আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নতুন কমিটিতে অভিজ্ঞ ও তরুণদের প্রাধান্য দেয়া হবে

ডান্ডিবার্তা রিপোর্ট

একটু আগেভাবেই হতে যাচ্ছে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সম্মেলন। সে কারণেই হঠাৎ করেই আলোচনায় চলে আসছে নারায়ণগঞ্জের কমিটিগুলো পুনর্গঠনের বিষয়টি। এরই মধ্যে মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটি পার করেছে ৬ বছর। জেলার কমিটি নিয়েও আছে বিতর্ক। অপরদিকে বিএনপির জেলা ও মহানগর কমিটি হয়েছে ২ বছর আগে। রয়েছে ব্যর্থতাও। এসব কারণে দুটি দলের কমিটির রদবদল হতে যাচ্ছে দ্রুত।উভয় দলের নেতারা জানান, আগামী মার্চের পরেই মূলত আওয়ামী লীগ ও জুনের মধ্যেই পরিবর্তন সহ পুনর্গঠন হতে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কমিটিগুলো। এর মধ্যে আওয়ামী লীগে তারুণ্যের পাশাপাশি অভিজ্ঞদের প্রাধান্য দেওয়া হতে যাচ্ছে। আর বিএনপিতে কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে বিগত দিনে সক্রিয় থাকা নেতাদেরকেই সামনের কাতারে আনা হবে। তবে সবক্ষেত্রেই দুটি দুলের প্রধান ও সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারকদের ভূমিকাকেই প্রাধান্য দেয়া হবে।

বিএনপি

সদর-বন্দর আসনের সাবেক তিনবারের এমপি অ্যাডভোকেট আবুল কালামকে সভাপতি ও বিলুপ্ত নগর বিএনপির সেক্রেটারী এটিএম কামালকে সাধারন সম্পাদক করে ২০১৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারী নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির ২৩ সদস্য ও জেলা বিএনপিতে ২৬ জনের আংশিক কমিটির তালিকা প্রকাশ করা হয়। একইসাথে জেলা বিএনপির সাবেক কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী মনিরুজ্জামানকে সভাপতি ও জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক মামুন মাহমুদকে সাধারণ সম্পাদক করে জেলা বিএনপির কমিটি গঠন করা হয়। তবে ওই কমিটি নারায়ণগঞ্জে তেমন একটা প্রভাব ফেলতে পারেনি। কমিটি গঠনের অনেকদিন পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত জেলা ও মহানগর বিএনপির অপূর্ণাঙ্গই থেকে যাচ্ছে।  বিএনপির একটি সূত্র জানায়, নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি কাজী মনিরুজ্জামান ও সেক্রেটারী মামুন মাহমুদের উপর ক্রমশ আস্থা হারাতে শুরু করেছেন খোদ তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। সবশেষ নির্বাচনে মামুন মাহমুদ একদিনের জন্যও কোন প্রার্থীর পক্ষে মাঠে নামেনি। বিপরীতে কাজী মনিরুজ্জামানেরও কোন নির্দেশনা পায়নি নেতাকর্মীরা। সে কারণে জেলার কমিটি পুনর্গঠন হতে পারে। এখানে এবার আলোচনায় চলে আসছেন সাবেক এমপি গিয়াসউদ্দিন ও সোনারগাঁয়ের আজহারুল ইসলাম মান্নান। এছাড়া জেলা বিএনপির নিয়ন্ত্রক হিসেবে আসতে পারেন চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা তৈমূর আলম খন্দকার। তাছাড়া স্টিয়ারিং কমিটিও হতে যাচ্ছে জেলা বিএনপির অদৃশ্য হিসেবে। সেখানে আড়াইহাজারের নজরুল ইসলাম আজাদ, ফতুল্লার শাহআলম ও রূপগঞ্জের মোস্তাফিজুর রহমান ভূইয়া দিপুর নাম রয়েছে। অপরদিকে সংসদ নির্বাচনে মহানগর বিএনপির সভাপতি আবুল কালামের ভূমিকাতে সবাই ক্ষুব্ধ ও হতবাক। বন্দরে কালামের এলাকাতে দলেরম মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আসলেও সেখানে তিনি ছিলেন না। তবে সেক্রেটারী এটিএম কামালের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা হলেও তিনি ছিলেন সরব। সে কারণে কামালের একমাত্র ছেলেকেও একরাত থাকতে হয়েছে থানার ভেতরে আটক অবস্থায়। দলের হাই কমান্ডও কামালের প্রতি সন্তুষ্ট। পরবর্তী কমিটিতে এটিএম কামাল হতে পারেন সভাপতি। যদিও এ দৌড়ে চেষ্টা করছেন সহ সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন খান। তিনিও সম্প্রতি ৫৯ দিন কারাভোগ করেছেন। তবে আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আবারো সাখাওয়াত আগ্রহী হলে তাকে সহ সভাপতির পদেই রাখতে পারে হাই কমান্ড। সেক্রেটারী পদে বর্তমান কমিটির পদত্যাগী যুগ্ম সম্পাদক মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদকেই তালিকার শীর্ষে রাখা হয়েছে। তবে তিনি আবার মহানগর যুবদলের সভাপতি থাকায় দেখা দিয়েছে প্রশ্ন। এ ক্ষেত্রে যুবদল ছাড়লেই খোরশেদকে দেওয়া হতে পারে মহানগর বিএনপির সেক্রেটারীর পদ। তাছাড়া জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মাসুকুল ইসলাম রাজীবকেও মহানগর বিএনপির সেক্রেটারী করা হতে পারে।

আওয়ামী লীগ

২০১৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আনোয়ার হোসেনকে সভাপতি ও অ্যাডভোকেট খোকন সাহাকে সাধারণ সম্পাদক করে মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটি গঠন করা হয়। এর দুই বছর পর ২০১৫ সালের ১০ ডিসেম্বর ৭১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। এর আগে বিলুপ্ত শহর আওয়ামী লীগের কমিটিতেও সভাপতি ও সেক্রেটারী পদে ছিলেন আনোয়ার হোসেন ও খোকন সাহা। কমিটির মেয়াদ ছিল ২ বছর। কিন্তু পার হয়ে গেছে ৬ বছর। সে কারণেই এবার কমিটি নতুন করে হতে যাচ্ছে। বর্তমান কমিটির সভাপতি পদে থাকা আনোয়ার হোসেন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। তিনিও চাচ্ছেন নতুন কমিটিতে তার অনুগামী কেউ শক্ত অবস্থান গড়ে তুলুক। দলের একাধিক নেতা জানান, সভাপতি পদে বর্তমান সেক্রেটারী খোকন সাহা ও সহ সভাপতি চন্দন শীলের নাম উঠে এসেছে। তাদের মধ্যে দুইজনই পোড়খাওয়া নেতাদের অন্যতম। মাঝে খোকন সাহাকে দেখা যায় প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের সঙ্গে বিরোধে জড়াতে। তবে পরবর্তীতে তিনি আবার নির্বাচনের আগে মিলে যান তাদের সঙ্গে। বিপরীতে কমতি নেই চন্দন শীলের ক্ষেত্রে। জেলা পরিষদের সবশেষ নির্বাচনে তাঁর নাম কেন্দ্রে পাঠানো হলেও শেষতক তিনি মনোনয়ন পাননি। তাছাড়া ২০০১ সালের ১৬ জুন চাষাঢ়া আওয়ামী লীগ অফিসে বোমা হামলায় দুই পা হারান তিনি। সেক্রেটারী পদে বেশ কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে। সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পদ পাওয়ার তালিকায় রয়েছেন কয়েকজন। তারা হলেন মহানগর আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জাকিরুল আলম হেলাল ও জিএম আরাফাত।  খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামীলীগের শাসনামলে শামীম ওসমানের যারা ভরসার পাত্র ছিলেন তাদের মধ্যে একজন গোলাম সারোয়ার যিনি ইতোমধ্যে ইন্তেকাল করেছেন। তিনি ছিলেন এক সময়ের শহর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। সারোয়ার ছাড়াও তার ছোট ভাই জাকিরুল আলম হেলাল ওইসময়ে সরকারী তোলারাম কলেজের জিএস ছিলেন। বর্তমানে সেই জাকিরুল আলম হেলাল মহানগর আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পদে রয়েছেন। তার ছোট ভাই শাহাদাৎ হোসেন সাজনু নগর যুবলীগের সভাপতি পদে রয়েছেন। তার নেতৃত্বে মহানগর যুবলীগের কমিটি আসছে বলেই মনে করছেন সকলে। আর সর্বশেষ ভাগ্নে মোঃ জুয়েল হোসেন মহানগর স্বেচ্ছাসেবকলীগের সভাপতি পদে আসীন হয়েছেন। ২০০১ এর পরে রাজধানীতে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে শামীম ওসমানের পক্ষে প্রথম স্লোগান তুলে মিছিল বের করেছিল হেলাল। এসব কারণে মহানগর আওয়ামী লীগের সেক্রেটারী পদে হেলালও পোড়খাওয়া নেতা হিসেবে পরীক্ষিত। তাছাড়া সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে রয়েছে বিপুল সংখ্যক কর্মীবাহিনী। আলোচিতদের একজন জিএম আরাফাত। বিএনপি সরকারের আমলে প্রতিকূলতার মাঝে নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সেক্রেটারী ও পরে কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক নির্বাচিত হন। বেশ আলোচিত এত নেতা সম্প্রতি বেশী সমালোচিত হয়েছেন ফতুল্লা ও আলীগঞ্জ এলাকার বহুল বিতর্কিত শ্রমিক লীগ নেতা কাউসার আহমেদ পলাশের পক্ষ অবলম্বন করে। সংবাদ প্রকাশের জের ধরে ওই পলাশের বিশাল ক্যাডার বাহিনী সাংবাদিকদের চামড়া তুলে নেওয়ার পাশাপাশি একের পর এক মিথ্যে মামলায় যখন হয়রানি করছে ওই সময়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী যখন পলাশকে বয়কট করছিল তখন তার পাশে বসে উৎসাহ ও সাহস যুগিয়েছেন আরাফাত। আর এসব কারণে আরাফাতও বিতর্কে বিঁধছেন। দলের নেতাকর্মীদের মতে, পলাশের মত একজন দুর্ধর্ষ চাঁদাবাজের পক্ষ নিয়ে নিজের রাজনৈতিক প্রজ্ঞাও জানিয়ে দিয়েছেন আরাফাত। অপরদিকে ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর আবদুল হাইকে সভাপতি, সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীকে সহ সভাপতি এবং আবু হাসনাত মোহাম্মদ শহীদ বাদলকে সাধারণ সম্পাদক করে তিন সদস্য বিশিষ্ট জেলা আওয়ামীলীগের আংশিক কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্র। ১৩ মাস পর নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের ৭৪ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন দেয় কেন্দ্র। জানা যায়, এবারের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রূপগঞ্জ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য গোলাম দস্তগীর গাজীর মনোনয়ন ঠেকাতে একাট্টা হয়ে নামছিলেন স্থানীয় আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা। যাদের নেতৃত্বে ছিলেন কায়েতপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও রংধনু গ্রুপের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম। তাদের সাথে দলীয় মনোনয়নের দাবী নিয়ে যোগ দিয়েছিলেন জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি আব্দুল হাই। নির্বাচনী আলাপ আলোচনার শুরুতে তাদের দ্বারা দখল ছিল রূপগঞ্জের নির্বাচনী মাঠ। এরই মধ্যে কেন্দ্রীয় আওয়ামীগের কার্যালয় দলীয় মনোনয়ন ফরম ছাড়া হয়। যার ধারাবাহিকতায় রূপগঞ্জ আসনেও আওয়ামীলীগের মনোনয়ণপ্রত্যাশীরা মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন। কিন্তু এখানে জেলা আওয়ামীলীগের অভিভাবক হিসেবে আব্দুল হাই মনোনয়নপ্রত্যাশীর সাড়িতে  থাকা সত্ত্বেও রেকর্ড সংখ্যক মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করা হয় এই আসন থেকে। যা সারাদেশের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রায় ৪২ জন মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন। স্বভাবতই এই বিষয়টি জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি আব্দুল হাইয়ের ব্যক্তিত্বে আঘাত হানে। আওয়ামী লীগের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানান, সেক্রেটারী হিসেবে রূপগঞ্জের উপজেলা চেয়ারম্যান শাহাজান ভূইয়া ও সোনারগাঁয়ের সাবেক এমপি আবদুল্লাহ আল কায়সারের নাম প্রস্তাব করছেন। জেলার ভবিষ্যত কমিটিতে আবু সুফিয়ান, সোনারগাঁয়ের মাহফুজুর রহমান কালাম ও আবু জাফর বিরুও ভালো অবস্থানে আসতে পারেন। তাছাড়া সিদ্ধিরগঞ্জের সাবেক পৌর প্রশাসক মতিন প্রধানওকে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হওয়া দেখা যেতে পারে। নেতাকর্মীদের মতে, আপাতত মহানগরের কমিটি বদল হলেও জেলার কমিটি বদল হতে আরো কিছুদিন সময় লাগতে পারে। তবে মহানগরের কমিটির উপর ভিত্তি করেই ভবিষ্যতে জেলার কমিটি সাজানো হবে।

About ডান্ডিবার্তা

View all posts by ডান্ডিবার্তা →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *