প্যারাডাইজ পেপারস কী?

প্যারাডাইজ পেপারস কেলেঙ্কারিতে নারায়ণগঞ্জের ৩ ব্যাবসায়ী! ১৬ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে প্রেস নারায়ণগঞ্জসহ বেশ কিছু স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমে এ সংবাদ প্রকাশের পর অনেকের কাছেই প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়- প্যারাডাইজ পেপারস কী?

বিশ্বের ক্ষমতাধর ব্যাক্তিত্ব ও ব্যবসায়ীদের গোপন নথি প্রকাশের ঘটনা জার্মান একটি গণমাধ্যমে প্রথমবারের মতো ঘটে ২০১৬ সালে। তখন সে তথ্য ভান্ডারের নাম দেয়া হয় পানামা পেপারস। ২০১৭ সালের নভেম্বরে সেই একই গণমাধ্যমে ঘটনাটির পুনরাবৃত্তি ঘটলে তথ্য ভান্ডারটি প্যারাডাইস পেপারস নামে প্রকাশিত হয়। এ সকল নথি প্রকাশের পর সারা বিশ্বে রীতিমতো হৈচৈ পড়ে যায়। সেখানে ফাঁস হয়েছে বিশ্বের ক্ষমতাধর অনেক ব্যক্তির গোপন তথ্য। শতাধিক রাজনৈতিক নেতা ও হাইপ্রোফাইল মানুষের নাম রয়েছে এ তালিকায়। গোপন নথিতে উঠে এসেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ব্রিটেনের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ, কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর মতো বাঘা বাঘা মানুষের গোপন তথ্য।

প্যারাডাইস পেপারস কী
প্যারাডাইস পেপারস বিশ্বের ২৫ হাজারেরও বেশি প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক লেনদেন ও মালিকানা-সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্যের এক বিশাল ডাটাবেজ। এ প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিক পৃথিবীর ১৮০টি দেশের ধনী, সুপরিচিত ও প্রভাবশালী ব্যক্তি। মূলত একটি ফার্মের এই নথিগুলো একসঙ্গে ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘প্যারাডাইস পেপারস’। নথিগুলো ওই ফার্মের ক্লায়েন্টদের গোপন বিনিয়োগ, অর্থ পাচারসহ কর ফাঁকির বিষয় প্রমাণ করে। বেশির ভাগ তথ্যই বিভিন্ন দেশের রাজনীতিবিদের, যারা কর থেকে বাঁচার জন্য বিভিন্ন ট্যাক্স হ্যাভেনে (কর দিতে হয় না কিংবা খুবই নিম্ন হারে কর দেওয়া যায় এমন দেশ) বিনিয়োগ করে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। তাই এই কেলেঙ্কারির নাম দেওয়া হয়েছে ‘প্যারাডাইস পেপারস’।
প্যারাডাইস পেপারসে বলা হয়, করের হাত থেকে বাঁচতে দেশের বাইরের বিভিন্ন স্থানে অর্থ খাটিয়েছেন বিশ্বের ১৮০টি দেশের বিত্তশালীরা। কর দিতে হয় না বা নামমাত্র কর দিয়ে বিনিয়োগ করা যায় এমন স্থানগুলোই বেছে নিয়েছেন তারা। অনেকেই এসব লেনদেন করেছেন সবার চোখের আড়ালে। টাকা কামানোর জন্য এসব বিনিয়োগের সঙ্গে জড়িত চমকে দেওয়া কয়েকজনের নাম প্রকাশ করা হয়েছে। সামনে আরও নাম প্রকাশ করা হবে বলে জানা গেছে।

এসব নথি প্রথমে একটি জার্মান দৈনিকের হাতে আসে। পরে সেসব নথি ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টসের (আইসিআইজে) হাতে তুলে দেন তারা। এসব নথি পেয়েছে বিবিসি, গার্ডিয়ানসহ বিভিন্ন দেশের ১০০টি সংবাদমাধ্যম। ২০১৭ সালের ৫ নভেম্বর আইসিআইজে তাদের ওয়েবসাইটে এ তথ্য প্রকাশ করেছে।

১ কোটি ৩৪ লাখ নথিপত্র নিয়ে তদন্ত করে খুঁজে বের করা হয়েছে কীভাবে শিল্পপতি ও রাজনীতিকরা বিদেশে টাকা সরিয়ে দেন। বিভিন্ন দ্বীপরাষ্ট্রে কোম্পানির জাল তৈরি করে কীভাবে কর ফাঁকি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়, উঠে এসেছে সেসব নানা তথ্যও।

নথির উৎস এবং ফাঁসের ঘটনা
২০১৬ সালে ফাঁস হওয়া পানামা পেপারসের মতো এবারও এসব নথি প্রথমে আসে জার্মান দৈনিক সুইডয়চে সাইটংয়ের হাতে। পরে সেসব নথি ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টসের (আইসিআইজে) হাতে তুলে দেন তারা। ১ কোটি ৩৪ লাখ গোপন নথির এই ডাটাবেজে রয়েছে ১৪০০ গিগাবাইটেরও বেশি ডাটা। নথিগুলোর প্রায় ৬৮ লাখ এসেছে অফশোর আইনি সেবা সংস্থা অ্যাপলবাই এবং করপোরেট সেবা সংস্থা এস্টেরা থেকে। ২০১৬ সালে এস্টেরা আলাদা হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠান দুটি একসঙ্গে অ্যাপলবাই নামে কর্মকাণ্ড চালাত। আরও ৬০ লাখ নথি ১৯টি আদালতের করপোরেট রেজিস্ট্রি থেকে বের করা হয়েছে। আদালতগুলোর বেশির ভাগই ক্যারিবীয় অঞ্চলের। বাকি অল্প কিছু নথি পাওয়া গেছে সিঙ্গাপুরভিত্তিক আন্তর্জাতিক ট্রাস্ট এবং করপোরেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান এশিয়া সিটি ট্রাস্ট থেকে। প্যারাডাইস পেপারসে ফাঁস করা নথিতে রয়েছে ১৯৫০ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত প্রায় ৭০ বছরের তথ্য।

আইনি সংস্থা অ্যাপলবাইয়ের সদর দফতর বারমুডায়। ১৮৯০-এর দশক থেকে বিশ্বব্যাপী কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। এই কোম্পানি বিদেশের বিচারব্যবস্থায় কম বা শূন্য কর হারে কাজ করতে তাদের গ্রাহকদের সাহায্য করে থাকে। তাই বর্তমানে এটি হয়ে উঠেছে অফশোর আইনি সেবাদানকারী বিশ্বের সবচেয়ে বড় দশ প্রতিষ্ঠানের একটি।

পানামা বনাম প্যারাডাইস
২০১৬ সালের এপ্রিলে কর ফাঁকির তথ্য ফাঁস করে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন ফেলেছিল পানামা পেপারস। পানামা পেপারসের মতো এবারও প্যারাডাইস পেপারস নামে অর্থ কেলেঙ্কারির তথ্য ফাঁস করেছে একই জার্মান দৈনিক। দুই তথ্য ফাঁসের তুলনা করছেন? চলুন দেখে নেওয়া যাক প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে পানামা পেপারস বনাম প্যারাডাইস পেপারস—

পানামা পেপারসে ফাঁস হওয়া নথির সংখ্যা ছিল ১ কোটি ১৫ লাখ। এদিক দিয়ে প্যারাডাইস পেপারসের আকার বড়। কেননা এতে নথি আছে ১ কোটি ৩৪ লাখের বেশি। কিন্তু ডাটাবেজের আকারের হিসেবে প্যারাডাইস পেপারসের তুলনায় পানামা পেপারস অনেক বড়। প্যারাডাইস পেপারসের ডাটা ১৪০০ গিগাবাইট এবং পানামার ডাটা ২৬০০ গিগাবাইট।

প্যারাডাইসের তথ্য অনুসন্ধান ও ফাঁসের কাজে যুক্ত সাংবাদিকের সংখ্যা (৩৮১) পানামা পেপারসের (৩৭৬) চেয়ে বেশি। তবে মিডিয়া পার্টনার ও সংশ্লিষ্ট দেশের হিসেবে পানামা পেপারসের সঙ্গে যুক্ত ছিল ৭৬টি দেশের একশরও বেশি মিডিয়া পার্টনার। আর প্যারাডাইস পেপারসে আইসিআইজে এখন পর্যন্ত ৬৭টি দেশের ৯৬টি মিডিয়া পার্টনারকে যুক্ত করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *