নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের একাল-সেকাল

নারায়ণগঞ্জ ক্লাব সোয়াশত বছর পূর্তি পালন করল। এ উপলক্ষ্যে ক্লাবের সভাপতি তানভীর আহাম্মেদ ক্লাব সম্পর্কে যা ভাবছেন তাই তুলে ধরলাম। ক্লাব সভাপতি তারভীর আহাম্মেদ জানান, ঔপনিবেশিক আমলে প্রতিষ্ঠা পাওয়া ইউরোপিয়ান ক্লাব কালের বিবর্তনে আজ নারায়ণগঞ্জ ক্লাব লিঃ।১২৫বছরে যা পরিণত হয়েছে ‘পলিটিক্যাল হান্টিং গ্রাউন্ড অব বেঙ্গল’ খ্যাত এই শিল্প-বন্দর নগরী নারায়ণগঞ্জের আভিজাত্য গৌরব আর ইতিহাসের অন্যতম প্রতীকে। নারায়ণগঞ্জ ক্লাব শুধু একটি এলিট শ্রেনীর চিত্ত বিনোদন বা অবকাশ যাপনের প্রতিষ্ঠানে থেমে নেই। আজ নারায়ণগঞ্জ ক্লাব পরিণত হয়েছে কালের স্বাক্ষী’তে। সেই ঐতিহ্যের ধারক-বাহক প্রতিষ্ঠানটির নির্বাচিতসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পেরে আমি সত্যিই গর্বিত। শুধু গর্বিতই নই, নারায়ণগঞ্জ ক্লাব লিমিটেড এর ১২৫তম বছরের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায়আমি অত্যন্ত সম্মানিত বোধ করি এবং আমার অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে ক্লাবের সকল সদস্যদের প্রতি জানাই আমার আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। সভাপতি হিসেবে কি করতে পেরেছি আরপারিনি, সেই হিসেব আমি কষতে রাজি নই। কারণ, আমার একার পক্ষে কোন কিছুই করা সম্ভব ছিল না। যা যা করতে পেরেছি তার সবই সম্ভব হয়েছে ক্লাবের সকল সম্মানিতসদস্যদের অপার সহযোগিতার কারণে। তবে নিজের উপর অর্পিত দায়িত্ব থেকে জবাবদিহিতার একটা ব্যাপারঅবশ্যই রয়েছে। সেই জবাবদিহিতার জায়গা থেকেই গত দুই বছরে ক্লাবের উন্নয়নে আমি ও আমার কার্যনির্বাহী কমিটিযা কিছু করতে পেরেছি তার কিছুটা সম্মানিত সদস্যদের সামনে উপস্থাপন করছি।

নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের ইতিহাসে এর অবকাঠামোগত উন্নয়নে যে অসাধ্যকে আমরাসাধন করতে পেরেছি সেটি হল ক্লাবের পুরাতন কমিউনিটি সেন্টার ভবন ভেঙে সেখানে ১০ তলা বিশিষ্ট বহুতল ভবননির্মাণ প্রকল্পের মত যুগান্তকারী একটি সিদ্ধান্ত যেটি বাস্তবায়নের পথে রয়েছে।তবে এই কাজটির জন্য আমি অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে ধন্যবাদ জানাই ক্লাবেরসম্মানিত সকলসদস্যদেরযারাআমাদের এই প্রকল্পের প্রস্তাব এবং তা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া সবটুকু দায়িত্বগ্রহণ করে বহুবছর পূর্বের এসোসিয়েট সদস্য (ক্লাব সদস্যদের স্ত্রী-সন্তানদের)তৈরীর প্রবর্তনটি চালু করার ক্ষেত্রে স্বতঃস্ফূর্ত মত দিয়েছিলেন এবং ক্লাব ফান্ডে বিপুল অর্থ জমা করে এই প্রকল্পের পথকে কয়েক ধাপে এগিয়ে দিয়েছেন। আশা করছিএই প্রকল্প সম্পন্ন হওয়ার সংগে সংগেনারায়ণগঞ্জ ক্লাব অনন্য অবস্থানের আরেকটি ধাপে পৌছে যাবে এবং আমাদের এই ক্লাবটি বাংলাদেশ সহ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও নারায়ণগঞ্জের একটি Land Mark হিসাবে প্রতিষ্ঠা পাবে।

ক্লাবের লেনদেনের স্বচ্ছতা আনতে প্রথমবারের মত ক্যাশ লেনদেন রহিত করে Cash Card এর প্রচলন করা হয়েছে এবং হিসাব বিভাগকেনতুন সফটওয়্যারের মাধ্যমে ঢেলে সাজানো হয়েছে। আমাদের চেষ্টাই ছিলক্লাবের আয়ের উৎসগুলোকে ভর্তুকি থেকে তুলে এনে লাভজনক অবস্থায় নিয়ে আসা। সেই প্রয়াসে সকলের সহযোগিতা নিয়েই ক্লাবের ডিপার্টমেন্ট স্টোর, বেকারী, স্নেক্স ওবার-বি-কিউ এবং ক্যাটারিং সহ প্রতিটি বিভাগকে লাভজনক পর্যায়ে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছি।একই সংগে আমরা চেষ্টা করেছি ঔপনিবেশিক আমলের ঐতিহ্যকে ধরে রেখেক্লাবের লাউঞ্জগুলোকে নতুনভাবে‘ব্রিটিশ আর্কিটেকচারের’ আদলে সাজানোর। ক্লাবের অফিস রুম, নতুন কার্ডরুম নির্মাণ সহ পুরানো রুমগুলোকেসংস্কারের আওতায় এনেইতিমধ্যেই নতুন রুপে ঢেলে সাজানো হয়েছে এবং আরও কিছুর কাজ এগিয়ে যাচ্ছে।

আমরা সবসময় চেষ্টা করেছি ক্লাবের মান উন্নয়নে ক্লাবের সংগে দেশের স্বনামধন্য বড় বড় প্রতিষ্ঠানেরসঙ্গে কর্পোরেট বন্ডিং তৈরী করার যা বাস্তবায়নের প্রায় শেষের পথে। আমরা আমাদেরক্লাব সদস্যদের জন্য ব্যবস্থা করেছি পৃথক ক্রেডিট কার্ডের,যা আমাদের ক্লাবের পরিচিতিকে ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে যাবে।

আপনারা জানেন জাতীয় ক্রীড়া ক্ষেত্রে নারায়ণগঞ্জের অবদান অনেক। সেই ব্যাপারেও এই ক্লাব কোন অংশে পিছিয়ে নেই। আমরা প্রায় প্রতি বছরই জাতীয় পর্যায়ের স্নুকার প্রতিযোগিতা আয়োজন করি। স্নুকার আমাদের নারায়ণগঞ্জ ক্লাবে একটি গর্বের খেলা। আমাদের বেশ কয়েকজন খেলোয়ার আছেন যারা নিয়মিত জাতীয় পর্যায়ে খেলে সাফল্য নিয়ে এসে ক্লাবের সম্মানকে আরও উচ্চতরে নিয়ে গেছেন। আমাদের ক্লাবের ক্রিকেট দল শুধুমাত্র দেশীয় ক্লাবগুলোর মধ্যেই নয়, আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলের বহু খ্যাতনামা ক্লাবের অংশগ্রহণে আয়োজন করা ক্রিকেট টূর্নামেন্টে ধারাবাহিক ভাবে সফল হওয়ার গৌরব অর্জন করছে।বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক প্রায় সকল অধিনায়কই আমাদের ক্লাবের সদস্য। তাদের সকলের সমন্বয়ে আমাদের ক্লাব ক্রিকেট দল অপরাজেয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। দেশবরেণ্য অনেক বর্তমান ও সাবেক ক্রীড়াবীদ এই ক্লাবের সদস্য।আমাদের আয়োজন করা প্রেসিডেন্ট কাপ আন্তঃক্লাব টেনিস প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের প্রসিদ্ধ ক্লাবগুলোর জাতীয় মানের অনেক খেলোয়ার অংশগ্রহণ করে থাকে। এই প্রেসিডেন্ট কাপ আন্তঃক্লাব টেনিস প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের টেনিস তথা ক্রীড়াঙ্গনে নারায়ণগঞ্জ ক্লাব কে একটি বিশেষ মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আমরা টেনিস এর লাউঞ্জ ভবনটিদ্বিতীয় তলায়সম্প্রসারণ করেছি, পুরানো জিমনেশিয়াম ভেঙ্গে নতুন ভবন তৈরী করে সেখানে এর সকল কার্যক্রম স্থানান্তর করা হয়েছে। সুইমিংপুলে প্রথমবারের মত সংযোজন করা হয়েছে অত্যাধুনিক মানের জাকুজি। আমরা ক্লাবের শুধুমাত্র সদস্যগণই নয় বরং তাদের পরিবারকে সংগে নিয়ে সমস্ত নিয়মিত অনুষ্ঠানগুলোকে ভিন্ন মাত্রায় আয়োজন করেছি, যা সকলের কাছে প্রশংসনীয় হয়েছে।

নতুন আঙ্গিকে আবহমান বাঙ্গালী সংস্কৃতির ধারক পহেলা বৈশাখ, বসন্ত বরণ উদযাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রাশ্চাত্য ঐতিহ্যকেও স্মরণ করতে 31st NightGes Valentines দিবসের আয়োজন করা হয়। ক্লাব সদস্য ও সদস্য পরিবারের জন্য আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেভ্রমনের মাধ্যমেবিশ্বকে জানতে ভ্রমনেরব্যবস্থা করা হয়েছে। যেখানে ছিল দুবাই, মিশর ওঅস্ট্রেলিয়ার মত উন্নত দেশ। এছাড়াও চলতি বছর প্রথমবারের মত বিমানযোগে আকাশ পথে নৈসর্গিক সৌন্দর্য্যরে চারনভূমিবিশ্বের বৃহত্তম সমুদ্র সৈকতকক্সবাজার ভ্রমন ছিল সকলের জন্য চমকপ্রদ ও আনন্দঘন।

আমি কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরন করছি, বীর মুক্তিযোদ্ধা, ক্লাবের সাবেক সভাপতি ওনারায়ণগঞ্জ-০৫ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য জনাব এ কে এম সেলিম ওসমান কে,যিনি প্রথম উপলব্ধি করেছিলেন, ক্লাব সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্বর্ধনাআয়োজনের বিষয়টি। তারই অনুপ্রেরনায় প্রতি বছর বেশ ভাবগাম্ভির্য্যরে মধ্যে দিয়ে এ অনুষ্ঠানটি উদ্যাপিত হয়ে আসছে।আমি দৃঢ় ভাবেবিশ্বাস করি, মুক্তিযোদ্ধারাই এ জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান।জাতির সেই শ্রেষ্ঠ সন্তান ক্লাব সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানে প্রতি বছর ১৭ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্বর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়। গত বছর ক্লাব সভাপতি হিসেবে এমন একটিমর্যাদাকর সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করতে পারা এবং মুক্তিযুদ্ধেরচেতনায় নতুন প্রজন্মকে উদ্ভাসিত করার লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধের উপর প্রামাণ্য চিত্র ও নাটক মঞ্চায়নের আয়োজন করতে পেরে আমি ভাষায় বর্ণনাহীন এক অপার আত্মতৃপ্তি পেয়েছি, যা আমার জন্য অত্যন্ত আনন্দের ও গর্বের। আমরা আমাদের ক্লাবের মাধ্যমে দুঃস্থ মানুষের পাশেও থাকার পরিকল্পনায় অংশ নিয়েছি। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ঈদের সময় প্রায় ১১০০ পরিবারকে নতুন কাপড় ও লুঙ্গী সহ খাদ্য সামগ্রী দিয়ে ঈদের আনন্দ বন্টন করা এবং পার্শ্ববর্তী দেশ মায়ানমার থেকে আসাকক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবিরে আশ্রয় নেয়াপ্রায় ২,৫০০পরিবারের মাঝে খাবার ও প্রয়োজনীয় ঔষুধ সরবরাহ করা হয়।

নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের ঐতিহ্য ও গৌরবের ১২৫ বছর পূর্তী উদযাপনের অংশ হিসেবে ক্লাব সবুজ চত্বরে সদস্য ও সদস্য পরিবারের অংশগ্রহণে প্রথমবারের মত কৃত্রিম ভৌতিক পরিবেশের আবহ তৈরী করে সেখানে Halloween Party আয়োজন করা হয়। ভিন্নধর্মী এ আয়োজন ক্লাব সদস্য ও পরিবারবর্গসকলের মধ্যে প্রশংসীত হয়। এছাড়াও ১২৫ বছর পূর্তীকে স্মরণীয় করে রাখতে দেশী ও বিদেশী ক্লাব গুলোর অংশগ্রহণে ১৫ থেকে ১৭ নভেম্বর, ২০১৮,০৩ (তিন) দিনব্যাপী Sports Carnival (ক্রিকেট, স্নুকার, পুল ও সুইমিং)এবং১৯, ২২ ও ২৩ নভেম্বর, ২০১৮ বিশেষসাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। সাংস্কৃতিক পর্বের প্রথম দু’দিনের অনুষ্ঠানক্লাব প্রাঙ্গনে অনুষ্ঠিত হলেও সমাপনী দিবসের অনুষ্ঠান এ কে এম শামসুজ্জোহা ক্রীড়া কমপ্লেক্সে অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে সঙ্গীত পরিবেশন করবেন এ উপমহাদেশের নন্দিত শিল্পী ভারতীয় তারকা সুনিধী চৌহান ও তার দল।

আমি কৃতজ্ঞ চিত্তে ক্লাবের সাবেক সভাপতিবৃন্দের মূল্যবান পরামর্শ ও সার্বিক দিক-নির্দেশনার জন্য তাদের গভীরভাবে স্মরণকরছি। একই সংগে কার্যনির্বাহী কমিটি,বিভিন্ন বিষয়ে গঠিত উপ-কমিটি,বর্ধিত কলেবরে ‘কথা’ প্রকাশনা’র সম্পাদনা পরিষদ এবং বিশেষ করে ১২৫ বছর পূর্তী উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক সহ সম্মানিত সদস্যদের আন্তরিক সহযোগিতার জন্য আমি শ্রদ্ধাবনতচীত্তে তাদের প্রতিওকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

 

পরিশেষে, আমি বলতে চাই, সফলতা যতটুকু তার সবই আপনাদের, আর ব্যর্থতার দায়ভার পুরোটাই আমার। আমার এই পথচলায় সঙ্গী হওয়ায় আমি আপনাদের প্রতি চির কৃতজ্ঞ। আপনাদের ভালোবাসা নিয়েই আগামীদিনের পথ চলতে চাই। সকলে ভাল থাকুন, সুস্থ থাকুন।

নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের সোয়াশত বছর পূর্তি

ব্রিটিশ ছাড়িয়ে পাকিস্তান, পাকিস্তানের পর বাংলাদেশ। এই ব্রিটিশ উপ-মহাদেশের প্রাচীনতম নারায়ণগঞ্জ ক্লাব এক সময় ইউরোপিয়ান ক্লাব হিসাবে পরিচিত ছিল। ১৮৯৩ সালে ব্রিটিশরা ব্যবসা উপলক্ষ্যে নারায়ণগঞ্জ আসার পর তাদের বিনোদনের লক্ষ্যে গড়ে তোলে এই ক্লাব। এক সময় ইউরোপিয়ান ক্লাবে বিট্রিশ ছাড়া অন্যদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। নারায়ণগঞ্জবাসীর কৌতুহলের এই ক্লাবটিতে বাংগালীদের প্রবেশাধিকার ছিলনা বললেই চলে। ১৯৬৬ সালে ব্যবসা বাণিজ্যের সুত্রধরে ব্রিটিশদের সাথে সুসম্পর্কের কারণে তৎকালীন মন্ত্রী এম.এ সাত্তার প্রথম এই ক্লাবের সদস্য হন। বলা চলে তৎকালীন ইউরোপিয়ান ক্লাবের প্রথম বাংগালী সদস্য এম.এ সাত্তার। কালের পরিক্রমায় ইউরোপিয়ান ক্লাবে ধীরে ধীরে বাংগালী সদস্য বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে ইউরোপিয়ান ক্লাব নারায়ণগঞ্জ ক্লাব নাম ধারন করে। নারায়ণগঞ্জ তথা দেশের এলিট শ্রেনীর বিভিন্ন শ্রেনী পেশার মানুষই শুধুমাত্র এই ক্লাবের সদস্য হতে পারত। বাংগালীদের সদস্য হওয়া ছিল অনেকটা স্বপ্নের মত। স্বাধীনতার পর বাংগালীর কর্তৃত্বে আসে নারায়ণগঞ্জ ক্লাব। বাড়তে থাকে ক্লাবের বাংগালী সদস্য সংখ্যা। একসময়ের স্বপ্নের নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের সদস্য সংখ্যা ১৩৬১ । তাছাড়া এবার ক্লাব সদস্যদের পরিবারের সদস্যরাও এসোসিয়েট মেম্বার হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানের সকল প্রকার সুবিধা সম্বলিত নারায়ণগঞ্জ ক্লাবে রয়েছে সুইমিংপুল, জিমনেশিয়াম, বার, কার্ডরুম, ¯œুকার ও পুল, টেনিস সহ সকল সুযোগ সুবিধা। সোয়শত বছর পূর্তিতে ক্লাবে এবার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। ক্লাবের কমিউনিটি সেন্টার ভেঙ্গে সেখানে নির্মিত হবে ২০ তলা বিশিষ্ট নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের আধুনিক ভবন। যা ইতিমধ্যেই ক্লাব সদস্যরা অনুমোদন করেছে। এই ভবনটি নির্মিত হলে তা হবে দেশের অন্যতম সেরা দৃষ্টি নন্দন ক্লাব। সোয়শত বছর পূর্তি উপলক্ষেচলতি বছরে প্রথম প্রহরে আতশবাজির ও কেক কাটার মাধ্যমে অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা করেন বর্তমান সভাপতি তানভীর আহমেদ সহ সাবেক সভাপতিবৃন্দ। একে একে বছর ভরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সোয়াশত বছর পূর্তি জাঁক জমকপূর্ণভাবে পালিত হয়। সোয়াশত বছর পূর্তির প্রধান আকর্ষন ছিল ক্লাব সদস্য ও তাদের পরিবারবর্গকে নিয়ে আনন্দ র‌্যালী। আনন্দর‌্যালীটি শহরের সকলের দৃষ্টি আকর্ষন করতে সক্ষম হয়। পাশাপাশি চলে নাটক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সংগীতা অনুষ্ঠান ও সর্বশেষ ২৩ নভেম্বর, ২০১৮ তারিখে এ কে এম সামসুজ্জোহা ক্রীড়া কমপ্লেক্সে গ্র্যান্ড গালা নাইটের মাধ্যমে সোয়শত বছরের অনুষ্ঠানমালার সমাপ্তি ঘটে। এ অনুষ্ঠানে এই উপ-মহাদেশের প্রখ্যাত সংগীত শিল্পী সুনিধী চৌহান সংগীত পরিবেশন করে। মধ্যরাতে আঁতশবাজির মাধ্যমে সোয়শত বছর অনুষ্ঠানের পরিসমাপ্তি ঘটে।

নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের গ্র্যান্ড গালা নাইট ও সুনিধী চৌহানের সংগীতানুষ্ঠান

নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের সোয়শত বছর পূর্তী উপলক্ষে২৩ নভেম্বর, ২০১৮ তারিখ রাতে এ কে এম সামসুজ্জোহা ক্রীড়া কমপ্লেক্সে অনুষ্ঠিত হয় গ্র্যান্ড গালা নাইট। এ অনুষ্ঠানে প্রধান আকর্ষন ছিল এই উপ-মহাদেশের প্রখ্যাত সংগীত শিল্পী সুনিধী চৌহান। সুনিধী চৌহানের মঞ্চে আরোহন ও সংগীতানুষ্ঠানের ভঙ্গিমা ছিল মনে রাখার মত। সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে একের পর এক আলো আধারের মধ্যে সুনিধী চৌহান রাত ৯টায় মঞ্চে উঠে। শুরু করে একের পর এক সংগীত। দীর্ঘ পৌনে দুই ঘন্টা বিরতিহীন ভাবে সুনিধী চৌহান ৩০টির মত গান পরিবেশন করে ক্লাব সদস্যদের মাতিয়ে রাখে। সমসাময়িক কালে নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের অন্যান্য অনুষ্ঠানগুলির মধ্যে সুনিধী চৌহান সংগীত পরিবেশের ঢং সহ আলোর ব্যবহার ছিল মনে রাখার মত। সবকিছু মিলিয়ে সুনিধি চৌহান ক্লাব সদস্যদের তার সংগীতের মাধ্যমে মাতিয়ে রাখে যা নারায়ণগঞ্জক্লাবের সোয়াশত বছর পূর্তি অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষন ছিল।

সোয়শতবছরপূর্তি উপলক্ষেক্লাবসভাপতির বক্তব্য

নারায়ণগঞ্জক্লাবের সোয়াশতবছরপূর্তি উপলক্ষ্যে ক্লাবসভাপতিতানভীরআহমেদ ক্লাবেরসকলসদস্য ও তাদেরপরিবারবর্গকে শুভেচ্ছাজানিয়েবলেন‘পলিটিক্যালহান্টিংগ্রাউন্ড অব বেঙ্গল’ খ্যাত এই শিল্প-বন্দর নগরী নারায়ণগঞ্জের আভিজাত্য গৌরব আর ইতিহাসের অন্যতম প্রতীকে। নারায়ণগঞ্জ ক্লাব শুধু একটি এলিট শ্রেনীর চিত্ত বিনোদন বা অবকাশ যাপনের প্রতিষ্ঠানে থেমে নেই। আজ নারায়ণগঞ্জ ক্লাব পরিণত হয়েছে কালের স্বাক্ষী’তে। সেই ঐতিহ্যের ধারক-বাহক প্রতিষ্ঠানটির নির্বাচিতসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পেরে আমি সত্যিই গর্বিত। শুধু গর্বিতই নই, নারায়ণগঞ্জ ক্লাব লিমিটেড এর ১২৫তম বছরের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায়আমি অত্যন্ত সম্মানিত বোধ করি এবং আমার অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে ক্লাবের সকল সদস্যদের প্রতি জানাই আমার আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।

বাংলাকে আমি কখনও বিভক্ত মনে করিনি’-কুমার সানু

২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর এই উপ মহাদেশের গুরি শিল্পী কুমার সানু নারায়ণগঞ্জ আসেন। এদিন নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের গেষ্ট হাউজে দৈনিক ইত্তেফাককে দেয়া একান্ত সাক্ষাতকারে বলেন, দুই বাংলার মধ্যে অভিন্ন সেতুবন্ধন রয়েছে। এ যেন বিনে সুতার মালার মতো। নারায়ণগঞ্জ ক্লাবে থার্টিফার্স্ট নাইটে সঙ্গীত পরিবেশন করতে বাংলাদেশে আসেন উপমহাদেশের গুণী সঙ্গীতশিল্পী কুমার শানু। শুধু ভারতেই নয়, পুরো বিশ্বে ছড়িয়েছেন নিজের সুরের যাদু। এবার বাংলার মঞ্চও মাতিয়ে গেলেন তিনি। মঞ্চে টানা একঘণ্টা নিজের জনপ্রিয় গান গেয়ে নামেন তিনি। পরে পৌনে বারোটায় আবারও মঞ্চে ওঠেন এবং ইংরেজি নববর্ষকে বরণ করাসহ গানে গানে দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করেন। দর্শকদের বিভিন্ন অনুরোধের গানের পাশাপাশি নিজের পছন্দের গানও পরিবেশন করেন গুণী এই শিল্পী। মধ্যরাত পর্যন্ত মাতিয়ে রাখেন সবাইকে। এ যেন এলেন, গাইলেন এবং জয় করলেন। অনুষ্ঠানের পরে ইত্তেফাকের সাথে এক বিশেষ আড্ডায় বসেন কুমার শানু। আড্ডায় উঠে আসে বাংলাদেশ সফরসহ দুই বাংলার গানের বিভিন্ন দিক নিয়ে। এছাড়া নিজের সঙ্গীত জীবনের শুরুর দিকের কথাও বলেন তিনি। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন ইত্তেফাকের স্টাফ রিপোর্টার হাবিবুর রহমান বাদল

বাংলাদেশ সফর কেমন লাগছে?

বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের প্রতি আমার অপরিসীম ভালোবাসা সবসময় থাকে। বাংলাদেশে আমার যে এতো ভক্ত রয়েছে তা না এলে বুঝতাম না। আমার পৈতৃক নিবাস এই বাংলাদেশেই। তাই ডাক পেলেই ছুটে আসতে মন চায়। সবসময় হয়তো আসার সুযোগ হয় না। আমার বাবা ঢাকা রেডিওতে গাইতেন। সেখান থেকে বাংলাদেশের প্রতি একটা যোগসূত্র আমার আগে থেকেই। দুই বাংলার মধ্যে অভিন্ন সেতুবন্ধন রয়েছে। এ যেন বিনে সুতার মালার মতো। আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়ি নদীর তীরে এই বাংলায়। বাংলাদেশের মানুষ অনেক অতিথিপরায়ণ। আমি অনেক দেশে ঘুরেছি। যে ক’টি দেশ আমি উল্লেখ করতে পারি তার মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ। আর এদেশের খাবারের প্রশংসা তো করতেই হয়।

আমাদের দেশের গান প্রসঙ্গে বলুন

বাংলাদেশের গান অনেক আগে থেকেই সমৃদ্ধ। রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন, এছাড়া অনেক গুণী সঙ্গীতশিল্পীর জন্ম এই বাংলাদেশে। সেই জায়গার গানের অবস্থা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই আমার। এক সময় বাংলাদেশের গান অনেক শোনা হতো। এখন আসলে ব্যস্ততার কারণে গান শোনার জন্য আলাদা করে সময় বের করতে পারি না। তাই শুধু বাংলাদেশেরই না, আমাদের দেশের গানও আমার তেমন শোনা হয় না। এখন নতুনদের গান আর শোনা হয় না। এখানে এসে যতটুকু বুঝলাম, বাংলাদেশের মানুষ অনেক সঙ্গীতপ্রিয়। এখানে গানের পরিসর এখন অনেক বড়। দেশের বাইরেও বাংলাদেশের গান এখন সমৃদ্ধ ও প্রশংসিত।

এপার বাংলার গানের সাথে ওপার বাংলার পার্থক্য কেমন মনে করেন?

আমরা বাঙালি, এটাই আমার কাছে মূল বিষয়। বাংলাকে আমি কখনও বিভক্ত মনে করিনি। আর দুই বাংলার গানের মধ্যে কোনো পার্থক্য আছে বলে আমি মনে করি না। বাংলাদেশিরা যেমন নজরুলের পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথকে গ্রহণ করেছে ঠিক তেমনি আমরাও রবীন্দ্রনাথের পাশাপাশি নজরুলকে গ্রহণ করে নিয়েছি। দুই বাংলার গানের মধ্যে যারা পার্থক্য খোঁজে তারা মূলত সঙ্গীতপ্রেমী নয়। বাংলা ভাষা যেমন আমাদের সবার তেমনি বাংলা গান আমাদের সবার। পশ্চিমবঙ্গের শিল্পীদের গান যেমন এদেশে অনেক অনেক জনপ্রিয় তেমনি বাংলাদেশের অনেক শিল্পীও আমাদের দেশে অনেক জনপ্রিয়। আমাদের দেশের অনেক শিল্পীর চেয়ে রুনা লায়লা অনেক জনপ্রিয় পশ্চিম বাংলায়। শুধু তাই না, তার হিন্দি গানের ভক্তও অনেক। এই মেলবন্ধন কিন্তু আমাদের সব সময়েই দেখা যায়।

ভারত ও বাংলাদেশের শিল্পীদের মধ্যে একযোগ হওয়া বিষয়ে কী বলবেন?

দুই বাংলার গানের মধ্যে কিন্তু এক সময় খুব ভালো একযোগ ছিল। এখন হয়তো সেই জায়গা থেকে অনেকটা সরে গেছে। এখন সবার ব্যস্ততা বেড়েছে। তাই বড় পরিসরে কিছু করার ইচ্ছে থাকলেও সম্ভব হয় না। তবে ইদানিং চর্চাটা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশে আমাদের কৈলাশ খের গান গেয়েছে। কলকাতার চলচ্চিত্রেও বাংলাদেশের কয়েকজন গান গেয়েছে। এই চর্চাটা আবারও শুরু হয়েছে। আশা করি ভবিষ্যতে ভালো হবে। সময় সুযোগ পেলে বাংলাদেশের যেকোনো শিল্পীর সাথে অ্যালবাম বের করতে রাজি আছি। দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন যত সুদৃঢ় হবে ততোই উভয় দেশের সংস্কৃতি মজবুত হবে। দুই বাংলার মানুষের মধ্যেও আরও ঘনিষ্ঠ সর্ম্পক গড়ে তোলার আহ্বান জানাই। আর আমার বিষয়ে বলবো, এই বাংলার মাটি ও মানুষ যখনই ডাকবে আমি ছুটে আসবো তাদের কাছে।

এবার বাংলাদেশ সফর নিয়ে বলুন

এবার থার্টিফার্স্ট নাইটে নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের আমন্ত্রণে এসেছি। আমার সাথে ১৪ জনের যন্ত্রদল এসেছে। মঞ্চে ওঠার সাথে সাথে দর্শকরা চিত্কার করে আমার আগমনের যে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন তাতে তাদের ভালোবাসায় আমি সিক্ত। প্রথমবার থার্টিফার্স্ট নাইট বাংলাদেশে করলাম। নারায়ণগঞ্জ জায়গাটার নাম আমি আগেও শুনেছি।

আপনার সঙ্গীতজীবনের গল্প খানিকটা জানতে চাই

সঙ্গীত পরিবারেই আমার বেড়ে ওঠা। কিন্তু আমার এই পর্যন্ত আসার পথটা খুব সহজ ছিল না। ছোটবেলায় তবলা বাজাতাম। এক সময় গানের চর্চা করতে করতে মুম্বাই চলে যাই। সেখানে শুরু করি সঙ্গীত সাধনা। একসময় সুযোগ পেয়েও যাই। ‘জিনা তেরী গলিমে’ গানটি হিট হওয়ার পর জুলুম ছবিতে সঙ্গীত পরিবেশন করি আমি। এরপর ‘আশিকি’ ছবিতে গাওয়া সবগুলো গান সুপার হিট হওয়ার পর আমাকে আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। কিন্তু এই পথটা আমাকে জীবনের মানে বুঝিয়েছে। স্বপ্ন কি সেটা বুঝিয়েছে। কখনও হার মানতে শিখিনি। অনেক জায়গায় ঘুরেছি একটি সুযোগের জন্য। তখন তো এখনকার মতো মিউজিক করা এতো সহজ ছিল না। আর পরিসরটাও ছিল খুব ছোট। সেখান থেকে নিজেকে প্রমাণ করে আজকে আমি কুমার শানু হয়েছি। সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক। প্রকাশকাল ৪ জানুয়ারি ২০১৬।

নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের সোয়াশত বছর পূর্তির বছর ব্যাপী অনুষ্ঠানের জমকালো সমাপ্তি

নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের সোয়াশত বছরের সমাপনি দিবস ছিল গত ২৩ নভেম্বর। একেএম সামসুজ্জোহা ক্রীড়া কমপ্লেক্সে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বছর ব্যাপী অনুষ্ঠানের সমাপ্তি টানা হয়। সমাপনি অনুষ্ঠানে ১শত ২৫ বছর উদযাপন পরিষদের পক্ষ থেকে ক্লাবের প্রতিটি সদস্যকে উপহার সামগ্রী প্রদান করা হয়। ক্লাবের সিনিয়র সহ সভাপতি ডা. শফিউল আজম ফেরদৌস এর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানের শুরুতে সংগীত পরিবেশন করেন উপ মহাদেশের প্রখ্যাত সংগীত শিল্পী সুনিধী চৌহান সংগীত পরিবেশন করেন। পৌনে ২ ঘন্টা ব্যাপী সুনিধী চৌহান দর্শক শ্রোতাদের মাতিয়ে রাখেন। পরে ক্লাব সভাপতি তানভীর আহাম্মদ উদযাপন কমিটির সকলকে মঞ্চে আহবান করেন। একে একে মঞ্চে উঠেন সদস্যবৃন্দ। ক্লাব সভাপতি ও উদযাপন পরিষদের চেয়ারম্যান অনুষ্ঠানে সহযোগিতা করার জন্য কমিটির সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। পরে আতশবাজির মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।

About ডান্ডিবার্তা

View all posts by ডান্ডিবার্তা →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *