কোন্দলে পিছিয়ে পড়েছে বিএনপি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় ক্ষমতাসীনরা

ডান্ডিবার্তা রিপোর্ট

নারায়ণগঞ্জে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ধীরে ধীরে পাল্টাতে শুরু করেছে। জেলার বিএনপি দলের পদ পদবীধারীদের বিভক্তিতে চলে যাওয়া সহ ত্যাগী নেতাকর্মদের মূল্যায়ন না করার ফলে দিন দিন এ দলের কার্যক্রম পিছিয়ে পড়ছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে মনোনয়ন ইস্যুতে বিভক্তি দেখা গেলেও জেলার বিভিন্ন স্থানের উন্নয়ন সহ শহরের গলার কাটা যানজট নিরসনে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা মাঠে নেমে যানজট মুক্ত করতে সক্ষম হলেও চারদিকে আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে উঠে আসে। এসব কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা ফের ঘুরে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। জানা গেছে, ‘নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সর্বশেষ নির্বাচনে বিএনপির কেন্দ্র  থেকে জেলার সভাপতি অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকারকে নির্বচানে অংশগ্রহণ করার কথা উঠলে তিনি নির্বাচন থেকে সরে আসেন। এতে করে বিএনপির কেন্দ্রীয় হাইকমান্ডের সাথে তার টানাপোড়ন শুরু হলে দূরত্ব বাড়তে থাকে। এসময় সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াতকে মনোনয়ন দেয়া হয়। এদিকে নাসিক নির্বাচনের পর বিএনপির নতুন কমিটি ঘোষণা করা হলে অনেকটা জেদের বসে তৈমূর আলম খন্দকারকে বাদ দিয়ে কাজী মনিরকে সভাপতি ও মামুন মাহমুদকে সাধারণ সম্পাদক করে জেলা বিএনপির কমিটি ঘোষণা করা হয়। অথচ এর আগে কাজী মনিরকে দলের কোন কর্মসূচিতে তেমন সক্রিয়া দেখা যায়নি। আর অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকার বিগত দিনে নিঃস্বার্থভাবে দলের জন্য কাজ করে ত্যাগী নেতার খেতাব কুড়িয়েছেন। এছাড়া তার সাথের নেতাকর্মীরাও হামলা, মামলা, জেলা, জুলুম উপেক্ষা করে মাঠ গরম করে দলের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন। তবে বিএনপির নতুন কমিটিতে এসব ত্যাগী নেতাদের অনেকের ঠাঁই হয়নি। এতে করে ত্যাগী নেতারা অবমূল্যায়িত হওয়ার ফলে দলের কার্যক্রম থেকে অনেকটা ছিটকে পড়ে। আবার অনেকে ক্ষোভে অপমানে দলের কার্যক্রম থেকে নিজেকে আড়াল করে রাখে। এর মধ্যে তৈমূর আলম খন্দকারের ছোট ভাই ১৩ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও মহানগর যুবদলের আহবায়ক মাসুকুল আলম খন্দকার খোরশেদকেও মূল্যায়ন করা হয়নি। গত ৮ ফেব্রুয়ারী বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার দুর্নীতির রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সারা দেশের মত এ জেলার বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে নাশকতার শঙ্কায় মামলা দায়ের করা হয়। এতে জেলার ৭ টি থানায় মোট ১৩ টি মামলা দায়ের করা হয়। আর তাতে কয়েক হাজার নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেয়া হয়। এসময় দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের ধরপাকড়ের মধ্য দিয়ে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়। এদিকে দলের কেন্দ্রীয় কমসূচিগুলো ঠিক মত পালন করতে পারেনি। হাতে গোনা কয়েকজন কর্মী নিয়ে নামে মাত্র দায় এড়ানো কর্মসূচি পালন করতে দেখা যায়। আর পুলিশ  প্রশাসন এই সুযোগে দলীয় কর্মসূচি পালনে বাধা দিলে তারা আরো কোনঠাসা হয়ে পড়ে। এ সময় দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের শূণ্যতা দেখা দিলে বিগত দিনে ত্যাগী নেতা হিসেবে  চিহ্নিত তৈমূর আলম খন্দকাারের বলয়ের নেতাকর্মীদের নাম সবার মুখে উঠে আসে। আর দলের বর্তমান পদ পদবীধারী অধিকাংশ নেতাদের কেউ কেউ ঘরকুনো হয়ে পড়ে। আবার অনেকে পরিস্থিতি বুঝে মাঠে নামলেও অনেকটা ব্যাকফুটে স্পৃহাতে কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন। এতে দলের নেতাকর্মীদের অনৈক্যের বিষয়টি সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়।  এদিকে ত্যাগী নেতা হিসেবে তৈমুরের সাথে একনিষ্টভাবে কাজ করা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এটি এম কালাম বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। আর মহানগরের সভাপতি আবুল কালাম ও সিনিয়র সভাপতি অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত দুইভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এছাড়া বিগত দিনের ত্যাগী নেতাদের অবমূল্যায়নের মধ্যে দিয়ে আগে থেকেই দলের নেতারা বিভক্ত হযে পড়েছেন। এতে করে দলীয় কমসূচিগুলোতে তারা জোরালো সারা ফেলতে পারছেনা। আর সাংগঠনিক দিক দিয়েও দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিএনপি দলের নেতাকর্মীরা যখন বিভক্তিতে কোনঠাসা হয়ে পড়েছে তখন ক্ষমতাসীন দলের মহাজোটের নেতাকর্মীরা আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নকে ঘিরে বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে। মনোনয়ন প্রত্যাশীদের একে অপরের সমালোচনা করে বক্তব্য দিলে বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে। তবে এ সময় আওয়ামীলীগ ও জাতীয় পার্টির মনোনয়ন প্রত্যাশী ও একই দলের একাধিক মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যকার বাকযুদ্ধ দেখা যায়। এতে করে মহাজোটের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভক্তি দৃশ্যমান হতে থাকে। এর মধ্যে জাপা নেতা ও এমপি সেলিম ওসমানের সাথে একই আসনের আওয়ামীলীগ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের পক্ষ নেয়া জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি আব্দুল হাই ও সেক্রেটারি আবু হাসনাত শহীদ মোহাম্মদ বাদল বাকবিতন্ডয় জড়িয়ে পড়ে। এদিকে ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জ আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে শ্রমিক নেতা কাউসার আহম্মেদ পলাশ ইতোমধ্যে চাঁদাবাজি সহ নানা অপকর্মের বিতর্কের জালে জাড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়। এর জের ধরে তার লোকজনেরা প্রকাশ্যে সাংবাদিকের চামড়া তুলে নেয়ার হুমকি দিয়ে মিছিল করে। এর কিছুদিন পর নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সামনে এক শ্রমিক নেতা পলাশের লোকেরা মানববন্ধন করাকালে বক্তারা বলেন, ‘সাংবাদিকেরা পলাশকে গডফাদার বানানোর চেষ্টা করছে। কারণ তিনি এই আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশা করেছেন।’ এদিকে এই আসন থেকে আনেক আগে থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে বহাল রয়েছেন বর্তমান এমপি শামীম ওসমান।  এদিকে নব্য হাইব্রিড নেতা কামাল মৃধা যিনি পল্টিবাজ হিসেবে সবার কাছে বেশ পরিচিত রয়েছে। কারণ তিনি বিগত দিনে আওয়ামীলীগ থেকে পল্টি মেরে বিএনপিতে যোগদান করে সুসময়ের মাছির মত ফের আওয়ামীলীগে যোগদান করেছেন। তবে তার এই পল্টিবাজির ব্যাপারটি দায়ভার তার কথিত রাজনীতিক গুরু মহানগর আওয়ামলীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেনের কাধে চাপিয়ে দেন। গত ২৮ এপ্রিল শনিবার দুপুরে শহরের নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের কনভেনশন হলে নৌকার মাঝি সংগঠনের পক্ষ থেকে আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে কামাল মৃধা নিজের রাজনৈতিক কর্মকান্ড করতে গিয়ে নির্যাতন, জুলুম, মামলা ও মৃত্যুর পথ থেকে বেঁচে আসার ঘটনার কথাও বলেন। একই সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি ও নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেনকে ‘রাজনৈতিক পিতা’ দাবি করে জানান তাঁর নির্দেশে জীবন রক্ষার জন্য বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন তবে সেখানে তিনি কোন পদ পাননি। বরং সেটাও ছিল আদর্শগত ভাবে বিএনপি নয়। যা আনোয়ার হোসেনও জানেন।’ তবে এ ব্যাপারে সভাপতি আনোয়ার হোসেন সবকিছু অস্বীকার করেছেন। আর এ ব্যাপারটিতে অভিযোগ উঠছে কোন এক শ্রমিক নেতার অনুষ্ঠানে যোগদান না করার প্রেক্ষিতে তার প্রেসক্রিপশনে মোট অংকের টাকার বিনিময়ে কামার মৃধা এ ধরণের কাজ করছে বলে একাধিক সূত্র বলছে। তবে এতোকিছুর পর মহাজোটের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভক্তি দেখা দিলেও সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে তাল মিলিয়ে তারা ঘুরে দাড়াতে শুরু করেছে। নারায়ণয়ঞ্জ-৪ আসনের এমপি শামীম ওসমান ডিএনডির জলাবদ্ধতা দূরীকরণে ৫৫৮ কোটি টাকা মেগা বাজেটের মধ্য দিয়ে কাজ শুরু করায় ইতোমধ্যে প্রশংসা কুড়াতে শুরু করেছেন। এছাড়া শহরের গলার কাটা যানজটের ভোগান্তি নিরসনে তার নির্দেশে নবগঠিত জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সড়কের যানজট নিরসনে কাজ করেন। এতে করে একদিনের মধ্যে শহরের যানজট উধাও হয়ে সড়ক অনেকটা ফাঁকা হয়ে পড়ে। এই কাজের মধ্য দিয়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মী সহ এমপি শামীম ওসমান শহরের টক অব দ্যা টাউনে পরিণত হয়েছেন। তাছাড়া পুলিশ প্রশাসন যেই কাজটি করতে ব্যার্থ হচ্ছেন ছাত্রলীগের কর্মীরা এমপির নির্দেশের একদিনের মধ্য তা  করে দেখিয়েছেন। পরে অবশ্য পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তারা এমপির কড়া বক্তব্যের রোশানলে পড়ে যানজট নিরসনের ব্যাপারে হার্ডলাইনে অবস্থান করেন। সদর-বন্দর আসনের এমপি সেলিম ওসমান শিক্ষাখাত থেকে শুরু করে উন্নয়নের বিভিন্ন খাতে কাজ করে যাচ্ছেন। তবে শীতলক্ষ্যা সেতু নির্মানে তিনি বেশ দৌড়ঝাঁপ করলেও তা নির্মাণ বেশ সময় সাপেক্ষ বলে সাময়িকভাবে ফেরী চালুর ব্যাপারে কাজ করেন। ইতোমধ্যে ফেরীর র‌্যাম সিড়ি তৈরি হলেও ফেরী সার্ভিস কয়েকদিনের মধ্যে তা চালু হতে যাচ্ছে বলে জান াগেছে। এছাড়া রমজান মাস উপলক্ষ্যে প্রতি বছরের মত এ বছর সেন্ট্রাল ঘাটের সবকটি ট্রলার এক মাসের জন্য ফ্রি করে দিয়েছে। এভাবে নানা উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে জনগণের প্রশংসা কুড়াতে শুরু করেছেন এই নেতা। অন্যদিকে জেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সুফিয়ান বিশাল শোডাউন করে আলোচনায় উঠে এসেছে। তিনি তৃণমূল পর্যায়ে মানুষের কাছে দিয়ে নৌকার পক্ষ্যে জনমত তৈরি করছেন। এছাড়া সমাজের উন্নয়মূলক নানা কাজে ভূমিকা পালন করছেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ‘মহাজোটের নেতারা মনোনয়ন ইস্যুতে বিভক্তিতে চলে গেলেও তারা পরদর্শীতার সাথে উন্নয়মূলক নানা কাজের মধ্য দিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। মহাজোটের নেতারা এখন মাঠ গুছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। এতে মনে হচ্ছে, পরীক্ষার আগে শিক্ষার্থীরা যেমন খেলাধুলা-দুষ্টমি বাদ দিয়ে শুধুমাত্র পড়াশোনায় মনোযোগ দেয়। ঠিক তেমনি নির্বাচনের আগে একে অপরের রেশরেশি ছেড়ে জনমত তৈরি ও জনগণের মন জোগানোর কাজে ব্যক্ত হয়ে পড়ছেন। কারণ আগামী ডিসেম্বর মাসে যদি আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বচন অনুষ্ঠিত হয় তাহলে এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। আর  সেই প্রস্তুতির হিসেব কষেই নির্বাচনের জয়-পরাজয়ের সমীকরণ তৈরি হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *