News

ওসমান পরিবারের নেতাদের কবর জিয়ারত করেন আইভী

ডান্ডিবার্তা | 26 February, 2020 | 8:40 am

ভাষা সৈনিক স্বাধীকার আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ খান সাহেব ওসমান আলী, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত একেএম শামসুজ্জোহা, রত্মগর্ভা ভাষা সৈনিক নাগিনা জোহা ও সাবেক এমপি একেএম নাসিম ওসমানের কবর জিয়ারত করেছেন সিটি করপোরেশনের মেয়র ও জেলা আওয়ামীলীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। এ সময় তিনি কবরগুলোতে গোলাপ ফুলের পাপড়ি ছড়িয়ে দেন ও মিলাদে উপস্থিত ছিলেন। গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১০টায় নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সভাপতি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও নারায়ণগঞ্জের পৌরপিতা প্রয়াত আলী আহম্মদ চুনকা’র ৩৬তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল শেষে তিনি ওই কবরগুলো জিয়ারত করেন। এসময় তাঁর সাথে ছিলেন আলী আহম্মদ চুনকা’র ছেলে আলী আহম্মদ রেজা রিপন, আলী আহম্মদ রেজা উজ্জল ও জামাতা আব্দুর কাদির সহ পরিবারের সদস্য ও জেলা আওয়ামীলীগের সাগঠনিক সম্পাদক একেএম আবু সুফিয়ান, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, শ্রমিকলীগ, আলী আহাম্মদ চুনকা ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবি সংগঠনের ব্যক্তিরা। আলী, এম ওসমান (১৯০০-১৯৭১) রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, সমাজসেবক। জন্ম ১৯০০ সালের ১ জানুয়ারি কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি উপজেলার জামালকান্দি গ্রামে। পিতা হাজী ডেঙ্গু প্রধান। ওসমান আলী নিজ গ্রামের স্কুলেই প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। তিনি ১৯২০ সালে প্রবেশিকা পাস করেন। অতঃপর তিনি কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন। ছাত্রজীবনেই ওসমান আলী রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। তিনি কলেজ বয়কট করে ১৯২০ সালে খেলাফত আন্দোলন এবং পরে অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেন। এ সময় তিনি অসহযোগ আন্দোলনের বিশিষ্ট নেতাদের সংস্পর্শে আসেন। ওসমান আলী অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে নারায়ণগঞ্জে এসে রাজনীতির পাশাপাশি পাট ব্যবসা শুরু করেন। এ সময়ে তিনি কম্যুনিস্ট নেতা বেণুধর, বিপ্লবী নেতা অনিল মুখার্জী ও জ্ঞানচক্রবর্তীর সংস্পর্শে আসেন। উনিশ শতকের ত্রিশের দশকে নারায়ণগঞ্জের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে হিন্দু ও মাড়োয়ারীদের প্রাধান্য ছিল। নারায়ণগঞ্জে এ সময় অনেক এজেন্সি ও ব্রোকার হাউস গড়ে ওঠে। এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই ছিল ইউরোপীয় ও পশ্চিম ভারত থেকে আগত মাড়োয়ারী সম্প্রদায়ের। ব্যবসাক্ষেত্রে বাঙালি মুসলমানদের দৈন্যদশা লক্ষ করে ওসমান আলী নিজে ব্রোকার হাউজ খুলে পাট ব্যবসায়ে আত্মনিয়োগ করেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর ব্যবসার প্রসার ঘটে। লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তান আন্দোলন শুরু হলে ওসমান আলী নারায়ণগঞ্জে আন্দোলনকে সংগঠিত করেন এবং বামপন্থী ও অন্যান্য স্থানীয় নেতাদের সহযোগিতায় সেখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার চেষ্টা করেন।এম ওসমান আলী ১৯৪৬ সালে সাধারণ নির্বাচনে (নারায়ণগঞ্জ দক্ষিণ নির্বাচনী এলাকা) ঢাকার নবাব খাজা হাবিবুল্লাহকে পরাজিত করে বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। এ সময় তিনি নারায়ণগঞ্জ শহর মুসলিম লীগের প্রেসিডেন্ট এবং ঢাকা জেলা মুসলিম লীগের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি ১৯৪২ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ শহর মুসলিম লীগের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৬ সালে নারায়ণগঞ্জে ‘ঝুলন যাত্রা’ উপলক্ষে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি হলে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে সমঝোতা আনয়নে তিনি বিশেষ ভূমিকা রাখেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ঢাকা জেলা মুসলিম লীগে ঢাকার নবাবদের সঙ্গে প্রগতিশীল গ্রুপের মতবিরোধ দেখা দেয়। এ বিরোধে ওসমান আলী প্রগতিশীল গ্রুপকে সমর্থন করেন এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে নারায়ণগঞ্জে গণসংবর্ধনা দেন। এম ওসমান আলী ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী দল আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা-সদস্য ছিলেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তাঁর বিশেষ ভূমিকা ছিল। এ জন্য তিনি কারারুদ্ধ হন। ১৯৬২ সালের শাসনতান্ত্রিক আন্দোলন, ছয়দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে ওসমান আলী সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। এম ওসমান আলী সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগী ছিলেন। তাঁর সম্পাদনায় ত্রিশের দশকে নারায়ণগঞ্জ থেকে সবুজ বাঙলা নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এ পত্রিকায় লিখতেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মোহিতলাল মজুমদার, জসীমউদ্দীন, আবুল মনসুর আহমদ, অধ্যাপক মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন, বন্দে আলী মিয়া, কাজী আবদুল ওদুদ, মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা প্রমুখ। এম ওসমান আলী ১৯৩৮ সালে নিজ গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন ওসমানিয়া হাইস্কুল, প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মসজিদ। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জের তানজিম মুসাফিরখানা, রহমতুল্লাহ অডিটোরিয়াম ও গণপাঠাগার নির্মাণে তাঁর অবদান ছিল। এসব জনহিতকর কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ১৯৪০ সালে ‘খান সাহেব’ উপাধিতে ভূষিত করে। কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের দমননীতির প্রতিবাদে তিনি ১৯৪৪ সালে এ উপাধি বর্জন করেন।সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান ও সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের বাবা মরহুম একেএম সামসুজ্জোহা ছিলেন একজন ভাষা সৈনিক স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত (মরনোত্তর) ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর। তিনি মহান ভাষা আন্দোলন, ১১ দফা, ৬ দফা, মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম সংগঠক। তিনি ১৯৭০ সালে গণপরিষদ ও ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে ছিলেন। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের বিজয় লগ্নে ১৯৭১ সনের ১৬ই ডিসেম্বর জাতির জনকের পরিবারকে (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাসহ) বন্দী দশা থেকে মুক্ত করতে গিয়ে ঢাকায় হানাদার বাহিনী কর্তৃক গুলিবিদ্ধ হয়ে ছিলেন। নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী ‘বায়তুল আমান’- এ জন্ম হওয়া বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। মহান ভাষা আন্দোলনে তাঁর পরিবারে ৫ জন সদস্য একসাথে কারাবন্দী হয়ে ছিলেন। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে তিনি আদমজী জুট মিলসহ চিত্তরঞ্জন কটন মিলস্, আর্দশ কটন মিল লক্ষèী নারায়ণ কটন মিল, আহমেদ বাওয়ানী কটন মিল, ঢাকা কটন মিল পুনর্গঠন করেন। তিনি নারায়ণগঞ্জ টেক্সটাইল ম্যানেজমেন্ট বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু স্বপরিবারে নিহত হওয়ার পর তিনি খুনিচক্রের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘদিন কারাভোগ করেন। ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ ক্লথ মার্চেন্টস এসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৮সালে তিনি নারায়ণগঞ্জ টাউন কে-অপারেটিভ ব্যাংকের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৩৫ সালে অবিভক্ত বাংলার বর্ধমান জেলার কাশেমনগরের জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন নাগিনা জোহা। তাদের পরিবারের পূর্বপুরুষদের নামানুসারে গ্রামটির নামকরণ করা হয়। বাবা আবুল হাসনাত ছিলেন সমাজহিতৈষী ও কাশেমনগরের জমিদার। তিনি শিল্প-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতায় বিশেষ সুনাম অর্জন করেন। নাগিনা জোহার বড় চাচা আবুল কাশেমের ছেলে আবুল হাশিম ছিলেন অবিভক্ত ভারতবর্ষের মুসলিম লীগের সেক্রেটারি ও এমএলএ। চাচাতো ভাই মাহবুব জাহেদী ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ছিলেন। ভাগ্নে পশ্চিমবঙ্গের কমিউনিস্ট নেতা সৈয়দ মনসুর হাবিবুল্লাহ রাজ্যসভার স্পিকার ছিলেন। নাগিনা জোহা ১৯৫০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদালয়ের অধীনে মেট্টিক পাস করেন। ১৯৫১ সালে নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী ওসমান পরিবারের সন্তান রাজনীতিবিদ এ কে এম শামছুজ্জোহার সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। স্বামীর বাড়িতে নতুন বউ হিসেবে এসেই ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। তার শ্বশুর তৎকালীন এমএলএ খান সাহেব ওসমান আলীর চাষাঢ়ার বাড়ি ‘বায়তুল আমান’ ছিল আন্দোলন-সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দু।নাসিম ওসমানের স্ত্রীর নাম পারভিন ওসমান। এই দম্পতির এক ছেলে ও দুই কন্যা আছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিবারের সকলের সাথে হত্যা করা হয়। তার আগের দিন ১৪ আগস্ট তিনি পারভীন ওসমানকে বিয়ে করেন। বিয়েতে শেখ মুজিবুর রহমানের পুত্র শেখ কামাল উপস্থিত ছিলেন। ১৫ আগস্ট স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হলে নাসিম ওসমান নবপত্মীকে ফেলে হত্যার প্রতিশোধ নিতে চলে যান। তিনি ঢাকায় প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। এরপর তিনি আবার ভারতে চলে যান এবং সেখানে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করেন। তৎকালীন কাদের বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ২০১৪ সালের ৩০ এপ্রিল ভারতের রাজধানী দিল্লীর দেরাদুন শহরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করেন প্রয়াত সাংসদ নাসিম ওসমান। তিনি সদর-বন্দর আসন থেকে ১৯৮৮৪, ১৯৮৬, ২০০৮ ও ২০১৪ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে ছিলেন।

[social_share_button themes='theme1']

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *