বিভিন্ন অপকর্মে ডিবি-পুলিশ বির্তকিত হচ্ছে

ডান্ডিবার্তা রিপোর্ট

সাধারণ মানুষের সমস্যা কিংবা সঙ্কটে মানুষ আশ্রয় নিবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে এটাই স্বাভাবিক। বিপদে আপদে নিরাপত্তা চাইবে আইন শৃংখলা বাহিনীর কাছে। পরম বন্ধুর মতো রক্ষকের ভূমিকা নিয়ে সাধারণ মানুষের পাশে এসেও দাঁড়াবে পুলিশ। কিন্তু সেই রক্ষকই দিন দিন ভক্ষকের অবস্থায় চলে যাচ্ছে, আস্থা হারাচ্ছে মানুষের কাছে। নারায়ণগঞ্জের পুলিশ প্রশাসনের গুটি কয়েক অসাধু কর্মকর্তার জন্য ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। সাধারণ মানুষের জান-মালের নিরপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গঠিত পুলিশ বাহিনী একের পর এক অপকর্মে লিপ্ত হওয়ায় সাধারণ মানুষ আস্তা হারাতে শুরু করেছে। দিনদিন সাধারণ মানুষের কাছে যে অনাস্থার আরেক নাম হয়ে যাচ্ছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। চলতি বছরে নারায়ণগঞ্জে বেশ কয়েকটি বিতর্কিত ঘটনায় বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার নাম জড়িয়ে আসার মধ্য দিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে এ বাহিনী। কখনো কাউকে জিম্মি করে অর্থ আদায় করা, কখনো চাকরির কথা বলে অর্থ হাতিয়ে নেয়া আবার কখনো মাদকসহ গ্রেফতার হচ্ছে নারায়ণগঞ্জ জেলায় কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তারা। সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ঘটনা ফের প্রশ্নবিদ্ধ করেছে এ বাহিনীকে। এ নিয়ে চলছে এখন তুমূল আলোচনা-সমালোচনা। আবার মামলা দায়ের হলেও ভুক্তভোগি বিচারপ্রার্থী যথাযথ বিচার পাবেনা বলেও মনে করছেন অনেকে। তবে সে আর যাহোক, প্রশ্ন উঠেছে, পুলিশ যদি রক্ষক হয়ে ভক্ষকের বেশ ধারণ করে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে অর্থ হাতিয়ে নিতে চায় আর সে না পেয়ে যদি ডাকাত বানিয়ে আদালতে প্রেরণ করে, তাহলে এই সাধারণ মানুষগুলো যাবে কোথায়? জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের ইন্সপেক্টর গিয়াসউদ্দিন সদর উপজেলার ফতুল্লার গেদ্দার বাজার এলাকা থেকে জামাল হোসেন নামে এক গরুর খামারিকে ধরে নিয়ে আসেন। পরে খামারিকে ডিবি কার্যালয়ে ৪দিন আটকে রেখে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে তাঁর পরিবার থেকে ৫ লাখ টাকা দাবি করেন। এ ঘটনা জানিয়ে ভুক্তভোগি জামাল হোসেনের ছোট ভাই আমান পুলিশ সুপার বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেও এর কোনো প্রতিকার পায়নি। বরং পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দেয়ার কারণে তরিগড়ি করে জামাল হোসেনকে একটি ডাকাতি মামলায় আদালতে প্রেরণ করা হয়। এবং আদালত থেকে জামাল হোসেনকে রিমান্ডে এনে নির্যাতনও করা হয়েছে বলে তাঁর পরিবার দাবি করেছেন। অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তার অনৈতিক কর্মকা-ের পরও কোনো রকম ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় বাধ্য হয়ে ১০ জুন আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন ভুক্তভোগি জামাল হোসেনের ভাই আমান।  এতে আসামী করা হয় জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের ইন্সপেক্টর মো. গিয়াস উদ্দিন, উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. শহিদুল ইসলাম, সহকারি-উপপরিদর্শক (এএসআই) নাজিম উদ্দিন, মো. আমিনুল হক, কনস্টেবল মো. হাদিউজ্জামান, মো. ইব্রাহিম হোসেন, মো. আফাজউদ্দিন ও জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের সোর্স সদর উপজেলার মধ্য কাশিপুর এলাকার মজিবুল্লাহর ছেলে মো. মাহবুব, চর নরসিংপুর এলাকার মো. আলীর ছেলে মো. মিজানুর রহমান এবং ভোলাইল পশ্চিমপাড়া এলাকার জাহেদ আলীর ছেলে মো. সুমন আক্তারকে। বাদীর পক্ষে আদালতে মামলাটি দায়ের করেন অ্যাড. সাঈদুর রহমান (সাব্বির)। শুনানি শেষে বাদীর আবেদনটি আদালত আমলে নিয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দিয়েছেন, একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদ-মর্যাদার অফিসারকে দিয়ে মামলাটি দ্রুত তদন্ত করিয়ে তা দাখিল করতে। কোট পিটিশন মামলা নং ১২৩/১৮। এর আগে নারায়ণগঞ্জ সদর থানায় কর্মরত পুলিশের সহকারি-উপপরিদর্শক সরোয়ার্দী রুবেল ৫০ হাজার পিস ইয়াবাসহ আটক হওয়ার পর বেশ সমালোচিত হয়েছিলো পুলিশ। এরও আগে বন্দরে পুলিশে চাকরি প্রার্থী ২০ জনের কাছ থেকে ৮০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার ঘটনায় পুলিশের আরেক এএসআই’র বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছিলো। সে এখন জামিনে। এ নিয়েও তুমূল হই চই হয়েছিলো সর্বত্র। শুধু তাই নয়, এর কিছুদিন আগে এক ব্যবসায়ী ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করেছিলেন, নারায়ণগঞ্জ গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে তাঁর কাছ থেকে তিন বারে ৫০ লাখ টাকা নিয়েছিলেন। এছাড়াও বিএনপির এক নেতার কাছ থেকে গ্রেফতার না করার শর্তে টাকা নেয়ার ঘটনা নিয়েও তোলপাড় হয়েছিলো ডিবি পুলিশের বিরুদ্ধে। এছাড়াও চেকপোষ্টের নামে নারায়ণগঞ্জের তিনটি স্পটে বেশ হয়রানির শিকার হতে হয় সাধারণ মানুষকে য নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার বলেই দাবি করেন অনেকে। এতো এতো বিতর্কের পরও পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষ কীভাবে আস্থা রাখবে? এমন প্রশ্ন এখন সর্বত্রই ওঠেছে। এ প্রসঙ্গে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ এর নারায়ণগঞ্জ জেলার সমন্বয়ক, বিল্লাল হোসেন রবিন বলেন, “পুলিশের মধ্যে জবাবদিহিতা না থাকার কারণে, স্বচ্ছতা না থাকার কারণে বারবার পুলিশ বিতর্কে জড়িয়ে যাচ্ছে। নানা ধরণের অপরাধ কর্মকা-েও পুলিশ সম্পৃক্ত হয়ে যাচ্ছে। এতে করেই বোঝা যায় সাধারণ মানুষের অবস্থাটা কতটা ভয়াবহ।” তিনি আরও বলেন, “দুঃখজনক হলেও সত্যি পুলিশ আজকাল এতটাই অপরাধ প্রবণ হয়ে পড়েছে যে, সাধারণ মানুষকে ধরে এনে টাকা না পেয়ে মাদক দিয়ে ফাঁসিয়ে দিচ্ছে, ডাকাত বানিয়ে ফাঁসাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে পুলিশের প্রতি আর মানুষের আস্থার জায়গাটা থাকবে না। প্রচলিত আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য এবং সংবিধানে পুলিশকে যেভাবে চলার পথ দেখিয়েছে সে জায়গাটা থেকে পুলিশ সরে আসছে কেবল মাত্র জবাবদিহিতার অভাবে। এবং এ কারণে পুলিশ দ্বারা মানুষের মানবধিকারও লঙ্ঘিত হচ্ছে।” রবিন বলেন, “পুলিশ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধনটা জোরালো করতে হলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একজন মানুষের যতটুকু আইনি সহায়তা পাওয়ার অধিকার তা নিশ্চিত করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে কোনো ভাবেই যেন মানবাধিকার লঙ্ঘিত না হয়, পুলিশ দ্বারা কোনো ভাবেই যেন সাধারণ মানুষ, বিচারপ্রার্থী ভুক্তভোগি না হয়। তা হলেই পুলিশ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধনটা শক্ত হবে।” এ ব্যপারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা কপিয় পুলিশের বিভিন্ন অপকর্মে বিভ্রত প্রকাশ করে বলেন, মাদক ব্যবসা কিংবা আইন বহিভ’র্ত কর্মকান্ডের সাথে জড়িত কাউকেই এ পর্যন্ত ছাড় দেয়া হয়নি। গুটি কয়েক সদস্যের জন্য সমগ্র পুলিশ বাহিনী দায়ি নয়। যারা ইতিমধ্যে বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িত থাকার প্রমান পাওয়া গেছে তাদের প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ডিবি পুলিশের অপকর্মে জড়িতদেরও ছাড় দেয়া হবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *