আজ : মঙ্গলবার: ৮ ফাল্গুন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ | ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ইং | ২ জমাদিউস-সানি ১৪৩৯ হিজরী | ভোর ৫:৪৪
fevro
শিরোনাম

ক্লাইমেট ফিকশন

বর্তমানে আমরা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি সায়েন্স ফিকশন দেখি অথচ পরিবর্তিত বিশ্ব ভাবছে ক্লাইমেট ফিকশন নিয়ে। কারণ ক্লাইমেট ফিকশনের মাধ্যমে ছোট গল্প, উপন্যাস ও চলচ্চিত্রে শৈল্পিকভাবে এমন গল্প বলা হয় যাতে জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণতা প্রাধান্য পায়। একে ইংরেজিতে সংক্ষেপে ক্লাই-ফিও বলা হয়। যেখানে ক্লাই অর্থ ক্লাইমেট আর ফি অর্থ ফিকশন। যেমন সাই-ফি বা সায়েন্স ফিকশনের ক্ষেত্রে সত্য। ক্লাইমেট ফিকশনে জলবায়ু ও পরিবেশ বিপর্যয়ের ফল কী হবে তার ওপর জোর দেয়া হয়। ঔপন্যাসিক জিম লাদার তার পোলার সিটি উপন্যাসে ২০৭৫ সালে আলাস্কা শহরের কী হাল হবে তার পটভূমি তুলে ধরেন। যখন আমেরিকায় ৪৮টি প্রদেশে উষ্ণ বাতাস বয়ে যায় আর এসব প্রদেশই বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ে। ভারতীয় লেখক অমিতাভ ঘোষ বলেছেন- মানব সৃষ্ট কারণে পরিবেশের কোনো ক্ষতি হলে যদি পুরো মানবজাতিকে তার ভোগান্তি ভবিষ্যতে পোহাতে হয়, তবে আমরা তা নিয়ে ক্লাইমেট ফিকশন লিখতে পারি। এক্ষেত্রে উদহারণ হতে পারে-বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে যদি বাংলাদেশের কোনো বন ধ্বংস হয়, ধ্বংস হয় মানুষের জীবন ও জীবিকা, যাতে মিশে থাকে মানুষের আবেগ, অনুভূতি ও প্রেম আর এর প্রভাব নিয়ে যদি কেউ গল্প বা উপন্যাস লেখে, তবে আমরা তাকে ক্লাইমেট ফিকশন বলতে পারি।

কানাডার বিখ্যাত লেখক মার্গারেট অ্যাটউড ক্লাইমেট ফিকশনকে স্পেকিউলেটিব ফিকশন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাবে মানুষের প্রেম, আবেগ-অনুভূতি, জীবনধারা, জীবনযাত্রার মান পরিবর্তন হয়, মানুষের ওপর প্রকৃতির বিপর্যয়ের পূর্বাপর অবস্থা নিয়ে এ ধরনের কল্পকাহিনী তৈরি হয়। যা মানুষকে পরিবেশের প্রতি সতর্ক হতে উদ্বুদ্ধ করে। পৃথিবীর বাইরের কোনো গ্রহে ঘুরে বেড়ানো নয়, নয় ঘড়ির কাঁটা ১৩টা বাজা বা ভয়ঙ্কর কোনো দুর্ঘটনা বর্ণনা করা গতানুগতিক কল্পনার ডানায় উড়ে। এখানে গল্পের প্লট নির্মাণ করা হয় পরিবেশ দূষণের ফলে কী হতে পারে বা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, বৈশ্বিক উষ্ণতা মানব সভ্যতার জন্য কী হুমকি নিয়ে আসতে পারে। ক্রাইম ফিকশন যেমন সমাজের ভয়ঙ্কর চিত্র তুলে ধরে অপরাধ জগতের, তেমনি ক্লাইমেট ফিকশন পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতার কারণে যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়, তার প্রভাব সম্পর্কে সচেতন করে। বছরের পর বছর বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, খরা, বরফ গলা এবং পূর্বঘোষিত তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, বদ্বীপগুলো ও উপকূলীয় অঞ্চল ডুবে যাওয়া, আন্তর্জাতিক নদীর প্রবাহে বাঁধ দিয়ে ভাটি অঞ্চলে পানি প্রবাহ হ্রাস-সবকিছুই আগামীর পৃথিবীর জন্য আগাম সতর্কবাণী বহন করছে। আর এই সতর্কবার্তাকে হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে, এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া মানুষ ও প্রাণিজগতের ওপর পড়লে অদূর ভবিষ্যতে কী হবে- তা নিয়ে উপন্যাস বা গল্প লেখাই ক্লাইমেট ফিকশন। যেমন বিজ্ঞানের বিরূপ প্রভাব কী হবে-তা নিয়ে লেখা সায়েন্সফিকশন, তার সহোদর ক্লাইমেট ফিকশন অদূর ভবিষ্যতে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে ।ক্লাইমেট ফিকশন ধারণার উদ্ভব হয় ২০০৬ সালে ড্যান ব্লুমের প্রথম ক্লাইমেট ফিকশন শব্দটির অবতারণার মাধ্যমে। ২০০৭ সালের দিকে ব্লুম প্রথম ফেসবুক টুইটারে ক্লাইমেট ফিকশন নিয়ে লেখালেখি শুরু করেন। ২০১২ সালে তিনি একগুচ্ছ উপন্যাস প্রকাশ করেন পোলার সিটি রেড নামের। এ উপন্যাসে তিনি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে অদূর ভবিষ্যতে ২০৭৫ সালে আলাস্কার উদ্বাস্তু হওয়া মানুষ নিয়ে কল্পকাহিনী রচনা করেন। ২০১৩ সালের এপ্রিলের শেষ দিকে ন্যাশনাল পাবলিক রেডিও ও ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্স মনিটর ব্লুমের এ ক্লাইমেট ফিকশন নিয়ে আবার আলোচনা শুরু করে। তারপর সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে তা ভাইরাল হয়ে দাঁড়ায়। এখন অ্যামাজানে সার্চ করলে অসংখ্য ক্লাইমেট ফিকশনের বই পাওয়া যাবে। তবু যে কোনো নতুন আঙ্গিকের সফলতা নির্ভর করে- সাহিত্যের ভোক্তা পাঠক তাতে কীভাবে সাড়া দেয় তার ওপর? ক্লাইমেট ফিকশন আগামীর হুমকির বিষয়টি তুলে ধরে বৈশ্বিক উষ্ণতা হ্রাসে প্রাকৃতিক সম্পদ ও বনসম্পদ রক্ষায় কতটা আমাদের প্রভাবিত করবে, তাও প্রশ্ন? তাই ক্লাইমেট ফিকশন হার্টস্ট্রোক লাইনের লেখক এডওয়ার্ড এল রবিন বলেন, উনিশ শতকের আগে কাল্পনিক উপন্যাসকে রূপকথার গল্প বলা হতো। এরপর বিশ শতকে সায়েন্সফিকশনের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে অনেক ডেসটোপিয়ান বা ভয়ঙ্কর আতঙ্কে বসবাস করা মানুষের জীবন নিয়ে উপন্যাস লেখা হলো। ব্যক্তি খাতের নিরাপত্তা, সম্পদ ধ্বংস হওয়া, ভিনগ্রহের মানুষের পৃথিবী আক্রমণ নতুন যন্ত্রপাতি আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর পরিবর্তন করার স্বপ্ন দেখার পরিবর্তে এখন জলবায়ু বা পরিবেশ বিপর্যয়ের প্রভাব কী হবে-তা নিয়ে কল্পকাহিনী লেখা হচ্ছে।

এ প্রেক্ষিতে প্রশ্ন দাঁড়ায়-ক্লাইমেট ফিকশন কি আমাদের পরিবর্তিত পৃথিবীতে জীবন ধারণ করায় অভ্যস্ত করে তুলবে? না পরিবতির্ত আগামীতে জীবন কেমন হবে তা ভাবতে শেখাবে? আর এ পরিবর্তিত অবস্থায় সামাজিক ও রাজনৈতিক ভূমিকা কী হবে ক্লাইমেট চেঞ্জ মোকাবিলায়? এ কারণে বলতে হয়- যদি ক্লাইমেট ফিকশন লেখক তার উপন্যাস বা গল্পে প্রত্যাশা বা আশার আলো না দেখান, তবে তা পড়ে মানুষের অসহায়ত্ব বৃদ্ধিরই বেশি সম্ভাবনা আছে। যেমন ক্ল্যারা হিউম, ব্যাক টু দ্য গার্ডেন নামের উপন্যাস রচয়িতা বলেন, যারা ক্লাইমেট ফিকশন নিয়ে লেখেন, তারা এমন ধরনের গল্প বা উপন্যাস রচনা করতে চায়। যার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করা যায় আর মানুষকে সতর্ক করতে পারেন হয়তো ভীতি সৃষ্টি করে। আর না হয়, মানুষের সামনে আপনি বাস্তবতা তুলে ধরে প্রত্যাশা ও পরিণতি ব্যাখ্যা করতে পারেন এবং মানুষকে পরিবেশ বিপর্যয়ের ব্যাপারে সচেতন করে তা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে উৎসাহ দিতে পারেন। তাই বাংলাদেশে ক্লাইমেট ফিকশন নিয়ে লিখলেও এ দেশের নদীর মৃত্যু, পানি প্রবাহ হ্রাস, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কী ধরনের বিরূপ প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে লিখতে হবে। স্বাধীন বাংলায় এ ব্যাপারে তেমন কোনো সাহিত্য রচিত হয়নি।

পুতুলনাচ

পুতুলনাচের পুতুলগুলো সাধারণত চার ধরনের হয়ে থাকে: তারের পুতুল, লাঠিপুতুল, বেণিপুতুল ও ছায়াপুতুল। তারের পুতুল সূক্ষ্ম তার বা সুতার সাহায্যে এবং লাঠিপুতুল লম্বা সরু লাঠির সাহায্যে নাচানো হয়; আর দুই বা ততোধিক পুতুল যখন একসঙ্গে বেঁধে হাত দিয়ে নাচানো হয় তখন তাকে বলে বেণিপুতুল।

যে কোনো গল্প বা কাহিনী অবলম্বনে পুতুলগুলো দর্শকদের সামনে উপস্থিত হয়ে বিভিন্ন চরিত্র রূপায়িত করে। চরিত্রানুযায়ী পোশাক-পরিচ্ছদ, রূপসজ্জা এবং নানাবিধ উপকরণ সংযোজন করে পরিচালক পুতুলের অভিনয়শৈলী তুলে ধরেন। মানুষের মতোই পুতুলগুলো হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা, রাগ-দুঃখ ইত্যাদির অভিনয় করে। সাধারণ নাটকে স্থানের সীমাবদ্ধতা থাকলেও পুতুলনাচে তার বিস্তৃতি অনেক। জলের প্রাণী, আকাশের পাখি, ডাঙ্গার মানুষ, বনের পশু সবই কাহিনীর প্রয়োজনে একমঞ্চে এক সঙ্গে অভিনয় করে। নির্বাক পুতুলসহ সব প্রাণীই নিজস্ব আচার-আচরণের পাশাপাশি মানুষের ভাষায় কথা বলে। ফলে পুতুলনাচ হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত ও আনন্দময় এবং সব বয়স ও শ্রেণীর দর্শকরা তা সানন্দে উপভোগ করে।

বিশ শতকে আধুনিক শিল্পকলা হিসেবে পুতুলনাচ স্বীকৃত হয় এবং টেলিভিশন আবিষ্কারের পর তা বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা লাভ করে। চারু ও কারুকলা শাখার প্রায় সব ফর্মেরই ব্যবহার ও প্রয়োগ একে টোটাল আর্ট ফর্মের পর্যায়ে উন্নীত করেছে।

গল্প, কবিতা, নাটক, অভিনয়, গান, নৃত্যকলা, ভাস্কর্য এবং অন্যান্য দৃশ্যমান আর্টের সার্থক মিলন ঘটেছে পুতুলনাচে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পুতুলনাচ একটি পুরাতন শিল্পকলা হিসেবে পরিচিত। ইউরোপে পুতুলনাচের সবচেয়ে প্রাচীনতম ধারক জার্মানি। মধ্যযুগে ইটালিতে ‘পুলসিনেলো’ নামে আবির্ভাব ঘটে সুতা পাপেটের, ফ্রান্সে যার নতুন নাম হয় ‘পলসিনেল’। দস্তানা পাপেটের জনপ্রিয় চরিত্র হিসেবে জš§ নেয় ‘পাঞ্চ’। এই পাঞ্চ চরিত্রের প্রতিরূপ দৃষ্ট হয় রাশিয়া, জাপান ও ব্রাজিলে। জার্মানি ও সুইডেনে পাঞ্চের নাম ‘কাসপার’, হল্যান্ডে ‘ইয়ান ক্লাসেন’ এবং হাঙ্গেরি ও রোমানিয়ায় ‘ভাসিলচে’। এছাড়াও মিসর, চীন, কোরিয়া, ফিলিপাইন, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং শ্রীলঙ্কায় পুরনো ও আধুনিক ধারার পুতুলনাচের অস্তিত্ব বিদ্যমান। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ক্যালকাটা পাপেট থিয়েটার, পিপলস থিয়েটার, ডলস থিয়েটার এবং বর্ধমান পাপেট থিয়েটার আধুনিক ধারায় পুতুলনাচের চর্চা চালিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশে পুতুলনাচের প্রায় হাজার বছরের ঐতিহ্য রয়েছে। এসব পুতুল তৈরি করা হয় শোলা এবং হালকা কাঠ দিয়ে। তাতে কাপড় ও বিভিন্ন অলঙ্কার পরানো হয়। এক সময় হিন্দু-সম্প্রদায়ভুক্ত পেশাজীবী পুতুল-নাচিয়ে দল গ্রামে-গঞ্জে পুতুলনাচ প্রদর্শন করত এবং তারাই বংশপরম্পরায় ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পমাধ্যমটিকে বাঁচিয়ে রাখে। এখন অনেক পেশাদার শিল্পী ধর্মনিরেপেক্ষভাবে পুতুলনাচের দল গঠন ও পরিচালনা করছেন। বাংলাদেশে তারের পুতুল ও লাঠিপুতুলের চর্চাই বেশি হয়। এক্ষেত্রে শিল্পী দু’হাতে সর্বোচ্চ তিনটি পুতুল ধরে সংলাপ বা সুরের তালে তালে পুতুলকে নাচান। পুতুলনাচে সাধারণত রাধাকৃষ্ণ, সীতাহরণ বা রামায়ণ-মহাভারতের অন্যান্য কাহিনী এবং লোকজীবনের বিভিন্ন কিসসা, পালাগান ইত্যাদি তুলে ধরা হয়। এছাড়া সমসাময়িক ঘটনাবলি, যেমন শিশু, নারী ও বয়স্ক শিক্ষা, সুখী পরিবার, দাম্পত্যজীবন, প্রেম-বিরহ, জামাই-শাশুড়ি ও বউয়ের কলহ ইত্যাদিও লক্ষ্য করা যায়। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মঞ্চসহ বিভিন্ন মঞ্চ, স্কুলপ্রাঙ্গণ ও টেলিভিশনে পাপেট থিয়েটার প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর পাশাপাশি গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে বাংলার ঐতিহ্যবাহী এ মাধ্যমটির আধুনিকায়নের কার্মকাণ্ডও এগিয়ে চলছে।

পুতুলনাচ দেশে দেশে
ইউরোপে পুতুলনাচের সবচেয়ে পুরনো ঐতিহ্য ধরে রেখেছে জার্মানি। ইতালিতে মধ্যযুগে ‘পুলসিনেলো’ নামে সুতো পাপেটের আবির্ভাব ঘটে। ফ্রান্সে এর নাম পাল্টে হয়ে যায় ‘পলসিনেল’। দস্তানা পাপেটের চরিত্র হিসেবে জš§ নেয় ‘পাঞ্চ’। পাঞ্চের মতো নানান চরিত্রের দেখা মেলে রাশিয়া, জাপান ও ব্রাজিলে। জার্মানি ও সুইডেনে পাঞ্চের নাম ‘কাসপার’, নেদারল্যান্ডসে ‘ইয়ান ক্লাসেন’ আর হাঙ্গেরি ও রোমানিয়ায় ‘ভাসিলচে’। এশিয়ার চীন, কোরিয়া, ফিলিপাইন, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও শ্রীলঙ্কায়ও পুতুলনাচের প্রচলন প্রাচীনকাল থেকে এখনো আছে।

মুস্তাফা মনোয়ার ও তার পাপেট শো
বাংলাদেশে ঐতিহ্যবাহী এই পুতুলনাচ বা পাপেট শিল্পকলার সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন চিত্রশিল্পী ও নন্দনতাত্ত্বিক মুস্তাফা মনোয়ার। তিনি আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পাপেট থিয়েটার নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রদর্শনী করছেন। তার নেতৃত্বে এডুকেশনাল পাপেট ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (ইপিডিসি) পাপেটশিল্পী সৃষ্টি, কুশলীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দান, পাপেটের মাধ্যমে শিশু-কিশোরদের মধ্যে দেশাত্মবোধ জাগ্রতকরণ, দেশীয় সংস্কৃতি ও কৃষ্টির সঙ্গে নতুন প্রজšে§র পরিচিতিকরণ ইত্যাদি কার্যক্রম চলছে। দেশের লোকগাথা, রূপকথা ও লোকসংগীত থেকে উপাদান নিয়ে ইপিডিসি আনন্দঘন শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান প্রযোজনা ও প্রদর্শন করে আসছে। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি অনুষ্ঠান হচ্ছে পণ্ডিত ও মাঝি, প্রবাদ বাক্য, আগাছা, লোভ, লিচুচোর, ছোট মেয়ে ও প্রজাপতি, খুকি ও কাঠবিড়ালি, মোমের পুতুল, শান্তির পায়রা, বকের কান্না, গাধা ও কচুরিপানা এসব। বাংলাদেশের পাপেট মিডিয়া আজ আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে। ১৯৯৭ সালের নভেম্বরে নরওয়েতে আন্তর্জাতিক পাপেট থিয়েটার ফেস্টিভ্যাল এবং ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বরে ভারতের কলকাতায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী ও সম্মেলনে বাংলাদেশ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে।

ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় বাংলাদেশি স্টল

এবার ৬৯তম ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় অংশ নিচ্ছে বাংলাদেশের ‘আগামী প্রকাশনী’। জার্মান সরকার ও ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা কর্তৃপক্ষ পরিচালিত একটি কর্মসূচিতে বাংলাদেশ থেকে অতিথি পাবলিশার্স হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন আগামী প্রকাশনীর নির্বাহী পরিচালক মিতিয়া ওসমান তিসমা। আগামী প্রকাশনীর এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, বৃহস্পতিবার মিতিয়া ওসমান তিসমা ভোরে তার্কিজ এয়ারের একটি ফ্লাইটে ঢাকা ত্যাগ করবেন। তিনি ৬ থেকে ১৫ অক্টোবর বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করবেন। এই কর্মসূচির আওতায় তার যাবতীয় খরচ আমন্ত্রিত কর্তৃপক্ষ বহন করছে। মেলায় আগামী প্রকাশনীকে সৌজন্য স্টল বরাদ্দ করেছে। বইমেলা চলবে ১১ থেকে ১৫ অক্টোবর। স্টল নং Hall 5.1/B 134। মেলা সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে এ www.buchmesse.de/de ওয়েবসাইটে।

এই বিষয়ে জার্মান বুক অফিস বুলেটিনের ২৬০ এডিশনে তার সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছে। ২৬৫ এডিশনে তার পরিচিতিতে বলা হয়েছে- ‘আগামী প্রকাশনীর নির্বাহী পরিচালক মিতিয়া ওসমান তিসমা, বাংলাদেশ আমন্ত্রণ প্রোগ্রাম-২০১৭ এর জন্য নির্বাচিত হয়েছেন।’

আগামী প্রকাশনীর ওই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ১৯৮৬ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত আগামী প্রকাশনী বাংলাদেশের শীর্ষ প্রকাশনা সংস্থাগুলোর মধ্যে একটি। আগামী প্রকাশনী মুক্তিযুদ্ধের উপর সবচেয়ে বেশি বই প্রকাশের জন্য বিখ্যাত। সংস্থাটি, সৃজনশীল মননশীল, ও গবেষণাধর্মী বই প্রকাশ করে।

এতে আরও বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ এ সময়ের দেশের শীর্ষস্থানীয় লেখক, কবি, সাহিত্যিক, রাজনীতিক, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীর প্রতিনিধিত্বশীল ও নির্ভরযোগ্য বই প্রকাশ করে। এখন পর্যন্ত দুই হাজারেরও বেশি শিরোনামের বই প্রকাশ করেছে। এই তালিকায় রাজনীতি, আত্মজীবনী, স্মৃতিকথা, কবিতা, প্রবন্ধ বাংলা ও ইংরেজিতে উভয় ভাষার বই এবং শিশুদের বই রয়েছে।

শহীদ কাদরী বহুমাত্রিক শিল্পবোধের কাব্যনির্মাতা

দিলীপ কুমার বড়ুয়া : শহীদ কাদরী ষাটের দশকের নির্মোহ নাগরিক জীবনের কবি। স্বাদেশিক মনন,বিশ্বনাগরিকতা–বোধ, শব্দ ও উপমা প্রয়োগের অভিনবত্বে সৃজনশীলতার ধারায় শহীদ কাদরী অনিবার্যভাবে কাব্যনির্মাণ করেছেন আবেগের প্রপাতে । শহীদ কাদরী নাগরিক জীবনে বিপন্নতার মুখোমুখি হয়েছেন, সেকারণে তাঁর কবিতায় সুপষ্ট হয়ে ওঠে আম্নসংকটের বিবরণ। সুগভীর জীবনবোধ, বিশ্ব নাগরিক চৈতন্য এবং আধুনিক শিল্পদৃষ্টির উৎকর্ষতায় তাঁর কবিতার অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে মৌলিকতায় ভাস্বর। ষাটের কবিতার মূল কাব্যধারার অবয়বে শহীদ কাদরী কাব্যবোধ ও শিল্পিত ভাষায় নির্মাণ করেছেন নাগরিক ক্লেদ, মনোবৈকল্য এবং আত্মজৈবনিক স্বীকারোক্তি পরিভাষা ।

শৈশব থেকে নগরে বেড়ে ওঠা কবি শহীদ কাদরীর কবিতার শরীরে ক্লেদ, গ্লানি ও যান্ত্রিকতা ,নগর জীবনের বিচ্ছিন্ন উপলব্ধি, জীবনচিত্রের স্বরূপ–বাস্তবতা ও নগরের অবক্ষয়ী দিনলিপির টুকরো অনুষঙ্গ দৃশ্যমান। সময়ের বৈরীতায় ঘর ছেড়েছিলেন অনেক আগেই । সেই থেকে কবিতার পথে পথে ঘুরে বেড়িয়েছেন অনেকটা পথ। বোহেমিয়ান এক বাউণ্ডুলে জীবন কাটিয়েছেন অভিমানে। বাঙালির ঐকান্তিক বোধের সামগ্রিকতায় পঞ্চাশের তিন আলোচিত কবি শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক এর সাথে সৃষ্টির উল্লাসে পথ হেঁটেছেন একজন শহীদ কাদরী। তাঁদের কবিতায় উদ্ভাসিত হয় বাংলাদেশের কবিতার উন্মেষের কাল। আধুনিক নগর ভাবনায় কবি শহীদ কাদরী নাগরিক–জীবন–সম্পর্কিত শব্দ চয়নের মাধ্যমে বাংলা কবিতায় নাগরিকতা ও আধুনিকতাবোধের সূচনা করেছিলেন। তাঁর কবিতায় নাগরিক জীবনের বাইরেও বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ নিসর্গ, পশু–পাখি কিংবা লোকজ সংস্কৃতির নানা বৈচিত্র্যপূর্ণ বিষয়ের সন্ধান মেলে। বাংলা কবিতার বিপুল ঐশ্বর্যের স্রোতস্বিনী ধারায় বহুমাত্রিক শিল্পবোধের সামগ্রিকতায় তিনি উন্মেষ ঘটিয়েছেন আত্মপ্রত্যয়ী অনুভবের উদ্ভাসিত চিত্রকল্প । মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার এই কবি বাংলাদেশ ও বাঙালির অন্তর্জগৎ স্পর্শ করেছেন নিবিড় মমতায়।

শহীদ কাদরী এক নিপুণ শব্দভাস্কর হয়ে কবিতার শাশ্বত ভাষায় সৃষ্টি করেছেন নান্দনিকতায় ভরা কবিতার সাম্রাজ্য মার্কসিজমে বিশ্বাসী কবি শহীদ কাদরীর ব্যক্তি ও কবিজীবন বলতে গেলে অনেক বেশিই ঘটনাবহুল। প্রবাস জীবন, বিদেশি স্ত্রী, বিরামহীন অসুস্থতা বারবার তাকে লেখালেখি থেকে বিচ্যুত করতে চাইলেও প্রকৃত কবি কখনো লেখার কলম ফেলে অন্য কিছুতে পুরোটা মগ্ন হতে পারেন না। পারেননি শহীদ কাদরী সেই সৃজনের সমারোহ থেকে ফিরে আসতে।

শহীদ কাদরী উত্তরাধিকার,তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা এবং সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই এই ত্রয়ী কাব্যগ্রন্থ দিয়েই বাংলা কবিতার গভীরে তাঁর শেকড় প্রোথিত করেছেন। গভীর অনুসন্ধানী দৃষ্টির সীমানায় সময়কে ধারণ করে শহীদ কাদরী গভীর শিল্পবোধ ও কাব্যভঙ্গিতে নির্মাণ করেছেন তাঁর কবিতার ক্ষেত্র । তিনি তাঁর অপার কাব্যপ্রতিভাকে ভাষাভঙ্গি, উপস্থাপনা, বিন্যাস কৌশলে সব সময় নিজেকেই অতিক্রম করতে চেয়েছেন নতুন নতুন চিত্রকল্পের নির্মাণ, নব নব উপমার গভীর দর্শনবোধে।

শহীদ কাদরী প্রত্যক্ষ করেছেন ৪৭–এর দেশভাগ। তাঁরই চোখের সামনে সংঘটিত হয়েছিল বাঙালি জাতির একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ । তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন একটি পরাধীন জাতির নির্মম শোষণ–বঞ্চনার অজস্র করুণ কাহিনী। তিনি তাঁর উত্তরাধিকার কাব্যগ্রন্থে লিখেছেন এভাবে : শৃঙ্খলিত, বিদেশী পতাকার নীচে আমরা শীতে জড়োসড়ো/ নিঃশব্দে দেখেছি প্রেমিকের দীপ্ত মুখ থেকে জ্যোতি ঝরে গেছে/নিম্নমুখো ফিরেছে বালক সমকামী নাবিকের/মরিয়া উল্লাস ধ্বনি আর অশ্লীল গানের কলি/নীর পালকের মত কানে গুঁজে, একা সাঁঝবেলা।/যীশুখৃষ্টের মতন মুখে সৌম্য বুড়ো সয়ে গেছে/ল্যান্টর্নের ান রাত্রে সৈনিকের সিগারেট, রুটি, উপহার/এবং সঙ্গম–পিষ্ট সপ্তদশী অসতর্ক চিৎকার কন্যার।

উত্তরাধিকার কাব্যের উত্তরাধিকার কবিতায় কবির যে–শিল্পসত্তা মাতৃজরায়ু থেকে নেমেই সন্ত্রস্ত শহরে ব্ল্যাকআউটের রাতের আঁধার দেখতে পাচ্ছে তা অতঃপর আক্রমণ করে বি–জীবনায়নের রাষ্ট্রকাঠামোকে। শহীদ কাদরী তাঁর দীপ্ত ভাষা, দৃঢ় চিত্রকল্পে আপাদমস্তক নাগরিক কবি। যার মননে, চিন্তা চেতনায় সতত প্রবহমান প্রাত্যহিক নাগরিকমনস্ক নগরভাষ্যচিত্র অনেক বেশি দৃশ্যমান। তৎকালীন কবিরা যেখানে প্রথম কাব্যের পরে দ্বিতীয়–তৃতীয় কাব্যে এসে হয়ে যান স্বজাতি–স্বদেশ লগ্ন, আশাবাদে–সংগ্রামে–উত্তেজনায় যোগমুক্ত, সেখানে যেন শহীদ কাদরী এক নির্বাসিত আত্মার মতো একলা ঘুরে বেড়ান শহরেই, যে–শহরে তুমুল বৃষ্টিও হয়। তারা পূর্ণিমা–প্রেত্মার্ত তারা নির্বীজ চাঁদের নিচে, গোলাপ বাগানে/ ফালগুনের বালখিল্য চপল আঙুলে, রুগ্নঊরু প্রেমিকার/ নিঃস্বপ্ন চোখের পরে নিজের ধোঁয়াটে চোখ রাখে না ভুলেও;/ কম্পমান অবিবেকী হাতে গুঁজে দেয় ম্লান ফুল/ পীতাভকুম্নলে তার।

কবিতার শব্দবাণ ও দ্ব্যর্থহীন প্রতিবাদী ভাষার উৎসারণে তাঁর কবিতার ভেতর দিয়ে অত্যাচারী শাসকের দম্ভের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তিনি দ্ব্যর্থহীন সত্যোচ্চারণে দ্বিধা করেননি। পরাধীন জাতির শৃঙ্খল ছেঁড়ার দ্রোহের আগুন ছড়িয়েছেন তাঁর কবিতায়। তিনি দাঁড়িয়েছেন অসহায় ছিন্নমূল মানুষের পাশে। কবির একাকিত্বের যন্ত্রণা একান্তই কবির একার। তাঁর এই অসহায়ত্ব ও একাকিত্বের ভয়াবহ চিত্র এঁকেছেন সমাজ, দেশকে নিয়েই। মনের অন্তর্দেশ রাঙানো যন্ত্রণা গুলো কাদরীর অভিব্যক্তিতে প্রকাশ পেয়েছে শব্দ ও উপমা প্রয়োগের অভিনবত্বে – জন্মেই কুঁঁকড়ে গেছি মাতৃজরায়ু থেকে নেমে-/সোনলি পিচ্ছিল পেট আমাকে উগ্রে দিলো যেন/দীপহীন ল্যাম্পপোস্টের নীচে, সন্ত্রস্ত শহরে/নিমজ্জিত সবকিছু, রুদ্ধচক্ষু সেই ব্ল্যাক–আউটে আঁধারে।/-এইমতো জীবনের সাথে চলে কানামাছি খেলা/এবং আমাকে নিষ্কপর্দক, নিষ্ক্রিয়, নঞর্থক/করে রাখে; পৃথিবীতে নিঃশব্দে ঘনায় কালবেলা! /আর আমি শুধু আঁধার নিঃসঙ্গ ফ্লাটে রক্তাক্ত জবার মতো/বিপদ–সংকেত জ্বেলে একজোড়া মূল্যহীন চোখে/পড়ে আছি মাঝরাতে কম্পমান কম্পাসের মতো অনিদ্রায়। (উত্তরাধিকার)

কবির ভাবনা বলয়ে শহর কেন্দ্রিক কথামালার ঢেউ কবিকে উদ্বেলিত করেছে বারম্বার। যার প্রকাশ ঘটেছে তাঁর ছান্দসিক শিল্পীসত্তায় – সহসা সন্ত্রাস ছুঁলো। ঘর–ফেরা রঙিন সন্ধ্যার ভীড়ে/যারা ছিলো তন্দ্রালস িগ্িবদিক ছুটলো, চৌদিকে/ঝাঁকে ঝাঁকে লাল আর শোলার মত যেন বা মড়কে/শহর উজাড় হবে, –বলে গেল কেউ –শহরের/পরিচিত ঘণ্টা নেড়ে খুব ঠাণ্ডা এক ভয়াল গলায়/এবং হঠাৎ/সুগোল তিমির মতো আকাশের পেটে/বিদ্ধ হলো বিদ্যুতের উড়ন্ত বল্লম।

শহীদ কাদরীর বিচিত্র ভাবনার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তাঁর তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা তে। বাঙালি জাতির ওপর পাকিস্তানি শোষকদের নিপীড়ন, নির্যাতন এর বিপরীতে সমগ্র বাঙালি জাতির স্বাধীনতা লাভের প্রবল আকাঙক্ষা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, স্বাধীনতা লাভের সফলতা, স্বাধীনতা–উত্তর কালে নৈরাজ্য, স্বপ্নের স্বদেশকে নিয়ে অযুত প্রত্যাশার উপজীব্য বিষয়াবলী তিনি বাক্যবন্ধনীতে আবদ্ধ করেছেন তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা তে। সচেতন মানুষের চেতনার শেকড়ে নিবিষ্ট শহীদ কাদরী স্বাধীনতা সংক্রান্ত তীব্র দ্যুতিময় পংক্তিমালায় ভাবনার প্রকাশ করেছেন দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমাতে– স্বাধীনতা, তুমি কাউকে কি দিয়েছো সারাদিন/টো–টো কোম্পানির উদ্দাম ম্যানেজারী করার সুবিধা/ কাউকে দিয়েছো ব্যারিকেডহীন দয়িতার ঘরে যাওয়ার রাস্তা/কাউকে দিলে অবাধ সম্পাদকীয় লেখার অপরূপ প্ররোচনা/উজ্জ্বল কিশোরকে ফের কবিতার আঁতুড়ঘর, মেঘের গহ্বর, /আর আমাকে ফিরিয়ে দিলে/মধ্যরাত পেরুনো মেঘলোকে ডোবা সকল রেস্তোরাঁ/স্বাধীনতা, তোমার জরায়ু থেকে/জন্ম নিলো নিঃসঙ্গ পার্কের বেঞ্চি, /দুপুরের জনকল্লোল/আর যখন–তখন এক চক্কর ঘুরে আসার/ব্যক্তিগত, ব্যথিত শহর, স্বাধীনতা! (স্বাধীনতার শহর : তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা)

স্বাধীন দেশে কবির যে ঘরে ফেরার আকুতি কবিতার ছন্দের ব্যঞ্জনায় মূর্ত হয়ে ধরা দিয়েছে ।যদিও সবুজ বাংলার বিস্তীর্ণ প্রান্তর পাকিস্তানিদের হত্যাযজ্ঞে , রক্তপাতে, আর্তনাদে বধ্যভূমি। তারপরও ঘরে ফেরার ব্যাকুলতা । শৃঙ্খলিত, বিদেশী পতাকার নীচে এতকাল জীবন ছিল জড়োসড়ো–এখন যেন ল্যাম্পপোস্টগুলো দীপহীন নয়, ব্লাকআউট অমান্য করে প্রিয় স্বাধীনতা যেন দিগন্তে জ্বেলে দিয়েছে বিদ্রোহী পূর্ণিমা ।

কবির উপলব্ধির বিস্তৃত অঙ্গনে নৈসর্গিক শুভ্রতার প্রগাঢ়তা কবিকে উদ্বেলিত করেছে – আবাল্য তোমার যে নিসর্গ ছিলো নিদারুণ নির্বিকার,/ সুরক্ষিত দুর্গের মতন আমাদের প্রতিরোধে সে হলো সহায় ,/ ব্যাক আউট অমান্য করে তুমি দিগন্তে জ্বেলে দিলে/ বিদ্রোহী পূর্ণিমা । আমি সেই পূর্ণিমার আলোয় দেখেছি ;/আমরা সবাই ফিরছি আবার নিজস্ব উঠোন পার হয়ে / নিজেদের ঘরে। (ব্যাক আউটের পূর্ণিমায়)

তিনি শিল্প সৌকর্যের চর্চায় খুঁজেছেন জীবনানন্দীয় কোমলতা, শিল্পিত সৃষ্টির অসীম উজ্জ্বলতা। তাঁর কবিতা দেশ দেশীয় কাব্যপ্রবাহ অতিক্রম করে বিশ্বমননের জ্যোৎস্নায় উদ্ভাসিত। তিনি লিখেছেন – পরিত্যক্ত মূল্যবোধ, নতুন ফুলের কৌটোগুলো/নিঃশব্দে থাকবে ফুটে মধ্য–বিশ শতকের ক্লান্ত শিল্পের দিকে চেয়ে/-এইমতো নির্বোধ বিশ্বাস নিয়ে আমি/বসে আছি আজ রাত্রে বারান্দার হাতল–চেয়ারে/জ্যোৎসনায় হাওয়ায়। (নশ্বর জ্যোৎসনায় : উত্তরাধিকার)

আমরা–বাঙালি ক্রমাগত এগিয়ে চলেছি চরম অস্থিতিশীলতার মধ্যে দিয়ে–রাজনৈতিক অস্থিরতার ধার বেয়ে। শান্তি–স্বস্তি আমাদের কাছে সোনার হরিণ কিংবা চাঁদের অমাবস্যা হয়েই থেকে যায়। শাসকের হাত বদল–পক্ষান্তরে শোষকের হাতবদল, সেনাধ্যক্ষের শাসনভার গ্রহণ আর অসহায় জনতার নির্যাতিত হবার ইতিহাস আমাদের পরিচিত প্রসঙ্গ। এ দেশ–মা–মাটি– মানুষ একটু স্বস্তির জন্য, কাঙিক্ষত সুবাতাসের জন্য আর্তচিৎকারে কাতর। শহীদ কাদরী রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা আর দুঃশাসন থেকে বাঙালির মুক্তির স্বপ্ন দেখছেন আপন স্বপ্ন–বিভোরতায়। কবি স্বদেশী চেতনায় উজ্জীবিত করতে চান আগামী প্রজন্মকে– ভয় নেই আমি এমন ব্যবস্থা করবো/একজন কবি কমান্ড করবেন বঙ্গোপসাগরের সবগুলো রণতরী/এবং আসন্ন নির্বাচনে সমরমন্ত্রীর সঙ্গে প্রতিযোগিতায়/সবগুলো গণভোট পাবেন একজন প্রেমিক, প্রিয়তমা/সংঘর্ষের সব সম্ভাবনা, ঠিক জেনো, শেষ হয়ে যাবে/আমি এমন ব্যবস্থা করবো, একজন গায়ক/অনায়াসে বিরোধী দলের অধিনায়ক হয়ে যাবেন/সীমান্তের ট্রেঞ্চগুলোয় পাহারা দেবে সারাটা বৎসর/লাল নীল সোনালি মাছ-/ ভালোবাসার চোরাচালান ছাড়া সবকিছু নিষিদ্ধ হয়ে যাবে, প্রিয়তমা। (তোমাকে অভিবাদন, প্রিয়তমা : তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা)

জীবনকে শিল্পের উজ্জ্বল ক্যানভাসে, প্রাপ্তি–অপ্রাপ্তির সমগ্রতাকে স্পর্শ করে কল্পনার শব্দমালায়, কাব্যকথায় তিনি নিঃসঙ্কোচে, আত্মচেতনায় ছুটেছেন অন্ধকারের বীভৎসতা থেকে নক্ষত্রের আলোর দিকে। তিনি ঐতিহ্য, গ্লানি, অপ্রাপ্তি, বিচ্যুতি থেকে সরিয়ে নিজেকে– ব্যক্তিক অস্তিত্বকে সযত্নে সুন্দর রাখতে দৃঢ় প্রত্যয়ী। কবিতাকে কখনো তিনি অক্ষম অস্ত্র মনে করেছেন; কখনো বা আবাহন জানিয়েছেন গর্জে ওঠার তাগিদে– হে আমার শব্দমালা, তুমি কি এখনও বৃষ্টি–ভেজা/বিব্রত কাকের মতো/আমার ক্ষমতাহীন ডাইরির পাতার ভেতর বসে নিঃশব্দে ঝিমুবে।/ তাহলে তোমার ধ্যানে আবাল্য দুর্নাম কিনে আমি/অনর্থক বড়াই করেছি।/যদি পারো গর্জে ওঠো ফিল্ডগানের মতো অন্তত একবার।/ (কবিতা, অক্ষম অস্ত্র আমার : তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা)

এই বাংলার মাটি–আমাদের আবাসভূমি–শহীদ কাদরীর স্বদেশ শত অজানা বণিক–শাসকের চাপে বিপর্যস্ত আর অগণন বিদ্রোহের আগুনের শক্তভূমি। অচেনা শিবির, কুচকাওয়াজের ধ্বনির অন্তরালে এই দেশ–মাটি অবিচল, অটুট, অনন্ত। বারবার সারাদেশ হয়েছে বধ্যভূমি। আর্তনাদে বহুবার প্লাবিত হয়েছে বাংলার বিস্তীর্ণ প্রান্তর। স্বজন হারানোর ব্যথায় কাতর, জীবনের আনন্দে ফিরে আসার ব্যাকুল প্ররোচনায় আমরা বিভ্রান্ত; পচা রক্তমাংসের ঘ্রাণে বিব্রত এ জাতি। অত্যাচার, মোহ, অচেনা শহরের বাতি, ইতঃস্তত হাঁটাহাঁটি, বিদেশের ফুটপাত, দোকানের বৈভব–সবকিছু থেকে দূরে সরে আমরা ফিরছি– ঘরমুখো আমরা; চেতনামুখো। সকল বেদনা, গ্লানি, পরাভব, বিচ্ছিন্নতা, বিপন্নতা ও মৃত্যুর ওপারে কবির প্রগাঢ় জীবনপ্রেম। আর নিঃসন্দেহে শহীদ কাদরী নির্মাণ করেছেন কবিতার এক নতুন উত্তরাধিকার।

শহীদ কাদরী বাংলার জল–মাটি–বাতাস–আলো–প্রকৃতিতে বেড়ে উঠেছেন । এ দেশের মমতা তার দেহে মাখা, তিনি এ মাটির প্রতি শ্রদ্ধায় অবনত–মস্তক। ভেতরের পলায়নপর অবসাদগ্রস্ততা তাঁকে পরাস্ত করতে পারেনি কখনো। আপাদমস্তক তিনি বাঙালি। নগরজীবনে কবি দেখেছেন ক্রমাগত গড়িয়ে গড়িয়ে নেমে পড়ার দৃশ্য। যদিও দুএকটি নুয়ে–পড়া গাছের ডাল বন্ধুর সমর্থ হাতের মতো করমর্দনের জন্য এগিয়ে আসতে থাকে নগরবাসীর জীবনে। আর গ্রাম এক স্নিগ্ধ চারণক্ষেত্র। গ্রামে সোনালি খড়ের ভিটে আছে, গভীর কুয়োতলা আছে। খররৌদ্রে জিরানোর জন্য চত্বর আছে। অথচ শহরের যান্ত্রিক জীবনে আছে ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের উন্মুক্ত আলিঙ্গন।

১৯৭০–এর নভেম্বরে যে সামুদ্রিক ঝড় আমাদের উপকূলকে ও মানুষজনকে বিধ্বস্ত করেছিল তারই সূত্র ধরে শহীদ কাদরী তাঁর একটি ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের জার্নাল কবিতাটি রচনা করেন। নির্বিবেকি কাফনের আড়ালে দাঁড়িয়ে কবি–শোকহীন, মানবিক অহংকারে ঝকঝকে :/আমি তো শোকগ্রস্ত নই, টেলিফোনের ডায়াল ঘোরালে/প্রত্যেকে উত্তর দিচ্ছে যে যার নিজের ঘরে সুস্থ স্বাভাবিক।/তবু শোকের প্রস্তাব চারদিকে, এখানে জীবিতের মুখ যেন/ মিশে গেছে মৃতের আদলে, শবযাত্রার মতো গম্ভীর মিছিলে/ ছেয়ে গেলো আমার শহর, ভরে গেলো বঙ্গোপসাগরের গর্জনে, অথচ নির্বিকার দাঁড়িয়ে রইল যথাস্থানে শহরের রেস্তোরাঁগুলি। বিবেকি কবির মধ্যে যে সন্ত্রাস ও আতঙ্ক জাগে তা দেখে যে নিজের ওয়ার্ডরোব থেকে অনর্গল বেরিয়ে আসছে/ আমারই কাপড় চোপড় ফুলে যাওয়া লাশের মতো/ যেখানেই হাত রাখি সবকিছু মৃতের দেহের মতো/ শীতল, ঠান্ডা, হিম। কবি আর রেস্তোরাঁর নীল আলোর মধ্যেও আত্মগোপন করতে পারেন না। পরাবাস্তব জগতের মতো তাঁর প্রিয়তম রেস্তোরাঁটি। চূর্ণ–বিচূর্ণ হয়ে/ পড়ে আছে বঙ্গোপসাগরের উপকূলে। অর্থাৎ কবিকে ছুঁয়ে যায়, পরিবর্তন ঘটায় ওই প্রাকৃতিক দুর্যোগ।

শহীদ কাদরীর জীবনদর্শনে প্রবাসজীবনসঞ্জাত ভাসমানতা প্রকট হলেও তার উৎসারণে আছে স্বদেশে উন্মূল হয়ে থাকার অন্তর্বেদনা । তাঁর জীবন–ভূমির প্রতি টান কোনো তত্ত্বীয় কাঠামো বা রাষ্ট্রীয়–পারিবারিক কাঠামোর মধ্যে নয়, তা মুক্তই থাকতে চেয়েছে নদীর জলধারার মতো, প্রবহমান স্রোতে ভেসে যাওয়ার প্রবল আকাঙক্ষা। শহীদ কাদরীর কবিতায় নগর জীবনের চিত্রকল্পে দেখা মেলে প্রকৃতির বিচিত্র রূপের। তাঁর কাব্যিক ছন্দের বাক্য বন্ধনীতে কুয়াশা, মেঘার্দ্র আকাশ, কাঠবেড়ালী, কুকুর, বানর, ভাঁটফুল, জোছনা, গুল্মলতা, রাজহাস, নীলরঙা মাছি, স্রোতস্বিনী, জল, সাঁঝ, লাল ফুল,রুগ্ন গোলাপ, কাঁকড়া, ইন্দ্রধনু, চাঁদ, সমুদ্রোচ্ছ্বাস, সবুজ ঝোপ, চড়ুই পাখি, জোনাকি ইত্যাদি শব্দের ব্যঞ্জনা । আবার তাঁর কবিতায় নগর জীবনের শব্দ –বিজ্ঞাপন, ট্যাক্সি, টুরিস্ট, ট্রাফিক আইল্যান্ড, লাইট হাউস, সিনেমার কিউ, নেমপেট, কারফিউ, পার্ক, এভিনিউ, হাসপাতাল, অ্যাকুরিয়াম, বোটানিকাল গার্ডেন, ল্যাম্পপোস্ট, ব্যাক আউট, রেকর্ড পেয়ার, প্রেসক্রিপশন, নর্দমা, টাইপরাইটার, প্ল্যাকার্ড, ব্যাংক, ফুটপাত, পেভমেন্ট, মাইক্রোফোন, টায়ার ইত্যাদির মতো শব্দরাজিও প্রাঞ্জল ভাষায় উপস্থাপিত হয়েছে। যার মধ্য দিয়ে তিনি প্রকাশ করেছেন কবিতায় নাগরিক জীবনের প্রতিচ্ছবি। আমাদের বোধের বারান্দায় কবি অনিবার্যভাবে আত্মপ্রত্যয়ী অনুভবে কাব্যনির্মাণ করেছেন নাগরিক বোধের দীপ্র আধুনিকতা আর নগর জীবনের রুগ্বতা, হীনতা, নিঃসঙ্গতা, ক্লেদ আর শূন্যতার চিত্র। কবির তৃতীয় কাব্য কোনো ক্রন্দন নেই–এর অনেক কবিতা ও শিল্পসুষমায় ঋদ্ধ। তাঁর শেষ কাব্য আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও–এর কবিতায় স্বদেশ–স্বজনের দিকে ফিরে আসার আর্তিতে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা–উত্তরকালে সংকট কালে কল্যাণ–প্রত্যাশী ও বিরল শুভবোধসম্পন্ন মানুষদের একজন হয়ে শহীদ কাদরী দেশের প্রতি জাগ্রত রেখেছিলেন তাঁর বোধ। সচেতন ছিলেন প্রজ্ঞায় ও জ্ঞানে। তাঁর কবিতায় এ বোধের অনুরণন সব সময় ছিল । শহীদ কাদরী স্বদেশের মাটিতে আর স্বদেশের বাতাসে মিশে আছেন। অপার কাব্যপ্রতিভা অনন্য শহীদ কাদরী আজ আমাদের মাঝে নেই। আছে তাঁর কীর্তিত ইতিহাস, সৃজনের অন্বেষা সমৃদ্ধ কবিতার উর্বর ক্ষেত্র। তিনি কবিতার শাশ্বত ভাষায় ভাস্বরিত থাকবেন পাঠকের অন্তরে । কাব্যকুশলতার শৈল্পিক সৌকর্যে শহীদ কাদরী আমাদের মননে, চেতনায় আলো ছড়াবে অনন্তকাল।
(সংগৃহীত)

একই চক্কর || নাসরীন জাহান

আজকের আবহাওয়া খুব ভালো।

মাথা ঘুরিয়ে লোকটিকে দেখি। সামনে জলের স্রোত, টকটকে লাল সূর্যের অর্ধেকটাই খেয়ে ফেলেছে সমুদ্র, এ রকম পরিবেশে এই স্থানে কারও সঙ্গে কথা জমানোর জন্য এই বাক্যের তুলনা হয় না। আমিও মৃদুকণ্ঠে বলি, তা ঠিক বলেছেন, এ রকম আবহাওয়া সচরাচর পাওয়া যায় না।

বুঝলেন, এ নিয়ে তিনদিন এসেছি, সূর্য ডোবার মুহূর্তটি দেখব, লোকটি সেই কাঙ্ক্ষিত দুর্লভ দৃশ্যটির দিক থেকে চোখ সরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলে, প্রতিদিনই ঠিক এই সময়ে কোত্থেকে যে একটা কুফা মেঘ আসে!

আমিও সেই দৃশ্যের সম্মোহনের মধ্যেই রীতিমতো গেঁথে ছিলাম।

এ এমনই এক দুর্দান্ত অনুভব, এমনই হিমজ্যোতিচক্র খেলা করে চারপাশে, মহাবিশ্বের কোন অতলে নিজেকে চূর্ণবিচূর্ণ করে হারিয়ে ফেলার এমনই এক ধারালো তলোয়ার, যেন বনবন ঘুরছে, জীবাণু পড়া মাত্র দ্বিখণ্ডিত হয়ে যাবে। সেই অনুভবের মুহূর্তে ব্যাটা কী রকম এঁটো হাত ঢোকাচ্ছে।

ভ্রুর মধ্যে বিরাট এক ঢেউ তুলে দেখি, আমি রাহুমুক্ত হয়েছি। খপ করে গিলে ফেলেছে সূর্যটি, এরপর কী নির্বিকার, কী স্থির জল, যেমন- আমি খাইনি, এমনই এক গোবেচারা মুখ। আকাশটা এখন সাদাটে, শুধু একটু কালো রং উড়ে উড়ে তার মধ্যে কি এক বিষণ্নতা ঢুকিয়ে দিতে চাইছে।

কদিন যাবত আপনাকে দেখছি, লোকটি ধুলো ঝেড়ে দাঁড়ায়, মনে হচ্ছে আপনিও আমার মতন নিঃসঙ্গ।

সব ছায়া কেটে গেলে এবার অবাক হওয়ার পালা।

লোকটি সেধে নিজেই কথা বলতে চাইছে। বয়সের এমন একটা প্রান্তে এসে পৌঁছেছি, কাউকে ডাকলেও একটা সুস্থির জবাব পাই না। আমিও কোনো রকম একটা কিছু বলে লাপাত্তা হয়ে যাই।

এককালে জীবনে আলো ছিল, গান ছিল, সে সময় অনেকেই চিনত। ইচ্ছে করে আলাপ জমাতে চাইত। সেই সূর্যাস্তের মুহূর্তে আমি যেন নিমজ্জিত ছিলাম সেই বয়সে, আমার কপালে জমেছিল সেই বয়সের ভাঁজ। গত দশ বছরের মধ্যে কেউ আমার সাথে সেধে আলাপ জমাতে চায়নি। আমার বিস্মিত হওয়ার কথা ছিল, তার বদলে কী-না উল্টো বিরক্তি? মাটিতে হাত চেপে আমিও দাঁড়াই, বয়সটাই এমন, নিঃসঙ্গতার! বুঝলেন, এই দেশে তা-ও কিছু দাম আছে- বাইরের দেশে কুকুরও শুঁকে দেখে না।

কথাটা বলেই মনে হলো বেখাপ্পা হয়ে গেল। লোকটির সামনে অস্বস্তিবোধ করি-এ জন্যেই হয়তো আমার সাথে কেউ কথা বলে শান্তি পায় না।

লোকটি যেন আমার মনের চিন্তা ছিঁড়ে নেয়, বুঝলেন, কেউ আমার সঙ্গে কথা বলে সুখ পায় না।

কিছুক্ষণ বলার পরই দেখি হাই তুলছে, বলে বড় পেঁচাও তুমি অথবা বলে, বড়ো শব্দ তোমার কথায়। কত কী যে বলে। আমি কিন্তু চেষ্টা করি যদি একটু রসিয়ে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা যায়। কিন্তু শব্দের ভারসাম্য ঠিক রাখতে পারি না। দেখা যায় যে কথাটা বলতে হয় ফিসফিসিয়ে তার মধ্যেও শব্দ ঢুকে পড়েছে, আপনিই বলুন মানুষের কথাতেই তো শব্দ হবে। গাছপালা পশুপাখি জলের মাছেরা কি শব্দ করে আলাপ করে ?

তার কথার তোড়ে আমিও হাঁপিয়ে উঠি। তার সমস্যাটা ধরতে পারি, বড়ো খরখরে কণ্ঠ তার, এ ছাড়া বলার ভঙ্গিটা ক্লান্তিকর, যেন মুখস্ত কিছু আউরে যাচ্ছে।

হোটেলে ফেরার জন্য হাঁটছি, সে বলে, আপনি কি বিরক্ত হচ্ছেন?

না না, আমার ভালোই লাগছে।

ভালো লাগার অবশ্য কোনো কারণ নেই। কোটে হাত ঢুকিয়ে মৌজ করে সূর্যাস্ত দেখছিলেন। আমিও এই মুহূর্তটার জন্য কদিন যাবত মুখিয়ে আছি, অথচ দেখুন সেই মুহূর্তেই আমি আপনার সঙ্গে বকবক শুরু করে দিয়েছিলাম, যেন এমন জরুরি কথা সেই মুহূর্তে না বললেই চলত না।

আপনি কথা জানেন ভালো।

ধন্যবাদ! কিন্তু আমার বলার ভঙ্গিটা বড়ো বিশ্রী।

না, তা হবে কেন? বলে আমি দাঁড়িয়ে চশমার ধুলো মুছি, আপনি একাই এসেছেন?

আমি একাই এসেছি, বলে লোকটি হাসে, মানুষ তো একাই, কী বলেন, এই যে পৃথিবীতে আপনার এত লোক আছে কিন্তু আপনি একটি বিপজ্জনক বয়সকে সঙ্গে নিয়ে একা পথ চলছেন।

আমি হেসে ফেলি, মানুষের সব বয়সই বিপজ্জনক, একটি শিশু, একজন যুবতী, বৃদ্ধা। ঠিকই বলেছেন আপনি, যদি অসুখে পড়ি, সে তো এই বয়সে হতেই পারে, না? যদি মাথা ঘুরে যায়, কেউ ধরার নেই। পৃথিবীতে অনেক লোক আছে আমার কে বলল আপনাকে, তাহলে কি একা পথ চলি?

আপনি কি বিরক্ত হচ্ছেন?

কেন বারবার এই প্রশ্ন করছেন?

আমি কিছু কথা বলতে চাই আপনার সঙ্গে, সে এক দীর্ঘ কাহিনি। জানেন বুক ফেটে মরে যাচ্ছি, কাউকে বলতে পারছি না, আপনি একলা একজন এই বয়সের মহিলা, সমুদ্র পাড়ে, সূর্যাস্ত দেখছেন, লক্ষ করছি, হ্যাঁ কদিন যাবতই। খোঁজও নিয়েছি আপনার সম্পর্কে, আপনার কী সব বইটই আছে। তার মানে লেখিকা, আপনি আমার বিষয়টা বুঝবেন। শুধু বিরক্ত হবেন না, ধৈর্য ধরে শুনবেন, তাতেই আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচব।

তাহলে তো বহু দূর এগিয়েছেন, আমি হেসে ফেলি, আমার অনেক খবরই জানেন। সে কাহিনি কি খুবই গুরুত্বপূর্ণ?

আমার জন্য সেটা আমার অস্তিত্বের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। আপনি শুধু শুনবেন, এরপর আপনার সরল প্রতিক্রিয়া জানাবেন, আমি চিরকৃতজ্ঞ থাকব।

ঠিক আছে আপনি কাল সন্ধ্যায় আসুন, আজ আমার ভীষণ মাথা ধরেছে।

অসীম দয়া আপনার।

পরদিন লোকটি এসে একটানা নিজের দুঃখ-কষ্টের বর্ণনা দিয়ে সকালটাকে পচিয়ে ফেলে। প্রথমে আমি অত্যন্ত সহানুভূতির সঙ্গে তার বেদনার সঙ্গে একাত্ম হতে চাইছিলাম। তার স্ত্রী অন্যের হাত ধরে চলে গেছে, সন্তানেরা তাকে দেখছে না, বোকার মতো সে তার সব সম্পত্তি ওদের নামে লিখে দিয়েছিল, এরপর এখন কি রকম দুর্বিষহ তার দিনরাত্তির যাচ্ছে, স্রেফ পথের ভিখিরি সে, এইসব কথাই সে বলছিল খুঁটিনাটি বর্ণনার মাধ্যমে, স্ত্রীর চেহারা, গড়ন, প্রতিটি সন্তানের আলাদা বৈশিষ্ট্য, পিতা হিসেবে নিজ চরিত্রের বিশাল মহানুভবতা, সবই তাৎপর্যময়, কিন্তু বলার ধরন একঘেঁয়ে, ফলে তার বেদনাও হয়ে ওঠে আমার জন্য ক্লান্তিকর।

আমি দুপুর পেরোতে থাকলে চেয়ারে মাথা এলিয়ে দিই।

সে অদ্ভুত কণ্ঠে বলে, এখনো তো আসল প্রসঙ্গেই আসি নি।

আমি ভাষা হারিয়ে ফেলি, বলি আমাকে এসব বলে কী লাভ? আমি কী করতে পারব আপনার?

আপনি লেখিকা মানুষ, আপনি আমাকে নিশ্চয়ই একটা পথ দেখাতে পারবেন। মানুষ, মানুষের মন এসব নিয়ে আপনার কাজ, আপনি যদি না পারেন-

দেখুন, আমি মনোচিকিৎসক নই, এ ছাড়া আপনার যা সমস্যা সেখানে মনোচিকিৎসকেরও কিছু করার নেই, আসামি আপনার সন্তানেরা, আপনি নিজে তাদের সব লিখে দিয়েছেন, এখানে আইনও কিছু করতে পারবে না।

আমি তো বলেছিই, আমার মূল সমস্যায় এখনো আমি আসি নি। লোকটি নখ খুঁটতে থাকে, সমস্যা আমার বন্ধু আবদুর রহমানের।

কী আশ্চর্য! আপনি আপনার বন্ধুর সমস্যা বলার জন্য আমাকে খুঁজে বের করেছেন? তা ছাড়া আমি কে? কয় অক্ষরই বা লিখেছি? এ দেশে আপনি আর লেখক খুঁজে পেলেন না?

আপনার প্রশ্নের উত্তর পর্যায়ক্রমে দিচ্ছি, লোকটির কণ্ঠ অকস্মাৎ ঝনঝন করে ওঠে, প্রথমত, এখন আমার বন্ধুর সমস্যাই আমার সমস্যা, আমি তাকে সেইভাবেই অনুভব করি।

দ্বিতীয়ত, আপনি কে এই তো? আপনি আমারই মতো সংসার পরিত্যক্ত, কিন্তু অসীম মনোবল নিয়ে একাকী জীবনযাপন করছেন এ রকম একজন নারী, তৃতীয়ত আমি যে সমস্যার কথা বলব, সেটা উপলব্ধি করার ক্ষমতা একমাত্র আপনার আছে। আমি অন্তত এই ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে এসেছি।

আমি চুপ হয়ে থাকি। এমনিতে কারোর সঙ্গে একটু কথা বলার জন্য পাগল হয়ে থাকি। এ রকম অবস্থায় কেউ যখন আগ্রহে কথা বলতে চাইছে, আমার আনন্দিত হওয়ার কথা। কিন্তু এ রকম অবস্থায় আমি একজন শ্রোতা চাই, যে আমাকে আমার নিঃসঙ্গতাকে আষ্টেপৃষ্ঠে অনুভব করবে। কারও দুঃখ-বেদনা-বিপর্যয় শোনার মতো মানসিক অবস্থা আমি হারিয়ে ফেলেছি। কিন্তু এই লোক আজ আমাকে ছাড়বে না, জানি না কখন তার সব বৃত্তান্ত বর্ণনা শেষ হবে।

আবদুর রহমান ছিল নিজে অসুখী, ধীর কণ্ঠে লোকটি শুরু করে। নিজের জীবনে অশান্তি থাকলে যা হয়, যা কিছু সহজ যা কিছু সুন্দর সবকিছুই কুৎসিত বাঁকাচোরা মনে হয়। অন্যের জীবনের সুখ মনের মধ্যের দাউদাউ ঈর্ষাকে ফাঁপিয়ে তোলে।

আমি মাথা তুলে বলি, আপনি নিজের উপলব্ধি আবদুর রহমানের ওপর চাপাচ্ছেন কেন?

লোকটি বলে, এই উপলব্ধি নিছক আমার নয়, সাধারণ মানুষের যা হয় আমি সেটাই বললাম, আবদুর রহমানেরও তা-ই হয়েছিল, তার মধ্যবয়স্ক এক সহকর্মীর সুখ-শান্তি তাকে উন্মাদ প্রায় করে তুলেছিল।

সেই সহকর্মীও ছিলেন যন্ত্রণাকর চরিত্রের, সারাক্ষণ স্ত্রীর গল্প, এই বয়সেও স্ত্রী তার প্রতি কেমন নিবেদিত, সারাবছর দুজনে কীভাবে সঞ্চয় করেন শীতকালীন ভ্রমণের জন্য, অফিস শেষ হতেই কীভাবে ঘর তাঁকে টানে, এইসব গল্প, লাঞ্চ ব্রেকের সময় সারাক্ষণ আবদুর রহমানের সঙ্গে, কাহাতক সহ্য হয় তার? একদিন সহকর্মীকে চ্যালেঞ্জ করে বসে সে, মানুষের কোনো-না-কোনো শূন্যতা থাকেই, নিশ্চয়ই এত কিছুর পরও সহকর্মীর কিছু শূন্যতা আছে।

সহকর্মী স্পষ্ট কণ্ঠে উচ্চারণ করেন, আমার কোনো শূন্যতা নেই।

আবদুর রহমান ক্ষেপে ওঠে, দীর্ঘ জীবনে স্ত্রীকে নিয়েই আপনি পূর্ণ- এ হয় না, নিশ্চয়ই আপনি এখনো কোনো সুন্দরী যুবতীর প্রেমে পড়তে পারেন। আপনি সেই পথের ধার ঘেঁষেন না বলেই নিজেকে আপনার জানা হয়ে ওঠেনি।

সহকর্মীর সে কী বেদম হাসি, তুমি মানুষের জীবনের নির্মল সুখ কি তা-ও চেনো না, তুমি যে কথা বলছ সে হলো পৈশাচিক সুখের কথা। আমি নির্মল সুখেই পূর্ণ।

আমি ঘাড় তুলে বিষয়টির প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করি, কিন্তু আবদুর রহমানের অসুখটা কি ছিল?

লোকটি এতে বিগলিত হয়ে পড়ে। শুনতে চান? সে এক লম্বা কাহিনি, আপনি শুনতে চাইলে অবশ্যই আমি বলতে পারি।

আপনি সংক্ষিপ্ত করে বলুন।

লোকটি দমে গিয়ে বলে, সব কথা কি অত অল্পের মধ্যে সারা যায়?

আমার ক্ষুধা পেয়েছে, ভাবি, আপনি কাল এসে বিস্তারিত বলুন, এটাই বলব তাকে।

ইতিমধ্যে সে আবদুর রহমান বৃত্তান্ত শুরু করে দিয়েছে। তার জন্ম, কীভাবে সে বড় হচ্ছিল, তার চিন্তার গতি প্রকৃতি, লোকটি আবদুর রহমানের শৈশবের মধ্যেই এক ঘণ্টা কাটিয়ে দেয়, ততক্ষণে আমি ধৈর্য রক্ষার শেষ প্রান্তে পৌঁছেছি।

সত্যি বলতে তার এরপরের বর্ণনাগুলো সঠিকভাবে আর আমার কানে যায় না। তবে বিচ্ছিন্নভাবে, কিছু টুকরো শব্দ জোড়া করলে সেই দীর্ঘ কাহিনির সংক্ষিপ্ত রূপ যা দাঁড়ায় তা হলো, সেই ভয়ানক জেদ আর ঈর্ষা আবদুর রহমানকে উন্মাদ প্রায় করে তুললে সে অফিস শেষে একদিন তার সহকর্মীকে নিজের বাসায় নিয়ে আসে। তার স্ত্রী ছিল তারচেয়ে পনেরো বছরের ছোট।

সেই সুন্দরী স্ত্রী আবদুর রহমানকে একদম ভালোবাসত না। স্ত্রীকে সে অনুরোধ জানায়, সে যেন সহকর্মীর সঙ্গে আন্তরিক সুন্দর আচরণ করে।

এই খেলায় সে একসময় সফল হয়। দু-তিন সন্তানের মা হয়েও মহিলার মধ্যে ছিল হাজার রঙ, কুমারীর অভিব্যক্তি।

যা হোক, ক্লান্ত আমি ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন এই ঘটনা শুনে হেসে ফেলি, তাহলে সেই দাম্পত্য জীবনে সুখী লোকটি সেই সুন্দরী নারীর প্রেমে পড়েছিল?

লোকটি গভীর বেদনার্ত কণ্ঠে বলে, প্রেম কি সোজা প্রেম? একেবারে পৈশাচিক প্রেম, সব মিলিয়ে আবদুর রহমানের যখন হুঁশ হয় তখন বেলা অনেক গড়িয়ে গেছে। অফিসের ফাঁকেও কাজ ফাঁকি দিয়ে সেই সহকর্মী আবদুর রহমানের স্ত্রীর কাছে চলে যেত।

আপনি এখন বলতে চান কী?

আমি বলতে চাই, আবদুর রহমানের কি প্রায়শ্চিত্ত হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?

আমি হেসে ফেলি, দেখুন যে ঘটনা বলছেন সেখানে সবাই পরিণত, যে সহকর্মীকে স্ত্রী সুখের চেয়েও বেশি টেনেছে অন্য সুখ, এখানে মূল নায়ক সে, সে আবদুর রহমানের ওপর কিছু সময়ের জন্য ভর করেছে মাত্র। নিশ্চয়ই তার মধ্যেও কিছু শূন্যতা ছিল। সেই লোকটি কি বাচ্চা, তাকে ফুঁসলে কেউ বিপথে নিয়ে গেছে বলা যাবে ?

তবুও, অস্ফুটকণ্ঠে উচ্চারণ করে লোকটি, মানুষের নির্মল সুখের মধ্যে কখনো ছায়ার মতো হাত বাড়ায় অশরীরী জন্তু, পরিণত বয়সেও, একজন মানুষ তার খপ্পরে পড়তে পারে। মানুষের মধ্যে একটা আজন্ম শিশু সত্তা আছে, ঠিক সেইটাকে নাগালে নিয়ে, আমি কি আপনাকে বোঝাতে পারছি? আপনি বুঝতে পারছেন না কেন মন্দের জোর বড়ো বেশি? একজন লোক মুক্ত সুন্দর জীবন নিয়ে যখন সুখী, ধরা যাক সেই মানুষ বড়ো সরল, তার সেই সরলতার পথ ধরে মন্দের বহুবর্ণ চেহারায় সেই মানুষকে ধাঁধিয়ে কেউ যদি সব তছনছ করে দেয়, আপনি তাকে দোষ দেবেন না? তাহলে তো শয়তানও দোষী নয়, সে-ও তো পরিণত মানুষকে বিপথে নিয়ে যায়।

দেখুন, আমি এই ঘটনায় নতুন করে আবদুর রহমানের প্রায়শ্চিত্তের কিছু দেখছি না, সে নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল দিয়েছে।

লোকটির কণ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ হয়ে ওঠে, আপনি মনে করছেন তার প্রায়শ্চিত্ত হয়ে গেছে?

কেন বুঝতে পারছেন না, আপনি এমন কোনো অজানা রহস্যের প্যাঁচ আমার সামনে কষেন নি আমি বুঝব না আপনি কে, বলতে বলতে আমার শরীরে হিমস্রোত বয়ে যায়, যা ছিল অচেতন, নিস্তরঙ্গ, সেই ঘটনা, যা ছিল একান্তই নিজস্ব পাথরের মতো স্থবির তা একসময় আশ্চর্য এক আঁধারে রূপ নেয়, আমার গলা ঠিকরে তেতো জল উঠে আসে, আপনার স্ত্রী-তো এখন সেই লোকেরই সংসার করছে এক সময় যে আমার স্বামী ছিল, সে কবেকার কথা; কেন এতদিন পর এইসব নিয়ে এসেছেন?

লোকটি কেঁদে ফেলে, অনেক ঘুরেছি, কোথাও আমার শান্তি হয় না, সেই নির্মম ঘটনার নির্দোষ বলি ছিলেন আপনি এবং আমিই সেটা ঘটিয়েছি, যতবার ভেবেছি, বিশ্বাস করুন-

আমি এইবার আক্ষরিক অর্থেই, নেতিয়ে পড়ি, নির্দোষ বলি? মিস্টার আবদুর রহমান, আপনি ভালোই বলেছেন, মানুষের সংসারে সুখের ফাঁক না থাকলে কাউকে কেউ অত সহজে মন-ভোলানো পথে টেনে নিয়ে যেতে পারে? আমাদের দাম্পত্য জীবনে সুখ ছিল, বড় একঘেয়ে বড়ো ক্লান্তিকর সেই সুখ, সে যখন সেই পথে হেঁটে গেল, সে-ও বাঁচল, আমিও নিজেকে একলা করে জানার, চেনার সুযোগ পেলাম। বুঝলেন, একধরনের শৃঙ্খল থেকে যেন আমার মুক্তি হলো, এই দেখুন, কথা বলার নেশায় পেয়েছে আমাকে আর এখন আপনি কেমন ঝিমিয়ে পড়ছেন-।

ভন্ড

বইমেলা ভাঙনের মুখে, রাত আট,
একটি লোক, পরনে কাপড় ছিন্ন বা মলিন,
চুল উশকোখুশকো, মুখে কালসিটে, নোংরা
বহুক্ষণ দাঁড়িয়ে রয়েছে একঠায়
বকছে বিড়বিড় করে, ভাই আমি কবি নই,
কবিতা লিখি না, ভাই আমি ক্ষমা চাই,
দাঁত নড়বড়ে, স্বর অর্ধস্ফূট,
বলেই চলেছে, করজোড়ে, বন্ধ হয়ে আসা চোখে,

কেউ শুনছে, কেউ বা শুনছে না,
চলে যায় সযতেœ এড়িয়ে
ঠোঁটে মৃদু হাসি, ভ-!

বাংলাদেশ নাইট

ডান্ডিবার্তা রিপোর্ট
হ‌ুমায়ূন আহমেদ তখন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটির ছাত্র। ভিনদেশে সে সময় ‘বাংলাদেশ নাইট’ আয়োজনের অভিজ্ঞতা তিনি লিখেছেন হোটেলগ্রেভারইন বইয়ে। তাঁর সেই আবেগ, উচ্ছ্বাস নিশ্চয়ই এ সময়ের অনেক তরুণের সঙ্গেও মিলে যাবে। ১৯ জুলাই এই বরেণ্য লেখকের মৃত্যুদিবস। হ‌ুমায়ূন আহমেদের স্মরণে আজ স্বপ্ন নিয়ের পাঠকের জন্য তাঁর ছাত্রজীবনের গল্পটি তুলে ধরা হলো

মোরহেড স্টেট ইউনিভার্সিটিতে আন্তর্জাতিক বর্ষ উদ্‌যাপন উপলক্ষে অন্যান্য দেশের সঙ্গে উদ্‌যাপিত হবে বাংলাদেশ নাইট। এই অঞ্চলে বাংলাদেশের একমাত্র ছাত্র হচ্ছে মিজান, আর আমি আছি নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে। মিজানের একমাত্র পরামর্শদাতা, আশপাশে সাত শ মাইলের মধ্যে দ্বিতীয় বাঙালি নেই।

কফির পেয়ালা হাতে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মিজানের টেলিফোন।

হ্যালো, হ‌ুমায়ূন ভাই?

হ্যাঁ।

প্ল্যান-প্রোগ্রাম নিয়ে আপনার সঙ্গে আরেকবার বসা দরকার।

এখনো তো দেরি আছে।

দেরি আপনি কোথায় দেখলেন? এক সপ্তাহ মাত্র। শালাদের একটা ভেলকি দেখিয়ে দেব। বাংলাদেশ বললে চিনতে পারে না। হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। ইচ্ছা করে চড় মেড়ে মুখ বন্ধ করে দিই। এইবার বুঝবে বাংলাদেশ কী জিনিস। ঠিক না, হ‌ুমায়ূন ভাই?

হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ।

শালাদের চোখ ট্যারা হয়ে যাবে দেখবেন। আমি আপনার এখানে চলে আসছি। মিজান টেলিফোন নামিয়ে রাখল। আমি আরেকটি দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললাম। এই ছেলেটিকে আমি খুবই পছন্দ করি। তার সমস্যা একটাই, সারাক্ষণ মুখে—বাংলাদেশ বাংলাদেশ। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন একটা খোলার চেষ্টা করেছিল। একজন ছাত্র থাকলে অ্যাসোসিয়েশন হয় না বলে সেই চেষ্টা সফল হয়নি। অন্য স্টেট থেকে বাংলাদেশি ছাত্র আনার চেষ্টাও করেছে, লাভ হয়নি। এই প্রচণ্ড শীতের দেশে কেউ আসতে চায় না। শীতের সময় এখানকার তাপমাত্রা শূন্যের ৩০ ডিগ্রি নিচে নেমে যায়, কে আসবে এ রকম ভয়াবহ ঠান্ডা একটা জায়গায়?

মিজান এ ব্যাপারে বেশ মনমরা হয়েছিল। বাংলাদেশ নাইটের ব্যাপারটা এসে পড়ায় সেই দুঃখ খানিকটা কমেছে। এই বাংলাদেশ নাইট নিয়েও বিরাট কাণ্ড। মোরহেড স্টেট ইউনিভার্সিটির ফরেন স্টুডেন্ট অ্যাডভাইজার মিজানকে বলল, তুমি এক কাজ করো, তুমি বাংলাদেশ নাইট পাকিস্তানিদের সঙ্গে করো।

মিজান হুংকার দিয়ে বলল, কেন?

এতে তোমার সুবিধা হবে। ডবল ডেকোরেশন হবে না। এক খরচায় হয়ে যাবে। তুমি একা মানুষ।

তোমার এত বড় সাহস, তুমি পাকিস্তানিদের সঙ্গে আমাকে বাংলাদেশ নাইট করতে বলছ? তুমি কি জানো, ওরা কী করেছে? তুমি কি জানো, ওরা আমাদের কতজনকে মেরেছে? তুমি কি জানো…?

কী মুশকিল, তুমি এত উত্তেজিত হচ্ছ কেন?

তুমি আজেবাজে কথা বলবে, তুমি আমার দেশকে অপমান করবে, আর আমি তোমার সঙ্গে মিষ্টি কথা বলব?

মিজান ফরেন স্টুডেন্ট অ্যাডভাইজারের সামনের টেবিলে প্রকাণ্ড এক ঘুষি বসিয়ে দিল। টেবিলে রাখা কফির পেয়ালা উল্টে পড়ল। লোকজন ছুটে এল। প্রচণ্ড হইচই।

এ রকম মাথা গরম একটা ছেলেকে সব সময় সামলে-সুমলে রাখা মুশকিল। তবে ভরসা একটাই—সে আমাকে প্রায় দেবতার পর্যায়ে ফেলে রেখেছে। তার ধারণা, আমার মতো জ্ঞানী-গুণী মানুষ শতাব্দীতে এক-আধটা জন্মায়। আমি যা বলি, শোনে।

মিজান তার ভাঙা মরিস মাইনর নিয়ে ঝড়ের গতিতে চলে এল। সঙ্গে বাংলাদেশের ম্যাপ নিয়ে এসেছে। সেই ম্যাপ দেখে আমার আক্কেল গুড়ুম। যে কটা রং পাওয়া গেছে, সব কটাই সে লাগিয়েছে।

জিনিসটা দাঁড়িয়েছে কেমন বলুন তো?

রং একটু বেশি হয়ে গেল না?

ওরা রংচং একটু বেশি পছন্দ করে, হ‌ুমায়ূন ভাই।

তাহলে ঠিকই আছে।

এখন আসুন, প্রোগ্রামটা ঠিক করে ফেলা যাক। বাংলাদেশি খাবারের নমুনা হিসেবে খিচুড়ি খাওয়ানো হবে। খিচুড়ির শেষে দেওয়া হবে পান-সুপারি।

পান-সুপারি পাবে কোথায়?

শিকাগো থেকে আসবে। ইন্ডিয়ান শপ আছে, ওরা পাঠাবে। ডলার পাঠিয়ে চিঠি দিয়ে দিয়েছি।

খুব ভালো।

দেশ সম্পর্কে একটা বক্তৃতা দেওয়া হবে। বক্তৃতার শেষে প্রশ্নোত্তর পর্ব। সবার শেষে জাতীয় সংগীত।

জাতীয় সংগীত গাইবে কে?

কেন, আমি আর আপনি।

তুমি পাগল হয়েছ? জীবনে আমি কোনো দিন গান গাইনি।

আর আমি বুঝি হেমন্ত? এই সব চলবে না, হ‌ুমায়ূন ভাই। আসুন, গানটা একবার প্র্যাকটিস করি।

মিজান, মরে গেলেও তুমি আমাকে দিয়ে গান গাওয়াতে পারবে না…

…উৎসবের দিন ভোরবেলায় আমরা প্রকাণ্ড সসপ্যানে খিচুড়ি বসিয়ে দিলাম। চাল, ডাল, আনাজপাতি সেদ্ধ হচ্ছে। দুটো মুরগি কুচি কুচি করে ছেড়ে দেওয়া হলো। এক পাউন্ডের মতো কিমা ছিল, তাও ঢেলে দিলাম। যত ধরনের গরম মসলা ছিল সবই দিয়ে দিলাম। জ্বাল হতে থাকল।

মিজান বলল, খিচুড়ির আসল রহস্য হলো মিক্সিংয়ে। আপনি ভয় করবেন না। জিনিস ভালোই দাঁড়াবে।

সে একটা খুন্তি দিয়ে প্রবল বেগে নাড়তে শুরু করল। ঘণ্টা দুয়েক পর যা দাঁড়াল তা দেখে বুকে কাঁপন লাগে। ঘন সিরাপের মতো একটা তরল পদার্থ। ওপরে আবার দুধের সরের মতো পড়েছে। জিনিসটার রং দাঁড়িয়েছে ঘন কৃষ্ণ। মিজান শুকনো গলায় বলল, কালো হলো কেন বলুন তো, হ‌ুমায়ূন ভাই। কালো রঙের কিছুই তো দিইনি।

আমি সেই প্রশ্নের জবাব দিতে পারলাম না। মিজান বলল, টমেটো পেস্ট দিয়ে দেব নাকি?

দাও।

টমেটো পেস্ট দেওয়ায় রং আরও কালচে মেরে গেল। মিজান বলল, লাল রঙের কিছু ফুড কালার কিনে এনে ছেড়ে দেব?

দাও।

তাও দেওয়া হলো। এতে কালো রঙের কোনো হেরফের হলো না। তবে মাঝে মাঝে লাল রং ঝিলিক দিতে লাগল। দুজনেই মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লাম। জাতীয় সংগীতেরও কোনো ব্যবস্থা হলো না। মিজানের গানের গলা আমার চেয়েও খারাপ। যখন গান ধরে মনে হয় গলায় সর্দি নিয়ে পাতিহাঁস ডাকছে। শিকাগো থেকে পানও এসে পৌঁছাল না।

অনুষ্ঠান সন্ধ্যায়। বিকেলে এক অদ্ভুত ব্যাপার হলো। অবাক হয়ে দেখি দূর দূর থেকে গাড়ি নিয়ে বাঙালি ছাত্রছাত্রীরা আসতে শুরু করেছে। শুনলাম মিজান নাকি আশপাশের যত ইউনিভার্সিটি আছে, সব ইউনিভার্সিটিতে বাংলাদেশ নাইটের খবর দিয়ে চিঠি দিয়েছিল। দেড় হাজার মাইল দূরে মন্টানো স্টেট ইউনিভার্সিটি, সেখান থেকে একটি মেয়ে গ্রে হাউন্ড বাসে করে একা একা চলে এসেছে। মিনোসোটা থেকে এসেছে ১০ জনের একটা বিরাট দল। তারা সঙ্গে নানান রকম পিঠা নিয়ে এসেছে। গ্রান্ড ফোকস থেকে এসেছেন করিম সাহেব, তাঁর ছেলেমেয়ে এবং স্ত্রী। এই অসম্ভব কর্মঠ মহিলাটি এসেই আমাদের খিচুড়ি ফেলে দিয়ে নতুন খিচুড়ি বসালেন। সন্ধ্যার ঠিক আগে আগে সাউথ ডাকোটার ফলস স্প্রিং থেকে একদল ছেলেমেয়ে এসে উপস্থিত হলো।

মিজান আনন্দে লাফাবে না চেঁচাবে, কিছুই বুঝতে পারছে না। চুপচাপ বসে আছে, মাঝে মাঝে গম্ভীর গলায় বলছে, দেখ শালা বাংলাদেশ কী জিনিস। দেখে যা।

অনুষ্ঠান শুরু হলো দেশাত্মবোধক গান দিয়ে।

এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি…।

অন্যান্য স্টেট থেকে মেয়েরা যারা এসেছে, তারাই শুধু গাইছে। এত সুন্দর গাইছে। এই বিদেশ-বিভুঁইয়ে গান শুনে দেশের জন্যে আমার বুক হু হু করতে লাগল। চোখে জল এসে গেল। কেউ যেন তা দেখতে না পায় সে জন্য মাথা নিচু করে বসে রইলাম।

পরদিন ফার্গোফোরম পত্রিকায় বাংলাদেশ নাইট সম্পর্কে একটা খবর ছাপা হলো। খবরের অংশবিশেষ এ রকম—

একটি অত্যন্ত আবেগপ্রবণ জাতির অনুষ্ঠান দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। অনুষ্ঠানটি শুরু হয় দেশের গান দিয়ে। আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করলাম, গান শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশি ছেলেমেয়েরা সব কাঁদতে শুরু করল। আমি আমার দীর্ঘদিনের সাংবাদিকতা জীবনে এমন মধুর দৃশ্য দেখিনি…। (সংক্ষেপিত)

সেরা বাঙালি পুরস্কার পেলেন নির্মলেন্দু গুণ

আজকাল এনএবিসি সেরা বাঙালি পুরস্কার পেলেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় কবি নির্মলেন্দু গুণ। ভারতের কলকাতা ভিত্তিক আজকাল পত্রিকা গ্রুপের চেয়ারম্যান সত্যম রায় চৌধুরী স্বাক্ষরিত একটি চিঠির ছবি নির্মলেন্দু গুণ নিজ ফেইসবুক পেজে শেয়ার করে এ কথা জানান।

বাংলাদেশের জনপ্রিয় এই কবি বলেন, ‘গত বছর (২০১৬) সব মিলিয়ে আটটি পুরস্কার পেয়েছিলাম। তার মধ্যে বহু বিতর্কিত স্বাধীনতা পুরস্কারটিও ছিল। এই বছরটিও ভালোই শুরু হয়েছিলো। জানুয়ারিতে মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তর নামে প্রবর্তিত মধুসূদন পদক পেয়েছিলাম। ফেব্রুয়ারিতে পেয়েছিলাম “সমধারা” পুরস্কার। ভেবেছিলাম স্বাধীনতার মাস মার্চেও নিশ্চয়ই একটা না একটা পুরস্কার জুটবে। কিন্তু না। মার্চ চলে গেলো। নো পুরস্কার। মনে মনে লজ্জা পেলাম। তারপর এলো এপ্রিল। April is thd cruelest month. কবি টি এএস এলিয়ট সাহেব কেন যে একথা বলেছিলেন, তা বুঝলাম। নো পুরস্কার। শ্রমিকদের নিয়ে এতো কবিতা লিখেছি, ভাবলাম মে মাসে পুরস্কার আসবে। না, এবারও পুরস্কার এলো না। যখন পুরস্কারের কথা ভুলতে বসেছি, তখন জুন মাস, আমার জন্মমাসটি এলো একটা অভাবিত অচিন্তনীয় পুরস্কারের শুভবার্তা নিয়ে। কলকাতার আজকাল পত্রিকা গ্রুপের চেয়ারম্যান সত্যম রায় চৌধুরীর একটি পত্র এলো আমার নামে।’

তবে পুরস্কারটি উত্তর আমেরিকায় প্রদান করা হবে বলে সেখানে যেতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশের এই কবি। সত্যম রায় চৌধুরীকে লেখা চিঠিতে তিনি অনুরোধ জানিয়ে বলেন, আমাকে এরকম একটি গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারের জন্য মনোনীত করায় আমি অত্যন্ত আনন্দিত ও সম্মানিত বোধ করছি। আপনাদের আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।
আমি এই পুরস্কার গ্রহণে সম্মত আছি। কিন্তু ভগ্ন স্বাস্থ্যহেতু ( আমার বাইপাস সার্জারি হয়েছে কিছুকাল আগে, যার ধকল আমি এখনও কাটিয়ে উঠতে পারিনি) দীর্ঘ আকাশপথ পাড়ি দিয়ে, আমেরিকার সান্টা ক্লারায় অনুষ্ঠিতব্য বঙ্গ সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে এই পুরস্কারটি গ্রহণ করা আমার সম্ভব হবে না।’

তবে নিজের বদলে কোন এক প্রতিনিধিকে প্রেরণের অনুমতি পেলে নাম পাঠাবেন বলে জানিয়েছেন নির্মলেন্দু গুণ।

কবি সুফিয়া কামালের ১০৬তম জন্মদিন আজ

কবি বেগম সুফিয়া কামালের ১০৬তম জন্মদিন আজ। মানবতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পক্ষে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার একজন সমাজসেবী ও নারীনেত্রীর  নাম বেগম সুফিয়া কামাল। নারী জাগরণের পুরোধা ব্যক্তিত্ব তিনি। ১৯১১ সালের ২০ জুন বরিশালের শায়েস্তাবাদে এক অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। সুফিয়া কামাল ছিলেন বাংলা ভাষার বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিক। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সাহিত্যিক, রাজনৈতিক ও সংস্কৃতিকর্মীদের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন।

কবি সুফিয়া কামাল তার সাহিত্য চর্চার পাশাপাশি নারীমুক্তি, মানবমুক্তি এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় নিরলস কাজ করে গেছেন।

তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে—সাঁঝের মায়া, মায়া কাজল, মন ও জীবন, শান্তি ও প্রার্থনা, উদাত্ত পৃথিবী, দিওয়ান, মোর জাদুদের সমাধি পরে প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। গল্পগ্রন্থ ‘কেয়ার কাঁটা’। ভ্রমণকাহিনী ‘সোভিয়েত দিনগুলি’। স্মৃতিকথা ‘একাত্তুরের ডায়েরি’ অন্যতম।

সুফিয়া কামাল ৫০টিরও অধিক পুরস্কার লাভ করেছেন। এর মধ্যে বাংলা একাডেমি, সোভিয়েত লেনিন, একুশে পদক, বেগম রোকেয়া পদক, জাতীয় কবিতা পুরস্কার, স্বাধীনতা দিবস পদক উল্লেখযোগ্য। ১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে দাফন করা হয়। বাংলাদেশি নারীদের মধ্যে তিনিই প্রথম এ সম্মান লাভ করেন।

জন্মদিন উপলক্ষে নানা আয়োজন

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি কবি সুফিয়া কামালের ১০৬তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সংগঠনটি বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করছে। এর মধ্যে রয়েছে কবি সুফিয়া কামাল স্মারক বক্তৃতা, কবি সুফিয়া কামাল সম্মাননা পদক প্রদান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। আজ সকাল ১০টায় বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ মিলনায়তনে মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং শিক্ষা ও সুফিয়া কামাল শীর্ষক স্মারকবক্তৃতা, সম্মাননা পদক প্রদান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে। স্মারক বক্তৃতা প্রদান করবেন- বিশিষ্ট সামজবিজ্ঞানী প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. অনুপম সেন।

ইত্তেফাক/নূহু

লাবণ্য ভেজা মেঘ (রোমান্টিক ছোট গল্প)

দর্পণ কবীর
এক.
মেয়েটি রাতুলের দিকে অবাক চোখে তাকালো। ও বিস্মিত কণ্ঠে বললো,
‘আপনি আমাকে চিনতে পারছে না! সত্যি বলছেন?’
রাতুল মেয়েটির দিকে ভালো করে তাকালো। মেয়েটির মায়াবি মুখ। ডাগর চোখ, দৃষ্টিতে এক ধরনের লাবণ্য আছে। নাক টিকালো না হলেও মন্দ নয়। ঠোঁট পুরুও নয়, সরুও নয়। চিবুকটা একটু লম্বা হওয়ায় মেয়েটির মুখমন্ডলে অতিরিক্ত সৌন্দর্য দৃশ্যমান। হাসলে মেয়েটিকে অপ্সরীর মত লাগতে পারে, মনে মনে ভাবলো রাতুল। মেয়েটির চোখেমুখে বিস্ময় এবং বিস্ময়ের আড়ালে হালকা রাগের আস্তরণ। রাতুল মেয়েটিকে চিনতে পারছে না, এটাই রাগ ও বিস্ময়ের কারণ। অথচ রাতুল সত্যিই মেয়েটিকে চিনতে পারছে না। ও মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে নরোমকণ্ঠে বলল,
‘আমার স্মৃতিভ্রম রোগ আছে, জানতাম না। এখন মনে হচ্ছে, এই রোগের চিকিৎসা করাতে হবে। আপনি আমাকে চেনেন, অথচ দেখুন, আমি আপনাকে চিনতে পারছি না। আমার ভীষণ লজ্জা লাগছে!’
এবার মেয়েটি হেসে ফেললো। রাতুল যা ভেবেছিল, তাই। হাসলে মেয়েটিকে অপ্সরীর মত লাগে। হাসলে মেয়েটির লাবণ্যময় দৃষ্টি এতো উজ্জ্বল হয় যে, মনে হবে মেয়েটি অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখছে। রাতুল চোখ নামিয়ে নিল। মেয়েটি বলল,
‘আমি ধরে নিচ্ছি, আপনি রসিকতা করছেন। আমাকে না চেনার ভান করছেন। আমি বৃষ্টি। রাকিবের কাজিন..।
‘বৃষ্টি’ নামটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে রাতুলের যেন বজ্রপাত হলো। ও চমকে তাকালো বৃষ্টির মুখের দিকে। ওর দৃষ্টি আটকে গেল। এ কথা ঠিক, এতোদিন পর বৃষ্টিকে ওর চেনার কথা নয়। চারবছর আগে ও বৃষ্টিকে দেখেছে। রাতুলের সঙ্গে বৃষ্টির কোন সম্পর্কও নেই। ছোট্ট দুটো ঘটনার জন্য বৃষ্টি ওর স্মৃতিতে কাঁটার মত বিধে আছে। যা ঘটেছে, তা কখনো বিশেষ ঘটনা হিসাবে ভাবেনি রাতুল। বিয়ে বাড়িতে অনেক রকম ঘটনাই ঘটে। ওসব মনে রাখতে নেই। বিয়ে বাড়ির উৎসবে হাসি-তামাশার মত ঐ সব তুচ্ছ ঘটনা মিলিয়ে যায়। বৃষ্টির কথাও মিলিয়ে গিয়েছিল। বলা যায়, বৃষ্টির কথা রাতুল ভুলেই গিয়েছিল। অথচ সেই বৃষ্টি ওর সামনে বসে আছে। জলজ্যান্ত বৃষ্টি ওর সামনে বসে আছে আর ও চিনতে পারছিল না। বৃষ্টিকে চিনতে না পারার জন্য ও একটু বিব্রত হলো। রাকিবদের বাড়িতে বৃষ্টিকে ও দেখেছে, কথাও হয়েছে। কিন্তু বৃষ্টির পরিচয় ও জানেনি। বৃষ্টি কে, কোথায় থাকে বা বিয়ে বাড়িতে ও কার আত্মীয়, এ সব কিছুই জানতো না। জানার কথাও নয়। রাতুল ঐ বিয়েবাড়িতে ছিল অপরিচিত অতিথি। বন্ধু রাকিবের বড় ভাইয়ের বিয়ে উপলক্ষে ও গিয়েছিল খুলনায়। রাতুল স্মৃতি হাতরে পেছনে ফিরে গেল। রাকিবের সঙ্গে ওর পরিচয় টিএসসিতে। ডাচের সামনে আড্ডা মারতে গিয়ে একদিন পরিচয় হয় ওদের। পরিচয়টা কয়েকদিনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতায় রূপ নেয়। রাকিব ছিল রাষ্ট্র বিজ্ঞানের ছাত্র। রাতুল ইংরেজী সাহিত্যে পড়ছিল। রাকিব ছাত্র রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিল। ও পুরো ঢাকা শহর ঘুরে বেড়াতো। রাতুল পাবলিক লাইব্রেরী আর শাহ আজিজ মাকের্টের বইয়ের দোকান ছাড়া কোথাও খুব একটা যেত না। চরিত্রের দিক থেকে রাকিব যতটা ডানপিটে-চঞ্চল, রাতুল ঠিক তার উল্টো। তারপরও ওদের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়েছিল। রাকিবের অনুরোধে রাতুল ওর সঙ্গে একবার খুলনায় গিয়েছিল। সেটা ছিল রাতুলের প্রথম খুলনায় যাওয়া। রাকিবের বড় ভাইয়ের বিয়ের আগেরদিন সকালে ওরা হাজির হল ওদের সোনাডাঙ্গার বাড়িতে। বাড়িতে গমগম করছিল মানুষ। হৈ-হুল্লোর, গানবাজনা, চিৎকার-চেঁচামেচি ছিল। সেসঙ্গে ভূড়িভোজের নানা আয়োজনও। রাকিবদের বাড়ি গিয়ে রাতুল বুঝতে পেরেছিল ওরা কতটা ধনাঢ্য পরিবার। রাকিবকে দেখে তা বোঝার উপায় নেই। রাতুল ওদের বাড়িতে গিয়ে ভীষণ লজ্জায় মিইয়ে গেল। ও হৈচৈ, হট্টগোল পছন্দ করছিল না। বিয়েবাড়ির অনেক ব্যস্ততার মধ্যেও রাকিবের মা ওকে যতœ করে খাবার দিয়েছিলেন। মাতৃস্নেহের পরশ পেয়েছিল ও।
রাকিবের ভাইয়ের বিয়েতে অংশ নেয়াটা তেমন বড় কোন ঘটনা নয়। কিন্তু দুটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার মুখোমুখি হয়ে রাতুল নতুন এক অভিজ্ঞতা লাভ করেছিল। ঐ বিচ্ছিন্ন ঘটনা দুটির কারণে রাকিবের ভাইয়ের বিয়েতে অংশ নেয়ার স্মৃতি মাঝেমাঝে মনে পড়ে ওর। বিয়ের আগেরদিন বিকেলে রাকিবদের দোতালা বাড়ির ছাদে গানের আসর বসেছিল। ঐ আসরে পেছনের সারিতে নীরব শ্রোতা ছিল রাতুল। রাকিব ছিল না। গানের আসরে অনেকে গান গেয়েছিল। বৃষ্টিও গান গেয়েছিল। বৃষ্টির কণ্ঠে মাধুর্যতা ছিল, কিন্তু ‘সেদিন দুজনে দুলেছিনু বনে’ রবীন্দ্রসঙ্গীতের অন্তরা ভুল সুরে গেয়েছিল ও। ভুল সুরটা রাতুলের ইন্দ্রিয়তে বাজছিল। বৃষ্টির গান শেষ হবার পর উপস্থিত সকলে করতালির মধ্য দিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলো। দু’তিন জন বৃষ্টিকে টাকাও উপহার দিল। দর্শক-শ্রোতাদের কাছ থেকে ‘ওয়ান মোর, আরেকটি রবীন্দ্রসঙ্গীত হোক’ দাবি উঠলো। আনন্দের উচ্ছ্বাসে বৃষ্টি হারমোনিয়ামে হাত রাখার সময় রাতুল মুখ ফসকে বলে ফেললো,
‘খেয়াল রাখবেন, রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুরটা যেন ঠিক থাকে!’
এই এক কথায় যেন বজ্রপাত হলো। বৃষ্টি রাগে ও লজ্জায় আসর ছেড়ে চলে গেল। শ্রোতারা পেছনে ফিরে কটমট করে রাতুলের দিকে তাকালো। রাতুল ভীষণ অপরাধ করে ফেলেছে, এমন ভাব চোখেমুখে ফুটিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই আসর থেকে সরে পড়লো। রাতের বেলায় এক বিব্রতকর ঝড়ের কবলে পড়লো ও। বাড়ির ছাদ তখন জনশুন্য। বিয়েবাড়ির উৎসব চলছে বাড়ি জুড়ে। রাতুল বাড়ির ছাদের এক কোণে বসে আকাশের তারা দেখছিল। হঠাৎ ঝড়ের তান্ডব হয়ে ওর সামনে এসে দাঁড়ালো বৃষ্টি। ও একটি কাগজ বাড়িয়ে দিয়ে রাগী গলায় প্রশ্ন করলো,
‘আমাকে প্রেমপত্র কেন পাঠিয়েছেন? হাউ ডেয়ার ইউ! ছোটলোক, লম্পট! রাস্কেল!’
বৃষ্টির গালাগাল আগুনের গোলার মত লাগছিল। রাতুল কিছুই বুঝতে পারছিল না। কী বলবে, তাও বুঝতে পারলো না। ও হত বিহবল হয়ে গেল। বৃষ্টি থামলো না। ও চিৎকার করে কান্না জুড়ে দিল। বৃষ্টির কান্না শুনে ছাদে এলেন রাকিবের মা ও আরো কয়েকজন মহিলা। বৃষ্টি ঐ কাগজটা রাকিবের মায়ের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে কাঁদো গলায় বললো,
‘খালা, দেখো ভাইয়ার বন্ধু আমাকে প্রেমপত্র পাঠিয়েছে!’
রাকিবের মা বৃষ্টিকে ছাদ থেকে নিচে নিয়ে গেলেন। রাতুল এমনই লজ্জায় পড়লো যে, ওর মরে যেত ইচ্ছা করছিল। কিছুক্ষণ পর কাউকে না জানিয়ে ও রাকিবদের বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছিল। এরজন্য ঢাকায় ফিরে রাকিব ওকে অনেক ভৎসর্না করেছিল। রাকিব ওকে জানিয়েছিল, বৃষ্টিকে পছন্দ করে ওদের প্রতিবেশী এক তরুণ সেদিন প্রেমপত্র পাঠিয়েছিল। ঐ তরুণ প্রেমপত্রে রাতুলের নাম ব্যবহার করেছিল। এ খবর জানার পর বৃষ্টির অনেক মন খারাপ হয়েছিল। যাই হোক, সত্য উদঘাটনের মধ্য দিয়ে রাতুল এক নিদারুন লজ্জা থেকে রেহাই পেয়েছিল। সেই বৃষ্টি এখন বসে আছে ওর সামনে। রাতুল বৃষ্টির দিকে মুচকি হাসলো। ও বললো,
‘আমি ঠিক আশা করিনি, আপনার সঙ্গে আমার কখনও দেখা হবে।’
এ কথায় বৃষ্টির চোখের দৃষ্টি যেন কেমন হল। কয়েক সেকেন্ড পর বৃষ্টি বলল,
‘আমি অবশ্য আশাবাদী। আমি সহজে আশা ছাড়ি না। এই যে দেখুন, আপনি আমাকে না চেনার ভান করলেন, কিন্তু আমি আশা ছাড়িনি।’
‘হুম। তা আপনি আমার কাছে কেন এসেছেন এবং কী জন্য এসেছেন, বলবেন কি?’
রাতুলের প্রশ্নে মিষ্টি করে হাসলো বৃষ্টি। ও বললো,
‘আপনার অফিসে এসে বিরক্তির কারণ হলাম নাতো?’
‘না, তা নয়। পত্রিকার অফিসে গেষ্ট তো হরহামেশা আসছে। আমি আসলে আপনার আসার কারণ জানতে চাচ্ছি। আমি বুঝতে পারছি, আপনি নিশ্চয় জরুরি কোন কাজে আমার কাছে এসেছেন। তাইনা?’
রাতুলের কথায় মৃদু হাসলো বৃষ্টি। বৃষ্টির হাসি কেমন মাতাল করে দিচ্ছে। রাতুল নিজেকে সামলে নেয়ার চেষ্টা করে। ও কিছু বলতে যাচ্ছিলো, এরমধ্যে বৃষ্টি বলল,
‘আপনার কাছে একটি দাবি নিয়ে এসেছি। দাবিটি আমাদের দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আপনার কাছে তুচ্ছ হতে পারে হয়তো। কিন্তু আমাদের দাবি আপনাকে পুরণ করতে হবে।’
বৃষ্টির কথায় কিছু আঁচ করতে পারল না রাতুল। ও বলল,
‘ঠিক বুঝলাম না। পরিচয়ের চার বছর পর আপনি কী দাবি তুলতে চাইছেন?’
আবারো হাসলো বৃষ্টি। সুন্দরী মেয়েরা কেন যে অকারণে কেবল হাসে! মনে মনে ভাবলো রাতুল। ওর কথার জবাবে বৃষ্টি বলল,
‘খুব সংক্ষেপে বলছি। আপনি তো জানেন, আপনার বন্ধু রাকিব ভাইয়া ফ্রান্সে থাকেন?’
‘হুম। ছাত্র রাজনীতির খেসারত। মাষ্টার্সটা দিতে পারলো না। হত্যা মামলায় জড়িয়ে গেল। হুলিয়া মাথায় নিয়ে পালিয়ে গেল ইউরোপ। ওর জন্য দুঃখ হয়!’
রাতুর কথাগুলো বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। বৃষ্টি বলল,
‘রাকিব ভাইয়া দেশে ফিরেছেন কাল। শুক্রবার তার বিয়ে!’
‘তাই নাকি! ও তো আমাকে ফোন করল না! স্টুপিড!’
‘না, না। রাগ করবেন না। ভাইয়া আপনাকে সারপ্রাইজ দিতে চান। আমাকে বলেছেন, যেভাবে পারি আপনাকে যেন খুলনায় নিয়ে যাই। দায়িত্বটা আমার ওপর পড়েছে।’
‘কিন্তু সারপ্রাইজ আর রইলো কোথায়? আপনি তো ওর কথা বলেই দিলেন।’
‘আমি জানি, ও কথা না বললে আপনি আমার সঙ্গে খুলনায় যাবেন না। তাই বলে ফেললাম। কাল তৈরি থাকবেন। আমি আপনাকে এই অফিস থেকেই পিক করবো।’
বৃষ্টির কথায় বিষম খেল রাতুল। ও বলল,
‘কী বলছেন!’
‘না, করবেন না, প্লিজ! আমার জন্য আপনি খুলনা থেকে ঢাকায় ফিরে এসেছিলেন। এবার আমার শাপমোচনের পালা। আপনাকে খুলনায় নিয়ে যেত পারলে হয়তো সেদিনের অপরাধের খানিকটা হলেও সাজা মওকুফ হবে। তাছাড়া আপনাকে খুলনায় নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব পড়েছে আমার ওপর।’
কথাগুলো বলে বিনীতচোখে রাতুলের মুখের দিকে চেয়ে রইল ও। রাতুল ভাবনায় পড়ে গেল। বৃষ্টি বলল,
‘অতো কি ভাবছেন? বন্ধুর বিয়েতে যাওয়া তো আপনার দায়িত্ব। না হয় নিমন্ত্রণটা আমার কাছ থেকে পেলেন, এই যা!’
‘না, ভাবছি, সেই খুলনা থেকে আমাকে নিয়ে যেতে আপনি যখন এসেছেন..!’
এ পর্যন্ত বলল রাতুল। বৃষ্টির হাসির সামনে ও ফ্রিজ হয়ে গেল। ও আর কিছু বলল না। হাসি সামলে নিয়ে বৃষ্টি বলল,
‘আমি কিন্তু ঢাকাতেই থাকি। নিবাস রোকেয়া হল। অর্থনীতিতে অনার্স ফাইনাল দিয়েছি এবার।’
বৃষ্টির কথায় ভিড়মি খেল রাতুল। বৃষ্টি ঢাকায় থাকে এবং ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, এ কথা রাকিব ওকে বলেনি। আশ্চার্য! বিস্ময়ের ধাক্কায় ও থ’ হয়ে গেল। ও রাগে বৃষ্টির সঙ্গে খুলনায় যাবার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল মনে মনে। রাকিবকে গালাগাল দিতে হবে। বৃষ্টি বলল,
‘আমি উঠি? কাল তৈরি থাকবেন। অফিসে আজ ছুটির নোটিশ জমা দিয়ে রাখুন। কয়েকদিন থাকতে হবে খুলনায়।’
বৃষ্টির কথায় মাথা নেড়ে সম্মতি প্রকাশ করল রাতুল। খুলনায় যাবার ব্যাপারে ওর আর কোন অস্বস্থি রইল না। বৃষ্টি ফের একটা হাসির বাণ মেরে দমকা হাওয়ার মত ওর অফিস থেকে বের হয়ে গেল।

দুই.
টয়োটা এলিয়ন নতুন গাড়িতে বসে কেমন অস্বস্থি লাগলো রাতুলের। ওর এই অস্বস্থি নতুন গাড়ির জন্য, না বৃষ্টির পাশে বসার জন্য-এটা ঠিক বুঝতে পারছে না ও। রাতুল সত্যি সত্যি খুলনায় যাচ্ছে। গাড়িতে উঠতে গিয়ে অবাক হয়েছিল ও। এটা যে বৃষ্টিদের গাড়ি, এটা বুঝতে কোন অসুবিধা হয়নি। ড্রাইভার রব বৃষ্টিকে সমীহ প্রকাশ করে ‘আপা-আপা’ করছিল খুব। রাতুল মিলাতে পারছিল না এই গাড়িটি খুলনা থেকে ওকে নিতে এসেছে কিনা। এমন হতে পারে। কিন্তু প্রশ্নটা করা সমীচিন নয় বলে করেনি। প্রশ্নটা মনে খচখচ করছিল। গাড়ি ছুটছে পথে। গাড়ির ভেতর গুমোট পরিবেশ হালকা করতেই যেন বৃষ্টি রাতুলের উদ্দেশে বলল,
‘আমি এতো সহজে আপনাকে খুলনায় নিয়ে যেতে পারবো, ভাবিনি। আমার মনে হয়েছিল আপনি শিলাপ্রস্তুরের এক পাথুরে মানুষ।’
রাতুল বৃষ্টির কথায় চকিত তাকালো ওর দিকে। বলল,
‘এখন কী মনে হচ্ছে?’
এ কথার জবাব দিতে গিয়ে মিষ্টি করে হাসলো বৃষ্টি। বলল,
‘অনেক কিছুই তো মনে হচ্ছে। কোনটা বলবো?’
এর জবাবে কী বলা যায়, তা ভেবে পেল না রাতুল। বৃষ্টি ওর কাছ থেকে কোন জবাব না পেয়ে বলল,
‘আচ্ছা, আপনি ইংরেজী সাহিত্যে মাষ্টার্স করে পত্রিকার সাংবাদিক হলেন কেন?’
রাতুল বলল,
‘সাংবাদিক বলতে যা বোঝায়, আমি সেই সাংবাদিক নই। সংবাদপত্রে কাজ করছি সাব এডিটর হিসাবে। সাংবাদিকতা আমি করিনা। সাংবাদিক হতে হলে সাহসী হতে হয়। আমি সাহসী নই। আমি বিভিন্ন সংবাদ অনুবাদ করি। সাংবাদিকদের সংবাদ কখনও রি-রাইট করি। ইংরেজী সাহিত্যে লেখাপড়া করেছি বলে অনুবাদের কাজটা আমার জন্য সহজ হয়েছে।’
কথাগুলো এক নিশ্বাসে যেন বলল। বৃষ্টি বলল,
‘একটা ভালো চাকরির সন্ধান করলেও পারেন।’
‘এটা যে ভালো চাকরি নয়, তা কে বলল আপনাকে?’
রাতুলের কথায় লজ্জা পেল বৃষ্টি। লজ্জা কাটিয়ে উঠতে ও বলল,
‘অনুবাদক বা সাব-এডিটরের চাকরি সম্পর্কে আমার সঠিক ধারনা নেই। তাই..।’
বৃষ্টির কথায় হো হো করে হেসে উঠলো রাতুল। বৃষ্টি বলল,
‘বলুন তো, আপনার বিশেষ গুণ কি?’
এই প্রশ্নের জবাবে রাতুল রসিকতার কণ্ঠে বলল,
‘কেউ ভুল সুরে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইলে সেই ভুল ধরিয়ে দিতে পারি।’
ও এবার মিটিমিটি হাসতে লাগল। বৃষ্টি কথাটাকে পজিটিভলি নিল। ও কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে রাতুলের দিকে তাকিয়ে বলল,
‘আমাকে হারিয়ে দিয়ে আপনার খুব বড় জয় হবে ভাবছেন? আমি আপনাকে সহজেই ছাড়ছি না।’
বৃষ্টির কথার মাথামুন্ডু কিছু বুঝলো না রাতুল। কিন্তু কথাটায় যে এক কিছু ইঙ্গিত আছে, তা বুঝতে পারলো। ও কিছু একটা বলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। এ সময় বৃষ্টির সেলফোন বেজে উঠলো। বৃষ্টি ফোনের কল রিসিভ করলো।
‘হ্যালো, কে, ভাইয়া? হ্যাঁ, হ্যাঁ, সে তো আছে। আমার সঙ্গে যাচ্ছে। হ্যাঁ, খুলনাতেই নিয়ে যাচ্ছি। কী, কথা বলবে? দাঁড়াও, দিচ্ছি।’
বৃষ্টি ওর সেলফোনটা বাড়িয়ে দিল রাতুলের দিকে। রাতুল কৌতুহল নিয়ে সেলফোনটি ওর কানে রাখলো। ও প্রান্তে রাকিব।
‘কীরে, কী খবর? অনেক বছর তোর সঙ্গে যোগাযোগ নেই। ক্ষমা করে দিস।’
রাকিবের কথার জবাবে বাজে কিছু কথা বলার ইচ্ছে হল ওর। কিন্তু বৃষ্টির সামনে ওসব কথা বলা যায় না। ও রাগ সংযত করে বলল,
‘তুই আমার সঙ্গে এতো নাটক করছিস কেন, বলতো? দেশে ফিরলি, ফোন না করে বোনকে পাঠালি আমাকে নিয়ে যেতে। তোর বিয়ে বলে যাচ্ছি।’
ও প্রান্ত থেকে খিলখিল করে হাসছে রাকিব। রাতুলের পাশে বৃষ্টিও হাসছে। রাকিবের এই হাসির কারণ খুঁজে পেল না ও। রাতুল ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলল,
‘আবার হাসছিস? তোর সঙ্গে বন্ধুত্ব করা ঠিক হয়নি।’
রাকিব বলল,
‘আমি এখন যা বলবো, শুধু শুনে যাবি। এরপর কথা বলবি।’
‘আবার কী নাটক,শুনি?’
‘শোন, আমি দেশে আসিনি। আমি কথা বলছি প্যারিস থেকে। আর আমি গত বছরই এখানে বিয়ে করে ফেলেছি।’
‘কী বললি!’
‘চেঁচাস নে! শুধু কথা শুনে যা। আমিই বৃষ্টিকে বলেছি মিথ্যা গল্প বলতে।’
‘মিথ্যা গল্প? কেন? আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। তাহলে আমি খুলনায় যাচ্ছি কেন?’
‘বলছি। তোকে খুলনায় যেতে হবে। বৃষ্টির জন্য তোকে যেতে হবে।’
রাকিবের কথায় স্তম্ভিত হয়ে গেল রাতুল। ওর কান যেন লাল হয়ে গেছে। রাকিব কী বলছে! ও বলল,
‘রাকিব, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। ঘটনা কি খুলে বলবি?’
রাতুলের অস্থিরতায় রাকিব বলল,
‘বলছি, ধৈর্য ধরে শোন। বৃষ্টির বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। কিন্তু বৃষ্টি বিয়েতে রাজী হচ্ছে না। ও তোকে বিয়ে করতে চায়। না, কোন কথা তুই বলবি না। আমি যা বলছি, আগে তা শোন। বৃষ্টি আমার খালাতো বোন, জানিস তো?’
‘জানি।’
‘তুই ওকে অপমান করেছিলি। আবার তোকে ও না জেনে অপমান করেছিল। এরপর থেকে তোর প্রতি একটা আধো ছায়া স্বপ্নময়তায় ওর মনে রেখাপাত সৃষ্টি হয়ে আছে। এই রেখাপাতটা যে দিনেদিনে গভীর হয়ে যাচ্ছিলো, ও বুঝতে নাকি পারেনি। এ কথা বৃষ্টি আমাকে বলেছে।’
‘রাকিব, তোদের এই নাটকের কোন স্থানে, কোন চরিত্রে আমি আছি, বলতো?’
‘তুই কেন্দ্রীয় চরিত্রে আছিস। আমি পার্শ্বচরিত্রে। শোন, আমি বৃষ্টির গার্জেন হিসাবে তোর কাছে বৃষ্টির বিয়ের প্রস্তাব করছি। তুই প্রস্তাব গ্রহণ কর।’
রাকিবের কথায় মাথা ভনভন করে ঘুরছে। ও তাকাতে পারছে না বৃষ্টির দিকে। বৃষ্টি গাড়ির জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে আছে। রাতুল বলল,
‘বন্ধু, জীবনে এতো বড় একটা সিদ্ধান্ত এক লহমায় নিয়ে ফেলা যায়? আর বৃষ্টিই বা আমাকে বিয়ে করবে কেন? আমি আহামরি কোন চাকরি করিনা। আমার নিজের কোন অর্থবিত্ত নেই। আমার জীবনের সঙ্গে বৃষ্টি কেন সংযুক্ত হবে। এখানে ভালোবাসা বলেও তো কিছু নেই! অকারণে একটি পরীর মত মেয়ে আমার মত সাধারণ একজনের সঙ্গে কেন জড়াবে, সেটা ভেবে পাচ্ছি না। জীবন তো নাটক নয় বন্ধু!’
‘কিন্তু বন্ধু, আমাদের বাড়িতে গিয়ে যে নাটকের প্রথম দৃশ্যটা তুই শুরু করেছিলি, এর শেষ পর্বটা যে বৃষ্টির ইচ্ছার ওপর নির্ভর করছে। আমি শুধু ঘটনা এবং বাস্তবতা তোর সামনে তুলে ধরলাম। এখন তুই আর বৃষ্টি সিদ্ধান্ত নে, কী করবি। আমি পরে জেনে নেব। ফোন রাখছি।’
বলেই রাকিব ফোনটা রেখে দিল। রাতুল অবাক হল। ওকে এমন এক সমস্যার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে ফোন রেখে দিল। রাতুল বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। এরপর ও বৃষ্টির উদ্দেশে বলল,
‘আপনি আসলে কী চান? আমি কিছু বুঝতে পারছি না। রাকিব যা বলল, তা কি সত্যি?’
বৃষ্টি গাড়ির জানালা থেকে মুখ ফেরালেও ওর মুখ অবনত। অবনত মুখে ও বলল,
‘আমি কি আপনার অযোগ্য?’
‘যোগ্য বা অযোগ্যতার কথা নয়। আপনি আমাকে ভালো করে চেনেন না, জানেন না। আমাদের মধ্যে কোন সম্পর্কও নেই। ভালোবাসা হলে নাহয় বলা যেত, চলো আমরা বিয়ে করি। কিন্তু..!’
‘কিন্তু কি?’
‘কিন্তুটা বুঝতে পারছেন না?’
কণ্ঠে কপট রাগ তুলে বৃষ্টি বলল,
‘আপনি কি সবসময় সবকিছু বুঝতে পারেন? না, বোঝার চেষ্টা কখনো করেছেন?’
বৃষ্টির কথায় বিচলিত বোধ করল রাতুল। ও যেন আজ ঘোরের মধ্যে পড়েছে। বৃষ্টি কী বলছে? রাতুলের বুক দুরুদুরু কাঁপতে লাগল। বুকের ভেতরের কাঁপুনিটা বাড়ছে। রাতুল নরোম গলায় বলল,
‘আপনি ভুল করে আমাকে ভালোবেসে ফেলেননি তো!’
কথাটা যেন গুমোট দুপুরে উদাসী পুকুরে ঢিল ছোড়ার মত। ঢিলটা পড়লো এবং মৃদু ঢেউ উঠল। বৃষ্টি ঠোঁট উল্টিয়ে বলল,
‘ভালোবাসলেই কী! আপনি কী আর ওসবের খবর রাখেন?’
বৃষ্টির কথায় রাতুল কী বলবে? ও একটু চুপ থেকে বলল,
‘ভুল সুরে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইলে তা শুধরে নেয়া যায়, ভুল মানুষকে ভালোবাসলে তা কিন্তু শুধরে নেয়া যায় না। নীলকণ্ঠের বিষ হয়ে যায়। জানেন তো?’
বৃষ্টি খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। ওকে অদ্ভূত সুন্দর লাগছে। রাতুল মুগ্ধচোখে তাকিয়ে রইল বৃষ্টির দিকে। টয়োটা এলিয়ন গাড়িটি বাতাস কেটে ছুটে চলছে হাইওয়েতে। রাতুলের মনটাও যেন এরচেয়েও বেশি গতিতে কোথাও ছুটে যাচ্ছে। নিজের মনকে টেনে ধরে নিজের কাছে রাখতে পারছে না। এমন কখনও হয়নি ওর। খুলনায় যাওয়াটা ওর ঠিক হচ্ছে কিনা, ও ঠিক বুঝতে পারছে না। বৃষ্টির হাসির থামার পর রাতুল বলল,
‘এখন বলুন তো, আমি খুলনায় কেন যাবো, কাদের বাড়ি যাবো?’
বৃষ্টি বলল,
‘ভেরি সিম্পল। আপনি আমাদের বাড়ি যাবেন। আমি আপনাকে আমার বাবা-মা’র সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলবো, ইনি হচ্ছেন মিঃ রাতুল। বিশিষ্ট রবীন্দ্র বিশরাদ। তার সামনে রবীন্দ্রসঙ্গীত ভুল সুরে গাওয়া যায় না। রাকিব ভাইয়া আমার বর হিসাবে তাকে পছন্দ করেছেন। এখন তিনি যদি রাজী হন, বিয়ের আয়োজন করো। আর যদি তিনি রাজী না হন, তাহলে যে পাত্র তোমরা পছন্দ করেছো, তার সঙ্গে বিয়ের ব্যবস্থা করো। ব্যস!’
রাতুলের কণ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ। ও কী বলবে? বৃষ্টিকে উপেক্ষা করার শক্তি কি ওর আছে? এই প্রশ্নটাই ওর মনে পেখম ছড়িয়ে যাচ্ছে। এমন অপ্রত্যাশিত ঘটনার মুখোমুখি কেউ কখনও পড়েনি, এটা রাতুল জোর দিয়ে বলতে পারে। রাতুল কিছু বলতে পারলো না। ও চিন্তা করতে লাগল গত চার বছর বৃষ্টি কী করেছে। বৃষ্টি যদি রাতুলের প্রতি অনুরক্ত হবে, তবে ও কেন ওর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেনি। রাকিবও বৃষ্টি সম্পর্কে ওকে কিছু বলেনি। আজ চার বছর পর আচমকা বৃষ্টি ওকে এলেমেলো করে দিল। এটা কি সহজভাবে মেনে নেয়া যায়? ও কি বৃষ্টিকে ফিরিয়ে দেবে? পাটুরিয়াঘাট থেকে ও কি বাস ধরে ঢাকায় ফিরে আসবে? প্রশ্নগুলো ওর চেতনায় কালোমেঘের মত জমতে লাগল। এক সময় ওর খেয়াল হল বৃষ্টি নিশ্চুপ। রাতুল তাকাল ওর দিকে। ও দেখল গাড়ির জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে বৃষ্টি কাঁদছে। হঠাৎ করে ও কেন কাঁদছে, কে জানে! রাতুল সিদ্ধান্ত নিল ও বৃষ্টির সঙ্গে খুলনায় যাবে এবং বৃষ্টির বাবা-মা’র কাছে বিয়ের প্রস্তাব দেবে। বৃষ্টির চোখের জল অনেক অর্থপূর্ণ। একে উপেক্ষা করা যায় না। রাতুল একাকীত্বের রোদে পোড়া খড়খড়ে কাঠ হয়েছিল। এই একাকীত্বে বৃষ্টি যেন লাবণ্য ভেজা মেঘ।