আজ : মঙ্গলবার: ৮ ফাল্গুন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ | ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ইং | ২ জমাদিউস-সানি ১৪৩৯ হিজরী | ভোর ৫:৩২
fevro
শিরোনাম

নারকীয় সমাজ বাস্তবতা ও উত্তরণপর্ব

রাজনীতি আমাদের সমাজকে এমনভাবে চেপে ধরেছে চরম সত্য এমনকি জীবননাশের সংবাদও এখন তুচ্ছ। আমরা এখন মানতে মানতে সব মানছি। এককালে একজন মানুষের নাই হবার খবরে সারাদেশ তোলপাড় হয়ে যেত। এখন? খবরে দেখলাম চাটগাঁয় এক ছেলে রাতে বড় ভাইকে মেরে সকালে গেছে দাওয়াত খেতে। যে হাতে বড় ভাইয়ের রক্তের দাগ, সে হাতে বিরিয়ানি মুখে উঠল কিভাবে? কতটা নির্মম ও পাষাণ হলে এমন ঘটনার পরও মানুষ স্বাভাবিক থাকতে পারে? ঢাকায় দেখলাম মার পরকীয়ায় স্বামী খুনের খবর। মেয়ে তা দেখে ফেলায় মা মেয়েকে খুন করতেও পিছপা হয়নি। এর আগে আমরা দেখেছিলাম মেয়ের হাতে মা বাবা খুনের খবর। এরপরও আমরা বলব আমাদের সমাজ স্বাভাবিক আর সহজ?

অথচ চারদিকে এত সংস্কার এত রাখঢাক আর এর আড়ালে চলছে মানুষের পশু হবার ধুম। এটা কেমন সমাজ? দেখবেন খোলামেলা বা উদার থাকার সময় এতসব অঘটনের খবর ছিল না। তখনো হতো তবে তা পরিমিত। যত আমরা নিজেদের সংকুচিত করছি তত অপরাধ বাড়ছে। এতে সমাজের যে অবনতি আর খারাপ দিক সেটি এখন আর গোপন কিছু না। সবচেয়ে বড় কথা হলো বাইরের মানুষ লাগছে না। ঘরের মানুষই ঘরের মানুষের দুশমন। লেখক থেকে সাংবাদিক, নেতা থেকে অভিনেতা, সাধারণ থেকে অসাধারণ সব পরিবারে আজ এই হাল। এর মানে কী? এর মানে যদি ধরে নেই ভাঙছে আর ভাঙতে ভাঙতে আমাদের জীবন হয়ে উঠছে এক যন্ত্রণা তবে দায়ী কারা? আমরা কি ভুলে যাব এদেশের খুনের রক্ত প্রথম বইতে শুরু করেছিল রাজনীতির কারণে। একটি ছাত্রাবাসে সাত খুন দিয়ে শুরু। তারপর হত্যা করা হলো বঙ্গবন্ধুকে। মানুষ দেখল রাষ্ট্রপ্রধানও এমন নির্মমভাবে পৈশাচিকভাবে খুন হতে পারেন। আর খুনিরা বলে নিজেরাই নাকি জাতীয় বীর। অতঃপর জেলখানায় এই জাতির সেরা নেতাদের মারার পর সে খুন কাউকে ছাড় দেয়নি। একসময় মনে হতো এ প্রক্রিয়া ছাড়া কেউ গদিতে যেতে পারবে না। সেটা আপাতত থেমে থাকলেও দুশ্চিন্তা মুছে যায়নি। গ্রেনেড মারার মতো ঘটনাও এদেশে গল্পের বাস্তবতায় শেষ হয়। কেউ দায় নেয় না। দায় নিতে চায় না। বিচার আইন সব হাতের মুঠোয় থাকলে যা হয়, সমাজ আস্তে আস্তে দুর্বল ও নিস্তেজ হয়ে যায়। মানুষের প্রতিরোধও কমে আসে।

বাংলাদেশ এখন আসলে সে বাস্তবতায়। সমাজ সংসার জীবনে সবাই যার যার ধান্ধায় ব্যস্ত। সকাল থেকে রাত অবধি মুখ গুঁজে আছে মোবাইলে-ল্যাপটপে। কে কি করছে কেউ জানে না। প্রস্তুতিহীন একটি জাতিকে খুলে দেয়া হয়েছে অপার যোগাযোগের খোলা দুনিয়া। যেখানে নারী শরীর পুরুষ দেহ বা মারামারি সব দেখা যায়। তারুণ্য কিভাবে সংযত থাকবে সেটা দেখছে আদৌ? কিভাবে যৌবন নিজেকে বাঁচিয়ে রাখবে? এর উত্তর কেউ জানে না। যারা জানেন তারা আছেন নিজেদের নিয়ে। ছেলেমেয়েরা বিদেশ থাকলেই নিরাপদ এমন ভাবনার বড় মানুষরা মজা দেখেন। আর পরিতৃপ্তির ঘুম নিয়ে বলেন আমাদের কী করার আছে? সাধারণ মানুষ আতঙ্কে থাকতে থাকতে সেটাও স্বাভাবিক হয়ে গেছে। কত ঘটনা। খুন, লাশ, রাস্তায় মারা যাওয়া সবই জায়েজ। ফলে মানুষ জানে, দু’একদিন আহাজারি হবে তারপর সব আগের মতো। এটাই ভয়াবহ। মানুষ যদি জানত যতদিন বিহিত না হচ্ছে ততদিন আইন ছাড়বে না। বিচার থামবে না তাহলে হয়তো ভার লাঘব হতো। সেদিকে কারো খেয়াল নাই।

সমাজের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে অনেক আগে। একদিকে সংস্কার কাপড় খাবার নিয়ে বাড়াবাড়ি আরেকদিকে সব খোলা। ফলে মিলছে না। যারা উদার সমাজ ও উন্নত দেশে যান বা যাবার অভিজ্ঞতা আছে তারা জানেন সেখানে চাইলেই যা খুশি করা যায় না। সীমিত সুযোগ। আর ভেতরে উদার এসব সমাজে ভালোবাসা দিলে সব পাওয়া যায়। আর ভালোবাসাহীন হলে নিজেকে নষ্ট করার আগে কিছুই পাবেন না আপনি।

আমাদের হিসাব উল্টো। নষ্ট হবার জন্য মুখিয়ে আছি আমরা। কালোটাকার স্রোত এমন এক ভয়াবহ পরিবেশ তৈরি করছে মানুষ ভাবে যা পাব তাই ভোগ করব। এই সীমাহীন ভোগের লালসা আজ সর্বগ্রাসী। মা বাবা ভাইবোন বা আত্মীয়তার মতো পবিত্র সম্পর্কও আজ হুমকির মুখে। কেউ কাউকে ছাড় দিচ্ছে না। আর একটা বিষয় ভালো করে ভাবা দরকার। নির্মল আনন্দ আছে আসলে? যারা সিনেমা করেন তারাও এখন নেমেছেন আর কারো চরিত্র হননে। নায়ক সিডনি এসে মঞ্চে ধর্মের দাওয়াত দেন। এটা কেমন কথা ভাই? আপনি ছবি করেন পর্দায় থাকেন। আপনার নিজের জীবন নিয়ে চিন্তা করেন আপনার দায় ধর্মের প্রচার? তার কাজ করবেন সম্মানিত ধার্মিকেরা। এসব কারণে কে কি করে কি বলে বোঝা দায়। আর অবুঝ সমাজ তো এমন বালখিল্য আচরণ ফালতু কাজ আর খুনোখুনি করবেই। অথচ কত মায়ার দেশ ছিল আমাদের।

আমাদের জীবনে পরিবার ছিল সবার চেয়ে প্রিয়। আমাদের মা বাবা ভাইবোনেরা ছিল মালার মতো। সবাই একেকটি ফুল। আজো সে ধারা আছে বৈকি। তবে আস্তে আস্তে মালা থেকে ফুল ঝরে পড়ছে। খালি সুতো পড়ে থাকলে একদিন সে সুতো গলায় দেবার দড়ি হবে বলে রাখলাম।

তখন আমার বয়স বারো কি তেরো, বলী নামের একজন সুঠাম পেশীবহুল দারুণ শরীরের মানুষকে সবাই জুতোর মালা গলায় পরিয়ে পাড়াময় ঘুরিয়ে ফিরছিল। আমিও গেলাম পিছে পিছে। কেউ কেউ দু’চার ঘা দিচ্ছিল বটে, এমন সময় পাড়ার মুরব্বি মাতবের নামে পরিচিত একজন ছুটে এলেন। তিনি আসতেই সবাই সতর্ক আর থমকে দাঁড়াল। ভদ্রলোক সব শুনে বললেন, বলীর পরিবার আছে। মেয়ে আছে দুটো। তোমরা কি তা ভুলে গেছ? জুতার মালা খুলে নাও। আর তার বিচার হবে সামাজিকভাবে। তার গায়ে হাত তোলার অধিকার নাই কারো। তার কথা শুনে সেভাবেই ছেড়ে দেয়া হয় বলীকে। এর কিছুদিন পর বলীরা আমাদের পাড়া ছেড়ে চলে যায়। বলীর অপরাধ ছিল পরকীয়া। কিন্তু না বলী না সে মহিলা কেউ শারীরিকভাবে নির্যাতিত হয়নি। বা কেউ তাদের জীবন কেড়ে নেয়নি। তারাও অন্ধমোহে কারো ঘাতকে পরিণত হবার সাহস করেনি। তখন আমরা ছিলাম গরিব দেশের মায়াময় আলোকিত জাতি। আজ আমরা যন্ত্রে কৌশলে ডিজিটালে আগুয়ান জাতি কিন্তু ভালোবাসার নাম এখন পরকীয়া মোড়ানো লালসা।

বাংলাদেশের মানুষের জীবনে আনন্দের উপকরণ কমিয়ে দিয়েছে রাজনীতি। নাটক সিনেমা গান সংস্কৃতি সব কেমন জালবন্দি। এই বন্দিদশা থেকে সমাজকে মুক্ত করতে না পারলে মানুষ আদিম লালসার বাইরে যেতে পারবে না। খেয়াল করবেন সত্তর থেকে নব্বই দশক সব জায়গায় সংস্কৃতি ছিল পুরোভাগে। গান বাজনা নাচ এসব মিলে সংস্কৃতি রাজনীতিকে আগলে রাখত। এরশাদ পতনের পর আমরা ধরে নিয়েছিলাম এবার অন্যদিকে মোড় নেবে সমাজ। অন্তত গণতন্ত্র আর উদারনৈতিক সমাজ কাঠামোয় মানুষ জীবনের সঙ্গে একটা সমঝোতা করে ভালো থাকবে। কিন্তু মানতে হবে একদিনের জন্যও তা হয়নি। খালেদা জিয়া-তারেকের আমল শেষ হবার পর ধরে নেয়া হয়েছিল এবার রাজনীতিবিদদের বোধোদয় হবে। এক এগারোর পর তাদের শরীর মনে আসবে পরিবর্তন। শোনা যায় নিগৃহীত রাজনীতিবিদেরা এমন শপথ করেছিলেন নিজের কাছে। কিছুই হয়নি।

গুটিকয় বাদ দিলে পুরাই খাই খাই ভাব। আর যা খুশি করার উদগ্র প্রবণতা। আওয়ামী লীগের আমলে এত খুন জখম মারামারি এত অনাচার কেউ আশা করেনি। মুখ বন্ধ রাখলেই কি ঘটনা চাপা পড়ে যাবে? মূলত গদি বা শাসন যখন পোক্ত মনে করা হয় তখন মানুষ এমন বেপরোয়া হয়ে ওঠে। যার পরিণতি কখনো সুখকর হয় না। আজ সমাজ কোথায় তারা কি জানেন না? রাজধানীতে একটি পরিবারে মা বাবাকে খুন করায় আর সে ঘটনা দেখে ফেলায় মেয়েও খুন হয় মায়ের আদেশ বা সম্মতিতে। আমরা আসলে কোথায় যাচ্ছি বা একদা মায়ার দেশ ভালোবাসার দেশ নামে পরিচিত দেশের সমাজ আজ কোথায় গিয়ে ঠেকেছে?

কারো সময় আছে ভাবার? কদিন পরপর এমন ঘটনা ঘটে আর আমরা মেনে নেই। নিতে নিতে এখন স্বামী স্ত্রী সন্তান হত্যাও মেনে নিয়েছি আমরা। দুনিয়ায় অসম্ভব সাড়া জাগানো একটা ছবি আছে যেখানে শাবক বাঁচানোর জন্য মা হরিণী নিজেকে বাঘের কাছে সঁপে দিয়েছে। বাঘ তাকে আরাম করে খাবলে খাবলে খাচ্ছে।

আমরা কি পশুদের কাছ থেকেও শিখব না? সমাজ বাঁচানোর মানুষগুলো ঘুমিয়ে আছে। আর সাধারণ মানুষের উঠছে নাভিশ্বাস। দেশ যে উন্নত হচ্ছে সেটা অন্ধজনও বলতে পারবে। বোকাও জানে আগের মতো নাই বাংলাদেশ। কিন্তু মন পরিবর্তিত হয়নি। এখনো রাজনীতিতে পাকি বাতাস। চিন্তায় উগ্রতা। মননে সংকীর্ণতা। এখন জুটেছে চরম অমানবিক মনোভাব। চরম যৌনতা। এর নাম পরকীয়া না এর নাম মরণখেলা। কে বাঁচাবে আমাদের? কোন শক্তি উদ্ধার করবে সমাজকে?

লেখক : সিডনি প্রবাসী

দোষারোপের রাজনীতি কি শেষ হবে না?

যে যাই বলুন না কেন, আমাদের দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এখন আর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, তারা পরস্পর শত্রু। আওয়ামী লীগ মনে করে বিএনপি যেমন দেশের শত্রু, তেমনি আওয়ামী লীগেরও শত্রু। আবার বিএনপিও মনে করে আওয়ামী লীগ দেশ এবং বিএনপির দুশমন। এই দুই দলের শত্রুতা দিন দিন কেবলই বাড়ছে। আওয়ামী লীগ চায় বিএনপি শুধু দুর্বল ও নিঃশেষ হয়ে যাক। আর বিএনপি কামনা করে আওয়ামী লীগের ধ্বংস। অবশ্য দুই দলের চাওয়ার মধ্যে মৌলিক কিছু পার্থক্য আছে। এই ভিন্নতা দুই দলের জš§ ও বিকাশের ধারার মধ্যেই নিহিত আছে। আওয়ামী লীগের জন্ম হয়েছে একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায়, সাধারণ মানুষের চাহিদা পূরণের প্রয়োজনে। আর বিএনপির জন্ম হয়েছে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী সামরিক শাসকের গায়ে বেসামরিক লেবাস পরিয়ে তার ইচ্ছা তথা স্বার্থ পূরণের উদ্দেশ্যে। তাই আওয়ামী লীগের কাছে মানুষের স্বার্থ আগে, পরে ক্ষমতা। আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাই নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হয়েও বলতে পারেন, আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না, বাংলার মানুষের অধিকার চাই। আর বিএনপির কাছে প্রধান হলো ক্ষমতা, তারপর জনস্বার্থ। বিএনপি জনগণের স্বার্থে কোনো আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে তেমন নজির খুব একটা পাওয়া যাবে না।

এই যে দুটি বড় দল একে অপরের শত্রু হয়ে গেল, কীভাবে এটা হলো? এর জন্য কোন দলের দায় বেশি? এই প্রশ্নের জবাবও পাওয়া যাবে ভিন্ন ভিন্ন। কেউ বলবেন, আওয়ামী লীগই বিএনপিকে দূরে ঠেলেছে, বৈরী করে দিয়েছে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা, তাকে পাকিস্তানের চর বানানো, বঙ্গবন্ধুর খুনের সঙ্গেও তাকে জড়ানো- ইত্যাদি ঘটনা বিএনপিকে আওয়ামী লীগবিমুখ করে তুলেছে। আবার অন্যরা বলবেন, সব দোষ বিএনপির। বিএনপিই প্রথম জিয়াকে বঙ্গবন্ধুর প্যারালাল দাঁড় করাতে চেয়েছে। বাঁশের চেয়ে কঞ্চিকে বড় করতে গিয়ে বিপত্তি ঘটিয়েছে। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা চাননি, জিয়ার বেতার ঘোষণাই স্বাধীনতা যুদ্ধ ত্বরান্বিত করেছে- এমন সব ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও বালখিল্য প্রচারণা আওয়ামী লীগকে পীড়িত করেছে, আহত করেছে। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রধান বেনিফিশিয়ারি জিয়াউর রহমান। জিয়া বঙ্গবন্ধুর স্বঘোষিত খুনিদের বিচারের আওতামুক্ত রেখে, বিদেশে দূতাবাসে চাকরি দিয়ে নিজেকে তাদের মিত্র হিসেবেই প্রমাণ করেছেন। এ নিয়ে বিতর্ক করা অর্থহীন।

খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ক্ষমতায় এসেও বিএনপি আওয়ামী লীগকে ‘নির্মূলের’ ধারা থেকে সরে আসেনি। শেখ হাসিনাকে হত্যা-চেষ্টার মতো জঘন্য কাজেও বিএনপি নেতৃত্বের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের অনেক জনপ্রিয় নেতাকে বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে হত্যা করা হয়েছে। বিএনপিকে দুর্বল করতে বা দেখতে চায় আওয়ামী লীগ কিন্তু সেটা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায়। হত্যা-খুনের মাধ্যমে নয়।

দেশে বিদ্বেষপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরির পেছনে কোন দলের দায় বেশি বা কম তা নিয়ে বিস্তর বাগ-বিতণ্ডা করা যেতে পারে, কিন্তু কোনো বিতর্কই দুই দলকে আর কাছাকাছি আনতে পারবে বলে মনে হয় না। দুই দলের পথ আগাগোড়াই দুই দিকে। এদের একমুখো করার সাধ্য কারো নেই। সে জন্যই দেশের রাজনীতিতে নিরবচ্ছিন্ন শান্তি-স্বস্তি বজায় থাকার সম্ভাবনাও কম। দেশের মানুষকে সারাক্ষণ টেনশনে থাকতে হবে ক্ষমতার রাজনীতির উন্মাদ প্রতিযোগিতার ফলাফল কখন কী হয় তা দেখার জন্য।

দুই.
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সাজ সাজ রব পড়ে গেছে। বিশেষ করে বড় দুই দল- আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি নেতাদের মধ্যে বাগযুদ্ধ জমে ওঠার লক্ষণ প্রতিদিনই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ‘তুই ভালো না, মুই ভালো’ ঢঙের কথা চালাচালি জোরেশোরেই চলছে। একদলের সাধারণ সম্পাদক এখন যা বলছেন, কতক্ষণ পরেই অন্যদলের মহাসচিব তার বিরোধিতা করছেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের প্রচুর কথা বলছেন এবং স্ববিরোধী কথাও বলছেন। তিনি কেবল বিএনপির বিরুদ্ধে শব্দবোমা নিক্ষেপ করছেন তা নয়। নিজ দলের বক্ষভেদী তীরও তিনি মাঝেমধ্যে ছুড়ছেন। সম্প্রতি এক সভায় তিনি স্বেচ্ছাসেবক লীগকে উল্লেখ করেছেন ‘সাইনবোর্ড সর্বস্ব’ সংগঠন হিসেবে। আর ছাত্রলীগ সম্পর্কে বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ ও সরকার খেটেখুটে যে সুনাম অর্জন করে, ছাত্রলীগের একদিনের অপকর্মেই তা ধ্বংস হয়ে যায়।

কার উদ্দেশ্য তিনি এই ‘মহৎ’ বাণী দিলেন? এ তো সেই আকাশের ঠিকানায় চিঠি লেখার মতো। তিনি দলের সাধারণ সম্পাদক। দলের স্বার্থ রক্ষা করা তার দায়িত্ব। সাইনবোর্ডসর্বস্ব এবং ধ্বংসাত্মক দুইটি সহযোগী সংগঠনের উচ্ছৃঙ্খল কর্মী-সমর্থকদের নিয়ন্ত্রণের কোনো উদ্যোগ কিংবা কার্যকর কোনো পদক্ষেপ তিনি নিয়েছেন কি? বক্তৃতায় চটকদার কথার চাটনি মিশিয়ে তিনি বেহুদা পপুলারিটি নিতে চাইলেও একসময় এটা ব্যাকফায়ার করবে।

ওবায়দুল কাদেরের বক্তৃতা শুনে কখনো কখনো মনে হয় তিনি নিজ দলের চেয়ে বিএনপির ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশি চিন্তিত। যেমন সেদিন বলেছেন, আগামী নির্বাচনে অংশ না নিলে বিএনপি মুসলিম লীগের পরিণতি বরণ করবে। এমন ভবিষ্যদ্বাণী তিনি আগেও করেছেন। বিএনপি যদি মুসলিম লীগের পরিণতি বরণ করে তাহলে তো ওবায়দুল কাদের সাহেবদের খুশি হওয়ার কথা। বিএনপির ভালো-মন্দ নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে নিজের দলের ভেতরটা একবার ভালো করে পর্যবেক্ষণ করেন না কেন? নিজের ঘরের দুর্গন্ধ দূর না করে পরের ঘরের ময়লা দেখা খুব ভালো কাজ কি? স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগের কথা নিজেই বলেছেন। মূল দল আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবস্থা কি খুব ভালো? এমন কোনো জেলা আছে যেখানে আওয়ামী লীগ অন্তর্কলহে জর্জরিত নয়? আগামী নির্বাচনে একক প্রার্থী মনোনয়ন দিতে কী বেগ পেতে হবে তা কি তিনি জানেন? আওয়ামী লীগ যে সারাদেশে আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছে, সেই সংকট নিরসনের কথা ভেবেছেন কি?

ওবায়দুল কাদের একদিন বললেন, বিএনপির বুদ্ধিজীবীরাই বলেন দলটি মাজাভাঙা, হাঁটুভাঙা, কোমরভাঙা। বিএনপিকে তিনি এলোমেলো পার্টি, নালিশ পার্টি বলেও উল্লেখ করেছেন। প্রায়ই এ রকম করেন। দলবাজরা সম্ভবত এতে খুশি হয়। কিন্তু আবার ভিন্ন কথাও তিনি বলছেন। সেদিন তিনি বলেছেন, সাংগঠনিকভাবে এলোমেলো হলেও জনসমর্থনের দিক থেকে বিএনপিকে দুর্বল ভাবা ঠিক হবে না। এক মুখে এত কথা বললে মানুষ বিশ্বাস করবে কোনটা?

বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার কক্সবাজার আসা-যাওয়ার পথে ফেনীতে হামলার ঘটনা নিয়ে দুই দলের সাধারণ সম্পাদক/মহাসচিব কথার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। এসব পাল্টপাল্টি বক্তব্যে মানুষ কি খুব খুশি হচ্ছে? নাকি বিরক্ত হচ্ছে? খালেদা জিয়ার বহরে থাকা সাংবাদিকদের গাড়ি ভাঙচুর ও হামলার বিষয়ে ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিএনপির কোনো নেতা কেন আহত হলেন না? তিনি (খালেদা জিয়া) ও তার গাড়ি অক্ষত আছে। আহত হলো সাংবাদিক। সাংবাদিকদের ওপর হামলা হলে নিউজটা বড় হবে, চাঞ্চল্যকর হবে, দেশে-বিদেশে সাড়া জাগাবে। এ জন্য বিএনপি পরিকল্পিতভাবে ওই হামলা করেছে।

ওবায়দুল কাদের হয়তো ভেবেছেন, তার এই বক্তব্যে বিএনপি কুপোকাত হয়ে যাবে। মানুষ ভাববে, তাইতো, বেগম জিয়া যেহেতু আহত হননি, তাই হামলার ঘটনা সাজানো। কিন্তু তার এই যুক্তিজাল অনেকের কাছেই খুব মজবুত বলে মনে হয়নি। মনে আছে তো, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পর বিএনপিও প্রশ্ন তুলেছিল, শেখ হাসিনা যেহেতু প্রাণে বেঁচেছেন সেহেতু হামলাটা আওয়ামী লীগই ঘটিয়েছে!

এবার দেখুন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামের জবাব। তিনি বলছেন, খালেদা জিয়া রোহিঙ্গাদের ত্রাণ দেয়ার জন্য উখিয়া গেলেন। পথিমধ্যে লাখ লাখ মানুষ সাড়া দিল। ফেনীতে গিয়ে দেখা গেল, তার গাড়িবহরের পেছন দিকে সাংবাদিকদের গাড়িতে আক্রমণ হলো। আমাদের কর্মীদের গাড়িও আক্রমণ হলো। ১৩টি গাড়িতে আক্রমণ করে ১৪ জনকে আহত করে। তিনজনকে গাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। এর মধ্যে একজন নিখোঁজ ছিলেন দুই-তিন ঘণ্টা। পরে পুলিশ তাকে মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করেছে। ফেরার সময়ও একই ঘটনা। আমার গাড়ির পাশেই ককটেল বিস্ফোরণ হলো। তারপর উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে থাকা দুটো বাসের মধ্যে শব্দ হলো, আগুন লেগে গেল মুহূর্তের মধ্যে। তাতে বোঝা গেল, সে আগুনটা তৈরি ছিল। এরপরও তারা অবলীলায় বলে দিচ্ছেন এবং গ্রেফতার করছেন। সরকার যদি একটা অসত্যকে সত্য প্রমাণ করতে চায়, তাহলে তো সে সরকারকে কখনো বিশ্বাস করা যায় না। বিএনপি কি সরকারকে খুব বিশ্বাস করে? বিএনপি যেমন সরকারকে বিশ্বাস করে না, তেমনি সরকারও বিএনপিকে বিশ্বাস করে না। এই বিশ্বাসের সংকট এখন সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছড়িয়েছে। রাজনৈতিক ভাবে মানুষ বিভক্ত। অনুসারীরা নিজ নিজ নেতার কথাই সত্য বলে মানবে। যার হাতে তামাকের গন্ধ সেও দিব্যি বলবে, আমি ঘুমিয়ে ছিলাম ‘অমুক’ আমার হাতে কল্কে রেখে তামাক খেয়ে গেছে!

এ তো গেল দুই দলের অবস্থানগত ভিন্নতা। এবার দেখুন, বিএনপির মধ্যও কেমন ভিন্নতা। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ৩ নভেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, যত প্রতিকূল পরিবেশই আসুক না কেন, বিএনপি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে। নির্বাচনের আগে সরকার সংলাপ-সমঝোতা করতে বাধ্য হবে। কারণ বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন বিএনপিবিহীন হবে না।

খুব ভালো কথা। জনপ্রিয়তায় আস্থা থাকলে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিয়েই তা প্রমাণ করবে। জনপ্রিয় দল কখনো নির্বাচন বর্জনের উছিলা খোঁজে না। ১৯৭০ সালে ইয়াহিয়ার অধীনে নির্বাচনে অংশ নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার প্রমাণ দিয়ে গেছেন। কিন্তু মওদুদের প্রত্যয় ফুটো করে দিয়েছেন তার দলের আরেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় মওদুদ আহমদের বক্তব্য প্রসঙ্গে বলেছেন, আমি এখানে একটু সংশোধন করতে চাই- দেশে গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিকূল অবস্থা নিরসন না করে বিএনপি নির্বাচনে যাবে না। জনগণের ভোটে কোনো ধরনের বাধার প্রসঙ্গ থাকলে সে নির্বাচনে যাবে না বিএনপি। মানে কী দাঁড়াল? নির্বাচনে অংশ নেয়া না-নেয়া নিয়ে বিএনপিতে মতভিন্নতা আছে। আমাদের নেতারা কথা বলতে খুব পছন্দ করেন। তাদের কথা শুনে সাধারণ মানুষ রাজনৈতিকভাবে সচেতন না হয়ে বরং গোলক ধাঁধায় পড়েন।
লেখক : সাংবাদিক, কলাম লেখক

স্টপ জোনোসাইড

শঙ্কর প্রসাদ দে : রোহিঙ্গা মুসলমানের সংখ্যা প্রায় ৩০ লক্ষ। মূল সংকট এখানে। রাখাইনরা যে কোন অবস্থাতেই জনসংখ্যা এই রোহিঙ্গা আধিক্য মানতে নারাজ। যেমনটি পাকিস্তানিরা পাঞ্জাব এবং পূর্ব বঙ্গ থেকে শিক ও হিন্দুদের বিতাড়িত করে মুসলিম প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। অথচ আজকে যারা রাখাইনের রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারী বলা হচ্ছে তাদের কারোরই জন্ম বাংলাদেশে নয়। হয়তো অনেকের পূর্ব পুরুষ বাংলাদেশে ছিল। কিন্তু আজকের রোহিঙ্গা মুসলমানদের সবারই জন্ম রাখাইন তথা মায়ানমারে। আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় জন্মসূত্রে নাগরিকত্বই নাগরিকের শ্রেষ্ঠতম পরিচয় এবং ঠিকানা। জাতিসংঘ মানবাধিকার চার্টারে মিয়ানমারও স্বাক্ষরদাতা দেশ। রোহিঙ্গা সশস্ত্র মুজাহিদরা পশ্চিম রাখাইন নিয়ে একটি স্বাধীন রোহিঙ্গা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি করে আসছে। এটি নিতান্তই মিয়ানমারের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমস্যা। সমাধানও মিয়ানমারকেই খুঁজে বের করতে হবে।

চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির প্রতিবাদ সমাবেশের বক্তব্য শুনতে শুনতে চোখের সামনে ভেসে উঠছিল নাফ নদীতে ভেসে থাকা শিশুর লাশ। নাম না জানা ভাসমান অনেকগুলো লাশের জটলা। আরাকানে অগ্নিদগ্ধ ঘরবাড়ীর বিবর্ণ চেহারা, জবাই করা মানুষের বিকৃত ও বীভৎস ছবি। মনে হয় এভাবে চলতে থাকলে একসময় নাফ নদীর জলের রং হয়ে উঠবে লাল। মাটির রং হয়ে উঠবে লাল। প্রতিবাদী মানুষগুলোর চোখের রং হয়ে উঠবে লাল।

দীর্ঘদিন ধরে রোহিংগা সমস্যা নিয়ে এদেশের মিডিয়া জগতে একধরনের চাপা দেয়া মনোভাব লক্ষ্য করা গেছে। কূটনৈতিক ভাবে সরকার কোন বিব্রত অবস্থায় পড়ে কিনা অথবা আন্তর্জাতিক কূটনীতির সীমা লঙ্ঘিত হচ্ছে কিনা– এসব ভাবনা বুদ্ধিজীবী মহলে সবসময় ছিল। তবে ইদানিংকার বর্বরতা মানবতার সকল সীমা লঙ্ঘন করায় গোটা জাতির বিবেকই নড়ে চড়ে উঠেছে। এ প্রেক্ষাপটে ঘটনার খোলামেলা আলোচনা পর্যালোচনার সময় এসেছে মর্মে আমাদের ধারণা। বলে রাখা ভাল রাজনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ ছাড়া মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডে আশ্রয় নেয় মালাক্কা প্রণালী এবং আন্দামান সাগর অতিক্রম করে। তবে মূল সংকটের সূত্রপাত বাংলাদেশ থেকে অভিবাসী বলে দাবীকৃত মুসলিম জনগোষ্ঠীকে ঘিরে এবং এলাকা হিসেবে রাখাইন রাজ্যই এই সংকটের কেন্দ্র বিন্দু (সাবেক আরাকান)।

ইতিহাস বলছে, ৮ম শতক থেকে আরাকান ছিল একটি স্বাধীন রাজ্য। ৯ম থেকে ১৪ শতকে আরাকান আরব বণিকদের সংস্পর্শে আসে। তাদের হাত ধরেই অতি অল্প সংখ্যায় মুসলিম বসতি শুরু হয়। এই জনগোষ্ঠী ছিল বর্ণ এবং ভাষার দিক থেকে চট্টগ্রাম অঞ্চলের জনবসতির সমগোত্রীয়। মধ্যযুগীয় ঐ সময়কালে চট্টগ্রাম এবং আরাকান অঞ্চলের তীব্র কোন রাজনৈতিক টানাপোড়নের তথ্য পাওয়া যায় না। বরং ভূ–প্রাকৃতিক গঠন, চাষাবাদ ও ধর্মীয় বিশ্বাসের বিবেচনায় চট্টগ্রাম এবং আরাকান অঞ্চলের মধ্যে নৈকট্য এবং ঘনিষ্ঠতা দু’টোই ছিল। ১৭৮৪ সালে বার্মার রাজা বুদ্ধপায়া আরাকান আক্রমণ করে বার্মার অন্তর্ভুক্ত করলে লক্ষাধিক রোহিঙ্গা আরাকান ত্যাগ করে চট্টগ্রাম বিশেষত কক্সবাজার অঞ্চলে শরণার্থী হতে বাধ্য হয়। ১৮২৪ থেকে ১৯৪২ পর্যন্ত ব্রিটিশের হাতে ছিল। এ সময়কালে মূলত সড়ক যোগাযোগ এবং কৃষি উন্নয়নের জন্য ব্রিটিশ ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গা সহ চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে ব্যাপক অভিবাসন উৎসাহিত করে। বাংলাভাষী কৃষিকাজ ভিত্তিক মানুষগুলোর অনেকেই আরাকান তথা আজকের রাখাইন রাজ্যে স্থায়ী বসতি করতে শুরু করে। ১৯৪২ সালে বার্মা জাপানের দখলে গেলে ব্রিটিশ অঙ্গীকার করে যে, ক্ষমতা ফিরে ফেলে রাখাইনে রোহিঙ্গা স্বায়ত্তশাসন বাস্তবায়ন করবে। কিন্তু ১৯৪৫ ব্রিটিশ বার্মা পুনঃদখল নিলেও রাখাইন রাজ্যে পশ্চিমাংশ নিয়ে রোহিঙ্গা রাজ্য প্রতিষ্ঠার দাবী এড়িয়ে যায়। অগত্যা রোহিঙ্গাদের রাজনৈতিক সংগঠন মুজাহিদ মো: আলী জিন্নাহ’র নিকট পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্তির আবেদন পেশ করে। কিন্তু জিন্নাহ তার রাজনৈতিক মিশন ভারতবর্ষের বাইরে নিতে অনিচ্ছুক মর্মে জানিয়ে দিলে রোহিঙ্গারা দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় নিপতিত হয়। আজকের দিনে পৃথিবীর সব চেয়ে বিধ্বস্ত, নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর নাম রোহিঙ্গা। অথচ অং সানের বামপন্থী নেতৃত্বের হাতে বার্মার স্বাধীনতা এবং রোহিঙ্গাদের ভাগ্যকে বার্মার হাতে তুলে দিয়ে ব্রিটিশ শতাব্দীর আরেকটি বিপর্যয়ের সূত্রপাত করে যায়।

১৯৪৮ সালেই অং সানের বামপন্থী সরকারের আমলাতন্ত্র থেকে রোহিঙ্গাদের বিতাড়ণ শুরু হয়। সরকারি ঐ নীতির প্রতিবাদে সংগঠিত হতে শুরু করে রোহিঙ্গা সশস্র সংগঠন মুজাহিদীন। যারা আজ অং সান সুচীর রহস্যজনক নীরবতায় বিস্মিত হচ্ছেন, তাদের স্মরণ রাখা উচিত তার পিতা অং সানও কিন্তু রোহিঙ্গাদের সাথে রাজনৈতিক ভব্য আচরণ করেন নি। সামরিক ক্যু এর মাধ্যমে জেনারেল নে উইন ক্ষমতা দখল করে আরো বেশি রোহিঙ্গা বিরোধী অবস্থান নিতে শুরু করেন। সশস্ত্র বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অভিযানের নামে সেনাবাহিনী ১৯৭৭ সালে দুই লক্ষ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে শরণার্থী হতে বাধ্য করে। সামরিক জান্তা সবচেয়ে কঠিন আঘাত হানে ১৯৮২ সালে নতুন অভিবাসন আইন চালু করে। এই আইন ধারা রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের সব ধরনের নাগরিক অধিকার বাতিল করা হয়। ১৯৮৯ সালে বার্মা নাম পরিবর্তন করে মিয়ানমার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। আইন শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারের নামে পরিচালিত সেনা ও অভিযানের মুখে আড়াই লক্ষ রোহিঙ্গা যারা মূলত মুসলিম বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে পা বাড়াতে বাধ্য হয়। ১৯৯২–১৯৯৭ সময়কালে প্রায় ২ লক্ষ ৩০ হাজার এবং ২০১২ সালে দেড় লক্ষ ও সর্বশেষ ২০১৬ সালে ২৫ হাজার মুসলমান বাংলাদেশে প্রবেশ করলে মোটামুটি শরণার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ লক্ষের মত।

২০১৭ সালের আগস্টে আরেকদফা সামরিক অভিযানের মুখে এখন ভয়াবহ এক শরণার্থী সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। যা বিশ্ব বিবেককে প্রবলভাবে তাড়িত করছে। প্রতিবেশী মুসলমানদের সাহায্য করেছে এই অভিযোগে কিছু হিন্দুকেও রাখাইনে সেনাবাহিনী নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে এমনকি দেশ ত্যাগেও বাধ্য করা হচ্ছে। এমন বিভৎস অবস্থায় বিচলিত হয়ে খ্রিস্টান প্রধান পোপ নিন্দা জানিয়েছেন। যদিও অদ্যাবধি মুসলিম সহ অন্য কোন সম্প্রদায় থেকে প্রতিবাদ উত্থিত হয়নি। মুসলিম রাষ্ট্র অথবা পশ্চিমা প্রভাবশালী গণতান্ত্রিক কোন রাষ্ট্রপ্রধান এখনও অবদি মুখ খুলেন নি। একজন মাত্র রাষ্ট্রনেতা তুরস্কের এরদোয়ান প্রতিবাদ করেছে। জাতিসংঘও কেমন জানি নীরব। এ্যামনেস্টির মত সুযোগ সন্ধানী মানবাধিকার সংগঠনগুলো রহস্যজনকভাবে নীরব। অথচ বঙ্গোপসাগর ও নাফ নদীতে মানুষের লাশ নিয়ে টানাটানি করছে শকুন শৃগাল আর হাঙ্গরের দল।

২০১২ সালে রোহিঙ্গা মুসলিম কর্তৃক এক রাখাইন বুড্ডিস্ট মহিলাকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ এনে সেনাবাহিনী উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে। অথচ ঔ অভিযোগ যদি সত্যও হয় তবে সেটি নিতান্ত্যই একটি গুরুতর অপরাধ হিসেবে শাস্তিযোগ্য ছিল মাত্র। একজন বা কয়েকজনের ফৌজদারী অপরাধের জন্য ৩০ লক্ষাধিক মুসলমানকে দেশত্যাগে বাধ্য করে রীতিমত আন্তর্জাতিক অপরাধ। এবার অর্থাৎ আগস্টের ৩য় সপ্তাহে রোহিঙ্গারা একটি থানা আক্রমণ করেছে এই অভিযোগে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলমানকে রাখাইন ত্যাগে বাধ্য করা হচ্ছে। যে কোন বিচারে এইসব আক্রমণ ও গণহত্যা সংগঠন করে মায়ানমার সরকার মানবতার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ করছে বলে ধরে নেয়া যায়। রাষ্ট্র কর্তৃক এই জাতীয় মানবতা বিরোধী আন্তর্জাতিক অপরাধের বিরোধিতার জন্যই জাতিসংঘের জন্ম হয়েছিল। অথচ প্রতিষ্ঠানটি আজ যথেষ্ট সরব নয়।

তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মূল সংকট খোলাসা করার সময় এসেছে। রাখাইন প্রদেশে রাখাইন বুড্ডিস্ট আনুমানিক ২৫ লক্ষ। রোহিঙ্গা মুসলমানের সংখ্যা প্রায় ৩০ লক্ষ। মূল সংকট এখানে। রাখাইনরা যে কোন অবস্থাতেই জনসংখ্যা এই রোহিঙ্গা আধিক্য মানতে নারাজ। যেমনটি পাকিস্তানিরা পাঞ্জাব এবং পূর্ব বঙ্গ থেকে শিক ও হিন্দুদের বিতাড়িত করে মুসলিম প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। অথচ আজকে যারা রাখাইনের রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারী বলা হচ্ছে তাদের কারোরই জন্ম বাংলাদেশে নয়। হয়তো অনেকের পূর্ব পুরুষ বাংলাদেশে ছিল। কিন্তু আজাকের রোহিঙ্গা মুসলমানদের সবারই জন্ম রাখাইন তথা মায়ানমারে। আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় জন্মসূত্রে নাগরিকত্বই নাগরিকের শ্রেষ্ঠতম পরিচয় এবং ঠিকানা। জাতিসংঘ মানবাধিকার চার্টারে মিয়ানমারও স্বাক্ষরদাতা দেশ। রোহিঙ্গা সশস্ত্র মুজাহিদরা পশ্চিম রাখাইন নিয়ে একটি স্বাধীন রোহিঙ্গা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি করে আসছে। এটি নিতান্তই মিয়ানমারের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমস্যা। সমাধানও মিয়ানমারকেই খুঁজে বের করতে হবে। একটি জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক দাবির সাথে অবোধ শিশু, নারী, পুরুষ, ঘরবাড়ি তার গবাদি পশুর কি সম্পর্ক বুঝা মুশকিল। এই জন্যই বলছিলাম একাত্তরের বাংলাদেশ সংকটের সাথে আজকের রোহিঙ্গা সংকটে যথেষ্ট মিল রয়েছে। বাংলাদেশকে যেহেতু দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে এই রোহিঙ্গা সংকটের সাথে জড়িয়ে ফেলা হয়েছে সেহেতু বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অবিলম্বে বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরা উচিত। যেমনটি ইন্দ্রিরা গান্ধীর ভারত করেছিল ১৯৭১ সালে এবং এটিই আজকের সময়ের দাবি।

লেখক: আইনজীবী, কলামিস্ট
(সংগৃহীত)

মানবতার সেবায় সকলেই এগিয়ে আসুন

শ্যামল কুমার দাশ

ধর্মীয়ভাবে যে সম্প্রদায়েরই মানুষ হোক না কেন রাখাইন রাজ্যের বিপদগ্রস্থ বাসিন্দাদের বাঁচাতে সকলেই এগিয়ে আসা উচিৎ বলে আমি মনে করি। মনে করি, আর কাল বিলম্ব না করে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে মানবতার বিষয়টি প্রাধান্য দিয়ে বিপদগ্রস্থ অসহায় রোহিঙ্গাদের পাশে থাকা উচিৎ। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে মানবতার কথা বিবেচনা করে যতটুকুই সম্ভব আশ্রয় ও সেবার হাত বাড়িয়েছে যা কি-না পর্যাপ্ত নয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। আমার অবাক লাগছে মায়ানমার সরকার এত বড় একটি নৃশংস ঘটনা ঘটিয়ে চলছে অথচ বিশ্ব মানবতার কোন সাড়া শব্দ নাই। প্রতিদিন হাজার হাজার রোহিঙ্গারা মায়ানমার সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে যেভাবে প্রবেশ করছে শুধুমাত্র একটু নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য এ বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক মানব সেবাকারী সংস্থাগুলোই কি করছে? কি ই বা করছে শক্তিধর মুসলমান দেশগুলো? এ ব্যাপারে তাদের ভূমিকা দেখে মনে হচ্ছে সংস্থাগুলো কি শুধুই সাইনবোর্ডধারী না কি সেবার নামে নিজেদের সনদগ্রহনের চেষ্টা মাত্র। আমার জানামতে রোহিঙ্গারা শরণার্থীরা সবাই ইসলাম ধর্ম অনুসারী। যদিও সরকারী সংবাদ মাধ্যম থেকে প্রাপ্ত খবরে জানা যায় বাংলাদেশে রোহিঙ্গা মুসলমান জনগোষ্ঠীর সাথে ৫৩২ জন হিন্দু সম্প্রদায়ের রোহিঙ্গা শরণার্থীরা কক্সবাজারের সীমান্তে আশ্রয় নিয়েছে। আমি স্পষ্টাক্ষরে একজন মানুষ হিসাবে বলতে চাই, আন্তর্জাতিকভাবে সারা বিশ্বে এতগুলো ইসলামিক সংস্থা রয়েছে যারা আমরা মুসলমান, আমরা মুসলমান বলে দাবী করে, তারা এখন কোথায়? আমি আরো বলতে চাই, আমাদের বাংলাদেশের ইসলাম ধর্মীয় সংগঠনও কম নয়, মিছিল, মিটিং মানব বন্ধন করার বেলায় তো, কে কত বড় কথা বলে মানুষকে উৎসাহিত করবে তা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। রাজপথে লাখো মানুষ জমায়েত করে ইসলাম বাঁচাও, ইসলাম বাঁচাও বলে চিৎকার করেন। এখন যে, ইসলাম অনুসারীদের নিজের দেশ থেকে বিতারিত করে গন্তব্যহীন পথে বের করে দিচ্ছে যে দেশ, দেশের সরকার (মায়ানমার) হত্যা করছে হাজার হাজার মানুষ। শত শত লাশ ভেসে আসছে সীমান্তে। তাদের বিরুদ্ধে তো- বিশ্ব মুসলিম সম্প্রদায়কে একত্র করে অসহায় মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসার তেমনতো কোন কর্মসূচী দৃশ্যমান হচ্ছে না। ধিক মানবতাবাদী, ধিক মানব সেবাদানকারী পরিচয় প্রদানকারী সংস্থাগুলোকে। বিপদের দিনে যে মানুষগুলি নৃশংস হত্যার স্বীকার হচ্ছে এবং আশ্রয়কারী যে মানুষগুলি একমুঠো ভাত, এক টুকরো পড়নের বস্ত্র, একটু আশ্রয় নেওয়ার মত একটু সহায়তা পাচ্ছে না। তাহলে কি লাভ? সেবা সংগঠন বলে পরিচয় দেওয়ার। আমি, বাংলাদেশের ধর্মীয় সংগঠনের নেতা, ও বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের উদ্দেশ্যে বলছি, রোহিঙ্গাদের নিয়ে রাজনৈতিক ইস্যু তৈরী না করে এবং জনগণকে বিভ্রান্ত না করে, মানব সেবায় ব্রত হয়ে আসুন, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সরকারী সহায়তার পাশাপাশি আমরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী যার যা কিছু আছে তা দিয়ে সাহায্যের হাত বাড়াই। তবেই না হবে মানব সেবা।

সু চিও খেলছেন রোহিঙ্গাদের অধিকার নিয়ে!

শাহেদ হোসেন :
হিটলারের প্রচারমন্ত্রী জোসেফ গোয়েবলসের চিন্তা ভাবনা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রায় আটটি দশক পেরিয়ে গেলেও তার প্রচারতত্ত্বটি রাজনীতিতে এখনো বেশ জনপ্রিয়। জলজ্যান্ত মিথ্যাকে নিখাঁদ সত্যে পরিণত করার ব্যাপারে তার নীতি ছিল- কেউ বিশ্বাস করুক আর না করুক, মিথ্যাটাকে সত্য বলে অবিরাম প্রচার করতে থাকুন। একসময় জনগণের কাছে সেই মিথ্যই সত্য বলে মনে হবে।

আশির দশক থেকে আমাদের প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে গোয়েবলসের নীতি অনুসরণ করে যাচ্ছে। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক নয়, তারা বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অনুপ্রবেশকারী- এই ধুন তোলা হচ্ছে বছরের পর বছর ধরে। একইসঙ্গে প্রচার করা হচ্ছে, রোহিঙ্গারা সন্ত্রাসী, দাঁঙ্গাবাজ। তারা নিরীহ (!) বৌদ্ধভিক্ষুদের ওপর আক্রমণ চালায়।

একদিকে নিজের দেশের নাগরিকদের কাছে আর অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রোহিঙ্গাদের অসুর হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা চালানো হয়েছে। অপরদিকে দেশটির ইতিহাস থেকে রোহিঙ্গাদের অস্তিত্ব মুছে ফেলতে স্কুল-কলেজের পাঠ্যবইয়েও আনা হয়েছে পরিবর্তন। গত বছর দেশটির সংস্কৃতি ও ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ইতিহাস বিষয়ক পাঠ্যবই প্রকাশের পরিকল্পনা করেছে যাতে রোহিঙ্গাদের কথা একেবারেই উল্লেখ থাকবে না। খোদ মন্ত্রণালয়ের দাবি, মিয়ানমারের ইতিহাসে কোনো সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীকে কখনো রোহিঙ্গা নামে আখ্যায়িত করা হয়নি!

১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইন সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পর দেশটির প্রায় ৭০০ বছরের আদি বাসিন্দা রোহিঙ্গাদের জীবনে শুরু হয় দুর্ভোগের নতুন অধ্যায়। ১৯৭০ সাল থেকে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব সনদ দেওয়া বন্ধ করা হয়, ১৯৭৪ সালে কেড়ে নেওয়া হয় ভোটাধিকার। রোহিঙ্গাদের নির্মূলে ১৯৭৮ সালে শুরু হয় অপারেশন ‘কিং ড্রাগন’। ওই বছর আড়াই লাখ রোহিঙ্গা তাড়া খেয়ে বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে প্রবেশ করে। এরপর মিয়ানমারে ১৯৮৪, ১৯৮৫, ১৯৯০ ও ২০১২ সালে রোহিঙ্গা উচ্ছেদে একের পর এক অভিযান চালায় সামরিক জান্তা। এসব অভিযানে রোহিঙ্গাদের হত্যা-ধর্ষণ ছিল নিয়মিত ব্যাপার। ১৯৮২ সালে মিয়ানমার সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করে। রোহিঙ্গাদের সংখ্যা যাতে না বাড়ে সেজন্য তাদের বিয়েতে পর্যন্ত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।

রোহিঙ্গা নিধনে চরমপন্থি বৌদ্ধ ভিক্ষুদেরও পরোক্ষভাবে মদদ জুগিয়েছিল সামরিক জান্তা। এদের উস্কানিমূলক প্রচারণায় রাখাইনে একাধিকার দাঙ্গার বলি হতে হয়েছে রোহিঙ্গাদের। গত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে সেনাবাহিনী ও চরমপন্থি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের হামলায় বাংলাদেশে শরণার্থী হয়ে আসতে হয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গাকে। আর একই সময়ে হত্যার শিকার হতে হয়েছে হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে।

গত বছর সাধারণ নির্বাচনে অং সান সু চির দল এনএলডি প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলোর সঙ্গে ভোটযুদ্ধে বিশাল ব্যবধানে জয়লাভ করে মিয়ানমারের রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসে। সু চির এ বিজয় রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আশা জুগিয়েছিল। ভাবা হয়েছিল, হয়তো এবার সু চি রোহিঙ্গাদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে কিছু একটা করবেন। কিন্তু স্টেট কাউন্সিলর সু চি কি আদতে কিছু করেছেন?

গত বছর অক্টোবরে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীরা পুলিশের চৌকিতে হামলা চালিয়েছে দাবি করে রাখাইনে রোহিঙ্গা নিধন অভিযানে নামে সেনাবাহিনী। প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশ আশ্রয় নেয় প্রায় ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা। ওই সময় জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন স্যাটেলাইট ব্যবহার করে রাখাইন রাজ্যের বিভিন্ন এলাকার ছবি সংগ্রহ ও প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেসব ছবিতে প্রকাশ পায় রোহিঙ্গাদের শত শত গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়ার দৃশ্য। রোহিঙ্গা নারীদের ব্যাপকহারে ধর্ষণ ও নির্যাতনের অভিযোগ ওঠার পর জাতিসংঘের কর্মকর্তারা একে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ এবং ‘জাতিগত নিধন’ হিসেবে অভিহিত করেন। ‘গণতন্ত্রপন্থি’ হিসেবে আখ্যা পাওয়া সু চি অন্যদিকে জান্তা আমলের মতোই জাতিসংঘের এই অভিযোগ অসত্য বলে উড়িয়ে দিলেন। জাতিসংঘ রাখাইনে স্বাধীন তদন্ত দল পাঠানোর চেষ্টা করলে মিয়ানমার সরকার তাতে বাধা দেয়।

সে সময় বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সু চি বলেন, ‘আমি মনে করি না সেখানে জাতিগত নিধন চলছে। সেখানে যা হচ্ছে, তা বোঝাতে ‘জাতিগত নিধন’ শব্দ ব্যবহার করা খুবই কঠিন হয়ে যায়।… মুসলমানরাই মুসলমানদের হত্যা করছে৷’ এমনকি তিনি গণমাধ্যমকে দুষলেন যে, তারা রোহিঙ্গা ইস্যুতে অসত্য সংবাদ প্রচার করছে। অথচ জানুয়ারিতে যখন রোহিঙ্গাদের অবস্থা জানতে বিবিসির সংবাদদাতা জোনাহ ফিশার রাখাইন রাজ্যে রওনা হয়েছিলেন তখন মিয়ানমার সরকারের নির্দেশে তাকে মাঝপথে আটকানো হয়।

১৯৯১ সালে নোবেল কমিটি সু চিকে নোবেল পুরস্কার দেওয়ার যে তিনটি কারণ উল্লেখ করেছিল তার মধ্যে একটি ছিল জাতিগত শান্তি বজায় রাখায় তার শান্তিপূর্ণ ও অবিরত প্রচেষ্টা। ‘জাতিগত শান্তি’ শব্দটির মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিষয়টিও উঠে আসে। অথচ ঠিক ২৫ বছর পর সু চি নিজেকে প্রমাণ করলেন একজন সাম্প্রদায়িক নেত্রী হিসেবে।

গত বছর বিবিসির সাংবাদিক মিশাল হোসেনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারের সময় সু চিকে রোহিঙ্গা মুসলমানদের সঙ্গে মিয়ানমার সরকারের আচরণ নিয়ে বেশ অপ্রিয় ও কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। ওই সাক্ষাৎকারের পর সু চি মন্তব্য করেছিলেন, ‘সে (মিশাল হোসেন) যে একজন মুসলমান কেউ তো আগে আমাকে জানায়নি।’

আন্তর্জাতিক আলোচনা-সমালোচনার মুখে গত বছরের আগস্টে রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘ তার প্রাক্তন মহাসচিব কফি আনানকে প্রধান করে ৯ সদস্যের আন্তর্জাতিক কমিশন গঠন করে। এটি গঠনে উদ্যোগ নিয়েছিলেন সু চি। এই তদন্ত কমিশন গত বৃহস্পতিবার তার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ৬৩ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও চলাফেরার ওপর বিধিনিষেধ তুলে নেওয়াসহ ৮৮টি সুপারিশ করা হয়ছে। এই তদন্ত কমিশন গঠনের সময় সু চি বলেছিলেন কমিশনের প্রতিবেদন মেনে নেবেন। কিন্তু গত অক্টোবরে রাখাইনে সেনাবাহিনীর দমন অভিযানের পর জাতিসংঘের তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন মানতে অস্বীকৃতি জানান তিনি।

আশ্চর্যের ব্যাপার হলো যে, রোহিঙ্গাদের দুর্দশা লাঘবের পথের প্রথম পদক্ষেপ নেওয়ার ২৪ ঘণ্টার মাথায় জানানো হলো, রোহিঙ্গা বিদ্রোহীরা পুলিশের তল্লাশি চৌকিতে হামলা চালিয়েছে। এর জের ধরে সেনাবাহিনী রাখাইনে অভিযান চালাচ্ছে। আনান কমিশনের প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করার জন্য মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও সরকারের এটি কৌশল তা একটু চিন্তা করলেই বোঝা যায়। এর আগেও যখন রোহিঙ্গা ইস্যু সমাধানের জন্য মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ এসেছে তখনই হামলার অজুহাত তুলে রোহিঙ্গাদের ওপর দমন-পীড়ন চালিয়েছে সেনাবাহিনী।

গত ২৫ আগস্ট রাখাইনে নতুন করে শুরু হওয়া সেনা অভিযান ও রোহিঙ্গা নির্যাতনের বিষয়ে এখনো মুখ খোলেননি সু চি। তবে অবাক করার বিষয় হচ্ছে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) কর্মীদের ‘সন্ত্রাসী’ বলে আখ্যা দিয়েছে সু চি’র কার্যালয়। স্টেট কাউন্সিলর দপ্তরের এই মন্তব্য এটাই ইঙ্গিত দেয় যে রোহিঙ্গাদের দমন অভিযানের পেছনে পুরোপুরি সমর্থন আছে ‘গণতন্ত্রপন্থি’ নেত্রীর।

বিবিসির সাংবাদিক জোনাহ ফিশার লিখেছিলেন, সু চিকে যখন মিয়ানমারের সামরিক শাসকরা রেঙ্গুনে গৃহবন্দী করে রেখেছিল, তখন তার সঙ্গে কথা বলার জন্য, তার সাহসী প্রতিরোধের কাহিনি তুলে ধরার জন্য অনেক সাংবাদিক জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন। তবে আং সান সু চি ক্ষমতায় যাওয়ার পর সবকিছু যেন বদলে গেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতোই তিনি এখন সাংবাদিকদের প্রচন্ড অপছন্দ করেন। রোহিঙ্গা নিয়ে সু চির অবস্থান দেখে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক, তাহলে কি সামরিক জান্তার মতোই সু চি রোহিঙ্গাদের অধিকার নিয়ে লুকোচুরি খেলছেন?

লেখক: সাংবাদিক।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)

রোহিঙ্গা সমস্যা

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা : জাতিসংঘের হিসেবে ৬০ হাজার, এনজিওদের হিসেবে ৭০ হাজারের বেশি আর কক্সবাজার ও টেকনাফের স্থানীয় সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে মিডিয়া বলছে এক লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা সিমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে। বিপদের দিকটি হলো এরা ঢুকে কোথায় যাচ্ছে তার কোন হিসেব রাখছেনা কর্তৃপক্ষ।

মিয়ানমারে গণতন্ত্র ফেরার পর রোহিঙ্গাদের উপর অত্যাচার যেন আরো বাড়লো। নোবেল বিজয়ী অং সান সুচি গত নয় দশকেরও বেশি সময় ধরে মিয়ানমারে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, নাগরিক অধিকার রক্ষা ও বঞ্চিতদের অধিকার ফিরিয়ে আনার কথা বলে রাজনীতি করে এসেছেন। কিন্তু গত চার বছর ধরে মিয়ানমার সরকারি বাহিনী ও উগ্র বৌদ্ধরা রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর ভয়াবহ গণহত্যা চালালেও অং সান সুচি মুসলমানদের রক্ষায় একটি কথাও উচ্চারণ করেননি। বরং তিনি সংখ্যালঘু হিসেবে মুসলমানদেরকে স্বীকৃতি না দেয়ার পক্ষেই কথা বলে চলেছেন।

এখন জাতিসংঘ চাপ দিচ্ছে রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশের সীমান্ত খুলে দিতে। বাংলাদেশের অনেকেও নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়াবার আহবান রাখছেন। একথা সত্য মিয়ানমারে সংখ্যালঘু মুসলমানদের অবস্থা এখন ফিলিস্তিনিদের মতো ভয়াবহ। তাদের উপর যে নিপীড়ন চলছে তার অন্যায়ের প্রতিবাদ করাও সকলের দায়িত্ব। কিন্তু সমগ্র বিশ্ব চুপ করে থাকবে, আর বাংলাদেশকে সীমানা খুলে দিতে হবে, তারা এসে এখানে একটি জঙ্গি, অপরাধি ও সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক গড়ে একটা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে সেই ভাবনাও খুব জরুরী।

এদের প্রতি মানবিকতা দেখাতে গিয়ে সেখানকার মৌলবাদী সশস্ত্র গ্রুপগুলির প্রতি নৈতিক সমর্থন চলে আসছে কিনা সে ভাবনাটা বিশেষভাবে ভাবা প্রয়োজন। মিয়ানমারে সব মুসলমানদের উপর অত্যাচার হচ্ছে তাও নয়। হচ্ছে রোহিঙ্গাদের উপর। রোহিঙ্গারা বাস করে রাখাইন এলাকার মংডু, বুছিডংসহ সংশ্লিষ্ট শহরে।

১৯৪৭ সনে ভারত পাকিস্তান ভাগাভাগির সময় তখনকার বার্মার রোহিঙ্গা নেতারা বার্মিজ মুসলিম লীগ গঠন করে মুহম্মদ আলী জিন্নার সাথে দেখা করে পূর্ব পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হতে আগ্রহ দেখায়। তারা চেয়েছিল রোহিঙ্গা মুসলিম প্রধান এলাকাগুলি পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হোক। মোহাম্মদ আলী জিন্না তা বাস্তবায়ন করেননি। বৃটিশদের কাছ থেকে ১৯৪৮ সনে বার্মাও স্বাধীনতা পায়। এর পর থেকে বেশীরভাগ সময়ই সামরিক বাহিনীর কব্জাতেই ছিল দেশটি। যদিও সম্প্রতি এক ধরণের নিয়ন্ত্রিত ও সীমিত গণতন্ত্র এসেছে দেশটিতে। মিয়ানমানের নাগরিকত্ব সংক্রান্ত আইনে রোহিঙ্গাদেরকে সেই দেশের নাগরিক হিসাবেই স্বীকার করা হয়নি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম, শত শত বছর ধরে যারা বাস করছে তারা নাকি সে দেশের নাগরিক নয়। আর এমন একটি আইনকে সমর্থন করেন যিনি সেই অং সান সুচি পান নোবেল শান্তি পুরস্কার!

মিয়ানমারের নাগরিকদের কয়েক ধরণের শ্রেণী আছে। তার কোনটাতেই নেই রোহিঙ্গারা। মিয়ানমারের নাগরিকরা বলে রোহিঙ্গারা কখনোই সেদেশের নাগরিক ছিল না, কোনদিন নিজেদেরকে সেদেশের নাগরিক দাবীও করেনি, বরং আলাদা হওয়ার জন্য যুদ্ধ করেছে। এ ধরণের কথা বলার কারণও আছে। বার্মার স্বাধীনতার কয়েক বছর পরই রোহিঙ্গারা ইসলামি জিহাদ শুরু করে। রোহিঙ্গা মুজাহিদরা মংডু ও বুছিডংসহ বিভিন্ন জায়গায় সরকারী অফিস আদালতে হামলা করে, অমুসলিমদের হত্যা করে। সশস্ত্র মুজাহিদরা চেয়েছিল নাগরিকত্ব না নিয়ে রাখাইন প্রদেশ নিয়ে পাকিস্তানের সাথে যোগ দিতে। আর একারণেই বাংলাদেশের জামাতে ইসলামীর সাথে এদের সবসময়ের সখ্যতা।

টেকনাফের উখিয়াতে অনেক আগে থেকেই এই রোহিঙ্গাদের সাথে নিয়ে জামাতের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। একটা সময় রোহিঙ্গারা বার্মার এথনিক বার্মিজদের উপর আক্রমণ বাড়িয়ে দিলে সেনাবাহিনী নামে। সেই থেকেই শুরু হয় মিয়ানমার সরকারের রোহিঙ্গা মুসলিম বিরোধী অভিযান। জঙ্গি রোহিঙ্গাদের দমন করতে গিয়ে অনেক নিরীহ মুসলিম নাগরিকও এখন নিয়মিত নির্যাতনের শিকার।

রোহিঙ্গা সমস্যার স্বরূপটা তাই অনেক কঠিন। একে সাধারণ মুসলিম বিরোধী বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ কম। জাতিসংঘ চাপ দিলেই যদি বাংলাদেশ সীমান্ত খুলে দেয় তাহলে এই সমস্যা আরো প্রকট হবে। বাংলাদেশে এর আগে যে লাখ লাখ রোহিঙ্গা এসেছিল, মিয়ানমার তাদের ফিরিয়ে নিতে চায়নি। অন্যদিকে, মিয়ানমার সরকারের এই দাবি আরো জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইবে যে, এরা আসলেই ‘চিটাগনিয়ান’, বার্মিজ নয়। বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের গ্রহণ করতে শুরু করলে আরো বেশি করে মিয়ানমার সরকার তাদের তাড়ানোর অভিযান জোরদার করবে।

এসব রোহিঙ্গার একটি বড় অংশ সন্ত্রাসি, মাদক চোরাচালান ও অসামাজিক কাজে জড়িত। এবং বড় ভয়টা হলো কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় থাকা বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে এরা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। যেকোন উপায়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার পায়তারা করছে এরা। শুধুমাত্র বাংলাদেশেই নয়, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেও এরা নানা রকম অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ছে। রোহিঙ্গারা মধ্যপ্রাচ্য যাচ্ছে বাংলাদেশী পাসপোর্ট ব্যবহার করে। ফলে তাদের এসব অপকর্মের জন্য আন্তর্জাতিক বিশ্বে ভাবমূর্তি খারাপ হচ্ছে বাংলাদেশ আর বাংলাদেশী শ্রমিকদের।

দেশের একটি গোষ্ঠি, মূলত, ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক রাজনীতি যারা করে, তারা রোহিঙ্গা সমস্যাকে মুসলিমদের সাথে বৌদ্ধদের বিবাদ হিসাবে দেখিয়ে উত্তেজনা তৈরি করতে চাচ্ছে। ফেসবুকে, অনলাইনে তারা ফটোশপ করে উত্তেজনা ছড়াতে ব্যস্ত।

বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গারাও মিয়ানমারে ফেরত যেতে চায় না। মিয়ানমারও এদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসাবে স্বীকার করে কাউকে ফেরত নিতে আগ্রহী নয়। এদেশের যারা বলছেন, বাংলাদেশের সীমান্ত খুলে দেয়া হোক রোহিঙ্গাদের জন্য, তাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি মানবিক কারণের চেয়ে বেশি সক্রিয়।

বাংলাদেশ এমনিতেই ছোট একটি দেশ। জনসংখ্যার চাপে তার নাজুক অবস্থা। বাড়তি লাখ লাখ লোক আমাদের পক্ষে ধারণ করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশে গত বিশ বছরে যে পাঁচ লাখের মতো রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছে তাদের বেশিরভাগই নিজ দেশে ফিরে যায়নি। এরা কক্সবাজার আর পার্বত্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে আর নানা ধরণের জঙ্গি কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়েছে। আবার নতুন করে যদি রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া হয়, তারা দাঙ্গা শেষে নিজে দেশে ফিরে যাবে- এই নিশ্চয়তা আছে? তাই রোহিঙ্গাদের প্রতি অন্যায় দেখে আবেগি হলেও, আমাদের বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে। রোহিঙ্গাদের সাথে বাংলাদেশের ধর্মভিত্তিক সন্ত্রাসি রাজনৈতিক গোষ্ঠির আঁতাতের কারণে আমাদের শান্তি ও শৃংখলার কথাটিও বিবেচনায় রাখতে হবে।

এমন বাস্তবতায় সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নানা পর্যায়ে সমস্যাটি তুলে ধরার জন্যে। মিয়ানমারের দীর্ঘ সময় সামরিক শাসন ছিল। এখন কিছুটা হলেও বেসামরিক শাসন চালু হয়েছে। ফলে এখন আগের মতো আন্তর্জাতিক চাপ উপেক্ষা করা সম্ভব হবে না।

বাংলাদেশ যদি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের এদেশে নিরাপদ থাকার জায়গা দেওয়া হলে সেটা মিয়ানমারের জন্য একটি সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হবে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের এদেশে ঠেলে দেওয়ার। যা আসলে রোহিঙ্গা মুসলমানদের প্রতিই এক ধরনের অবিচার হবে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নীরব বিবেকের ভূমিকা পালন করে চলেছে বছরের পর বছর ধরে। চীন সরব রয়েছে মিয়ানমারের পক্ষে। বাংলাদেশ যেখানে রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে সেখানে বাংলাদেশকেই চাপ দেওয়া হচ্ছে অত্যন্ত কদর্যভাবে। আর বাংলাদেশের কতিপয় জ্ঞানপাপীর দরদের থলে যেন উপচে পড়ছে মানবাধিকারের আধিক্যে। অথচ এরাই এদেশের হিন্দুদের এদেশ থেকে উচ্ছেদে উল্লাস করে।

মিয়ানমার রাষ্ট্রটি পৃথিবীর বাইরের কোনও রাষ্ট্র নয়। জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে জাতিসংঘেরও দায়িত্ব রয়েছে রাষ্ট্রটির সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে নিরাপত্তা ও পূর্ণ নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের তত্ত্বাবধানে একটি কমিশন মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিমদের সমস্যা নিয়ে একটি রিপোর্ট দিয়েছে। জাতিসঙঘকে কফি আনানের রিপোর্টকে ভিত্তি ধরে সক্রিয় হতে হবে সমাদানের জন্য। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ অবশ্যই শরণার্থী হিসেবে রোহিঙ্গাদের সাহায্য-সহযোগিতা করবে কিন্তু সমস্যাটির সমাধান মিয়ানমারকেই করতে হবে এবং এ জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়কেই ব্যবস্তা নিতে হবে।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক

বিবিধ প্রসঙ্গ

বিভুরঞ্জন সরকার
কোন বিষয়ে লিখব বুঝে উঠতে পারছি না। অনেক বিষয় সামনে আছে। গত লেখায় ভেতর থেকে দেখা সিপিবিকে নিয়ে কিছু লিখেছিলাম এবং ভবিষ্যতে এ নিয়ে লিখব বলে আশা প্রকাশ করেছিলাম। অনেকে নানা মাধ্যমে আমাকে এ বিষয়ে তাদের আগ্রহের কথাও জানিয়েছেন। কিন্তু ভেবেচেন্তে ঠিক করলাম সিপিবি নিয়ে লেখার আরো সময় পাওয়া যাবে। চোখের সামনে অন্য যে ইস্যুগুলো ঘুরছে আজ সেদিকেই মনোযোগ দেয়া যাক।

সরকারের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি এখন অবসর যাপন করছে। অনেক ব্যর্থ আন্দোলন-সংগ্রাম করে তার ক্লান্ত। সহায়ক সরকার ছাড়া শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাবে না-এই গান শুনিয়ে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করছেন বিএনপি নেতারা। বিএনপি না পারলেও সরকারকে চাপের মধ্যে রাখার জন্য নিত্যনতুন ইস্যু তৈরি হচ্ছে। কোনো ইস্যু সরকার নিজে তৈরি করছে আবার কোনোটা আচমকা এসে সরকারকে চেপে ধরছে। যেমন ধরা যাক চিকুনগুনিয়ার কথা। ওরে বাপ, এমন যন্ত্রণাদায়ক ব্যাধি, ভাবাই যায় না। আমি নিজে একমাসের বেশি সময় কাতরেছি। বিএনপির ধ্বংসাত্মাক আন্দোলনের চেয়ে চিকুনগুনিয়া মনে হয় মানুষের মনে বেশি আতঙ্ক তৈরি করেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী অবশ্য জাতীয় সংসদে বলেছেন চিকুনগুনিয়া ছড়িয়ে পড়লেও আতঙ্কিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। মন্ত্রী গণমাধ্যমকে অহেতুক আতঙ্ক সৃষ্টি না করার আহ্বান জানিয়েছেন। মন্ত্রী আরো বলেছেন, চিকুনগুনিয়ার কারণ যে এডিস মশা তা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনের। এর দায়িত্ব কোনোভাবেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালের নয়। একজন ভুক্তভোগী বাসযাত্রী মন্ত্রীর বক্তব্য শুনে মন্তব্য করলেন: মামু, অহন কই যামু? এ বলে ওর দোষ, ও বলে এর। মাঝখানে চিড়েচ্যাপ্টা অবস্থা জনগণের।

সুইস ব্যাংকে অর্থ পাচারের খবর কয়েকদিন আগেই গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে। এ নিয়ে অনেকেই অনেক কথা বলছেন। স্বাভাবিকভাবেই দায় চাপছে সরকারের ওপর। কারা এই পাচারকারী? সরকার ঘনিষ্ঠদের দিকেই তো সন্দেহের চোখ যায়! অর্থমন্ত্রী অবশ্য সংসদে জানিয়েছেন, সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের টাকা পাচার নিয়ে গণমাধ্যমে প্রচারিত খবর ‘অতিশয়োক্তি’। ওই একই কাহিনী। যত দোষ নন্দ ঘোষ। সব ঝুট হায়। কিন্তু মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য কোনটা? অর্থমন্ত্রীর বয়ান নাকি গণমাধ্যমে প্রচারিত সংবাদ? প্রশংসাসূচক সংবাদ বের হলে ঠিক আছে, আর একটু বিরুদ্ধে সংবাদ হলেই ‘বোগাস’-এই নীতি পরিহার করা উচিত।

ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে আপিল বিভাগের রায় সরকারের জন্য একটি চরম বিব্রতকর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা সরকারকে একটা জব্বর ধাক্কা দিয়েছে। সংসদে এ নিয়ে উত্তাপ ছড়িয়েছেন সরকারদলীয় সদস্যরা। বাইরে সরকারবিরোধীদের উল্লাস চাপা থাকছে না এই রায় নিয়ে সরকারবিরোধীরা ফায়দা লোটার চেষ্টা করবে, করছে। নানা ধরনের কল্পগল্প ছড়ানো হচ্ছে। সরকার এবং সর্বোচ্চ আদালতের এই মুখোমুখি অবস্থানের সš§ানজনক নিষ্পত্তি কীভাবে হয়, সেদিকেই এখন সচেতন দেশবাসীর দৃষ্টি।

সুন্দরবন-রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র ইস্যুতেও সরকার খুব সুবিধাজনক অবস্থায় আছে বলে মনে হয় না। ইউনেস্কোর অবস্থান নিয়ে অহেতুক বিতর্ক তৈরি করার কোনো প্রয়োজন ছিল না। বিরোধীদের মতামত উপেক্ষা করে সরকার সুন্দরবনের সন্নিকটে রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সরকার এখন পর্যন্ত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলেই মনে। সরকার সরকারের কাজ করুক। কিন্তু সবাইকে কেন সরকারের অবস্থানের পক্ষে থাকতে হবে? সব ব্যাপারেই সরকারের এত অসহিষ্ণুতা কেন? দুই-চার-ছয়শ’ লোকের প্রতিবাদ সমাবেশ কিংবা মিছিল কি সরকারের গদি টলিয়ে দেবে? সরকারের এত আতঙ্ক কেন? নারায়ণগঞ্জে সাংস্কৃতিক কর্মীদের ওপর সরকার সমর্থকদের হামলা এবং কয়েকজনকে আহত করার ঘটনাটির নিন্দা না করে পারা যায় না। এর আগেও রামপাল ইস্যুতে প্রতিবাদকারীদের ওপর হামলা হয়েছে। এসব থেকে বিরত না হলে সরকারকে এক সময় বড় ঝামেলায় পড়তে হতে পারে।

এবার চোখ ফেরাই এখন বহুল আলোচিত ইস্যু ফরহাদ মজহারের দিকে। ফরহাদ মজহারকে নিয়ে তৈরি হয়েছে নাটকীয়তা তিনি ভোরবেলা বাসা থেকে বের হয়ে অপহৃত হলেন। মোবাইল ফোনে স্ত্রীকে প্রথমে জানালেন অপহরণকারীরা তাকে মেরে ফেলবে। তারপর জানালেন ৩০ লাখ টাকা দিলে ওরা তাকে ছেড়ে দেবে। আরো পরে এই টাকার পরিমাণ আরো কমিয়েও বলেছেন। কিন্তু টাকা কোথায় কীভাবে দিলে তার মুক্তি মিলবে সেটা তিনি বলেন। যা হোক সারাদিন এ নিয়ে গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক গসিপ চলল। বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে হামলে পড়ল। মুক্তচিন্তার পক্ষে যারা তারাও মনে করলেন ফরহাদ মজহারের অবস্থান যেহেতু সরকারের বিরুদ্ধে, তাই তার অপহরণের পেছনে না থেকেই পারে না। ২৪ ঘণ্টা সময় পার হওয়ার আগেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ফরহাদ মজহারকে যশোর থেকে উদ্ধার করল। তাতে স্বস্তি গেলেও সামনে এলো অসংখ্য প্রশ্ন। আশা করা হয়েছিল, যেমন দ্রুততার সঙ্গে তাকে উদ্ধার করা হয়েছে, তেমন দ্রুততার সঙ্গেই ঘটনার রহস্যোদ্ঘাটন করে পুলিশ তাদের সক্ষমতা ও পারদর্শিতার প্রমাণ দেবে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না বললেও তাদের উদ্ধৃত করে গণমাধ্যমে যেসব গল্প ছাপা হচ্ছে তা অনেকের কাছেই বিশ্বাস্য বলে মনে হচ্ছে না। এক নারীর জবানবন্দি আদালতে রেকর্ড করা হয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী তাকে টাকা দেয়ার জন্যই ফরহাদ মজহার অপহরণ নাটক সাজানো হয়েছে। ফরহাদ মজহারকে যারা একটু ভালোভাবে জানেন, তারা এটাও জানেন যে তিনি নাটকীয়তা পছন্দ করেন। এটা কি তার সাজানো নাটক? তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ প্রশ্নের জবাব পাওয়া যাবে না। আবার এ প্রশ্নও সামনে আসছে, তদন্তকারীরা শেষে যা বলবেন সেটা আমাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হবে তো? এই হয়েছে এক জ্বালা। আমরা পুলিশের কাছে নির্ভরতাও চাইব আবার তাদের কথা বিশ্বাসও করতে চাইব না।

ফরহাদ মজহার নিজে যে জবানবন্দি দিয়েছেন বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে তাতে তিনি সম্ভাব্য অপহরণকারী হিসেবে ‘সরকারকে যারা বিব্রত করতে চায়’ তাদের কথা বলেছেন। ফরহাদ মজহার যে রাজনৈতিক দলের গুণগ্রাহী সেই বিএনপি নেতারা ক্রমাগত বলছেন, ফরহাদ মজহার অপহরণ নাটক সরকারেরই সাজানো। তাহলে তো এটাই দাঁড়ায় যে, সরকারই সরকারকে বিব্রত করার জন্য এই নাটক সাজিয়েছে। এটা কি হতে পারে? কী জানি বাপু সব সম্ভবের দেশ বাংলাদেশে সবই হতে পারে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ফরহাদ মজহারের প্রশংসা করে অনেক কথার সঙ্গে এটাও বলেছেন যে, তিনি একজন বড় দার্শনিক। তা, তার দর্শনটা কী, মানব জাতির কোন উপকার তার দর্শন থেকে হয়েছে সেটা যদি একটু বিস্তারিত বলতেন তাহলে আমপাবলিকের একটি বুঝতে সুবিধা হতো। এটা ঠিক, ফরহাদ মজহারের কিছু সমর্থক আছেন। তবে এর চেয়ে বিরোধীর সংখ্যাই মনে হয় বেশি। তিনি নিঃসন্দেহে একজন চিন্তাশীল মানুষ। কিন্তু তার চিন্তা কারো উপকারে না লাগলেও অপকারে লাগে। ফরহাদ মজহারকে নিয়ে রহস্য জাল বিস্তার হতে না দিয়ে এটা গুটিয়ে ফেলাই হবে বিচক্ষণতার পরিচায়ক। সরকার সমস্যা জিইয়ে রেখে সেটা নিয়ে বিরোধীদের রাজনীতি করার সুযোগ দেবে, না সমস্যা সমাধানে ব্রতী হবে- সেটাই এখন দেখার বিষয়।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

নারীর জন্য ভাবনা

বর্তমান বাংলাদেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি, সামাজিক যোগাযোগ, রাজনীতির বিকাশে; বিশেষত অর্থনীতির বর্তমান সচল পরিস্থিতি সৃষ্টিতে নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এসব কর্মকাণ্ডে ও শ্রমে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত অনেক ক্ষেত্রে নারীর নিজের হলেও অংশগ্রহণের ধরন, শ্রম-মান, শ্রমের মজুরি নির্ধারিত হয় সামাজিক-রাষ্ট্রীয়, প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন বিষয়ের মিথষ্ক্রিয়ায় ও সিদ্ধান্তে। সামাজিক এসব সিদ্ধান্ত ও চলকের অনেক কিছুই নারীর অনুকূলে থাকে না। ঘরের বাইরে নারীকে বিভিন্ন সমস্যা অতিক্রম করতে হয়। এসব সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ চলক বা ইস্যু হলো নারীদের উপযুক্ত টয়লেট না থাকা। এর পেছনে পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিও ক্রিয়াশীল। এ কারণে নারী অনেক সময় তার রুচি, শিক্ষা, যোগ্যতা, মেধা এবং আকাক্সক্ষা অনুযায়ী পেশা নির্বাচন করতে পারে না। এমনকি ঘরের বাইরে কাজের অনুপ্রেরণাও হারিয়ে ফেলে। বাড়ির বাইরে নারীদের ব্যবহার উপযোগী টয়লেট না থাকায় একদিকে যেমন অর্থনীতির ওপর তার প্রভাব পড়ে, অন্যদিকে স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির কারণে নারী কর্মক্ষমতা হারায়। বিশেষত কর্মক্ষেত্রে নারীদের এই ঝুঁকির মাত্রা অত্যন্ত প্রকট।
নাগরিক জীবনে অভ্যস্ত নারীরা এ ধরনের সমস্যা মোকাবিলা করে বেশি। ঢাকা শহরে পাবলিক টয়লেট কোথাও কোথাও দেখা যায় বটে, কিন্তু তা অধিকাংশই পুরুষদের জন্য নির্মিত। যদিও এসব টয়লেট প্রায় সবসময়ই থাকে ব্যবহারের অনুপযোগী, নোংরা। এছাড়া অফিস-আদালত, হাসপাতাল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মার্কেট, শপিং মল, বাস বা রেল স্টেশনের মতো সাধারণ জায়গায়, যেখানে নারী-পুরুষ উভয়েরই যাতায়াত ও বিচরণ, সেখানে নারীরাই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হয়। অনেকক্ষেত্রে নারী ও পুরুষদের একই টয়লেট ব্যবহার করতে হয়। এতে নারীর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। শরীরবৃত্তীয় কারণে পুরুষের তুলনায় নারীর বাড়তি নিরাপত্তা ও শারীরিক প্রয়োজন প্রাকৃতিক বিষয়। পুরুষ যত্রতত্র টয়লেটের প্রয়োজন সম্পন্ন করতে পারে। কিন্তু একজন নারীর পক্ষে তা সম্ভব নয়। নারীরা ঘরের বাইরে, অফিসে, বাজারে যখন নানাবিধ কাজে অংশগ্রহণ করে তখন টয়লেট সমস্যার কারণে অনেকে প্রয়োজনীয় পানি পান করা থেকে বিরত থাকে। এতে তাদের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি তৈরি হয়। দেখা দেয় কিডনির সমস্যাসহ অন্যান্য রোগ। কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মজুরি বৈষম্যের মতোই এটিও ভয়াবহ একটি সমস্যা। যেমন বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি নারী শ্রমিক কাজ করে পোশাকশিল্পে। উল্লেখ্য যে, পোশাকশিল্পে বর্তমানে প্রায় ২২ লাখ শ্রমিক নিয়োজিত। এসব শ্রমিকের প্রায় ৮০ ভাগই নারী। অধিকাংশ পোশাকশিল্প কারখানায় নারী শ্রমিকদের স্বাস্থ্য এবং নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘ সময় বদ্ধ পরিবেশে কাজ করার জন্য তাদের স্বাস্থ্যগত নানা সমস্যা দেখা দেয়। নারী-শ্রমিকদের টয়লেটের সমস্যা নিয়ে অনেকে বেশি সরব হলেও, নারী শ্রমিকদের মতে, টয়লেটের সংখ্যার বিষয়টি তত গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা নয়, বরং সমস্যা হলো টয়লেট ব্যবহারের বিধিনিষেধ বিষয়ে। কেননা পোশাকশিল্পের কাজের ধরন এবং কর্তৃপক্ষের মাত্রাতিরিক্ত মুনাফা লাভের চিন্তার কারণে কর্মঘণ্টাগুলোতে অবসর থাকে না। ফলে নারী শ্রমিকদের দীর্ঘসময় টয়লেট ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হয়। এতে তাদের কিডনি ও অন্যান্য জটিল শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। তা ছাড়া অনেক পোশাকশিল্প কারখানায় পর্যাপ্ত টয়লেট না থাকায় শ্রমিকদের দীর্ঘ সময় টয়লেট ব্যবহারের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। এর সঙ্গে রয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও পুষ্টিকর খাবারের সংকট। ফলে নারী শ্রমিকরা আক্রান্ত হন নানা রোগব্যাধিতে। সব থেকে জটিল সমস্যায় পড়েন চাকরিজীবী গর্ভবতী নারীরা। সরকার মাতৃত্বকালীন ছুটি ৬ মাসে উত্তীর্ণ করেছে। সন্তান জন্মের পর তার দেখাশোনা ও মায়ের অনিবার্য ভূমিকার কথা বিবেচনা করে নারীরা এই ছুটি গ্রহণ করেন সাধারণত সন্তান জন্মের ১ সপ্তাহ পূর্বে। কিন্তু গর্ভকালীন সময়ে হরমোনের তারতম্যের কারণে নারীদের নানা রকম শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। এসময় নিয়মিত পুষ্টিকর খাবারের সঙ্গে সঙ্গে যথেষ্ট পরিমাণে স্যুপ বা তরল খাবার গ্রহণ করা প্রয়োজন। নিম্ন আয়ের অর্থনৈতিক কাজে জড়িত নারীরা একদিকে অর্থনৈতিক কারণে যেমন পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করতে পারে না, তেমনি অন্যদিকে সামর্থ্য থাকলেও তরল খাবারগ্রহণ থেকে বিরত থাকে। এর প্রধান ও অন্যতম কারণ কর্মক্ষেত্রে নারীবান্ধব টয়লেটের অপ্রতুলতা। ভাসমান নারীরা রাস্তাঘাটে ছোটখাট কাজে নিয়োজিত। যেমন ইটভাঙা, মাটিকাটা, রাস্তা সংস্কার, ভবন নির্মাণ ইত্যাদি। এছাড়া নিম্নবিত্তের নারীরা ধানখোলা, চাতাল, পশুপালন, কৃষিকাজে যুক্ত থাকে। তাদের জন্য কোনো টয়লেট সুবিধাই নেই। এ বিষয়ে সরকার যদিও কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু তা অপ্রতুল এবং হাস্যকর। কারণ, সে সব টয়লেট যেমন অপরিষ্কার, অপরিচ্ছন্ন, তেমনি ব্যবহার অনুপযোগী। মোবাইল টয়লেট আছে, কিন্তু তা নারীদের ব্যবহার উপযোগী নয়। কেবলমাত্র টয়লেট সুবিধা না থাকার কারণে নারীরা নিরাপত্তাহীনতা ও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। যার প্রভাব পড়ে আমাদের অর্থনীতিতে। বিনষ্ট হয় সামাজিক শৃঙ্খলা। এ কারণেও নারীদের জন্য পৃথক টয়লেট থাকা অত্যন্ত জরুরি। সমাজের পিতৃতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে নারী স্বাভাবিকভাবেই প্রান্তিক। সমাজের এই পিতৃতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা প্রয়োজন। সমাজ ও রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নয়নের জন্যই তা প্রয়োজন। নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গকে উত্থাপন না করেও কর্মক্ষেত্রসহ মানুষের প্রতিদিনের বিচরণ-সংলগ্ন এলাকায় নারীর জন্য পৃথক টয়লেটের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্রকে উন্নত করে তোলা সম্ভব।

লেখক: কবি, প্রকৃতি ও নগর সৌন্দর্যবিদ
rafeyaabedin@gmail.com

মুজিবনগর সরকার গঠনের নেপথ্য কাহিনী

মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে গৌরবোজ্জল অধ্যায়। এ অধ্যায় সঙ্গে জড়িয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের প্রাণকেন্দ্রে মুজিবনগর। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল কুষ্টিয়ার মেহেরপুর বৈদ্যনাথতলায় আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণের মাধ্যমে অস্থায়ী সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এপ্রিলে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা ও কলকাতায় বিভিন্ন বিদেশী ও ভারতীয় মিডিয়া নানাভাবে প্রশ্ন করে, স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার প্রধান কে? কিংবা তোমাদের সরকার কোথায়? এ অবস্থায় মরহুম তাজউদ্দিন আহমদ ১৯৭১ সালের ৩ এপ্রিল ভারতের তৎকালীন  ইদ্রিরা গান্ধীর সঙ্গে দিল্লীতে সাক্ষাত করেন। সেখানে স্বাধীন বাংলাদেশে সরকারের রূপরেখা গঠনে আলোচনা হয়। এ উপলক্ষে অস্থায়ী সরকার গঠনের জন্য ভারতের অবস্থানরত এমপি ও এমএনএদের খুজে বের করে একত্রিত করার দায়িত্ব দেয়া হয় চট্টগ্রামের প্রবীন নেতা মরহুম জহুর আহমেদ চৌধুরীকে। সহযোগী নেতাদের সন্ধানে মরহুম তাজউদ্দীন আহমদ প্রথমে আসামের গোয়ালপাড়া ও পরে আগরতলায় যান। সেখানে প্রবাসী সরকার গঠনের জন্য আওয়ামী লীগের এমপি ও এমএনএদের বৈঠকের আয়োজন করা হয়। ১০ এপ্রিল ওই বৈঠক আগরতলায় অনুষ্ঠিত হয়। ২৮ জন জনপ্রতিনিধি এতে উপস্থিত ছিলেন। ঐদিনই ভারতের বিভিন্ন পত্রিকা ও মিডিয়ায় মরহুম তাজউদ্দীন আহমদের পক্ষে তার প্রেস সেক্রেটারী কুষ্টিয়ার আওয়ামী লীগ নেতা (ষাট দশকের ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক) আমিনুল হক বাদশা ওই বার্তার কপি বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব পান। ওই বার্তায় বলা হয়েছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাস্ট্রপতি করে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার গঠন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। দিনাজপুর থেকে নির্বাচিত এমএনএ অধ্যাপক ইউসুফ আলীকে অস্থায়ী সরকারের শপথ অনুষ্ঠান আয়োজনের দায়িত্ব দেয়া হয়। শপথ অনুষ্ঠান বাংলাদেশের মুক্তাঞ্চলে অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু নানা কারণে ও নিরাপত্তার স্বার্থে ঐ স্থানটির কথা সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয়েছে। ১৭ এপ্রিল বাঙালির একটি ঐতিহাসিক স্মরণীয় দিন। স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী সরকারের মন্ত্রী পরিষদের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ও শপথ গ্রহণের দিন।  ভোরের দিকে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ, খন্দকার মোশতাক আহমদ, এম মনসুর আলী, এ এইচ এম কামরুজ্জামান ও এমএজি ওসমানী একটি গাড়ীতে অজানা অচেনা স্থানের দিকে রওয়ানা হয়েছিল। অন্যদিকে কলকাতা প্রেসক্লাবে উপস্থিত সাংবাদিকদের আবদুল মান্নান ও ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম উপস্থিত দেশী-বিদেশী সাংবাদিক ও বিভিন্ন মিডিয়াদের জানান আজ স্বাধীন বাংলার মাটিতে বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান হবে। এতে আপনারা আমন্ত্রিত। অনেকেই প্রশ্ন করলেন- কোথায়, কখন, কিভাবে অনুষ্ঠান হবে জানতে চান। তারা বললেন আমাদের অনুসরণ করুন। সবকিছুই দেখতে পারবেন। এই বলে সাংবাদিকদের গাড়িতে ওঠার অনুরোধ জানানো হয়। ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ সাল শনিবার ভোরে ভারতের সীমান্ত এলাকার হৃদয়পুরের দিক থেকে কয়েকটি গাড়ী এলো কুষ্টিয়ার মেহেরপুরে। প্রথমে এলেন আওয়ামী স্বোচ্ছাসেবক বাহিনীর প্রধান মরহুম আবদুর রাজ্জাক ও কয়েকজন ছাত্রনেতা। রাজ্জাক ভাইসহ অন্যদের স্থানীয় লোকজন চিড়া-মুড়ি ও আখেরগুড় দিয়ে নাস্তা করান। রাজ্জাক ভাই কয়েকজন স্থানীয় নেতাকে ডেকে বললেন, “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি” এই সঙ্গীত গাইতে পারে এমন কয়েজন কর্মীকে খুঁজে বের কর। তৎক্ষনাৎ তাদের মাধ্যমে হারমোনিায়াম তবলা ও বায়া সংগ্রহ করা হয়। কুষ্টিয়ার মেহেরপুরের বৈদ্যনাথপুর আমতলায় দাঁড়িয়ে তারা জাতীয় সঙ্গীতের রিহার্সেল দেওয়া হয়। শপথ অনুষ্ঠানের স্থান মেহেরপুরের আম্রকাননে পৌঁছতে বেলা ১১টা বেজে যায়। আগের কথামত ক্যাপ্টেন মাহবুবউদ্দিন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন। চীফ হুইপ অধ্যাপক আলী অনুষ্ঠানে স্বাধীনতার স্বাধীন সনদ পাঠ করেন। পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করেন গৌরীনগরের আওয়ামী লীগ কর্মী বাকের আলী, বাইবেল পাঠ করেন পিন্টু বিশ্বাস আর ত্রিপিটক পাঠ করেন ননী গোপাল ভট্টচার্য। পরে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম সবুজের মাঝে রক্তিম সূর্যশোভিত জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। এরপর জাতীয় নেতাদের নাম ঘোষণা করা হয়। তখন ফুলের পাপড়ি ছড়িয়ে তাদের বরণ করা হয়। মঞ্চে উঠে আসন গ্রহণ করলেন প্রথমে সৈয়দ নজরুল ইসলাম এরপর তাজইদ্দন আহমদ, এএইচএম কামরুজ্জামান, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, খন্দকার মোশতাক আহমদ  ও কর্ণেল এমএজি ওসমানী। ঐতিহাসিক মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার স্বাক্ষী। আর বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে ১৭ এপ্রিল একটি গৌরবোজ্জল দিন। মহান স্বাধীনতা আন্দোলনের যদি কোন মহাকাব্য লেখা হয় তবে সেই কাব্যের প্রচ্ছদে কবির নাম লেখা থাকবে- শেখ মুজিবুর রহমান।

রাশিয়া-তুরস্ক সম্পর্ক: কার লাভ কতটুকু

বিশ্ব রাজনীতিতে আলোচিত রাষ্ট্র রাশিয়ার সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক পুনরায় প্রতিষ্ঠার জন্য করণীয় প্রথম ধাপ সম্পন্ন করেছে আরেক আলোচিত রাষ্ট্র তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। সম্প্রতি এরদোয়ানের রাশিয়া সফরটি বেশ আলোচনায় ছিল ইউরোপ, এশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোতে। বিশ্ব রাজনীতিতে বর্তমানে দুটি দিক পরিলক্ষিত হয়। এক- উদারপন্থী রাজনীতি ও দুই- কট্টরপন্থী রাজনীতি। মুসলিম দেশ হিসেবে হিসেবে তুরস্কের রাজনীতি অনেকটাই উদারপন্থী। তবে ইউরোপ তথা পশ্চিমাদের প্রতি এরদোয়ানের দৃষ্টিভঙ্গি যে খুব বন্ধুসুলভ নয় এটা তার বিভিন্ন সময়ের বক্তব্য ও রাজনৈতিক অবস্থান অবলোকন করলে সহজেই বোধগম্য।
দেশীয় রাজনীতি, সংস্কৃতিতে অনেক ক্ষেত্রেই পশ্চিমা আচরণ, আবার রাজনৈতিক চিন্তা ও পদক্ষেপের ক্ষেত্রে একরোখা আচরণের কারণে এরদোয়ান পশ্চিমা দরবারে সমালোচিত অনেক বেশি। মূলত বহুমুখী এ আচরণই এরদোয়ানের সফরকে বহুমাত্রিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দাঁড় করিয়েছে বিশ্ব দরবারে। গত একযুগেরও বেশি সময় ধরে তুরস্কে ক্ষমতায় রয়েছে এরদোয়ানের দল। কখনও প্রধানমন্ত্রী আবার কখনও প্রেসিডেন্ট হয়ে সরকার পরিচালনা করে আসছেন এরদোয়ান। ক্ষমতায় আসার শুরু থেকে গত ৮ আগস্ট-এর পূর্ব পর্যন্ত কখনই রাশিয়ার সঙ্গে গলায় গলায় সম্পর্ক হয়নি তুরস্কের। বরং ২০১২ সালে থেকে সিরিয়া ইস্যুতে মস্কো-আনকারার সম্পর্ক দিন দিন তলানিতে নামে।
১৫-১৬ জুলাই তুরস্কের ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানের পর অনেকটা নড়েচড়ে বসে তুরস্ক সরকার। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটু বেপরোয়া ভাব লক্ষ্য করা যায় এরদোয়ানের মধ্যে। এরদোয়ান হয়তবা কখনই ভাবেনি যে তার নিয়ন্ত্রণাধীন অনেক কিছুই তার বিপক্ষে চলে গেছে। ক্ষমতাশীন হয়ে বিশ্ব রাজনীতির অনেক বিষয়েই নাক গলিয়েছেন এরদোয়ান। তার কথা বার্তায় বুঝা গেছে যে, তিনি ইউরোপসহ পশ্চিমের অনেক দেশকেই গুরুত্ব দেননি। অর্থাৎ বিশ্ব রাজনীতিতে নাক-গলানোর জন্য যে শিষ্টাচার ও নমনীয়তা প্রয়োজন, এরদোয়ানের বক্তব্যে তা খুব কমই পরিলক্ষিত হয়েছে। প্রেসিডেন্ট হওয়া মানেই তার সকল মন্তব্য ও বক্তব্য ভূ-রাজনীতির জন্য ইতিবাচক হবে এমন ধারণা পোষণ করা যে আদৌ ঠিক নয় তা হয়ত সেনা অভ্যুত্থান চেষ্টার পর এরদোয়ান আন্দাজ করতে পারছেন। সেজন্যই হয়ত, ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানের পর স্বদেশকে ভালোভাবে না গুছিয়ে বিদেশ সফর শুরু করেছেন। রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক তলানিতে নামার পেছনে এরদোয়ানের বিভিন্ন মন্তব্য ও বক্তব্য ইন্ধনের কাজ করেছে।
রাশিয়ার সাথে তুরস্কের সম্পর্ক পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হলে কার লাভ কতটুকু; এমন সমীকরণ সামনে আসতেই পারে। তবে খোলা চোখে দেখে মনে হচ্ছে লাভের পাল্লা রাশিয়ারই ভারি। কিন্তু তুরস্কের পাল্লা একেবারে খালি বিষয়টি এমনও নয়। রাশিয়া সফরের মাধ্যমে এরদোয়ান তথা তুরস্কের দুই ধরনের পরাজয় ঘটল। এক- এতদিন যাবৎ সিরিয়া ইস্যুতে রাশিয়ার প্রতি যে ক্ষোভ ও অভিযোগ এরদোয়ান ব্যক্ত করেছিল প্রত্যেকটাই অসার হয়ে বালির চরে মুখ থুবড়ে পড়ল এবং ভবিষ্যতে মন্তব্য করার ক্ষেত্রে এরদোয়ানের বাক্য বান কয়েক ধাপ শ্লথ হওয়ার পরিবেশ কায়েম হলো।
দুই- সিরিয়া ইস্যুতে রাশিয়া যে মন্তব্য করে আসছে ও যে পদক্ষেপ নিয়েছে প্রত্যেকটাই সঠিক ছিল এবং আছে এমনটাই প্রমাণ হলো। সাথে সাথে সিরিয়া তথা বিশ্বের অন্য কোনও দেশের সাথে যদি রাশিয়া যথাযথ ও ইতিবাচক আচরণ নাও করে সেক্ষেত্রে তুরস্কের ভালো-মন্দ কোনও মন্তব্য করার সাহস থাকল না। এরদোয়ান স্বীকার করুক আর নাইবা করুক এটা একটা যুক্তিযুক্ত অনুমান যে, রাশিয়া সফরের মাধ্যমে এরদোয়ান ও তুরস্কের মাথা নতজানু হয়েছে অর্থাৎ এরদোয়ানের নৈতিক পরাজয় ঘটেছে।
শুধু রাশিয়া নয়, এশিয়ার অনেক দেশ নিয়েও এরদোয়ান বিতর্কিত মন্তব্য করেছে। বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির বিষয়ে পশ্চিমা বিশ্বকে জড়িয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেছে এরদোয়ান। তুরস্কের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের ইতিবাচক মনোভাব থাকলেও সেটা এখন আর বজায় থাকার কথা না। কারণ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে মন্তব্য ও পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে এরদোয়ান মোটেও শিষ্টাচারের পরিচয় দেননি। এতে এরদোয়ানের দুটি দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভবনা দেখা দিয়েছে। এক-বাংলাদেশের মতো একটি উদীয়মান অর্থনীতির দেশের সঙ্গে সম্পর্ক নেতিবাচক হওয়ার সম্ভাবনা। দুই-পশ্চিমা দেশগুলোকে জড়িয়ে মন্তব্য করার কারণে পশ্চিমারা এরদোয়ানের ওপর আরেক দফা বিরক্ত হলো। বিশ্ব রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে শিষ্টাচারের কোনও বিকল্প নেই। গ্রামগঞ্জে একটা প্রবাদ আছে, ‘ক্ষেত আর আইল এক ভাবা ঠিক নয়’। কথাটি মনে হয়, শিষ্টাচার ও ভূ-রাজনৈতিক পরিবেশ স্বাভাবিক রাখার ক্ষেত্রে অনেক বেশি উপযোগী।
লেখক: শিক্ষার্থী, এমবিএ প্রোগ্রাম, ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।