সড়ক ও জনপদের জলাশয় ভরাট হচ্ছে দিনের পর দিন, বৃষ্টির পানিতে ভেঙ্গে যাচ্ছে ৩টি সড়ক

ডান্ডিবার্তা রিপোর্ট
বৃষ্টির পানি জমে নষ্ট হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের ৩টি প্রধান সড়ক। সড়ক ও জনপথ কর্তৃপক্ষ এই ৩টি সড়ক সংস্কারে গত কয়েক বছরের ব্যবধানে ৪০ কোটি টাকার উপরে ব্যয় করলেও বছর ঘুরতে না ঘুরতেই বৃষ্টির পানি জমে বেহাল অবস্থায় পরিণত হচ্ছে সড়কগুলো। আর এর অন্যতম কারণ হচ্ছে প্রধান ৩টি সড়কের পাশেই সড়ক ও জনপথের জলাশয়গুলো দেদারসে ভরাট হতে থাকা। ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ দলীয় লোকজন জলাশয়গুলো ভরাট করে বাসস্ট্যান্ড, দোকানপাট, মার্কেট গড়ে তুললেও কোন ধরনের পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি সড়ক ও জনপথ কর্তৃপক্ষকে। এছাড়া বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করে সড়কগুলো সংস্কার করা হলেও সড়কের পাশে কোন ড্রেন না থাকায় বৃষ্টির পানি রয়ে যাচ্ছে সড়কেই। লিংক রোডের পানি নিস্কাশনের ড্রেন কাজে আসছেনা, জলাশয় ভরাট করে বাসস্ট্যান্ড, মাইক্রোস্ট্যান্ড করার ফলে এ অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। জানা গেছে, ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ যাতায়াতের অন্যতম রুট হলো ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-পাগলা রুট থাকলেও উড়াল সেতুর (যাত্রাবাড়ি ফ্লাইওভার) কারণে লিংক রোড দিয়েই মূলত লোকজন বেশী চলাচল করে। প্রাইভেট কার ছাড়াও গণপরিবহনে এ রুটে যাত্রী সংখ্যাও বেশী। নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া থেকে সাইনবোর্ড পর্যন্ত ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের দৈর্ঘ্য ৮ দশমিক ৪ কিলোমিটার। এর মধ্যে ফতুল্লার শিবুমার্কেট এলাকাতে গড়ে উঠেছে অসংখ্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এছাড়া লিংক রোডের দুই পাশেই রয়েছে অসংখ্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান। ১৯৯৫ সালের দিকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হলে দ্রুত যাতায়াতে এই রুটটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন কয়েক হাজার যানবাহন চলাচল করে থাকে। নারায়ণগঞ্জ থেকে রাজধানী সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যাওয়ারও অন্যতম রুট এটি। এই সড়কটি মেরামতে গেল ৫ বছরে অন্তত ৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। জানা গেছে, ২০১৪ সালের ১৫ এপ্রিল ১২ কোটি ১২ লাখ টাকা ব্যায়ে ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডটির সংস্কার কাজের উদ্বোধন করেন সংসদ সদস্য শামীম ওসমান। ২০১৮ সালের ৮ মার্চ ফতুল্লার সস্তাপুর এলাকায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের রাস্তার সংস্কার কাজ পরিদর্শনে আসেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী এবং বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সেক্রেটারী ওবায়দুল কাদের। তিনি ওইসময় সংবাদকর্মীদের বলেন, ‘রাস্তটি ভালো ভাবে করার জন্য নির্দেশ দিয়ে দিয়েছি। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড ৮ কিলোমিটার রাস্তার নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮ কোটি ১৪ লাখ টাকা। গত বছরের শেষ দিকে সড়কটির নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। তবে বছর না ঘুরতেই সড়ক মেরামতের কোটি কোটি টাকাই যেন গচ্চায় পরিণত হয়েছে। বৃষ্টির পানি নিস্কাশনের কোন ব্যবস্থা না থাকায় মুষলধারের বৃষ্টি আসলেই ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের কয়েকটি স্পটে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতার। শহরের চাষাঢ়া এলাকাতে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে ডিপ ড্রেন নির্মাণ হলেও চাঁদমারী থেকে শিবুমার্কেট পর্যন্ত নির্মিত সওজের নির্মিত দীর্ঘ ৩ কিলোমিটার ব্যাপী ড্রেন সড়কটির পানি নিস্কাশনের কোন কাজেই আসছেনা। কারণ সেই ড্রেনটি পরিপূর্ণ মাটি ও ময়লার স্তুপে। অপরিকল্পিতভাবে ও সমন্বয়হীনতায় সড়ক ও ড্রেন নির্মাণ করার কারণে লিংক রোডে সৃষ্টি হয়েছে কয়েক হাজার ছোট বড় গর্ত। এছাড়া মুষলধারের এক ঘন্টার বৃষ্টিতেই লিংক রোডে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতার। পিচের প্রধান শত্রু হচ্ছে পানি। আর জলাবদ্ধতার পানিতে পিচ উঠে গিয়ে বারোটা বাজছে লিংক রোডের। ইতোমধ্যে সড়কটির বিভিন্ন স্থানে সড়ক উচু নিচু আকার ধারন করেছে। এছাড়া ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের চাঁদমারী থেকে সাইনবোর্ড পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে সড়ক ও জনপথের অসংখ্য জলাশয় ভরাট করে ফেলা হলেও দেখার যেন কেউ নেই। সাইনবোর্ডে জলাশয় ভরাট করে বাসস্ট্যান্ডও নির্মিত করেছেন ভাইস চেয়ারম্যান নাজিমউদ্দিন। এছাড়া চাঁদমারী এলাকাতে জলাশয় ভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছে মাইক্রোস্ট্যান্ড। পুরাতন সড়কে নেই পানি নিস্কাশনের ড্রেন, জলাশয় ভরাটে অসংখ্য দোকান নির্মাণ করে রেখেছে ক্ষমতাসীনরা আর এর ফলে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ (পাগলা) পুরাতন সড়কটিতে প্রশস্থতার ছোঁয়া লাগেনি। ঢাকা সড়ক ও জনপথ বিভাগের তথ্যমতে, শহরের চাষাঢ়া থেকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ (পাগলা) পুরাতন সড়কের পোস্তগোলা পর্যন্ত দৈর্ঘ্য ১২ কিলোমিটার। সড়কটির প্রশস্ততা মাত্র ২৪ ফুট। কিছু কিছু স্থানে সামান্য বেশী রয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ সড়কটিতে গত ২ যুগেও লাগেনি প্রশস্ততার ছোঁয়া। জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার পঞ্চবটি সংলগ্ন শাসনগাওয়ের বিসিক শিল্পনগরী এলাকাতে রয়েছে অন্তত সহ¯্রাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান। যাতে অন্তত ৩ লাখ শ্রমিক কাজ করছে। শুধুমাত্র বিসিক শিল্পনগরী থেকেই প্রতি বছরে আড়াই হাজার কোটি টাকা সমপরিমান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে। ফতুল্লার মুন্সিখোলা এলাকায় রড সিমেন্টের পাইকারী ব্যবসাকেন্দ্র, আলীগঞ্জ ও দাপায় পাথর ও বালু ব্যবসা, ফতুল্লার পঞ্চবটি, নরসিংপুর, বক্তাবলী এলাকায় শতাধিক ইটভাটা, বিভিন্ন স্থানে অর্ধশতাধিক রি-রোলিং মিল, পঞ্চবটিতে মেঘনা ও যমুনা পেট্রোলিয়াম তেলের ডিপো অবস্থিত। এসকল শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পণ্যবাহী কাভার্ডভ্যান, ট্রাক, তেলের ডিপোর ট্যাংকলরীসহ কয়েক হাজার যানবাহন প্রতিনিয়ত চলাচল করছে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ (পাগলা) পুরাতন সড়ক দিয়ে। মুন্সিগঞ্জের মুক্তারপুর এলাকায় গড়ে ওঠা শাহ সিমেন্ট, প্রিমিয়ার সিমেন্ট, ক্রাউন সিমেন্টসহ বেশ কিছু কারখানার কয়েকশত বৃহদাকার কাভার্ডভ্যানও প্রতিনিয়ত সড়কটি দিয়ে যাতায়াত করছে। এছাড়া গণপরিবহনতো রয়েছেই। ২০১৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর বিকেলে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পুরাতন সড়কটির ৬ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যায়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ (পাগলা) পুরাতন সড়ক সংস্কার কাজের উদ্বোধন করেন ফতুল্লা- ও সিদ্ধিরগঞ্জ আসনের এমপি শামীম ওসমান। তবে সংস্কার কাজ শুরু হয় ২০১৬ সালে। সড়কটির চাষাঢ়া থেকে পঞ্চবটি পর্যন্ত সড়কটির দুই পাশেই জলাশয়গুলো ভরাট করে দোকান, ফাস্টফুড, মার্কেট নির্মাণ করা হয়েছে। সড়ক সংলগ্ন কোন ড্রেনেজ সিস্টেম না থাকায় বৃষ্টির পানি সড়কের উপরেই রয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টির পানি জমে পরিণত হচ্ছে খানা খন্দকে। সড়কটি সংস্কারে সড়ক ও জনপথ ঢাকা বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের উদাসীনতার কারণে বছর না পেরুতেই সড়কটির বিভিন্ন স্থানে গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও কোথাও সড়ক এবড়োথেবড়ো অবস্থায় রয়েছে। খানপুর-শিমরাইল সড়কের দুই পাশের জলাশয়গুলো দখল চলছেই। নারায়ণগঞ্জ শহরের খানপুর থেকে সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল মোড় (চিটাগাং রোড) পর্যন্ত সড়কটি প্রায় ৮ কিলোমিটার। তবে দীর্ঘদিনেও এই সড়কটিতে লাগেনি প্রশস্ততার ছোয়া। সড়কটির খানপুর মেট্রো সিনেমা হল মোড় সংলগ্ন স্থানে রয়েছে জেলা ডিবি পুলিশের কার্যালয়। কিছুটা দূরেই রয়েছে নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল। যেখানে প্রতিদিন দূর দূরান্ত থেকে কয়েক হাজার রোগীর আগমন ঘটে। হাসপাতালের ঠিক পরেই রয়েছে জেলা প্রশাসকের বাসভবন। এরপর রয়েছে বিআইডব্লিউটিএ ও বিআইডব্লিউটিসি’র স্টাফদের কোয়ার্টার। বরফকল মাঠ সংলগ্ন স্থানে রয়েছে চৌরঙ্গী ফ্যান্টাসী পার্ক। বরফকল মাঠ থেকে কিল্লারপুল পর্যন্ত সড়কের দুই পাশেই রয়েছে অসংখ্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান। কিল্লারপুল মোড়ে রয়েছে ডিপিডিসি ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যালয়। এছাড়া বরফকল খেয়াঘাট ও নবীগঞ্জ খেয়াঘাট দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী পারাপার হয়ে থাকে। এছাড়া রয়েছে আদমজী ইপিজেড যেখানে অর্ধশতাধিক রপ্তানীমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এই সড়কটিতে চলাচল করে শীতলক্ষ্যা পরিবহন, দুরন্ত পরিবহন, লেগুনা, টেম্পু ও বেবীট্যাক্সি। এছাড়া ব্যাটারীচালিত অটোরিক্সাও চলাচল করে থাকে। এদিকে সড়কটির দুই পাশের অসংখ্য জলাশয় ইতিমধ্যে ভরাট করে ফেলা হয়েছে। জলাশয় ভরাট ও দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে অসংখ্য দোকানপাট বাড়িঘর। চৌধুরী ও ২নং ঢাকেশ্বরী এলাকায় মার্কেট ও ট্রাকস্ট্যান্ড বসানো হয়েছে। সড়কটি সংলগ্ন জলাশয়গুলো ভরাট করে ফেলায় সড়কটিতে জমে থাকছে বৃষ্টির পানি। এতে করে সড়কের বিভিন্ন স্থানে গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। এতে করে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে জনসাধারণকে।

About ডান্ডিবার্তা

View all posts by ডান্ডিবার্তা →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *