৫৫.০৭ মার্কিন মিলিয়ন ডলার, ২০১৯ সালে ২১৯৬.৫ মার্কিন মিলিয়ন ডলার, ২০২০ সালে ২৫৯৩.৮ মার্কিন মিলিয়ন ডলার ও ২০২১ সালে ৩০৫৭.২ মার্কিন মিলিয়ন ডলার লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে উৎপাদনশীলতা ২০১৫ সালে যা ছিল ১১.৪ শতাংশ, ২০২১ সালে এসে তা দাঁড়াবে ১২.৪ শতাংশে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *