একাত্তরে সেলিম ওসমান ও আকরামের ভূমিকা

বিশেষ প্রতিবেদন
হাবিবুর রহমান বাদল
একাদশ জাতীয় নির্বাচন দাড় গোড়ায়। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জের সর্বত্র চলছে টান টান উত্তেজনা। আজ সকাল থেকে নির্বাচনী প্রচারনা বন্ধ হয়ে গেছে। আগামী কাল শনিবার রাত পোহালেই ভোট। নারায়ণগঞ্জের ৫টি আসনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ন আসন হিসাবে পরিচিত সদর-বন্দর আসন নিয়ে আলোচনা সমালোচনার শেষ নেই। এই আসনে মহাজোটের প্রার্থী বর্তমান সাংসদ একেএম সেলিম ওসমান। অপর দিকে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী আওয়ামীলীগের সাবেক সাংসদ এসএম আকরাম। নির্বাচনী প্রচার প্রচারনা শেষ হওয়ায় শেষ মূহুর্তে প্রার্থী ও তার অনুসারিরা যেমন ভোটের হিসেব নিকেষ কষছে তেমনই ভোটাররা বিভিন্ন আলোচনায় দুই প্রার্থীকে নিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করে চলছে। বাংলাদেশের রাজনীতি মূলত: দুই ধারায় বিভক্ত। একটি স্বাধীনতার পক্ষের অপরটি স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তি হিসাবে পরিচিত। যদিও ঐক্যফ্রন্ট একাধিক সভা সমাবেশে বলে আসছে তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ^াসী। কিন্তু ঐক্যফ্রন্টের সাথে স্বাধীনতা বিরোধী জামাত ঐক্যবদ্ধ ভাবে একই মার্কায় নির্রাচন করায় সাধারণ মানুষ তাদের সেই বক্তব্যকে ইতিমধ্যেই প্রত্যাখ্যান করেছে। একদিকে জামাত যেমন প্রকাশ্যে ধানের শীষ নিয়ে ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে ভোট যুদ্ধে নেমেছে তেমনই কোন কোন আসনে জামাতের কেউ কেউ জমিয়তে ইসলামের নামে নির্বাচনী ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছে। সদর-বন্দর আসনের দুই প্রার্থী নিয়ে সাধারণ ভোটাররা এখন হিসেব নিকেষ শেষ করে সিদ্ধান্ত নিয়ে বির্তক চালিয়ে যাচ্ছে। কে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আর কে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের নয় এনিয়ে চলছে বিভিন্ন আড্ডা খানায় তর্ক বিতর্ক। মহাজোটের প্রার্থী জাতীয়পার্টির মনোনীত সেলিম ওসমান লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেও প্রচারনার অনেক আগে থেকেই তিনি আওয়ামী পন্থি হিসাবে পরিচিত। ৭১’এ মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নিয়েছিল সেলিম ওসমান। তার বড়ভাই প্রয়াত নাসিম ওসমান শুধু মুক্তিযুদ্ধেই অংশ নেয়নি বরং বঙ্গবন্ধু স্বপরিবারে নিহত হলে এই বর্বরচিত হত্যাকান্ডের প্রতিশোধ নিয়ে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন। বর্তমান সাংসদ ও মহাজোট প্রার্থী সেলিম ওসমানের পুরো পরিবারই আওয়ামী পন্থি। তাদের দাদার বাড়ি বাইতুল আমানে আওয়ামীলীগ প্রতিষ্ঠার প্রথম সভা হয়। তাছাড়া তার বাবা ও দাদা ছিলেন আওয়ামীলীগর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে বুকে লালন করে সেলিম ওসমান যৌবনের শুরু থেকে অদ্যাবদি আওয়ামীলীগ তথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আস্থাভাজন হিসাবে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করেছেন। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের মধ্যে একমাত্র সেলিম ওসমানই ব্যক্তিগত অর্থায়নে বঙ্গবন্ধু, বঙ্গমাতা ও তাদের পরিবারের নামে একাধিক স্কুল ও স্কুল ভবন এবং অডিটরিয়াম নির্মাণ করে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। পাশাপাশি ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী এসএম আকরাম এক সময় আওয়ামীলীগের মনোনয়নে এ আসনে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন। শুধু তাই নয় এসএম আকরাম নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের আহবায়কের দায়িত্বও পালন করেন। হঠাৎ করে তিনি আওয়ামীলীগ থেকে পদত্যাগ করেন। সম্প্রতি তিনি নাগরিক ঐক্যের উপদেষ্টা হন। নাগরিক ঐক্যের মনোনয়নে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হিসাবে নৌকা ছেড়ে সেই এসএম আকরাম এখন ধানের শীষ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিকের এই ডিগবাগি কেন? তবে বর্তমান তরুণ প্রজন্ম এসএম আকরামের অতীত জীবন সম্পর্কে না জনলেও আওয়ামীলীগের মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মী ছাড়াও সাধারণ মানুষ যারা মহান মুক্তিযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেছে তাদের বক্তব্য হলো এসএম আকরামের বর্তমান অবস্থান মুটেই ডিগবাজি নয়। বরং ৯৬ সালে আওয়ামীলীগের মনোনয়ন পাওয়াটাই ছিল ডিগবাজি। কারণ ৭১’এর মুক্তিযুদ্ধে মহাজোটের প্রার্থী যখন পাশের দেশে ট্রেনিং নিয়ে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে নারায়ণগঞ্জের হাতেগুনা কিছু কুলাঙ্গার ছাড়া সবাই যখন নিজেদের সাধ্য অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য সহযোগিতাসহ পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে নিজস্ব কায়দায় যুদ্ধ করে চলছে তখন ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী এসএম আকরাম পাকবাহিনীর নিয়ন্ত্রনাধীন চট্টগ্রাম বন্দরে একটি দায়িত্বশীল পদে কর্মরত থেকে পাকিস্তানী সরকারের সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা ভোগ করেছেন। সুতরাং পাকিস্তানের অখ্যন্ডতা রক্ষার পক্ষেই এসএম আকরামের ভ’মিকা ছিল এই বক্তব্য নতুন প্রজন্ম না জনলেও বয়স্ক ভোটাররা ভাল করেই জানেন। তবে এসএম আকরাম ৭১’এ তার ভ’মিকা নিয়ে হয়তো স্পষ্ট বক্তব্য দিবেন না। এমনকি আমার এই বক্তব্যকে অসত্য কিংবা বিভ্রান্তিকর বলে তিনি কিংবা তার অনুসারিরা মন্তব্য করতে পারে। কিন্তু ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী এসএম আকরাম সাহেবের স্মৃতি শক্তি যদি আগের মত থাকে তবে তাকে অনুরোধ করব ৯৬ সালে আওয়ামীলীগের মনোনয়ন পাওয়ার পর তিনি নগর ভবনের সামনে বঙ্গবন্ধুর শাহাদৎ বার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় নিজেই ৭১’এ চট্টগ্রাম বন্দরে কাস্টমন্সে তার চাকুরি করার ঘটনা বলেছিলেন। সেই অনুষ্ঠানে সৌভাগ্য কিংবা দুর্ভগ্যক্রমে বিশেষ অতিথি হিসাবে এই প্রতিবেদক উপস্থিত ছিলেন। সুতরাং আগামীকাল রাত পোহালে ভোটযুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ ও বিপক্ষের শক্তির মধ্যে হবে এটা দিবালোকের মত স্পষ্ট। আর তাই বলছিলাম ২০১৮ সালের এই বিজয়ের মাসে ঐক্যফ্রন্টের মনোনিত প্রার্থী হিসাবে এসএম আকরাম নির্বাচন করছেন এটাকে যারা ভোল পাল্টানো বলে আমি তাদের সাথে একমত নই। কারণ ৭১’ সালে তার কর্মজীবন এবং অবস্থানই প্রমাণ করে ৯৬ সালে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করা ছিল তার ভোল পাল্টানো। সুতরাং রবিবার সাধারণ ভোটররা বিশেষ করে করুণ প্রজন্ম যারা ৭১’এর বিজয় দেখেনি তারা ভেবে চিন্তে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে দুই প্রার্থীর অবস্থান বিবেচনা করে এটাই আমার প্রত্যাশা।

About ডান্ডিবার্তা

View all posts by ডান্ডিবার্তা →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *