কবি ও কবিতা

এক মায়াবী হরিণ সবসময় তাড়িয়ে নেয় কবিদের। কবিরা ছুটে চলে সে হরিণের পিছে স্বপনে-জাগরণে-লেখায়। কবিদের তাই বিরাম নেই। মগজের নিউরনে মাত্রা আর কবিতা দোল খায় সময়-অসময়। অসংগতি থেকে সংগতির সুন্দর কারুকাজের তাড়নায় তার ছুটে চলা। মায়াহরিণ আর কবির মাঝের দূরত্ব ঘুচাতেই তার ছুটে চলা। এই দূরত্বটা কবির কাছে ধরা দেয় কখনো নারী হয়ে, কখনো ফুল হয়ে, কখনো প্রকৃতি বা অন্য কোনো রূপে। কবিরা এই সংগতি এবং অসংগতির স্বচ্ছ দ্রষ্টা।

কবিরা অগ্রগামী আবেগ-অনুভূতি-মর্মযাতনা বয়ে বেড়ায়। সেটা যদি কেবল কঠিন পাহাড়ের মতো অন্য কারো শব্দের প্রতিধ্বনি করার জন্য হয়, সেটা অত্যন্ত দুঃখজনক। কবিকে বিচরণ করতে হয় তার চারিপাশ, তার সময়, তার শিকড় এবং এসবের ভবিষ্যৎ।

কবি, কবিতার এক ভূমিপুত্র। কবিতার চাষী। কবিতার চাষীদের স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য নিজেদের জমি-জিরাতে মনযোগী হতে হয়। বিনির্মাণ করতে হয় প্রকৃতি-পরিবেশ-সমাজ-মনন জাত নির্যাসের নিরিখে নিজস্ব স্বকীয়তা। সমাজ ও জাতীর বিবেক এবং মনন তৈরিতে কবি স্বপ্ন তাড়িত হৃদ্ধ ফেরিওয়ালা। নিজেদের মতো করেই তাকে বিশ্বমঞ্চে জায়গা করে নিতে হয়। তবেই তো কবি, অনন্য এক কবি।

কবি সময়ের মানুষ, কিন্তু অতিত-বর্তমান-ভবিষ্যতের নিরিখে শাণিত মানবতার প্রতিনিধি। কবিরা তাই আগে দেখেন, আগে বোঝেন, আগে কাঁদেন এবং দুঃখ-বেদনা-সুখ-আনন্দের শিল্পময় প্রতিধ্বনিও আগেই করেন। কবি তাই সময়ের ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমি। অন্ধকারেও দেখেন। তাই, অন্ধকারেও ডাকেন; সচেতন করবার জন্য। কবির দায়বদ্ধতা তাই এক অগ্রগণ্য সহজাত বৈশিষ্ট। সৌন্দর্য হলো সামাঞ্জস্যপূর্ণ বিন্যাস। সেটা হোক- দৃশ্যের, অদৃশ্যের (ভাবের) অথবা কথার। কবিতা এই তিনেরই সেরা প্রতিনিধিত্ব করে। শুধু মাত্রাবিন্যাস আর ছন্দ নির্মাণের জাদুকরী প্রয়াশ এবং শ্রবণ-সুখময়তায় নয়, কবিতা বর্তমানের শিক্ষা থেকে- বর্তমানের আনন্দ-বেদনা থেকে আলোটুকু নিয়ে- মানস চেতনায় আলো জ্বালাতে পারল কতটা স্থায়িত্বে আর সৌন্দর্যে, সেটা কবিতার অগ্রগণ্য নান্দনিকতা। কবিতাকে পাঠক, শ্রোতা এমনকি কবিরও কর্ণ এবং মন-প্রাণ দুটোই জয় করতে হয়- গণমানসের আনন্দ-বেদনা-ভালোবাসা এবং মানবিকতার নিরিখে।

অনিবার্য যে মৃত্যু, তাকে মানুষ ভুলেই থাকে প্রায়- আমৃত্যু। তাকে পাশবালিশ ভেবে ঘুমানোর মতো অনুভূতি খুব কম মানুষের থাকে। কবি-সাধক পারেন সেই অনুভূতির বালিশে জড়িয়ে ঘুমাতে। হয়তো হাহাকার থাকে। থাকে বেদনা। থাকে মানুষ ও শ্রষ্ঠার সঙ্গে মান-অভিমান। তবুও, সত্যকে সহজ করে দেখা আর দেখানোর সৎ সাহস ও মনন কেবল তাদেরই বেশি থাকে।

ভালো কবিতার স্বাদটা এখানেই যে, সে মানুষের সহজাত-মানবিক-অনিবার্য সত্যকে একটা গভীর অনুভূতির নিবিড়ে বসত করে, তার আরো গভীরে ঢুকে তার যুতসই উপমার মাধ্যমে অনিন্দ-সুন্দর-শৈল্পিক কারুকাজের সুপ্রকাশ ঘটায়। সে প্রকাশ সে স্বাদ পাঠকের জিহ্বায় লেগে থাকে, মানুষের মগজে লেগে থাকে। মগজ থেকে মননে গেঁথে যায়। সহজে যেতে চায় না। যায়ও না। কোনোটি অমর হয়েও থাকে- যুগান্তর হয়ে।

কবির ভাবনা-সাধনাজাত। কিছু কবিতা তাকে মৃতুঞ্জয়ের মহানত্ব দিতে পারে। মানুষের সহজাত মানবিক বোধ ও অনুভূতি যেমন সময়-সীমানা-ধর্ম-বর্ণ-দল-জাত-পাতের ঊর্ধ্বে, ভালো কবিতাও তেমনি সব কিছুর ঊর্ধ্বে। কবি এসব সময়, সীমানা, ধর্ম, বর্ণ, দল, জাত-পাতের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের নিরপেক্ষ মননে বসত করতে পারলে, নিজের নিরপেক্ষ মননে সাধনাজাত বসত করতে পারলে তবেই তার কবিতায় অমরত্ব আসতে পারে।

কবিকে আত্মতৃপ্তি এবং মনের প্রশান্তি ছাড়া বেশি কিছু চাইতে নেই। যদিও কবি স্বভাবগত সুনামের কাঙাল। লেখালেখি এক ধরনের মেডিটেশনের কাজ করে। কবি অন্তরে শুদ্ধ না হলে ভালো কবিতা হয় না। কবিতা কবিকে শুদ্ধ হতে শেখায়। শুদ্ধতা ছড়াতে শেখায়। ভালোবাসতে শেখায়। ভালোবাসাতে শেখায়। অন্তরগত নান্দনিকতা শেখায়। এসব কিছুই কবিকে অন্তরে-বাহিরে পবিত্র করে তোলে। প্রশান্তিময় করে তোলে। কবির প্রাপ্তিতে- এই আত্মিক প্রশান্তিটুকুই মুখ্য।

বাকি থাকে যে বাস্তবতা, তাকে মেনে নিলে কবি যে ঠকে যাবেন এমন নয়।

বাকি যে বাস্তবতা, সেটা কোমলে-কঠিনের মিশেলে সে বাস্তবতা, যা প্রতিনিয়ত কবিকে টক-ঝাল-মিষ্টির স্বাদ দেয়। সে বাস্তবতা থেকেই কবি তার রসদ খুঁজে পায়- ভাব-রস খুঁজে পায়- কবিতার জন্য, লেখার জন্য। হয়তো, এই বাস্তবতাই কবির চালিকাশক্তি। কবি তাই কলম ফেলে রেখে নিশ্চুপ থাকতে পারেন না। লেখা তাকে টানে। ভূতে পাওয়া রোগীর মতো সে বিছানা ছেড়ে কলম নিয়ে বসে পড়েন। নতুন কবিতার পিঠে-নতুন লেখার পিঠে সোয়ার হয়ে বসে পড়েন, অজান্তেই। এই ভূতে পাওয়া কবি-লেখকই যুগে যুগে মনন নির্মাণ করে থাকেন- সাধারণ মানুষের, সমাজের, দেশের; এবং মানব সভ্যতার। কবির প্রাপ্তি এখানেই যে, কবি- শ্রষ্টার প্রতিনিধি, কবি-মানবতার প্রতিনিধি।

About ডান্ডিবার্তা

View all posts by ডান্ডিবার্তা →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *