নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি নিয়ে হতাশ আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদের

ডান্ডিবার্তা রিপোর্ট
নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী সাংসদ শামীম ওসমান ও মেয়র সেলিনা হায়াত আইভীর মধ্যকার তিক্ততা বেড়েই চলছে। তবে, রাজনীতির মাঠ থেকে এই তিক্ততা এবার নোংরামির পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে উভয় পক্ষের অনুসারিরা। আর তা নিয়ে এখন সর্বত্র চলছে আলোচনা সমালোচনা। একাধিক সূত্র মতে, পারিবারিক ভাবে আইভী ও শামীম ওসমানদের দ্বন্দ্বের শুরু হয়েছিলো স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার প্রথম নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। এরপর কেটে গেছে অনেকটা সময়। ২০০৩ সালে একই পৌরসভায় নির্বাচন করেন আইভী। এসময় আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই দেশ ছাড়া। দলের অবস্থাও অনেকটা ত্রাহি ত্রাহি। আইভী নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগ কিছুটা প্রাণ ফিরে পায়। যদিও সেই নির্বাচনে আইভীকে প্রবাস থেকে সমর্থন দিয়েছিলেন বর্তমান সাংসদ শামীম ওসমান। শামীম ওসমান সেই সময় তার অনুসারি নেতাকর্মীদের আইভীর পক্ষে কাজ করার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে আওয়ামীলীগের একাধিক নেতা দাবী করেছেন। কিন্তু নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর কবরীর সাথে শামীম ওসমানের দ্বন্দ্ব শুরু হলে তৎকালীন নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান সেলিনা হায়াত আইভী কবরীর পক্ষ নিলে শামীম ওসমানের সাথে আইভীর দূরত্ব বাড়তে থাকে। ওই সময় কবরীর সাথে ওসমান পরিবারের সাপ নেউল সম্পর্ক ছিল। সেই সময় বাস ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে আওয়ামীলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে হাতাহাতির জের হিসেবে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামীলীগের পুরানো দ্বন্দ্ব আবার প্রকাশ্যে রূপ নেয়। এসময় কবরী পক্ষ নেয় আনোয়ার হোসেনসহ তার অনুসারীরা। মেয়র আইভী শামীম ওসমানের প্রতিপক্ষ হয়। ২০১১ সালে আওয়ামীলীগ প্রথম মেয়র নির্বাচনে শামীম ওসমানকে মনোনয়ন দিলে নাগরিক কমিটির সমর্থন নিয়ে সেলিনা হায়াত আইভী নির্বাচনে নামে। এ নির্বাচনে সেলিনা হায়াত আইভী প্রথম নারী মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর উত্তর মেরু ও দক্ষিণ মেরু প্রকাশ্যে রূপ নিলে নেতাকর্মীরাও দ্বিধা বিভক্ত হয়ে পড়ে। ত্বকী নিহত হওয়ার পর শামীম ও আইভীর দ্বন্দ্ব অনেকটাই দৃশ্যমান হয়ে উঠে। সেলিনা হায়াত আইভী এ হত্যাকান্ডের পিছনে ওসমান পরিবার জড়িত বলে দাবী করে বিভিন্ন সভা সমাবেশে বক্তব্য দিতে থাকে। সদর- বন্দর আসনের উপ-নির্বাচনে আনোয়ার হোসেন পুনরায় উত্তর মেরুর দিকে ঝুকে পড়েন। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শামীম ওসমান এমপি নির্বাচিত হন। ত্বকী হত্যাকা-ের মধ্য দিয়ে দুই পরিবারের দ্বন্দ্ব আরও বেশি জোড়ালো হতে শুরু করে। প্রকাশ্যে এই হত্যার জন্য শামীম ওসমানসহ তার পরিবারকেই দায়ী করে বিভিন্ন স্থানে বক্তব্য দিতে শুরু করেন আইভীসহ নারায়ণগঞ্জের সুশীল সমাজ। তিক্ততা এবার বেড়ে যায় বহুগুণ। শামীম অনুসারিরাও খালি মাঠ ছেড়ে না দিয়ে মাঠে নামেন। এসময় আইভীর বিরুদ্ধে দূর্নীতির অভিযোগ এনে আইভী বিরোধী সভা সমাবেশ শুরু করেন তারা, দিতে থাকেন পাল্টা জবাব। পরিস্থিতি যখন গরম ঠিক তখনই নিখোঁজ হয় শামীম ওসমান অনুসারি পারভেজ। যার হদিস এখনও মিলেনি। এই পারভেজ নিখোঁজের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওসমান পরিবার পারভেজের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় আইভীসহ তার অনুসারিদেরকেই দায়ী করতে শুরু করেন। উত্তপ্ত হয়ে উঠে রাজনীতি। ওসমান পরিবারের পক্ষে মামলা হলে সুফিয়ান, উজ্জ্বল, মিমনসহ আরও কয়েকজনকে আটক করে পুলিশ। কিছুদিন জেল খেটে তারা জামিনে বেরও হন। কিন্তু দুই পরিবারের মধ্যে বিভাজনের যে দাগ এতদিন ছিলো তা এবার দৃশ্যমান হয়ে উঠে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হন শামীম ওসমান। শুরু হয় এবার সেয়ানে সেয়ানে টক্কর। উভয় পক্ষের দ্বন্দ্ব এবার আরও তীব্র গতিতে ছুটতে থাকে। ব্যারটি হয়ে উঠে অনেকটা এমন, আইভী যা করবে তার বিরোধীতায় লিপ্ত হবে শামীম ওসমান আবার শামীম ওসমানের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। দ্বিতীয়বারের মত নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে শামীম ওসমানগং আনোয়ার হোসেনকে সমর্থন করে কেন্দ্রে নাম পাঠালে আওয়ামীলীগের হাই কমান্ড সেলিনা হায়াত আইভীকে দলীয় মনোনয়ন দেয়। এই নির্বাচনে সংবাদ সম্মেলন করে শামীম ওসমান আইভীকে সমর্থন জানালেও মেযর আইভী শামীম ওসমানকে বিশ্বাস করেনি। ফলে দ্বন্দ্ব থেকেই যায়। সর্বশেষ এসব দ্বন্দ্বের ভয়াবহ পরিণিতি ঘটে হকার ইস্যুকে কেন্দ্র করে। এ ঘটনায় আইভীর উপর হামলাও চালানো হয়। মেয়র আহতও হয়েছিলেন। তবে, দুই পরিবারের দ্বন্দ্বটা নোংরামি পর্যায়ে নেমে আসে। সম্প্রতি আইভীর বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী বরারবর জামাত-বিএনপির সাথে সখ্যতা ও সরকার বিরোধী বক্তব্য রাখার অভিযোগ এনে স্মারকলিপি পেশ করার দুইদিন পর ফেসবুকে আপত্তিকর ছবি আপলোড করলে একটি অনলাই এনিয়ে রিপোর্ট করে। নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে শুরু হয় নোংরামি। যা অতীতে ছিল না। আওয়ামীলীগের একাধিক নেতাকর্মী বলছেন, রাজনৈতিক কারণে দুই পরিবারের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিলো অতীত থেকে যা এখনও বিদ্যমান। কিন্তু ছবি বিকৃত করে এমন নোংরামি সত্যিকার অর্থে শোভন নয়। এতে করে দুই পরিবারের দ্বন্দ্ব লাঘবের পরিবর্তে তা আরও বহুগুণ তিক্ততায় পৌছাবে। যা কখনোই আর নিরসন হবার নয়। তাছাড়া রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিদের রাজনৈতিক ভাবেই মোকাবেলা করতে হয় নোংরামি দিয়ে নয়। যারা এই ধরণের নোংরামি করছে কিংবা সমর্থন করছে তারা মূলত দুই পরিবার থেকেই ফায়দা লুটার চেষ্টা করছে বলে তারা মন্তব্য করে।

About ডান্ডিবার্তা

View all posts by ডান্ডিবার্তা →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *