আজ: মঙ্গলবার | ২রা জুন, ২০২০ ইং | ১৯শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | ১০ই শাওয়াল, ১৪৪১ হিজরী | দুপুর ২:৫৮

সংবাদের পাতায় স্বাগতম

এতিমের জমি উদ্ধার করলেন এসপি হারুন

ডান্ডিবার্তা | ২২ আগস্ট, ২০১৯ | ১০:২৭

ডান্ডিবার্তা রিপোর্ট
দীর্ঘ ৮ বছর বেদখ থাকা এতিমের ৯ বিঘা সম্পত্তি ও পরিত্যক্ত ডাইং কারখানা দখলদারদের কবল থেকে উদ্ধার করে দিলেন নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ। গতকাল পুলিশ সুপারের নির্দেশে ডিবি পুলিশ সরে জমিনে গিয়ে দখলদারদের কবল থেকে জমি ও কারখানা দখল মুক্ত করে এতিম সামিনাকে বুঝিয়ে দেন। রেইনবো ডাইং সম্পূর্ণ চালু অবস্থায় বেদখল হয়ে যায়। ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় মিলটি দখল করে নেন জসিম ও হাসেম নামে দুই ব্যক্তি আর তাদের মূল্য শেল্টার দাতা ছিলেন শাহাদাৎ হোসেন ভূইয়া সাজনু, এমন অভিযোগ ভূমি মালিক সামিয়া সালামের। ২০১১ সালে দখল হয়ে যাওয়া এই ফ্যাক্টরির মূল জমির পরিমাণ ছিলো ৯ বিঘা। গত আট বছর ধরে নানা ভাবেই সামিনা ও তার ভাই শওকত সালাম চেষ্টা করছিলেন দখলদারদের কাছ থেকে তাদের পৈত্রিক সম্পত্তি উদ্ধার করতে। কিন্তু দখলদাররা ক্ষমতাসীন দলের লোক হওয়ার কারণে সেটি তারা কোনো ভাবেই উদ্ধার করতে পারছিলেন। শেষতক কোনো উপায়ন্ত না পেয়ে সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন জমির প্রকৃত ওয়ারিশ শওকাত সালাম ও তার বোন সামিনা সালাম। এসপি তাদের কাছ থেকে বৈধ কাগজপত্র এবং এই জমির প্রকৃত ওয়ারিশ তারা, সে পক্ষে প্রমাণপত্র চান। সে মোতাবেক যাবতীয় দলিল, প্রমাণপত্র এবং দখল করে নেওয়ার দালিলিক প্রমাণ উপস্থাপন করেন তারা। এর প্রেক্ষিতে গতকাল বুধবার রেইবো ডাইং অ্যান্ড ফিনিশিং ফ্যাক্টরীটি পুরো জমিসহ দখলমুক্ত করে দেন পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ। সূত্র মতে, ৩৪ নং উত্তর চাষাড়ার বাসিন্দা এম এ সালাম সদর উপজেলার কাঠপট্টি গুদারাঘাট এলাকায় প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন রেইনবো ডাইং অ্যান্ড ফিনিশিং লিমেটেড। মিলটি চালু অবস্থায় তিনি ২০০৪ সালে মারা যান। পরবর্তীতে ব্যাঙ্ক ঋনের কারণে মিলটি চালু রাখা সম্ভব হচ্ছিলো না এমএ সালামের পুত্র শওকত সালাম এবং সামিয়া সালামের পক্ষে। ফলে ব্যাংক লোনও পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছিলেন তারা। এমন পরিস্থিতিতে ফ্যাক্টরীটি বিক্রির উদ্যোগ নেন শওকত ও সামিনা। সামিনা জানান, ২০১১ সালে জনৈক জসিম নামে এক ব্যক্তির সাথে বায়নাপত্রে চুক্তি করেন তারা। কথা ছিলো তারা ব্যাঙ্কের লোন পরিশোধ করে জমির বাকী টাকা তাদেরকে বুঝিয়ে দিবে। কিন্তু সে আর তারা করছিলেন না। উল্টো মিলটির সিকিউরিটি গার্ড থেকে শুরু করে অন্যান্য কর্মকর্তা কর্মচারিদের মারধর করে তাড়িয়ে দিয়ে পুরো মিলটিই দখলে নিয়ে নেন। সামিনার দাবি, তারা যখন দখলবাজদের কাছ থেকে মিলটি ছাড়ানোর জন্য চেষ্টা করছিলেন তখন জসিমের পক্ষে এসে দাঁড়ান মহানগর যুবলীগের সভাপতি শাহাদাৎ হোসেন সাজনু। মূলত তিনিই গত আট বছর ধরে নানা ধরণের টালবাহানা করছিলেন। এরমধ্যে মিলের যন্ত্রপাতি বিক্রি করে তারা ২ কোটি টাকাও আত্মসাৎ করেন। জসিমের সাথে আরও রয়েছেন হাশেম নামে এক ব্যক্তি। তিনি এই ফ্যাক্টরীটিতেই কাজ কররেতন। তিনি বলেন, আমাদের সম্পত্তিতে আমরা কেউ যেতে পারছিলাম না। যতবারই আমরা আমাদের সম্পত্তি ফিরে পেতে চাইলাম ততবারই আমাদেরকে নানা ভাবে থামিয়ে দিলেন সাজনু। তিনি আমাদের ধৈর্য ধরতে বলেন। এমন আরও নানা কথা বলে আট বছর তিনি কালক্ষেপন করেন। এরমধ্যে জসিম নামে ওই ব্যক্তিকে দিয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে আমাদের আরও কিছু জমি নিজেদের নামে লিখিয়ে নেন হাশেম। সামিনা বলেন, জালিয়াতি করে জমি লিখিয়ে নেওয়ার ঘটনায় আদালতে মামলা দায়ের করি। মামলায় জসিমের নামে ওয়ারেন্টও ইস্যু হয়। তিনি বলেন, তাদের কাছ থেকে যখন জমিটি উদ্ধার করতে পারছিলাম না তখন পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিই। তিনি কাগজপত্র সব দেখে ডিবি পুলিশের ইন্সপেক্টর এনামুলকে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিলে বুধবার তারা দখলবাজদের কাছ থেকে আমাদের সম্পত্তি উদ্ধার করে আমাদেরকে বুঝিয়ে দেন। সামানি আরও যুক্ত করেন, জসিম বিভিন্ন জায়গায় ছড়াচ্ছেন তিনি আমাদেরকে দুই কোটি টাকা দিয়েছেন এবং ব্যাঙ্কেও দুই কোটি টাকা দিয়েছেন। কিন্তু তিনি ব্যাঙ্কে কোনো টাকা দেননি। দিয়ে থাকলে সে প্রমাণপত্র তিনি দেখাক। তাছাড়া আমাদেরকে সে দুই কোটি টাকা দেয়নি। প্রথমে ২০ লাখ টাকা দিয়েছেন। পরে ৫ বছরে আরও ৮০ লাখ টাকা দিয়েছে। আমরা এই টাকাটাও তাকে ফেরৎ দিতে প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু তিনি কোনো কিছুই করতে রাজি ছিলেন না। শুধু শুধু কালক্ষেপন করছিলেন সাজনুর মাধ্যমে। সাজনুই ছিলেন এর নেপথ্যে। এদিকে এ প্রসঙ্গে জানতে মহানগর যুবলীগের সভাপতি শাহাদাৎ হোসেন সাজনুর মুঠোফোনে বলেন, “এ ঘটনার সাথে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এটি পুরোপুরি ভিত্তিহীন অভিযোগ।” জসিম সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “জসিম আমার ফ্রেন্ড। সে দুই কোটি টাকা দিয়ে পাওয়ার নিয়েছেন। এরপরই সামিনাদের চাচা মামলা করাতে সে ওখানে যেতে পারেনি।” সামিনাদের দাবি তাদের একটি জমি জালিয়াতি করে লিখে নিয়েছেন জসিম। এ নিয়ে আদালতে মামলা হলে জসিমের নামে ওয়ারেন্টও ইস্যু হয়। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে এই প্রতিবেদকের উপর কিছুটা ক্ষুব্ধ হয়ে সাজনু বলেন, “আমার মনে হচ্ছে আপনি জসিমের সাথে কথা বলছেন!” এরপরই তিনি বলতে থাকেন, জসিমের নামে কোনো ওয়ারেন্ট ইস্যু হয়নি। হয়ে থাকলে জামিনে আছে। আর জমি বেদখল ছিলো সেটি কীভাবে বলেন। আগে গোড়ায় যান। জসিমের সাথে কথা বলেছেন? না জেনে কীভাবে বলেন জমি দখল ছিলো? জসিমের সাথে কথা বলেন। সে ২ কোটি টাকা দিয়ে রেজিস্ট্রি পাওয়ার নিয়েছিলো।” এদিকে পুলিশ সুপারের বরাত দিয়ে জেলা পুলিশের মিডিয়া উইং ডিআইও-টু সাজ্জাদ রোমন বলেন, “যে যত বড় ভাইয়ের লোক হোকে অপরাধ করলে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।” এ প্রসঙ্গে জসিম উদ্দিন বলেন, “পুলিশ সম্পূর্ণ অবৈধ ভাবে আমার বৈধ দখলকৃত জমিতে প্রবেশ করে আমার লোকজনদের মারধর করে বের করে দিয়েছেন। আমি এ ব্যাপারে লিগ্যাল অ্যাকশনে যাবো। উকিলের সাথে কথা বলে বাকী ব্যবস্থা নেব।” জসিম দাবি করেন, “২০১০ সালে আমি দুই কোটি টাকা দিয়ে তাদের সাথে বায়না করেছি। পরে তারা আমাকে পাওয়ারনামা দিয়েছেন। ব্যাঙ্কেও দুই কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখন জমির দাম বেড়ে যাওয়াতে তাদের লোভ হয়েছে। ফলে তারা এটি আবারও দখল নিতে চাচ্ছে।” মামলার ওয়ারেন্ট ইস্যু সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “একটি মামলা তারা কেরছিলেন। সে মামলায় ওয়ারেন্ট হয়েছিলো। আমি সে মামলায় জামিন পেয়েছি। তাছাড়া তারা ২০১৮ সালে একবার পুলিশের মাধ্যমে জমি দখল নিয়েছিলো। পরে কোর্ট আমাদের পক্ষে রায় দিয়েছেন। এ ব্যাপারে সমস্ত প্রমাণ আমার কাছে আছে।” এ ব্যপারে ডিবি ইনস্পেক্টর এনাম জানান, অভিযোগের প্রেক্ষিতে সরে জমিনে গিয়ে ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়। পরে কারখানা থেকে বের করে দেওয়া সিকিউরিটি গার্ডদের পূর্নবহাল করা হয়। এছাড়া অভিযুক্ত জসিম, হাসেম ও সাজনুর বিরুদ্ধে আরো অভিযোগ রয়েছে যা মামলা প্রক্রীয়াধীন। এ ব্যপারে পুলিশ সুপারের মিডিয়া উইং সাজ্জাদ রোমান জানান, পুলিশ সুপারের নির্দেশে ডিবি পুলিশ ঘটনাস্থালে গিয়ে অভিযোগের সত্যতা পান এবং জবর দখলীয় জমি ও কারখানা উদ্ধার করে প্রকৃত মালিকদের বুঝিয়ে দেন। তিনি আরো বলেন, আইনের উর্ধ্বে কেউ নয়। অপরাধী যেই হক তাকে ছাড় দেয়া হবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *