হাতিয়ায় ভার্জিন সি বিচ

ভোরের সূর্য উঁকি দিচ্ছে। বাদামী সৈকত মুহূর্তেই সোনালী রূপ ধারণ করেছে। রাতে ঘুমিয়ে থাকা লাল কাঁকড়ারা তাদের স্যাটেলাইট সাদৃশ্য চোখ দিয়ে চারদিক অবলোপন করছে। ওরা এই সৈকতে ঘুরে বেড়ায় রাজপুত্রের মতো। সাগরের বিশাল ঢেউ ওদের খেলার সাথী। ঢেউ আসলেই ওরা কোথায় যেন লুকিয়ে যায়। আবার পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে আসে। দূরে কোনো দর্শনার্থীকে দেখলেই ওরা লুকিয়ে পরে। মাঝে মাঝে বালুর সৈকতের গর্ত থেকে চোখ জোড়া বের করে বিপদ আঁচ করার চেষ্টা করে। সাগরের ঢেউগুলো দমার চরের নির্জনতাকে ভেঙে দেয়। সৈকতের সীমানা যেখানে শেষ সেখান থেকে শুরু উরি বন (এক ধরনের ঘাস)। উরি বনে বাতাসের ঝিরিঝিরি শব্দ যে কারো মনে আলাদা মাত্রা যোগ করবে। অনেকটা সমুদ্রের হূদপিণ্ডে বসে সমুদ্রের গর্জন শোনা। সমুদ্রের গানের সঙ্গে নিজ হূদযন্ত্রের সুর মিলিয়ে একাকার হয়ে যাওয়া। দমার চরে কোনো জনবসতি নেই। তবে রয়েছে গুটিকয়েক জেলে ও গরু-মহিষ চরানো রাখালের বাস। এ যেন অনন্তকালের নির্জনতা।

বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারের চেয়ে কোনো অংশে কম নয় এই সৈকত। বরং অনেক ক্ষেত্রে তার চেয়ে রোমাঞ্চকর ‘ভার্জিন সি বিচ’। স্থানীয়দের কাছে এটা ভার্জিন বিচ নামেই পরিচিত। এখানে বাতাসের হু হু শব্দ বিরোহী মনে কবিতার জন্ম দেয়। মনের ভাব স্বচ্ছ জলের মতো নয়নে ফুটে ওঠে। দূর সাগর থেকে ছুটে আসা বাতাসে উড়তে ইচ্ছা হয়।

যত দূর চোখ যায় বিশাল বালুময় সৈকত আর জলরাশি চোখে পড়ে। কুমারী সৈকতে (ভার্জিন সি বিচ) কেউ যেন মুক্তা মানিক ছিটিয়ে দিয়েছে। রোদের তাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সৈকতে রূপ-লাবণ্য আরো বেড়ে যায়।
সৈকতে পেছনে উরির বন। এই বন গরু-মহিষের খাদ্যের প্রধান উত্স। রাখালরা বনে ঘুরে বেড়ায়। গান করে। সাগর জলে গোসল করে। মাছ ধরে। আর গরু-মহিষ এখানে ঘুরে বেড়ায় স্বাধীনচিত্তে। দল বেঁধে চলে ওরা। উরির কচি ঘাস ওদের প্রিয় খাদ্য। সাগরের নোনা জলে ওরা খেলা করে। এখানে ওরা স্বাধীন। বনে মহিষ আছে তবে বাঘ নেই। তাই বাঘে-মহিষে এক ঘাটে জল খাওয়াও হয় না। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য উপভোগ করা যায় এখানে।

সৌন্দর্যের এই লীলাভূমিতে পর্যটকের সংখ্যা নেই বললে চলে। দুর্বল অবকাঠামো ও প্রচারণার অভাবে এখানে পর্যটকের আনাগোনা দেখা যায় না। তবে পর্যটন খাতে বিনিয়োগের অপার সম্ভাবনা আছে এখানে। প্রয়োজন সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও নীতিমালা। যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন ও পর্যটনের সুযোগ সুবিধা বাড়ানো গেলে স্থানীয় ও দেশের অথর্নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারতো এই চর।

ভার্জিন সি বিচ নামকরণ : মায়াবী দমার চরের সৌন্দর্য এখনো অপ্রকাশিত। নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার দক্ষিণ ও নিঝুম দ্বীপের পূর্ব দিকে দমার চরের অবস্থান। দমার চরের দক্ষিণ পাশে প্রায় পাঁচ কিমি দৈর্ঘ্য ভার্জিন সি বিচের অবস্থান। এখানে প্রকৃতির সৌন্দর্যের প্রাচুর্য আছে। কিন্তু সৌন্দর্য পিপাসুদের চোখের আড়ালেই রয়ে গেছে সেই রূপ। নজর এড়িয়ে যাওয়া এই সৈকতে পর্যটকদের পদাঙ্ক ছিল না বলেই এর নামকরণ করা হয়েছে ভার্জিন সি বিচ। নিঝুমদ্বীপের দেশ নোয়াখালী। আর ভার্জিন সি বিচ যেন সেই সৌন্দর্যের আরো একটি অলঙ্কার।

যেভাবে যাবেন : দমার চরের সঙ্গে সরাসরি কোনো সড়ক যোগাযোগ নেই। নোয়াখালীর চেয়ারম্যান ঘাট, ঢাকা ও চট্টগ্রাম সদরঘাট থেকে নির্দিষ্ট সময়ে জাহাজ ছাড়ে হাতিয়া দ্বীপের উদ্দেশে। হাতিয়ায় নেমে সড়ক পথে যেতে হবে জাহাজমারাস্থ মুকতারিয়া ঘাটে। সেখান থেকে পূর্ব দিকে গেলে আজিম ঘাট। এই ঘাট থেকে ট্রলার রিজার্ভ করে যেতে হবে ভার্জিন সি বিচে। ট্রলার আসা-যাওয়া ভাড়া ১০০০ টাকা পরবে।

থাকা-খাওয়া : দমার চরে থাকা খাওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। প্রায় জন মানবহীন দ্বীপে তাঁবু করে থাকতে পারে পর্যটরা। আর খাওয়া ব্যবস্থাও নিজেদের করে নিয়ে যেতে হবে। অনেকটা রোমাঞ্চ কর দ্বীপে একা হারিয়ে গেলে যেমন হয় তেমনি এক অবস্থা।

About ডান্ডিবার্তা

View all posts by ডান্ডিবার্তা →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *