করীম রেজা’র গল্প ‘কে’

ভুরু কুঁচকে ওঠায় চায়ের কাপে শেষ চুমুকটি আর দেয়া হয় না ।

বুকের মধ্যে কেমন খচ্ করে শব্দ হয়। কানে বাজে।
ধীরে চায়ের কাপ নামিয়ে রাখি। আড়চোখে আশেপাশে দেখি। বুকের শব্দ কেউ শুনতে পেয়েছে কিনা। পেয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে কি-না!

নাহ! কেউ দেখছে না। তাহলে শুনতে পায়নি। ব্যথাটি যে ডাক্তারের ব্যথা নয়, তা নিশ্চিত। শরীর এতটুকু নড়েনি। মুখের চামড়ায় সামান্য ভাঁজ ঝিলিক দিলেও তা দেখার মত দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বাইরে শুধু ভ্রূ কুঁচকে ছিল, আর কিছু নয়। কিন্তু শব্দ ঠিকই হয়েছে, বিঁধেছেও।
নিঃশব্দে হাত উঠে যায় বুকে।  যেখানে খচ্ করে লেগেছে। হাতে হৃদয়ের ওঠাপড়ার শব্দ ঠেকছে। কিন্তু খচ্ করার কোনও কারণ বুঝতে পারছি না।
সারাদিন খুব অস্থিরতায় কাটলেও আর কিছুই ঘটলো না।

গলির মুখে চায়ের দোকান। পুরনো দোকান, পুরনো খদ্দের। সুতার দোকানের সরকার। দোকানে সকালের প্রাথমিক কাজকর্ম সেরে একবার চায়ের দোকানে বসি। পিরিচে ঢেলে কাপের অর্ধেক চা খাই ফুরুত আওয়াজ করে। বাকী অর্ধেক চা খাই আস্তে-সুস্থে চুমুকে চুমুকে বহু দিনের অভ্যেস। দোকানের সামনের রাস্তা দিয়ে কারা আসে যায়, সবাইকে চিনি। চেনা সকাল, চেনা রাস্তা, রাস্তার মানুষ। চোখ বন্ধ করেও বলতে পারি লাল গামছা কাঁধে ঝুলিয়ে কোন্ সর্দার গুদামের চাবির গোছা কোমরে গুঁজে হেলেদুলে চলছে কখন। কার কত বছর হলো কোন্ দোকানে সব নামতার মত বলে দিতে পারি। চোখাচোখি হলে অনেকেই হাত উঠিয়ে সালামও দেয়। তবে আমি এই সময়ে শব্দহীন জবাব দিয়ে চুপচাপ থাকাটাই পছন্দ করি বেশি।

আগের দিনের মত আজও চায়ের দোকানে বসে। শেষ চুমুকের তখনও কয়েক চুমুক বাকী। ঠিক তখনই কালকের মত আবারও খচ্ করে শব্দ হলো, ব্যথাও পেলাম খুব। বিষয়টা ভুলেই গিয়েছিলাম। কাল সকালের চায়ের দোকানের এই ঘটনার পর আর কোথাও কিছু হয়নি। আমিও ভুলেছিলাম, তেমন মনে রাখিনি। কিন্তু এখনকার হৃদয়ের গোড়ায় আবার খোঁচা লাগায় আমার ভাবনা হলো, অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়লো মনে মনে, কোষে কোষে। সারা শরীর ঘেমে উঠলো। কাল কিন্তু ঘামিনি। ভয় পেলাম আজ। কিছু বুঝতে না পেরে গদিতে গিয়ে ফুল স্পীডে ফ্যান চালিয়ে দিয়ে চার হাত পা ছড়িয়ে দিলাম।

শান্ত বোধ করলাম কিছুক্ষণের মধ্যেই। কালকের মতো সেই রকম অস্থিরতা বোধ করলেও সারাদিনের বাকী সময়ে আর কিছুই হলো না
ডাক্তারের কাছে যাবার মানসিক চিন্তাও মুলতবী হয়ে রইল।
পরের দিনও কাপ হাতে নিয়ে ভয়ে ভয়ে বসে আছি চায়ের দোকানের টুলে। আজও কি শব্দ শুনবো? ঠিক তাই।
ভয় পেয়ে, চা পুরা না খেয়েই বের হলাম দোকান থেকে। ভূত-পেত্নীর কথা মনে আসলো। চিন্তা হলো জ্বীন-পরী কিনা! কিন্তু তা হতে পারে না। এসবে আমার বিশ্বাস নষ্ট হয়েছে অনেকদিন।

পরদিন সাপ্তাহিক ছুটি। কোনও কাজ নেই। তবুও অদৃশ্য আকর্ষণে দোকানে এসে বসেছি। অনায়াসে, কোন ঘটনা ছাড়াই চা খাওয়া হয়ে যায়। কোথাও কোন শব্দ নেই, ব্যথা নেই। সাহস করে আরও কিছুক্ষণ বসেই থাকি। আবার আরও সাহস করে হিসাবের বেশী আরেক কাপ চা খেয়ে নিজে নিজেই পরীক্ষা করি। খচ্ করার কারণ খুঁজি। পাই না কিছুই। কিন্তু চিন্তা আমার মাথায় গ্যাঁট হয়ে গেঁথে যায়।

পরদিন যথানিয়মে নিত্যদিনের কাজকর্ম সেরে এসে চায়ের দোকানে বসি। চায়ের কাপ শেষ; তবুও অনেকক্ষণ বসে থাকি। আশ্চর্য অনুভব করি, আজ কোনও ঘটনা ঘটে না বলে। ওই মুহূর্তেই সামনের চির পরিচিত রাস্তায় একটি অবিশ্বাস্য, অসম্ভব কারণ আবিষ্কার করি।
সাথে সাথেই আমার ব্যথার কারণও আঁচ করতে পারি। জ্বীন-পরী, ভূত-পেত্নী কিছুই নয়। শরীরের কোনও বিকারও না। একজন মানুষ, কারণ—একজন ক্ষুদ্র মানুষ মাত্র।
এদিকের রাস্তায় নবাগত এই শিশু মানব। তাকে প্রথমদিন দেখেই ভুরু কুঁচকে উঠেছিল। চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়েছিল। খচ্ করে বেঁধা হৃদয়ের আঘাত চিন্তা করার সুযোগ দেয়নি আর কিছু। তাতে সহজ কারণটি নজরে আসে নাই।
অপরিচিত, নতুন কেউ এই রাস্তায় আসলে আমার চোখে না পড়ে যায় না।
পাশের মহল্লায় একটি স্কুল আছে। সদর রাস্তা উল্টা দিকে। গলির মুখ থেকে আরেকটি সরু গলি গিয়ে শেষ হয়েছে স্কুলের অদূরে। সময় বাঁচানোর জন্য গলিপথ বেশ জনপ্রিয়।

সহজে স্কুলে  যাওয়ার জন্য তার এই গলিপথে আসা। স্কুলে যায়। হবে আশে পাশের নতুন কোন ভাড়াটিয়ার বাচ্চা। কাঁধে স্কুলের ব্যাগ, গুটি গুটি পায়ে টুক টুক করে চলা মানুষ। আমার দৈনিক কাজ এখন তাকে দেখা। হাতে কাঠি লেবেনচুষ অথবা আইসক্রিম অথবা বুট ভাজা। তাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখাই আমার এখন সর্বশ্রেষ্ঠ কাজ।
খঁচ্ করে বেঁধার মত শব্দ আর হয় না এখন। তবে বিষণ্নতা তিতা চায়ের মতো আমার শরীর জুড়ে থাকে আজকাল। সময় ভরে ছড়িয়ে থাকে নিঃশব্দ যন্ত্রণা। ঘুম থেকেও প্রায়ই জেগে উঠি। টের পাই বুকের ভেতর এক নীরব কষ্ট। মাথায়, বুকে, চারিদিকে এক সীমাহীন শূন্যতা।

সকালের কাজকাম অসমাপ্ত রেখেই এখন চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বসে থাকি চায়ের দোকানে। চুমুক দিয়েই বুঝতে পারি শিশু মানবের আসতে আরও দেরী। তবুও আমি বসে থাকি। বসে বসে বুঝতে পারি। আমি এখনও তাকেই খুঁজছি। সে যদিও এর চেয়ে বয়সে আরও বড় হবে। তারপরও একে দেখেই ওর কথা বেশী করে মনে হয়।

ফুপুর বাড়িতে আশ্রিত ছিলাম। ফুপাতো বোন চুনির সাথে বিয়ের কথা ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি। বউ মনে করি চুনিকে। বাইর বাড়ির যে ঘরে আমার থাকার জায়গা, তার কাছের  ঘরে ঘুমায় চুনি। ওর প্রতি আমার খুব টান। আমার অস্থিরতা স্নায়ুর নিয়ন্ত্রণ হারায়। এক শীতের ঠাণ্ডা রাতের অন্ধকারে ওর লেপের তলায় নিজেকে সাবধানে লুকিয়ে ফেলি।

ওই ঘটনার কয়েকমাস পরই ওর সাথে আমার সামাজিক বিয়ের অনুষ্ঠান হয় সমারোহে। নিয়ন্ত্রণ ছাড়া যৌবনের হঠাৎ বেড়ে ওঠা সময়ের ছাপ পষ্ট হতে থাকে চুনির শরীরে। বিয়ের অল্প পরেই তড়িঘড়ি সেই শীতের রাত, রাতের অসীম আনন্দ ঝেড়ে ফেলি। জন্মের আগে ছিল অবাঞ্ছিত। জোর খাটিয়ে জন্ম হলো ত্বরান্বিত। আর জন্মের পর পরিত্যক্ত।
চুনি বলেছিল অনেকবার, সেই, সেই-মেয়ের কপালে ছিল জোড় ভ্রূ, ঘন কালো, আমারই মতো। এই মেয়ের কপালে চোখের উপরও ঠিক তেমনই ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *