শ্রমিক অসন্তোষের আশংকায় শহরজুড়ে নজরদারিতে প্রশাসন

ডান্ডিবার্তা রিপোর্ট
ফতুল্লার বিসিক শিল্প নগরী ও এর আশেপাশের এলাকায় ৪ শতাধিক কারখানা থেকে প্রতি মাসে রপ্তানী হয়ে থাকে ৫ হাজার কোটি টাকার পণ্য। গত বছরের ডিসেম্বরর শুরুতে একটি কারখানা থেকে শ্রমিক অসন্তোষের শুরু হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল আরো কয়েকটি কারখানাতেও। যা নিয়ে সপ্তাহব্যাপী লঙ্কাকান্ডে রপ্তানীতে কমপক্ষে এক হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছিল বলে দাবি করেছিলেন মালিকপক্ষ। তবে গত ৩ জানুয়ারী থেকে ফের ক্রোনি গ্রুপের অবন্তী কালার টেক্সের শ্রমিকরা মজুরী বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন শুরু করায় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পূর্বের ন্যায় যাতে রপ্তানীমুখী গার্মেন্ট শিল্পে ফের শ্রমিক অসন্তোষ বৃহদাকার ধারন করতে না পারে সেজন্য নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। জানা গেছে, বিসিক শিল্পনগরী ও এর আশেপাশের এলাকায় ছোট বড় মিলিয়ে ৪ শতাধিক গামেন্ট কারখানা রয়েছে। যা থেকে প্রতি মাসে অন্তত ৫ হাজার কোটি টাকা রপ্তানী হয়ে থাকে। গত বছরের ২৯ নভেম্বর থেকে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার বিসিক শিল্পনগরীতে অবস্থিত রফতানিমুখী গার্মেন্ট ফকির অ্যাপারেলসের অন্তত ১০ হাজার শ্রমিক উৎপাদন মজুরী বৃদ্ধির দাবিকে কেন্দ্র করে আন্দোলনে নামে। ৩ ডিসেম্বর ফকির অ্যাপারেলসের শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনায় পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। ওই সময়ে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে এএসপি, ওসিসহ অর্ধশতাধিক আহত হয়েছে। কতিপয় শ্রমিক নেতার ইন্ধনে বহিরাগতদের উস্কানীতে ভাঙচুর করার অভিযোগ উঠে বিসিকের অন্তত ২০ থেকে ২৫টি কারখানা। পরদিনও ফকির গার্মেন্টের শ্রমিকরা বিক্ষোভ দেখায়। ওইদিন বিকেএমইএ’র সভাপতি এমপি সেলিম ওসমান ফকির অ্যাপারেলসে গিয়ে শ্রমিক অসন্তোষ নিরসন করেন। এরপর ৫ ডিসেম্বর বিসিক সংলগ্ন ভোলাইল এলাকায় অবস্থিত এন আর গ্রুপের গার্মেন্টের শ্রমিকরা আন্দোলনে নামে। ৬ ডিসেম্বর এন আর গ্রুপের শ্রমিকরা সকাল দশটায় কর্মবিরতি দিয়ে নারায়ণগঞ্জ-মুন্সিগঞ্জ সড়কে অবস্থান নেয়। এসময় শ্রমিকরা রাস্তায় গাছের গুঁড়ি ফেলে আগুন ধরিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করে বিক্ষোভ শুরু করে। খবর পেয়ে ফতুল্লা থানা পুলিশ ও শিল্প পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে শ্রমিকদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলে শ্রমিকরা পুলিশের উপর ইট-পাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে। এক পর্যায়ে শ্রমিক-পুলিশের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ ও কয়েক দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। এসময় শিল্প পুলিশের সহকারি পুলিশ সুপার মেহেদী ও ২০ পুলিশ সদস্যসহ অন্তত অর্ধশত সাধারণ শ্রমিক আহত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনতে পুলিশ কয়েক রাউন্ড টিয়ার সেল ও শটগানের গুলি ছোঁড়ে। সংঘর্ষের কারণে সকাল ১০টা থেকে দুপুর বারোটা পর্যন্ত একঘন্টা নারায়ণগঞ্জ-মুন্সিগঞ্জ সড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকে। সংঘর্ষের সময় পুলিশের আঘাতে এক নারী শ্রমিক নিহত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পোশাক শ্রমিকেরা এ অভিযোগ তুলে তারা এ ঘটনার বিচার দাবী করছেন। তবে পুলিশ বলছে, ভয়ে ও আতঙ্কে হুড়োহুড়ির সময় পদদলিত হয়ে অথবা হার্ট এ্যাটাকে ওই নারী শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। শহরের খানপুর তিনশ’ শয্যা হাসপাতালের জরুরী বিভাগের চিকিৎসক তাহমিনা নাজনীনের সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান, হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ওই নারীর মৃত্যু হয়েছে। তার শরীরে আঘাতের কোন চিহ্ন পাওয়া যায়নি। পরে ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ আসনের আওয়ামীলীগ দলীয় সংসদ সদস্য শামীম ওসমান কারখানা মালিকদের সঙ্গে কথা বলে শ্রমিকদের দাবী পূরণের আশ্বাস দিলে শ্রমিকেরা শান্ত হয়। ওইসময় শামীম ওসমান শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, সামনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আর ঠিক এর আগ মুহূর্তেই বহিরাগত শ্রমিক নামধারী নেতারা পরিবেশ অস্থিতিশীল করে তুলতে উস্কানী দিয়ে শ্রমিকদের রাস্তায় নামিয়ে অর্থনীতিকে ধ্বংসের পাঁয়তারা করছে। শামীম ওসমান আরও বলেন, শ্রমিকদের দাবী থাকতে পারে। এটি পূরণের জন্য মালিকপক্ষ, বিকেএমইএ, প্রশাসন রয়েছে। কিন্তু কারো সাথে কোনরূপ আলোচনায় না বসে এভাবে শ্রমিকদের রাস্তায় নেমে এসে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, গাড়ীতে হামলা, ভাঙচুর চালানোটা আমার কাছে ষড়যন্ত্রেরই অংশ মনে হচ্ছে। কিন্তু এই ষড়যন্ত্রের ফাঁদে যেন শ্রমিকরা পা না দেয় সেজন্য আন্দোলনরত শ্রমিকদের কারো উস্কানীতে কান না দেয়ার অনুরোধ জানান শামীম ওসমান। তখন বিকেএমইএর সাবেক সহ-সভাপতি ও বিসিক শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানিয়েছিলেন, অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়। শ্রমিকরা শ্রম আইন মানছে না। কোন রকম ইস্যু ছাড়া তারা কাজে যোগ দিচ্ছে না। শ্রম আইন একটি প্রক্রিয়াজনিত বিষয়। কোন সমস্য দেখা দিলে প্রথমে তা দাবি দাওয়া দিবে শ্রমিকরা। সমাধান না হলে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হবে। পরে দেশীয় প্রচলিত শ্রম আইন মতে রায় হবে। এছাড়া শ্রমিকদের মজুরী বৃদ্ধির জন্য বর্তমান সরকার গেজেট করেছে যা আগামী জানুয়ারী মাসে বাস্তবায়ন শুরু হবে। কিন্তু গুজব ছড়ানো হয়েছে অবন্তীসহ কয়েকটি কারখানা মজুরী বৃদ্ধি করেছে। একটি কুচক্রী মহল শ্রমিকদের উস্কে দিয়ে বিসিক শিল্পনগরীকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে চাইছে। গত ৭ দিনে চলমান শ্রমিক অসন্তোষে রপ্তানীতে প্রায় হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। ওই ঘটনার পরে ১০ ডিসেম্বর থেকে শ্রমিকরা কাজে যোগ দেয়। পরে গত প্রায় এক মাসে বিসিক শিল্পাঞ্চলে কোন ধরনের শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা ঘটেনি। এদিকে ফতুল্লার শাসনগাঁয়ে অবস্থিত ক্রোনি গ্রুপের অবন্তী কালার টেক্সের শ্রমিকেরা সরকারের গেজেট মোতাবেক মজুরী না দেয়া অভিযোগে ও মালিকপক্ষের হুমকীর প্রতিবাদে আন্দোলনে নামে। তারা প্রায় ২ ঘণ্টা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-মুন্সীগঞ্জ সড়ক অবরোধ করে রাখে। এতে ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ ছিল। এসময় শ্রমিকেরা অবন্তী কালারের গেইট ভাঙচুর করে। শিল্প পুলিশ ও ফতুল্লা থানা পুলিশ শ্রমিকদের শান্ত করে রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয়। গতকাল শনিবার দুুপুরে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে ক্রোনি গ্রুপের অবন্তী কালার টেক্স লিমিটেডের কয়েকশত শ্রমিক বঙ্গবন্ধু সড়কের এক পাশ দখল করে মূল মজুরি বৃদ্ধির দাবি ও ছাঁটাইকৃত শ্রমিকদের বেতন পরিশোধের দাবিতে সমাবেশ করেছে। সমাবেশে শ্রমিকেরা অভিযোগ করেন, সরকারের গেজেট মোতাবেক তদের মজুরি দেয়া হচ্ছে না। মজুরি বৃদ্ধির জন্য বার বার মালিক পক্ষের কছে গিয়েও তারা কোনো ফল পায়নি। উল্টো মালিক পক্ষ শ্রমিকদের শাসিয়ে তাদের ছাঁটাই করার হুমকি দেয়। এদিকে ফকির গ্রুপের গার্মেন্টের শ্রমিকদের আন্দোলন থেকে যেমন অন্যান্য কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছিল তেমন ক্রোনি গ্রুপের অবন্তী কালার টেক্স লিমিটেডের শ্রমিকদের আন্দোলনও বিসিক শিল্পাঞ্চলের অন্যান্য কারখানায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না মালিকরা। বিকেএমইএর সাবেক সহ-সভাপতি ও বিসিক শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, আমরা কোন শ্রমিককে ঠকাতে চাইনা। শ্রম আইন অনুযায়ী প্রতি বছর শ্রমিকদের ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট দিতে হয়। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিকেএমইএ’র সভাপতি সেলিম ওসমান এমপি শ্রম বান্ধব। শ্রমিকদের আগের মজুরী ৫ হাজার ৩০০ টাকা থেকে নতুন ওয়েজবোর্ড অনুযায়ী ৮ হাজার টাকা করেছেন। এখন দেখা গেছে যেসকল কারখানায় একজন শ্রমিক ৫ বছর ধরেই কাজ করছে তার ইনক্রিমেন্ট অনুযায়ী সে ৮ হাজার ৭০০ টাকা পাওয়ার কথা কিন্তু মালিকপক্ষ তাকে দিচ্ছে ৯ হাজার ২০০ টাকার উপরে। অনেকেই মনে করছেন সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী তার মূল বেতন বাড়েনি কিন্তু সেটা সঠিক নয়। কারণ শ্রম আইন অনুযায়ী ওই শ্রমিকের বেতন প্রতি বছরই ইনক্রিমেন্ট হারে বেড়েছে। দেখা গেছে ৬নং গ্রেডে যে শ্রমিক গত বছর আমার কারখানায় যোগ দিয়েছে যে নতুন মজুরী কাঠামো অনুযায়ী পাবে ৮ হাজার ৪০০ টাকা। কিন্তু কিছু সংখ্যক স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী যার বিদেশীদের অর্থের মদদে শ্রমিকদের উল্টাপাল্টা বুঝিয়ে বিপথগামী করছে। শিল্প পুলিশ-৪ নারায়ণগঞ্জ জোনের পুলিশ সুপার মো: জাহিদুল ইসলাম জানান, নিয়মতান্ত্রিকভাবে যে কারোরই আন্দোলন করার অধিকার রয়েছে। তবে রাস্তা অবরোধ করে বিশৃঙ্খলা করলে কাউকেই ছাড় দেয়া হবেনা। আমরা এ বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এছাড়া শ্রমিক আন্দোলনের নামে বিশৃঙ্খলার বিষয়ে সরকারও কঠোর অবস্থানে রয়েছে। যেকোন অপ্রীতিকার পরিস্থিতি মোকাবেলায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে তিনি জানান।

About ডান্ডিবার্তা

View all posts by ডান্ডিবার্তা →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *