আজ : মঙ্গলবার: ৮ ফাল্গুন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ | ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ইং | ২ জমাদিউস-সানি ১৪৩৯ হিজরী | ভোর ৫:৫৪
fevro
শিরোনাম
11

মুড়াপারার ঐতিহ্য বরবক শাহী মসজিদ

Badal-nj | ৩১ জানুয়ারি, ২০১৮ | ১০:১৪ অপরাহ্ণ

ডান্ডিবার্তা রিপোর্ট
কারুকার্য ও নির্মাণশৈলী বিবেচনায় স্থাপত্যশিল্পের অনন্য নিদর্শন শাহী মসজিদ। মোগল স্থাপত্যের নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম এ শাহি মসজিদ। প্রায় সাড়ে পাচ’শ বছরের পুরনো এই মসজিদটির স্থাপত্যরীতিতে মোগল ভাবধারার ছাপও সুস্পষ্ট। অবস্থান রূপগঞ্জের মুড়াপাড়া বাজার ঘেষা শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে। এ মসজিদ নিয়ে রয়েছে অনেক রোমাঞ্চকর কাহিনী। রয়েছে নানা ইতিহাস। বিভিন্ন ইতিহাস ও বইপত্র ঘেটে জানা যায়, ১৪৬৫ খ্রিস্টাব্দে গৌড়ের ইলিয়াস শাহী বংশের উত্তরাধিকার নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহের ছেলে রুকনউদ্দিন বরবক শাহ আছিয়া খাতুনের পরগনা শীতলক্ষ্যা তীরের মুড়াপাড়া এলাকায় আসেন। তার সফরসঙ্গী ছিলেন জৌনপুরের শাসনকর্তা মাহমুদ শর্কী, মুসলমান সাহিত্যিক আমীর জয়েনউদ্দীন, আমীর শিহাবউদ্দীন কিরমানী, মনসুর সিরাজী ও দেহরক্ষী বাসুদেব বসু। তিনি কয়েক মাস এ পরগনায় থেকে ঘুরে ঘুরে এলাকা দেখেন। আছিয়া খাতুনের আথিতিয়েতাও তাকে মুগ্ধ করে। তিনি এলাকাটি দেখে খুবই পছন্দ করেন। পরে তিনি এ পরগনায় মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। এরপর আছিয়া খাতুনের সঙ্গে আলোচনা করে মসজিদের কাজ শুরু করেন। মসজিদটি দেখাশোনার কাজে নিয়োজিত ছিলেন ঐসময়কার তার পৃষ্ঠপোষক মুসলমান সাহিত্যিক আমীর জয়েনউদ্দিন, আমীর শিহাবউদ্দিন কিরমানী ও মনসুর সিরাজী। একপর্যায়ে জৌনপুরের শাসনকর্তা মাহমুদ শর্কী ও দেহরক্ষী বাসুদেব বসুকে নিয়ে বরবক শাহ তার রাজ্য গৌড়ে ফিরে যান। এরপর ১৪৭৪ খ্রিস্টাব্দে বরবক শাহ পরলোক গমন করেন। পরে জৌনপুরের মাহমুদ শর্কী ও দেহরক্ষী বাসুদেব বসুর মুখে পিতার মসজিদের অসমাপ্ত কাজের বর্ণণা শুনে বরবক শাহের পুত্র সামসুদ্দিন আবু মুজাফফর ইউসুফ শাহ মসজিদটির নির্মাণ কাজ শেষ করার তাগিদ দেন। ১৪৭৭ খ্রিস্টাব্দে ইউসুফ শাহ দেহরক্ষী বাসুদেব বসুকে সঙ্গে নিয়ে আছিয়া খাতুনের পরগনায় ফিরেন। এসময় তিনি পৃষ্ঠপোষকদের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত মসজিদ নির্মাণের কাজ শেষ করার তাগিদ দেন। নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর বরবক শাহের নামানুসারে মসজিদটির নামকরণ করা হয় শাহী মসজিদ। একপর্যায়ে পরগনার ১৮ বিঘা জমি মসজিদের নামে দিয়ে দেওয়া হয়। এসময় মসজিদের দায়িত্বভার আমীর জয়েনউদ্দিন হারাভী, আমীর শিহাবউদ্দিন ও মনসুর সিরাজীকে বুঝিয়ে দিয়ে ইউসুফ শাহ পৃষ্ঠপোষক বাসুদেব বসুকে নিয়ে তার রাজ্য উড়িষ্যায় ফিরে যান। বরবক শাহ’র আমলে চট্রগ্রাম ও পটুয়াখালীর মীর্জাগঞ্জেও দুটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়। জানা যায়, শাহী মসজিদের পাশে রয়েছে ৫ টি কবর। এলাকার বর্ষীয়ান মুরুব্বিদের মতে, এখানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন পরগনার মালিক আছিয়া খাতুন, মুসলমান সাহিত্যিক আমীর জয়েনউদ্দিন হারাভী, আমীর শিহাবউদ্দিন ও মনসুর সিরাজী। আরেকজন শমসের মিয়া নামে এক পথচারী। জানা যায়, মোগল আমলের পতনের পরে ১৮৮৬ সালে ইংরেজ শাসনামলে তৎকালীন জমিদার জগদীশচন্দ্র বসু মসজিদটি মাটি দিয়ে ঢেকে ফেলেন। পরে এর পাশেই জমিদাররা হিন্দুদের তীর্থস্থান তৈরি করেন। একপর্যায়ে মসজিদটি জঙ্গল দিয়ে ঢেকে যায়। এর চিহ্ন পর্যন্ত দেখা যায়নি। ১৯২৫ সালের দিকে সাত ফুট উচ্চতা সম্পন্ন শমসের মিয়া নামে এক পথচারী একদিন এর পাশ দিয়ে হেটে যাচ্ছিলেন। এসময় তিনি পাশ থেকে সুমধুর কন্ঠে কোরআন তেলওয়াত ও আজানের গায়েবী ধ্বনি শুনতে পেয়ে থমকে দাঁড়ান। এনিয়ে তার কৌতুহলও বেড়ে যায়। একদিন সে জঙ্গল পরিষ্কার করে ও মাটি খোদাই শুরু করে। পরে গম্বুজ দেখতে পেয়ে আশপাশের লোকজনকে ডেকে আনেন। কিন্তু তখন জমিদারদের ভয়ে অনেকে জুবুথুবু হয়ে থাকতো। পরে শমসের মিয়া পরিষ্কার করে মিনারে দাঁড়িয়ে আজান দেন। এসময় জমিদারদের নির্দেশে তাদের পাইক-পেয়েদা তাকে গুলি করে। পরে শমসের মিয়াকে পরগনার মালিক আছিয়া খাতুন ও মুসলমান তিন সাহিত্যিকের পাশেই দাফন করা হয়। এনিয়ে কলকাতা আদালতে শমসের মিয়ার মা জমিলা খাতুন মামলাও দায়ের করেন। জানা যায়, বর্গাকার মসজিদটির দৈর্ঘ্য-প্রস্থ ৪০ ফুট করে। চারপাশের দেয়াল ছয় ফুট আট ইঞ্চি চওড়া। পূর্বপাশে রয়েছে খিলান আকৃতির প্রবেশপথ। এর ইটের দৈর্ঘ্য ১২ ইঞ্চি, প্রস্থ ১০ ইঞ্চি এবং চওড়া ২ ইঞ্চি। বর্তমান যুগের ইটের চেয়ে এর আকৃতি একেবারেই আলাদা। মসজিদের গম্বুজ খাজকাটা। গম্বুজের চূড়া গোলাকার ও সুচালো। খিলানের চারপাশ লতাপাতার কারুকাজ। ঐতিহ্যের সাক্ষী হিসাবে টিকে থাকা এই শৈল্পিক স্থাপনার শরীরজুড়ে এখন শুধুই অযতœ আর অবহেলার ছাপ। তবে এ পর্যন্ত প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের কারো পা পড়েনি এই স্থাপনায়। মসজিদ পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আমির হোসেন মিয়া বলেন, বাপ-দাদাগো মুখে হুনছি এই মসজিদের বয়স সাড়ে ৫০০ বছরের মতো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *