Home » শেষের পাতা » মেয়াদি সুদের ফাঁদে জিম্মি হত-দরিদ্র জনগোষ্ঠী

ওরা আমার পরিচয় কেড়ে নিতে চায়

০৯ এপ্রিল, ২০২২ | ১০:২২ পূর্বাহ্ণ | ডান্ডিবার্তা | 60 Views

কামাল উদ্দিন সুমন

‘গণমাধ্যম কর্মী (চাকরির শর্তাবলি) বিল, ২০২২’ শিরোনামে গেলো ২৮ মার্চ সোমবার রাতে জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হলো। এ আইনে সাংবাদিক পরিচয় মুছে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। একজন পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে আমি এর বিরোধীতা করা ছাড়া কোন উপায় খুঁজে পাইনি। যে আইন আমার পরিচয় মুছে ফেলতে চায় সে আইন সংশোধন ছাড়া পাশ হউক এটা আমি চাই না। সংঙ্গত কারনে আমি এই আইনের বিরোধিতা করছি এবং পাশাপাশি দেশের সকল পেশাদার সাংবাদিদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানিয়ে বলছি, সরকার এমন একটা আইন করতে যাচ্ছে যে আইনে সাংবাদিক আর একজন গার্মেন্টস শ্রমিকদের পরিচয়ের মধ্যে কোন তফাৎ থাকলো না। আইনে বিলুপ্ত করা হচ্ছে ‘সাংবাদিক’ পরিচয়। গনমাধ্যমকর্মীর নামে চালিয়ে দেয়া পরিচয় বহন করতে হবে পেশাদার সাংবাদিকদের। নিজেকের আইন অনুযায়ী ‘সাংবাদিক’পরিচয় দিতে পারবেন না যদি আইনটি পাশ হয়ে যায়। আইনটিতে সম্পাদকের ভূমিকা বিলুপ্ত করে দেওয়া হয়েছে। সাংবাদিকদের পরিচয় বিলুপ্ত করা হয়েছে। আমি সাংবাদিকতা করি, আমার পরিচয় থাকতে হবে। খসড়া আইনটিতে কোথাও সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় নেই। সাংবাদিকদের মানসম্মান খর্ব করা ও লাঞ্ছিত করার চেষ্টা হচ্ছে। ধারাবাহিকভাবে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, আইসিটি অ্যাক্ট, গণমাধ্যম সুরক্ষা আইন করা হচ্ছে। সাংবাদিকদের নিয়ন্ত্রণ ও বশীভূতকরণের এসব আইন সাংবাদিকেরা মেনে নিতে পারে না। এ ধরনের আইনের অধীনে সাংবাদিকেরা চলতে পারে না। আইনটিতে সাংবাদিক পরিচয় মুছে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে, আমাদের যে শেষ পরিচয় ছিল ‘সাংবাদিক’, সেটাও মুছে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে। আমাদের গণমাধ্যমকর্মী বানিয়ে দিয়েছে। একজন গার্মেন্টস শ্রমিক যেমন পরিচয় দেয় আইনটি পাশ হলে আপনাকে(সাংবাদিক) পরিচয় দিতে হবে গণমাধ্যম কর্মী। ইতোমধ্যে প্রস্তাবিত ‘গণমাধ্যমকর্মী (চাকরির শর্তাবলি) বিল-২০২২’ কড়া সমালোচনার মুখে পড়েছে। গত ২৮ মার্চ জাতীয় সংসদে খসড়া উত্থাপিত হওয়ার পর থেকে পেশাদার সাংবাদিক, সম্পাদকরা এর বিরোধিতা করছেন। ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগের নানা মাধ্যম থেকে শুরু করে টিভি চ্যানেলের টকশো, পত্রিকার উপসম্পাদকীয়তে তাঁরা সমালোচনামুখর। খসড়ার বিভিন্ন ধারার চুলচেরা বিশ্লেষণ করে তাঁরা বলছেন, পাস হলে তা হয়ে উঠতে পারে সাংবাদিক সমাজ ও গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের আরেক ‘কালাকানুন’। সাংবাদিকদের পক্ষে সোচ্চার ‘ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ’ও (টিআইবি)। প্রস্তাবিত আইনে সাংবাদিকদের চাকরির সুরক্ষা, সংশ্লিষ্ট সুবিধা ও অধিকার নিশ্চিত করা হয়নি বলে মন্তব্য টিআইবির। বিলটি সংশোধনের জন্য এককভাবে মালিকপক্ষের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে, গণমাধ্যম কর্মী ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সক্রিয় অংশ নেওয়া নিশ্চিতের দাবি জানায় সংস্থাটি। সাংবাদিকরা বলছেন, আইনটি কার্যকর হলে সম্পাদকসহ সাংবাদিকদের মর্যাদা কমবে। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে সরকারের নিয়ন্ত্রণ, কর্তৃত্ব বাড়তে পারে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খড়গের সঙ্গে নতুন আইন মিলে সাংবাদিকদের স্বাধীনতায় আরেক বাধা, জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে। তাঁদের মতে, প্রস্তাবিত খসড়া সংশোধন ও বিতর্কিত ধারাগুলো বাদ দেওয়া ছাড়া আইনটি প্রণয়ন হলে সাংবাদিকদের আর্থিক সুযোগ-সুবিধা আরো কমবে। আইনটি প্রণয়ন হলে চাকরির নিশ্চয়তা, নিরাপত্তা ঠুনকো বিষয়ে পরিণত হতে পারে। সাংবাদিকদের আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা ক্ষুন্ন হবে। তারা তখন ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার হারাবেন। শ্রম আইনের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন। ‘প্রস্তাবিত আইনটির ৫৪টি ধারার মধ্যে ৩৭টি ধারাই সাংবাদিকবান্ধব নয়। আইনটি মালিকদের সুবিধার জন্য করা হয়েছে। আইনটি পাস হলে সাংবাদিকরা রুটি-রুজি, অধিকার আদায়ের জন্য ট্রেড ইউনিয়ন করতে পারবেন না। তারা শ্রম আইনের সুবিধা পাবেন না।’ ‘আগে গ্র্যাচুইটির বিধান ছিল প্রতিবছর দুইটি, এখন একটি করা হয়েছে। আগে বিনোদন ছুটি তিনবছরে ৩০ দিন ছিল। তা কেটে ১৫ দিন করা হয়েছে। কোনো সাংবাদিক যদি অন্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সহকর্মীর বিপদে ছুটে যেতে চান, তাকে ছুটি নিয়ে যেতে হবে। তা না হলে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। খসড়ায় ঢাকার বাইরের সাংবাদিকদের জন্য কিছু বলা হয়নি। যা অসম্পূর্ণ ও ত্রুটিপূর্ণ আইন।’ খসড়ায় গণমাধ্যমকর্মী ও মালিকপক্ষের মধ্যে বিরোধ নিরসনে কিছু সুবিধার কথা বলা হলেও তা মূলত মালিকদের স্বার্থ বেশি রক্ষা করবে। যা হয়ে উঠতে পারে মালিকদের কর্তৃত্ব, স্বার্থরক্ষার আইন। তবে মালিকদের কেউ কেউ প্রস্তাবিত খসড়ার অসঙ্গতি দূর করতে হবে। খসড়ায় আইনে কী আছে, তা এতোদিন সাংবাদিক সমাজ জানতে পারেনি। সাংবাদিকতায় দেশের নেতৃত্বস্থানীয় অবস্থানে যাঁরা আছেন, তাঁদেরকেও খসড়া দেওয়া হয়নি। খসড়া চূড়ান্তের সময় দেশের কোনো সম্পাদক, সাংবাদিক নেতার সঙ্গে আলোচনা করা হয়নি। সাংবাদিক সমাজের অভিযোগ, নতুন করে আইন প্রণয়ন হলে সাধারণত বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধার চেয়ে আরো বাড়ানো হয়ে থাকে। প্রস্তাবিত খসড়ায় সাংবাদিকদের সুযোগ-সুবিধা বর্তমানের তুলনায় কমানোর কথা উল্লেখ আছে। এতে তাঁরা ‘বিস্মিত’। কোনো সাংবাদিককে চাকরিচ্যুত করতে হলে এখন চারমাসের অগ্রিম বেতন দেওয়ার নিয়ম আছে। খসড়ায় তা কমিয়ে একমাসের বেতনের জন্য প্রস্তাব করা হয়। এতে চাকরির ‘নিশ্চয়তায়’ আরো আঘাত আসবে। খসড়ায় সাংবাদিকদের জন্য দৈনিক ৮ ঘণ্টা হিসাবে সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টা কাজের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। উন্নত বিশ্বজুড়ে সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টা কাজের রেওয়াজ আছে। দেশের সরকারি কর্মচারিরা সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টা কাজ করেন। আইনটিতে ইউনিয়ন করার অধিকারও হনন করা হয়েছে। সাংবাদিকবিরোধী আইনের মাধ্যমে সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিলের ২(৪) ধারায় সংজ্ঞায় বলা হয়েছে- ‘গণমাধ্যম কর্মী অর্থ গণমাধ্যমে পূর্ণকালীন কর্মরত সাংবাদিক, কর্মচারী এবং নিবন্ধিত সংবাদপত্রের মালিকানাধীন ছাপাখানাসহ নিবন্ধিত অনলাইন গণমাধ্যমে বিভিন্নকর্মে নিয়োজিত কর্মী’। বিলের খসড়ায় কর্মরত সাংবাদিকের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা ছিল–‘সম্পাদক, প্রধান সম্পাদক, বার্তা প্রধান, নির্বাহী সম্পাদক, সহকারী সম্পাদক, বার্তা প্রযোজক, স্টাফ রাইটার, বার্তা সম্পাদক, সাব এডিটর, নিউজরুম এডিটর, সংবাদ প্রযোজক, ফিচার লেখক, রিপোর্টার, রিপোর্টার, সংবাদদাতা, ডেস্ক ইন চার্জ, কপি হোল্ডার, কপি টেস্টার, সম্পাদনা সহকারী, কার্টুনিস্ট, আলোকচিত্রী, ক্যামেরাম্যান ইত্যাদি’। প্রস্তাবিত বিলে অবশ্য কর্মরত সাংবাদিকের কোনো সংজ্ঞা উল্লিখিত হয়নি। সংজ্ঞা না লিখলেও এ বিষয়ে আবার বিধিবিধান আছে। বলা হয়েছে, ‘করণিক কাজে নিয়োগকৃত কোনো গণমাধ্যম কর্মীর শিক্ষানবিশকাল হইবে ২ (দুই) বৎসর এবং অন্যান্য গণমাধ্যম কর্মীর উক্ত সময়কাল হইবে ১ (এক) বৎসর’। কারা অন্যান্য কর্মী এবং কারা ক্লারিক্যাল কর্মী, তা উল্লেখ করা থাকলে ভাল হতো।. প্রস্তাবিত আইনে নিয়োগের ক্ষেত্রে কিছু বিধিবিধান এই আইনে যোগ করা হয়েছে, যা জরুরি ছিল। শ্রম আইনে ‘বিশ্রাম ও আহারের’ জন্য ১ ঘণ্টা বিরতিসহ সর্বমোট দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত গণমাধ্যম কর্মী আইনেও দৈনিক ৮ ঘণ্টা হিসেবে সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টা কাজের নিয়ম রাখা হয়েছে। তবে বিশ্বজুড়ে সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টা কাজের রেওয়াজ আছে, বাংলাদেশেও সরকারি কর্মচারিরা সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টা কাজ করেন। গবেষণা বলছে, সাপ্তাহিক কাজের সময় সপ্তাহে ৩০/৩২ ঘণ্টা রাখা হলে কাজের ফল ভাল পাওয়া যায়। যে কারণে আধুনিক প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মীদের সপ্তাহে তিনদিন ছুটি নিতে উৎসাহিত করছে। অথচ গণমাধ্যম কর্মী আইনে ‘সকল গণমাধ্যম কর্মীকে কোনো গণমাধ্যমে সপ্তাহে অন্যূন ৪৮ (আটচল্লিশ) ঘণ্টা কাজ করিতে হইবে’ লেখা থেকে মনে হচ্ছে আইনটি করেছেন গণমাধ্যমের মালিকরা। অথচ আইনটি করা হচ্ছে গণমাধ্যম কর্মীদের জন্য। শ্রম আইনে বলা হয়েছে ‘প্রতি সপ্তাহে কারখানা ও শিল্পের ক্ষেত্রে একদিন এবং দোকান ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে দেড় দিন ছুটি পাইবেন। গণমাধ্যম আইনেও লেখা যেতো গণমাধ্যম কর্মীরা সপ্তাহে কমপক্ষে একদিন ছুটি পাবেন, তবে প্রতিষ্ঠান চাইলে তা দুই বা তিন দিন করতে পারবেন। কেননা অনেক গণমাধ্যমে ইতিমধ্যেই সপ্তাহে দুইদিন ছুটি চালু আছে। যদিও আইনে অধিকতর সুবিধা দেওয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করা হয়েছে, কিন্তু আইনের বিভিন্ন ভাগের ভাষার প্রয়োগে আইনটিকে কর্মীবান্ধব বলে মনে হয়নি। গণমাধ্যম কর্মী আইনটি হয়তো চলতি বছর বা আগামী বছর পাস হবে। এই আইনে ওয়েজবোর্ড গঠনের বিষয়টি ঐচ্ছিক রাখা হয়েছে। সরকার ওয়েজ বোর্ড গঠন করতে পারবে, সরকার না চাইলে না-ও করতে পারে। সংবাদপত্রের জন্য নবম ওয়েজবোর্ড হয়েছে ২০১৮ সালে। খসড়ায় ৫ বছর পর পর ওয়েজবোর্ড হওয়ার কথা লেখা থাকলেও বিলে এর জন্য কোনো বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি। ওয়েজ বোর্ড না থাকলে বেতনকাঠামো কেমন হবে, তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। ফলে আবারও হয়তো ওয়েজ বোর্ড গঠনের জন্য সাংবাদিকদেরকে মাঠেই নামতে হবে। গণমাধ্যম আইনটি বাস্তবায়িত হচ্ছে কিনা, তা পর্যবেক্ষণের জন্য খসড়ায় একটা কমিটি গঠনের কথা আইনে বলা হয়েছিল, বিলে গণমাধ্যম আদালত স্থাপন করার কথা বলা হয়েছে। ৩ সদস্যের আদালতে একজন কর্মরত জেলা জজ থাকবেন চেয়ারম্যান, মালিক এবং কর্মীদের প্রতিনিধি থাকবেন সদস্য। আইনে ন্যনূতম বেতনের চেয়ে কম বেতন দিলে এক বছরের কারাদন্ডের বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু আইনে ন্যূনতম বেতন বলে কোনো কিছু ঘোষিত নেই কিংবা ঘোষণা করার কোনো বাধ্যবাধকতাও নেই। সরকার কি সাংবাদিকদেরকে আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায়ের দিকেই ঠেলে দিতে চাইছে? পরিশেষে একটাই কথা বলবো আমার পরিচয় বিলুপ্ত করে নয় আমার মেধা ও শ্রমকে কাজে লাগাতে রাষ্ট্র সক্রিয় হবে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি(ডিআরইউ)

Comment Heare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *