বায়ুদূষণ: হুমকিতে জনস্বাস্থ্য

দূষণ শব্দের অর্থ নোংরা, দূষিত, যা ভয়ংকর। শব্দদূষণ, নদী দূষণ, পরিবেশ দূষণের মতো বায়ুদুষণও এখন ভয়ংকর হয়ে উঠছে। মানুষের বাসোপযোগী উন্নত বসতবাড়ি, রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, নগরায়ণে মাটি খোঁড়াখুঁড়ির কারণে ধুলাবালি, সিমেন্টের ধুলা, ইটের ধুলার পাশাপাশি নগর মহানগরে যানবাহনের কালো ধোঁয়া মাত্রাতিরিক্ত বায়ুদূষণের আগ্রাসনে হুমকিতে এখন জনস্বাস্থ্য। সম্প্রতি জাতীয় এক দৈনিকে ‘দিল্লিতে জরুরি অবস্থা ঢাকা কতদূর’ শিরোনামে খবর প্রকাশিত হয়েছে।

খবরে জানা যায়, বায়ুদূষণ ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বাধ্য হয়ে শহরটির কর্তৃপক্ষ ১ নভেম্বর ’২০১৮ হতে ১০ দিনের জন্য জরুরি অবস্থা জারি করেছে। আমরা জানি যুদ্ধ বিদ্রোহ, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, অতি ভারি বর্ষণে ভূমিধস, দাবানল এবং অতি মাত্রার ভ‚মিকম্পে ধ্বংসস্তূপ থেকে আক্রান্তদের উদ্ধারে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়ে থকে। কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত ধুলার আগ্রাসনে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে হয়েছে, যা সচারচর ঘটে না। তবুও এটাই বাস্তবতা। দশদিনের সময়ের মধ্যে বায়ুদূষণ করে এমন সব কর্মকাণ্ডকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে সেগুলো বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

শহরটির কর্তৃপক্ষের আশা, এতে করে দূষণের মাত্রা কিছুটা কমানো সম্ভব হবে। প্রতিবছরই এই সময়ে দিল্লি ও তার আশপাশের এলাকায় দূষণের মাত্রা মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়। মূলত বিভিন্ন ধরনের নির্মাণ কাজ, দীপাবলি উপলক্ষে বিস্তর বাজি পোড়ানো, গাড়ির দূষণের পাশাপাশি, পাঞ্জাব ও পশ্চিম উত্তর প্রদেশের চাষের জমিতে ফসলের গোড়া পুড়িয়ে দেয়ার প্রথার কারণে বায়ুদূষণের মাত্রা বেড়ে যায়। ভারতীয় সংবাদসূত্রে জানা গেছে, জরুরি অবস্থার ১০ দিন দিল্লিতে ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়ে নির্দেশিকা জারি করেছে বিভিন্ন দেশ। কারণ দিল্লির বাতাসে ‘কোয়ালিটি ইনডেক্স’ এখন প্রায় ৩৬৬, যা নির্ণায়ক অনুযায়ী ‘মারাত্মক’।

তবে বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদফতরের দাবি, ঢাকার দূষণের মাত্রা এখনো সহনীয় পর্যায়ে আছে। এমন কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি, যার জন্য জরুরি অবস্থা জারি করতে হবে। তবে দূষণের কথা চিন্তা করে পরিবেশ অধিদফতর ইতোমধ্যে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির বায়ুমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ তাজমিনুর রহমান। পরিবেশ অধিদফতরের পরিচালক মোহাম্মদ জিয়াউল হকের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, আমরা দেখেছি ঢাকার বায়ুদূষণ বা ধূলিদূষণের পেছনে পাঁচটি বড় কারণ রয়েছে।

ঢাকা শহরের আশপাশে ইটভাটা, রাস্তা খনন, ভবন নির্মাণ, কালো ধোঁয়া ও সিমেন্ট বর্জ্যই পুরো শহরকে ধূলিকবলিত করে ফেলছে। আমরা এসব কারণ নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন সংস্থাকে চিঠি দিয়েছি। দেশের উন্নয়নে রাস্তাঘাট, ভবন নির্মাণ, নগরায়ণ করতে হলে ইট ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। এ জন্য মান্ধাতা পদ্ধতির ইটভাটাগুলোর বদলে সরকার অনুমোদিত পরিবেশবান্ধব জিগজাগ পদ্ধতির ইটভাটায় ইট পোড়ানো, শহরের ভিতরে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির পর পানি দিয়ে ভিজিয়ে দেয়া এবং সিমেন্টের বর্জ্যদূষণ রোধে ঢেকে রেখে কাজ করলে ধূলিদূষণ অনেকাংশেই কমে আসবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সব বিভাগকে নির্দেশিত পথে কাজ করতে বাধ্য করতে হবে।

পাশাপাশি এসব মনিটরিংয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীলতার সহিত কাজ করতে হবে। তা না হলে দিল্লির জরুরি অবস্থার মতো পরিস্থিতিতে ঢাকা শহরকেও পড়তে হতে পারে। তবে ঢাকার বায়ুদূষণের উৎস ও প্রকৃতি দিল্লির চেয়ে ভিন্ন বলেই এখানে আরো দীর্ঘ সময়ের জন্য উৎসগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা দরকার বলে মনে করেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি বলেন, যথাযথ তদারকি আর সঠিক পরিকল্পনার অভাব, বিদ্যমান আইন প্রয়োগের অভাব এবং সঠিক সময়ে দূষণের মাত্রা পরিমাপ না করার কারণেই দূষণ ইতোমধ্যেই মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।

ভারতীয় দৈনিক দ্য হিন্দুস্তান টাইমসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, বিশ্বের প্রতি ১০ জন মানুষের মধ্যে নয়জন বিপজ্জনক মাত্রার দূষিত বাতাসে শ্বাস নিচ্ছে। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দূষণে মৃত্যুর ৯০ শতাংশই দরিদ্র দেশে, আর সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহরের মধ্যে তৃতীয় স্থানে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। প্রথমেই ভারতের নয়াদিল্লি। দ্বিতীয় শহর হচ্ছে মিসরের কায়রো। চতুর্থ স্থানে ভারতের ফ্লিম সিটি খ্যাত মোম্বাই, আর পঞ্চম স্থানে চীনের রাজধানী বেইজিং।

সূত্র মতে, ২০১৬ সাল থেকে বিশ্বের এক হাজারেরও বেশি শহরের বায়ুদূষণ মাত্রা পর্যবেক্ষণ করে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, ১০৮ দেশের চার হাজার ৩০০ শহরের বায়ুর নমুনা সংগ্রহ করে মানুষের হৃদরোগ, ফুসফুসের ক্যান্সার ও স্ট্রোকের মতো রোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে। উক্ত পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বছরে ৪২ লাখ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে কল-কারখানা, কার, ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহনের বায়ুদূষণের কারণে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক ড. টেডরস আদানন গ্লোবিয়েসিস বলেছেন, বায়ুদূষণ আমাদের সবার জন্য হুমকি হলেও দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষজনকে সবচেয়ে বেশি হুমকির মধ্যে ফেলেছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, স্বাস্থ্য, পরিবহন, আবাসন ও অ্যানার্জি সেক্টর থেকে বৈশ্বিক উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

পাশাপাশি প্রতিনিয়ত বায়ুদূষণ পর্যবেক্ষণ ও তা কমিয়ে আনার কাজে যোগ দিচ্ছেন বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন সংস্থা ও সরকার। এরপরও বায়ুদূষণের সহনীয় মাত্রা যে হারে অতিক্রম করছে তা কমিয়ে আনতে যথাযথ উদ্যোগের ব্যাপারে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার নির্বাহী প্রধান তে দ্রোম আধানম ঘেরেইয়েসুসের বলেন, বিশ্ব ক্রমেই তামাকের গ্যাস চেম্বারে পরিণত হচ্ছে। বায়ুর সঙ্গে তামাক পোড়া বাতাসের যেমন পার্থক্য নেই, তেমনি ধনী গরিব নির্বিশেষে কেউই এ দূষণ থেকে মুক্তি পাচ্ছে না। খুবই নীরবে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির দিকে যাচ্ছে মানুষের স্বাস্থ্যের অবস্থা। অবিলম্বে তিনি বায়ুদূষণ রোধে সব দেশকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানান।

শংকার বিষয় হচ্ছে, গবেষক ড. মারিয়া নেইরাবের দেয়া পরিসংখ্যান অনুসারে, বিশ্বে ৩০০ মিলিয়ন শিশু বর্তমানে বায়ুদূষণের ঝুঁকিতে রয়েছে। বায়ুদূষণের কারণে শিশুদের মধ্যে ক্যান্সার ও মস্তিষ্কজনিত রোগের আধিক্য বেশি দেখা যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, গবেষণায় দেখা গেছে, দূষিত বায়ুর কারণে শিশুরা এমন সব রোগে আক্রান্ত হচ্ছে যা প্রচলিত প্যাথলজিতে নির্ণয় করা সম্ভব হচ্ছে না। এমনকি বায়ুদূষণের কারণে জš§ নেয়া শিশুর ডিএনএ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে ৫ বছর বয়স থেকে ১৮ বছর বয়স্কের ১৪ শতাংশ শিশু অ্যাজমায় আক্রান্ত হচ্ছে শুধু বায়ুদূষণের কারণে। বায়ুদূষণকে বিজ্ঞানীরা দুই ভাগে ভাগ করেছেন। এক ভাগ হচ্ছে ঘরের বাইরের দূষণ, আর এক ভাগ হচ্ছে ঘরের ভিতরের দূষণ। গৃহ অভ্যন্তরে ব্যবহৃত কয়লা, কাঠ ও কেরোসিনের মতো জ্বালানি থেকে নির্গত ধোঁয়া বাতাসের গুণগত মান নষ্ট করে। আর এ ক্ষেত্রে বিশ্বে প্রতিবছর ৪০ লাখ মানুষ মারা যাচ্ছে। আর এ ধরনের মৃত্যুর ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলো।

অথচ এমন এক সময় ছিল, যখন মানুষ কাঠের লাঙ্গলে গরু দিয়ে চাষাবাদ করত। সেচভিত্তিক চাষাবাদ ছিল না। আমন ধানের চাষাবাসই অন্যতম ছিল। বলতে গেলে শুষ্ক মৌসুমে শুকনা জমি চাষ দিলে ব্যাপক ধুলার জন্ম দিত। ফাল্গুন, চৈত্র, বৈশাখ মাসের বাতাসে ধূলিঝড়ে চোখ মুখ অন্ধকার করে দিত। আমরা এই সব চাষের জমিতে ছোটবেলায় খেলাধুলা করতাম। খেলাধুলা শেষে গোসল না করে ঘরে ফেরা যেত না। সে সময় কিন্তু বায়ুদূষণের কারণে ক্যান্সার কিম্বা মস্তিষ্কজনিত রোগের তেমন একটা আধিক্য ছিল না। আজ কিন্তু যান্ত্রিক যুগ।

সেচভিত্তিক চাষাবাদের কারণে জমিতে ধুলা সৃষ্টি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এখন কিন্তু নিভৃত পল্লীর চিরচেনা কাঁচা রাস্তাটিও পাকা হয়ে গেছে। রাস্তায়ও তেমন একটা ধুলাবালি নেই। এরপরও বায়ুতে দুষণের আধিক্য অনেক বেড়ে গেছে। বিশেষ করে যানবাহন এবং গ্যাস স্টোভ থেকে নির্গত নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড, জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সালফার ডাই-অক্সাইডের মাত্রা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। আমি আগেই বলেছি, কাঠের লাঙ্গলের যুগে ধুলার আধিক্য বেশি ছিল। এরপরও মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকি তেমন একটা ছিল না। কারণ সে সময় যানবাহন বলতে গরুর গাড়ি, ঘোড়ার গাড়ি, বাই সাইকেল ছিল অন্যতম।

আর এখন যান্ত্রিক যুগের কারণে বাস, ট্রাক, ট্রাক্টর, স্যালো ইঞ্জিনবাহিত যানবাহন এমনকি ফিটনেসবিহীন গাড়ির কালো ধোঁয়ার আগ্রাসনে বায়ুদূষণের মাত্রা অতীতের চেয়ে হাজার গুণ বেড়ে গেছে। এ কারণে বায়ুদূষণ এখন সব বয়সের মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষকরা বলছেন, মাত্র ১০ মাইক্রন আয়তনের ক্ষুদ্র কণা সহজে ফুসফুসের অভ্যন্তরে ঢুকতে পারে। অথচ স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি এমন অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে, যাদের আয়তন প্রায় আড়াই মাইক্রনের সমান। আর আড়াই মাইক্রন আয়তনের একটি কণা খুব সহজেই মানুষের ফুসফুস ভেদ করে রক্ত প্রবাহে মিশে যেতে পারে।

এখান থেকেই অনুমান করা যায়, বায়ুদূষণের আগ্রাসন এখন মানুষের সুস্থ জীবনের জন্য কত বড় হুমকি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০১৬ সালে ধূলিদূষণজনিত কারণে বাংলাদেশে প্রায় ৩৭ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। মোদ্দা কথা, বায়ুদূষণ রোধ করতে না পারলে মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়তেই থাকবে। বর্তমানে বিশ্বের বায়ুদূষণের অবস্থানে বাংলাদেশ তৃতীয় অবস্থানে বিদ্যমান আছে। সময় থাকতে জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ধূলিদূষণ রোধে সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে বায়ুদূষণের আগ্রাসন নিকট ভবিষ্যতে দিল্লির অবস্থানকেও টপকে ফেলতে পারে।
– লেখক : কলাম লেখক

About ডান্ডিবার্তা

View all posts by ডান্ডিবার্তা →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *