স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত ভাষা সৈনিক সামসুজ্জোহা স্বরণে

এইকাল এই সময়
হাবিবুর রহমান বাদল
শোকের মাস ফেব্রুয়ারী, আমার কাছে ফেব্রুয়ারী শোক ও গর্বের মাস, প্রতিবাদের মাস। কারন আজ থেকে ৬৭ বছর পুর্বে শুধু মায়ের ভাষা প্রতিষ্ঠার জন্যই এদেশের দামাল ছেলেরা পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে রাজপথে নামে নাই বরং সেদিন তারা নিজেদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে যে সংগ্রাম করতে হয়, প্রতিবাদ করতে হয় সেটাই শিখিয়েছিল। আর তাই ৫২-এর ভাষা আন্দোলনের মাত্র ১৯ বছর পর বাঙ্গালী জাতি তাদের স্বাধীকার আদায় তথা স্বাধীনতার জন্য ৭১ সালে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল এবং পাক বাহিনীর মত একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর বিরুদ্ধে মাত্র ৯ মাস যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছিল। এতদ্রুত অন্য কোন দেশ স্বাধীনতা অর্জনের জন্য এত রক্ত দিয়েছে তার কোন নজির নেই। তাই ৫২-এর ভাষা আন্দোলন ছিল আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের বীজ বপনের প্রথম ধাপ। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন হয়েছিল মায়ের ভাষা প্রতিষ্ঠা তথা নিজের মাতৃত্বের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই। আর তার মাত্র ১৯ বছর পর স্বাধিকার দাবি রুপ নেয় স্বাধীনতার আন্দোলনে। ভাষার জন্য যারা আন্দোলনের মাঠে সোচ্চার ছিল তাদের অনেকেই স্বাধীনতা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহনই নয় বরং সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাদেরই একজন একেএম সামসুজ্জোহা। মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত একেএম সামসুজ্জোহা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবরের পরিবার পরিজনকে রক্ষা করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন। নারায়ণগঞ্জে ভাষা আন্দোলনে যিনি অগ্রনী ভুমিকা পালন করেন। সাবেক এমএলএ ও এমপি একেএম সামসুজ্জোহা ৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার সাথে সাথে বাংলাদেশ বেতারের মাধ্যমে দেশবাসীকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে নিজ নিজ অস্ত্র নিকটবর্তী থানায় জমা দেয়ার আহ্বান জানান। ঐ সময় দেশে কোন সরকার ছিল না, ছিলনা কোন প্রশাসন। এমতাবস্থায় একেএম সামসুজ্জোহা দেশকে একটি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের হাত থেকে বাচানোর জন্য মুক্তিযোদ্ধা ও দেশবাসীকে আহ্বান জানান। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক একেএম সামসুজ্জোহা ভাষা আন্দোলনেও অগ্রনী ভুমিকা পালন করেন। তিনি প্রথম বাংলাদেশ বেতার কেন্দ্রে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন। নারায়ণগঞ্জ থেকে বহুল প্রচারিত দৈনিক ডান্ডিবার্তা ২০০৬ সালে সর্বপ্রথম জীবিত দশজন ভাষা সৈনিককে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মাননা প্রদান করে। সেই সময় নারায়ণগঞ্জে প্রত্যয় ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহনকারীদের সাক্ষাতকার গ্রহনকালে যেসব ভাষা সৈনিকদের নাম এসেছে তারা হলেন একেএম সামসুজ্জোহা, মমতাজ বেগম, বজলুর রহমান ও শফি হোসেন খান। মুলত নারায়ণগঞ্জে ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্বে ছিলেন একেএম সামসুজ্জোহা এটা সকলেই এক বাক্যে স্বীকার করেছেন। এরাই ভাষা আন্দোলনকে সংগঠিত করেছেন। সামসুজ্জোহা, মমতজা বেগম, বজলুর রহমান ও শফি হোসেন খান একাধিক স্থানে গোপন বৈঠক করে আন্দোলনের কর্মপন্থা ঠিক করতেন। ৫২ এর ভাষা আন্দোলনটিকে সংগঠিত করার পাশাপাশি ২১ ফেব্রুয়ারী প্রাদেশিক হরতাল সফল করার লক্ষ্যে সামসুজ্জোহার নেতৃত্বে ফতুল¬ায় একটি ক্লাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের ও ছাত্রসংগঠন কর্মীদের সভা হয়। অত্যন্ত গোপনীয়তার মধ্যে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্ম পরিষদের সভায় সামসুজ্জোহাকে আহ্বায়ক করে একটি কমিটি গঠিত হয়। ঐ সভায় সামসুজ্জোহা ছাড়াও আলমাস আলী, বজলুর রহমান বক্তব্য দিয়ে ছিলেন। ঐ সভা থেকেই জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের নিরাপত্তা বন্ধী থেকে মুক্তি দাবি করা হয়। মূলত এর পরই বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জনমত গঠনসহ আন্দোলন তীব্র হতে থাকে। এসময় একেএম সামসুজ্জাহা ছাড়াও মোস্তফা সারোয়ার, শফি হোসেন খান, বজলুর রহমান, আজগর হোসেন ভুইয়া, নাজির. মোক্তার, দাইমুদ্দিন, হাজী জানে আলম প্রমূখ ছিলেন প্রথম সারির নেতা। সামসুজ্জোহা শুধু নেতৃত্বেই ছিলেন না তিনি নিজে নেতা তৈরি করতেন। খান সাহেব ওসমান আলীর পুত্র একেএম সামসুজ্জোহার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার হিসাবে প্রথম সাংসদ নির্বাচিত হন প্রয়াত নাসিম ওসমান। এর পর তার কনিষ্টপুত্র একেএম শামীম ওসমান সাংসদ নির্বাচিত হন। ওসমান পরিবারের মেজ ছেলে ব্যবসায়ী নেতা একেএম সেলিম ওসমান ২০১৪ সালে নাসিম ওসমানের আকস্মিক মৃত্যুর পর উপ নির্বাচনে সাংসদ নির্বাচিত হয়ে শিক্ষার প্রসারে কাজ করে চলেছেন। সামাজিক কর্মকান্ডের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তাদের নামে উৎসর্গ করেন। যা বাংলাদেশে বিরল ঘটনা। একেএম সামসুজ্জোহার ৩২ তম মৃত্যু বার্ষিকী আজ বুধবার। মহান ভাষার মাসে সামসুজ্জোহাসহ সকল শহীদদের প্রতি রইল আমাদের অকৃত্রিম ভালবাসা ও শ্রদ্ধা।

About ডান্ডিবার্তা

View all posts by ডান্ডিবার্তা →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *