আজ: বুধবার | ৮ই জুলাই, ২০২০ ইং | ২৪শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | ১৭ই জিলক্বদ, ১৪৪১ হিজরী | সন্ধ্যা ৭:০৭

সংবাদের পাতায় স্বাগতম

আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠাতা ও ভাষা সৈনিক স্বাধীনতার পদকপ্রাপ্ত প্রিয় জোহা ভাই

ডান্ডিবার্তা | ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ | ১০:৩৯

অতিথি কলাম
এড. সামসুল ইসলাম ভ’ইয়া
বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা ও শেখ হাসিনা ডিজিটাল ও দুর্নীতিমুক্ত এবং সন্ত্রাস, মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নের আন্দোলনে জোহা ভাইয়ের মত নেতার আজ বেশী প্রয়োজন ছিল। আজ ২০শে ফেব্রুয়ারী সে নেতার ৩৩তম মৃত্যুবার্ষিকী। জোহা ভাইয়ের পূর্ণ নাম ছিল আবুল খায়ের মোহাম্মদ শামসুজ্জোহা বেশ বড় নাম। শুধু তার নাম বড় নয় তার আদর্শ, কাজ, আন্দোলন, সংগ্রাম ও কর্তব্য এবং নারায়ণগঞ্জবাসীর সেবা সহ ইত্যাদিতে বড় নামের স্বার্থক কাজ করেছেন তিনি। তবে নারায়ণগঞ্জবাসী সহ সকল দলের নেতাকর্মীরা তাকে ডাকতেন তাদের প্রিয় নাম “জোহা ভাই”। জোহা ভাই এর সাথে আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কটি ছিল নানা দিক থেকে। একদিকে তার সহকর্মী, রাজনৈতিক কর্মী, সাংবাদিক হিসাবে ও অন্যদিকে পারিবারিক সম্পর্ক হিসাবে তার সান্নিধ্য বা নৈকট্য লাভ করার পরম সুভাগ্য আমার হয়েছিল। জোহা ভাইয়ের ব্যাপারে লেখার বা বলার ইতিহাস আছে অনেক। যা এ ক্ষুদ্র পরিসরে বলা বা লিখে শেষ করা কঠিন। জোহা ভাই রাজনীতির শুধু রাজনীতি করেননি, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও খেলাধূলার জগতেও তার ব্যক্তিত্ব ও ব্যাপকতা তার ঐ নামটির চেয়ে ছিল ঢেড় বেশি প্রসারিত। বলা চলে জোহা দা’র ছিল এক বর্ণাঢ্য ও বৈচিত্র্যময় জীবন। এ বৈচিত্র্যময় জীবনে কখনো এসেছে আনন্দ উল্লাস আবার কখনো দুঃখ বেদনায় প্লাবিত হয়েছে। তার জনজীবনে এসেছে সুখ শান্তি তখন যেন তাকে উচ্ছাসিত দেখা যায়নি। আবার দুঃখের বেদনায় যখন মন ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েছে তখনও ভেঙ্গে না পড়ে দৃঢ়তার সাথে সকল দূর্ভোগকে সাহসের সঙ্গে মোকাবেলা করেন তিনি। এমনটাই ছিল নারায়ণগঞ্জবাসীর প্রিয় জোহা ভাই। তার কাজে কর্মে যে দৃঢ়তা ছিল তা ছিল ইস্পাতের মতো। তার ছিল প্রচন্ড সাংগঠনিক ক্ষমতা। সোনার চামুচ মুখে দিয়ে জোহা দা জন্মগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তিনি সেখান থেকে একজন সাধারন মানুষ হিসাবে তার কাজকর্মে ও ব্যবহারে সকল মহলের প্রিয় হয়েছেন। তার মূলবাড়ি ছিল কুমিল্লার দাউদকান্দিতে। তার বাবা খান সাহেব ওসমান আলী ভাগ্যের সন্ধানে নারায়ণগঞ্জে আসেন। তখন নারায়ণগঞ্জ ছিল পাট ব্যবসার শহর। ইংরেজ সাহেবরা এ নারায়ণগঞ্জকে প্রাচ্যের ডা-ি বলে খ্যাত করেছিলেন। এখানের তার পিতা পাটের ব্যবসায় জড়িত হয়েও রাজনৈতিক ভাবে খান সাহেব উপাধি পেয়ে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। জোহা ভাইয়ের জন্ম হয়েছিল সোনারগাঁওয়ের শম্ভুপুরা ইউনিয়নের নবীনগরে তার মামার বাড়িতে। ১৯৪২ সালে ছাত্র অবস্থায় এই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। সেই সময়ে নারায়ণগঞ্জে ছাত্র মুসলিম লীগের সেক্রেটারী দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৫ সালে মুসলিম লীগের কর্মী হিসাবে পরিচিত হয়ে ১৯৪৬ সালে জাতীয় নির্বাচনে তৎকালীন মুসলিম লীগের কর্মী হিসাবে উক্ত নির্বাচনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। দেশ বিভাগের পর ১৯৫১ সালে তিনি এক স্বনামধন্য ও খ্যাতনামা রাজনৈতিক পরিবারের মেয়ের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তার স্ত্রী মিসেস নাগিনা জোহা। তার স্ত্রী ছিলেন একজন কবি এবং অবিভক্ত বাংলার মুসলিম লীগের নেতা হাসিম সাহেবের চাচাতো বোন। তার স্ত্রী ইতিমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন, তার জন্য দোয়া প্রার্থী। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল। ঢাকায় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সে দিন এই নারায়ণগঞ্জের সিংহ পুরুষ শ্রদ্ধেয় জোহা ভাই সহ অন্যান্যরা নারায়ণগঞ্জ থেকে আন্দোলন তীব্র আন্দোলনে পরিণত করে ঢাকার আন্দোলনকে বেগবান করেছিলেন। সেই সময়ে নারায়ণগঞ্জ মহকুমার ভাষা সংগ্রাম কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব তিনি পালন করেন। নারায়ণগঞ্জের আন্দোলনের অন্যতম সুফল আজকের মাতৃভাষা। সে মাতৃভাষার আন্দোলন থেকেই ইতিহাসের পালাক্রমে ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের জয়, ১৯৫৬ সালে সাম্প্রতিক দাঙ্গা দমন, ১৯৫৮ সালের আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন, ১৯৬২ সালে কুখ্যাত হামিদুর রহমানের শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বাতিলের আন্দোলনে, ১৯৬৬ সালে ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলনের ৭ই জুনের রক্ত ¯্রােত আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের রাজনৈতিক দলের সহ ছাত্র সমাজের ঐতিহাসিক ১১ দফার আন্দোলন ও ১৯৭০ সালে জাতীয় নির্বাচন ইত্যাদি আন্দোলন ও সংগ্রামে জোহা ভাইয়ের নেতৃত্বে এগিয়ে গিয়েছিল। এ সকল আন্দোলনে জোহা ভাই এর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল ইতিহাসের বিরল ঘটনা। তিনি এক দিকে ভাষা সৈনিক, স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, স্বাধীনতার পদকপ্রাপ্ত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর, বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সাবেক গণ পরিষদ ও সংসদ সদস্য হিসেবে নারায়ণগঞ্জের গণমানুষের প্রিয় নেতা তিনি। ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের পূর্বাঞ্চলে ত্রিপুরা রাজ্যে মহান মুক্তিযোদ্ধাদের সংঘঠিত করে তাদের থাকা খাওয়া ও ট্রেনিং সহ যাবতীয় কাজের সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তিনি পূর্বাঞ্চলের যুদ্ধ পরিচালনা কমিটির অন্যতম সংগঠক ও রিলিফ পরিচালনা কমিটির সদস্য ছিলেন। সে সময়ে প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করেছেন। তাছাড়া তিনি তার ব্যক্তিগত তহবিল হইতে অসহায় মুক্তিযোদ্ধা ও শরনার্থীদের সাহায্য করেছেন। ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা বিজয়ের সংবাদ সর্বপ্রথম ঢাকার স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে জাতির উদ্দেশ্যে বেতার ভাষণের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীণ ও শত্রুমুক্ত ঘোষনাটি তিনি প্রথম মজিবনগর সরকারের পক্ষে ভাষণের মাধ্যমে বাঙালিকে অবগত করেছিলেন। উল্লেখ্য যে, সে সময়ে স্বাধীন বাংলার কোন জনপ্রতিনিধি এম এন এ বা এম পি বা স্বাধীন বাংলার কোন সরকারি কর্মকর্তা ঢাকায় প্রবেশ করেন নি। জোহা ভাই ই প্রথম মৃত্যুর ভয়কে উপেক্ষা করে ঢাকায় প্রথম প্রবেশ করেন এবং স্বাধীন বাংলা সরকারের পক্ষে স্বাধীন বাংলার পতাকা ঢাকা বেতার কেন্দ্র হাইকোর্ট সহ বিভিন্ন সরকারি অফিসে আনুষ্ঠানিক ভাবে উত্তোলন করে ইতিহাসে প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছেন। এ সময়ে ঢাকার রাস্তাঘাটে অলি গলিতে ও পাড়ায় মহল্লায় ব্যাপক গোলাগুলি চলছিল। সে সময়ে শত্রু মিত্র চেনা কঠিন ছিল। কে কাকে গুলি করেছে তাহা হিসাব করা কঠিন ছিল। সে সময়ে জোহা ভাই অসীম সাহস করে ধানমন্ডিতে পাক বাহিনীর হাতে আটক আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সহ বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যদের উদ্ধার করার জন্য ছুটে যান। তার সাথে ছিলেন ভারতের সেনা বাহিনীর কর্ণেল তারা সিং। যাওয়ার পথে শংকর নামক স্থানে পৌছা মাত্র পাক বাহিনী জোহা ভাইকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে। উক্ত গুলি জোহা ভাই এর ডান হাতের বাহুতে লেগে মারাত্মক জখম হন। অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান জোহা ভাই। স্বাধীনতার পর বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে পুনঃগঠনের জন্য বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে জোহা ভাই অমানুষিক পরিশ্রম করেন। যার ফলে সে সময়ে গোদনাইল আদমজী ফতুল্লা শিল্প এলাকা সহ বন্ধ হওয়া কলকারখানা চালু করে বেকার সমস্যা সমাধান সহ দেশের অর্থনৈতিক সাবলম্বী হওয়ার এই বিধ্বস্ত বাংলার পূর্ণগঠনের সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধু অনেক সময়ে জটিল কঠিন সময়ে অনেক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত জোহা ভাইয়ের সাথে পরামর্শ নিতেন। ১৯৭৫ সালের বঙ্গবন্ধু সপরিবারে শহীদ হওয়ার পর তৎকালীন মোস্তাক সরকার ভেবেছিলেন জোহা ভাইয়ের মত বঙ্গবন্ধুর প্রেমিক ও স্বাধীনতা সংগ্রামী নেতা বাহিরে থাকলে তাদের কুশাসন চালানো কঠিন হবে। তাই সেদিন খুনি মোস্তাক জাতীয় ৪ নেতাসহ জোহা ভাইকে কেন্দ্রী কারাগারে আটক করেন। জোহা বাই ও ক্যাপ্টেন এম মুনসুর আলী একই সাথে একই কক্ষে কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক ছিলেন। তার সম্মুখেই ১৯৭৫ সালে ৩রা নভেম্বর জাতীয় ৪ নেতাকে জেলখানার অভ্যন্তরে হত্যা করা হয়। আল্লার অশেষ রহমতের তিনি প্রাণে বেঁচে যান। জোহা ভাই ছিলেন ইতিহাসের মহানায়ক, বিভিন্ন সংগ্রামের ধারক ও বাহক ছিলেন তিনি। তার তিন পুত্রের মধ্যে বড় পুত্র মরহুম একেএম নাসিম ওসমান নারায়ণগঞ্জে ৫ আসনের সফল সংসদ সদস্য ছিলেন। মেঝ ছেলে সেলিম ওসমান নারায়ণগঞ্জ চেম্বার এন্ড কর্মাস ও বিকেএমইএ এর সভাপতি ও একজন সফল ব্যবসায়ী এবং বর্তমানে দ্বিতীয় বারের মত নারায়ণগঞ্জ ৫ আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তার ছোট ছেলে এ.কে.এম শামীম ওসমান এই প্রজন্মের অহংকার হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন এবং নারায়ণগঞ্জের ৪ আসনের উন্নয়নের রূপকার হিসেবে বর্তমান সংসদ সদস্য। তার দুই কন্যা নিগার সুলতানা ও নার্গিস বেগম বর্তমানে দেশের বাইরে স্বামীসহ বসবাস করছেন। আজ জোহা ভাই নাই। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ডিজিটাল ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ ও তার কর্তৃক ঘোষিত ভিশন ২০২১ বাস্তবায়নে জোহা ভাইদের মত পরীক্ষিত ত্যাগী নেতার প্রয়োজন ছিল সবচেয়ে বেশি। তবে আমরা যারা বেঁচে আছি জোহা ভাই এর আদর্শে কর্মী আমাদের সান্তনা এটুকু বিলম্বে হলেও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার জোহা ভাইকে তার মৃত্যুর পরেও স্বীকৃতি হিসাবে “স্বাধীনতা পদক” এ ভূষিত করেছেন। জোহা ভাই এর উত্তরসূরী হিসাবে, নারায়ণগঞ্জবাসী তথা সকল মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ থেকে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। একজন সৎ, আদর্শবান, ন্যায় নীতিবান সংগ্রামী নেতাকে এ পদক দিয়ে ভূষিত করেছেন। আজ জোহা ভাই নাই। কিন্তু রেখে গেছেন সৎ রাজনীতি, মানুষ সেবার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ ও জনগণের সেবায় উৎকৃষ্ঠ কীর্তি। এ সকল বাস্তবায়নে তার আত্মা শান্তি পাবে। আসুন আমরা তার আদর্শ পালন করে তাকে চিরকৃতজ্ঞ চিত্তে মর্যাদায় রাখি। এ হউক আমাদের প্রত্যাশা। তাহার আত্মার শান্তি হউক এই কামনা করি।
লেখক ঃ ফিন্যান্স সাংবাদিক ও আহ্বায়ক
সোনারগাঁ উপজেলা আওয়ামীলীগ
নারায়ণগঞ্জ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *