নতুন জোট নেতাদের একাল-সেকাল-পরকাল

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচন-পূর্ব সময়কালে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল-মতের নির্বাচনী জোট-উপজোট-মহাজোট হয়ে নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঠে থেকে প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হবেন এটাই হলো গণতন্ত্রের সৌন্দর্যের গোলাপের সুবাস। সাংবিধানিক পদ্ধতিতে ৫ বছর পর পর নির্বাচন হয়- এটাকে মাথায় রেখেই বড় দল বা জোটগুলো নির্বাচনমুখী হয়। ছোট দল বা জোটগুলো সারাবছর রাজনৈতিক সমীকরণ পর্যবেক্ষণ করে স্থির গতিতে চললেও নির্বাচনপূর্ব সময় তাদের দৌঁড়ঝাপ এত দ্রুত গতিতে থাকে যা কেবল বাংলাদেশের রাজনীতিরই সংস্কৃতির নয়, বিশ্ব রাজনীতিরও অংশ।

বাংলাদেশও এ অভিন্ন ধারায় প্রবাহমান। সঙ্গত কারনে ছোট ছোট দলগুলোর নেতৃবৃন্দ জোট গঠনে ও অভ্যন্তরীণ দরকষাকষির কালক্ষেপণে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে আত্মঘাতী ভুল করে থাকে। এই ভুলে ব্যক্তিগতভাবে তারা ক্ষতিগ্রস্থ হন, দলকে বিতর্কিত করে ও পরবর্তী প্রজন্ম পথহারা গতিহারা হয়ে যায়। ফলে কিছুকালের মধ্যেই সূদীর্ঘ রাজনীতির রূপ-রস-গন্ধ-শব্দ-সৌন্দর্য ফ্যাকাসে হয়ে নিঃশেষ হয়ে যায়। বাংলাদেশের তিনজন খ্যাতিসম্পন্ন রাজনীতিকের প্রসঙ্গে কিছু বলার ইচ্ছে থেকেই এগুলোর উপস্থাপন।

আসম আব্দুর রব বাংলাদেশের রাজনীতির একজন পরিচিত মুখ। তিনি মুক্তিযুদ্ধপূর্ব ও পরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ছায়া হয়ে ইতিবাচক কর্মকাণ্ড করায় রাজনীতির সুগন্ধি বিকশিত ও বৃদ্ধি পেয়েছে। বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে বিতর্কিত ভূমিকায় লিপ্ত থেকে রাষ্ট্রশক্তির বাইরে বড় একটি অপশক্তি বা বলয় সৃষ্টি করেন তিনি। আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মী, সংসদ সদস্য হত্যাসহ সারাদেশ দিয়ে সংহিসতার ধারক-বাহকে পরিণত হন তিনি। এরপর ঘোলা পানি অনেক দুরে গড়িয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধের বিতর্কিত অবস্থানকারী স্বৈরশাসকের জমানায় মন্ত্রীর পদমর্যাদায় বিরোধী দলীয় নেতা হয়েছিলেন। এরপর থেকে আজ অবদি তিনি রাজনীতির মাঠ বা আলোচনার টেবিল থেকে অন্তরাল হননি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোটের ঘুরপাকে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন।

ডা. বি. চৌধুরীকে একজন খ্যাতিসম্পন্ন চিকিৎসক হিসেবে মানুষ জানেন। তার বাবার একটি রাজনীতিক পরিচয় রয়েছে। ’৭৫-এ জাতির পিতাকে স্বপরিবারে হত্যার পেছনে জেনারেল জিয়ার হাত ছিল বলে পৌরবিজ্ঞানে ও খ্যাতিসম্পন্ন সাংবাদিকের বইগুলোতে এমন ইঙ্গিত বহন করে। দেশের এক বড় জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা বঙ্গবন্ধুর হত্যার সাথে জিয়া জড়িত, এ ধরনের বক্তৃতা বিভিন্ন সভা-সমাবেশে করে থাকেন। সেই জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক থেকে মন্ত্রী, সেনা ছাউনিতে গঠিত রাজনৈতিক সংগঠনের মহাসচিব এবং তার সহধর্মিণী খালেদা জিয়া সরকারের শীর্ষ পদ রাষ্ট্রপতি থেকে কি অপমান-অপদস্ত-শারীরিক লাঞ্ছিত করে তাকে সরানো হয়েছে তা দেশবাসী ভুলেনি। তার গঠিত রাজনৈতিক দলে দু’চারজন ভালো লোকজনও রয়েছে, যদিও দৃশ্যমান গণমুখী কর্মসূচীতে আড়ালে-আবডালে থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশের কুখ্যাত সন্তান ও মুক্তিযুদ্ধের জঘন্য অপরাধী শাহ আজিজুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রীর অধীনে রাষ্ট্রীয় কাজ করেছেন। এসব কর্মকাণ্ডই ছিল বি. চৌধুরীর বর্ণিল জীবনের ইতিহাস-ঐতিহ্যের মনস্তাত্ত্বিক ধারার পরিপন্থী।

ড. কামাল হোসেন বাংলাদেশের একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। সংবিধান প্রণয়নের সঙ্গে তার নাম জড়িয়ে আছে। বঙ্গবন্ধুর প্রতি পরম শ্রদ্ধা ও আনুগত্য রেখে বঙ্গবন্ধু সরকারের আইনমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত সহকর্মী হিসেবে সর্বত্র খ্যাতি অর্জন করেন। ইদানিং তার রাজনীতিক কর্মকাণ্ড-সংলাপ-সংবিধান পরিপন্থী বক্তব্যে জাতি হতভম্ব। মানুষ এ-ও মনে করেন, যিনি সংবিধান প্রণয়ন করেছেন, তিনিই আবার সংবিধানে নির্দেশিত ৫ বছর পর পর নির্বাচনের পরিপন্থী অবস্থান। সেকারণে এখন অনেকেই বলতে শুরু করেছে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে তাজউদ্দিন ও ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম ভারতে গেলেও তিনি যাননি, পাকিস্তানে তিনি ৯ মাসে কি করেছেন? এরকম প্রশ্ন তার বিরুদ্ধে আসবে কেন? ’৭১ এর মুক্তিযুদ্ধকালীন, ’৭৫ এর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কিছুদিন আগে বিদেশগমন এবং বর্তমান কর্মকাণ্ডের সাথে তার কোন কাকতালীয় মিল আছে কিনা?

বছর খানেক আগে একটি চ্যানেলে সাংবাদিক শ্যামল দত্তের সঞ্চালনায় তিনি বলেছেন, “৭২ সালের ৮ জানুয়ারি পাকিস্তান কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করে একটি অতিথি ভবনে রাখেন। ভুট্টো সাহেব বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে এসে বলেন, নিজেদের মধ্যে যা ভুল বুঝাবুঝি হয়েছে তা অবসানের সময় এখন। পাকিস্তানের সঙ্গে কোনভাবে লিঙ্কে থাকুন- এবলে ভুট্টো সাহেব বঙ্গবন্ধুর পা জড়িয়ে ধরুন। বঙ্গবন্ধু বলেছেন, বাঙলার মানুষ কেমন আছে, কি অবস্থায় আছে তা না জেনে আমি কিছুই বলতে পারছি না। এসব কথা বলার স্বাক্ষী হওয়ার পরো আপনার বিবেক কি বলেনা নির্বাচনকালীন সময়ে কার সাথে থাকা উচিত? আপনার সন্তান কার সাথে পথ চলবে, রাজনীতি করবে?

এই তিনজন খ্যাতিসম্পন্ন রাজনীতিক সম্পর্কে লেখার কারণ হলো, গত ২৮ আগস্ট সিঙ্গাপুরে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার দুইজন সদস্যের সঙ্গে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের এক নির্বাচনী ষড়যন্ত্র বৈঠক হয়- যা দৈনিক ইত্তেফাক ও মানবকণ্ঠের মতো জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরেও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ছকে গঠিত মন্ত্রীসভার বিশ্বসন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সাথে বিএনপির আতাতের ষড়যন্ত্র নির্বাচন, জাতি এতে চরমভাবে বিষ্মিত। এই তিন ব্যক্তিত্ব এই রাজনীতির সহচর জোটের সদস্য হতে পারেন না বলেই মানুষ মনে করেন।

অনেকেই মনে করেন, তারা তিনজন নেতা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষকে ভিত্তি করে জোট গঠনের মাধ্যমে বর্তমান ভঙ্গুর বিএনপির চেয়ে বড় জোট গঠন করতে পারে। তাদের জোট রাষ্ট্র-সরকার কোন-দলবিরোধী সেটাও জনগণকে পরিস্কারভাবে স্পষ্ট করে নির্বাচনকালীন জোট গঠন করুন। নতুবা আপনাদের সুদীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক ইতিহাস ও ঐতিহ্য এবং আপনাদের পরবর্তী প্রজন্ম তিরোধানের পরে অপরাজনীতির গভীর গহম্বরে নিমজ্জিত হয়ে চিরতরে হারিয়ে যাবে।

লেখক: রাজনীতি বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।

About ডান্ডিবার্তা

View all posts by ডান্ডিবার্তা →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *