Home » প্রথম পাতা » ফতুল্লার কাশিপুরে মোস্তফার অত্যাচারে অতিষ্ট সাধারন মানুষ

কত শিশু কাজ করত ওই মৃত্যুকূপে?

১২ জুলাই, ২০২১ | ৬:২৩ পূর্বাহ্ণ | ডান্ডিবার্তা | 222 Views

ডান্ডিবার্তা রিপোর্ট

জুস, ক্যান্ডি, বিস্কুট, লাচ্ছা সেমাইসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরি হতো হাসেম ফুডস লিমিটেডের কারখানায়। প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিক দিয়ে চলত তাদের কাজ। কর্মরত শিশু-কিশোর, শ্রমিক-জনতা পেটের আগুন জুড়ানোর জন্য মাত্র সপ্তাহখানেক আগে গত বৃহস্পতিবার রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেছিলেন। দুই মাস ধরে তাঁদের বেতন ও ওভারটাইমের টাকা পরিশোধ করছিল না মালিকপক্ষ। বাড়িভাড়া ও মুদিদোকানের বকেয়া পরিশোধ করতে না পেরে বাধ্য হয়ে তাঁরা রাস্তায় নেমেছিলেন। সপ্তাহ না ঘুরতেই তাঁরা শিকার হলেন কারখানার রহস্যময় আগুনের। মালিক বলেছেন, আগুন লাগতেই পারে। কী কঠিন পরিহাস! গত ১ জুলাই বিক্ষোভের খবর পেয়ে কাঁচপুর ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ ও ভুলতা ফাঁড়ি পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি ‘নিয়ন্ত্রণে’ এনেছিল। গলা উঁচু করে জানিয়ে গিয়েছিল, ‘মালিকপক্ষের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। গত ৫ জুলাই শ্রমিকদের দুই মাসের বকেয়া ওভারটাইমের টাকা দিয়ে দেওয়া হবে। বাকিটা ঈদের আগে পরিশোধ করে দেওয়া হবে। কোম্পানির অ্যাডমিন ইনচার্জ ইঞ্জিনিয়ার সালাউদ্দিনও সংবাদমাধ্যমকে একই কথা বলেছিলেন। বলা বাহুল্য, কেউ কথা রাখেনি। পেটের আগুনে জ্বলতে জ্বলতে কারখানার আগুনের পুড়ে কয়লা হলেন তাঁরা। শুক্রবার সন্ধ্যায় এক উদ্ধারকর্মী কাঁদতে কাঁদতে জানান, চেনা যায় না কে নারী কে পুরুষ, কোনটা মাথা, কোনটা হাত। মৃতদেহগুলো আগুনে পুড়ে এমন অবস্থা হয়েছে যে নারী, পুরুষ কিংবা পরিচয়—কারও পক্ষে কোনো কিছুই চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। বিক্ষুব্ধরা বলছেন, চারতলায় ‘দরজা বন্ধ’ না থাকলে এত মৃত্যু হতো না। পুলিশের কাঁদানে গ্যাস আর লাঠির বাড়ি খেয়েও শিশুকন্যার খোঁজে আসা হাতেম আলী ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস জানাল, পাঁচ-ছয়তলায় কোনো লাশ মেলেনি। ঢাকা থেকে ছুটে যাওয়া সাংবাদিক ফারুক ওয়াসিফ সেটা শুনে স্তব্ধ, ‘এটা অসম্ভব’। নিচের সিঁড়ি আগুনে বন্ধ হওয়ায় সবাই ওপরে উঠে গিয়েছিল। ছাদের তালা খোলা না বন্ধ ছিল, জানা নেই। পাঁচ-ছয়তলায় অনেকে আটকা পড়ার কথা। তাঁদের লাশ কোথায় গেল? একটা হাজিরা খাতা পড়ে ছিল, পৃষ্ঠাগুলো ছেঁড়া। তালা মারার অভিযোগ নিয়ে মালিকপক্ষ বিবিসিসহ সবাইকে বলেই চলেছে, ‘এটি মিথ্যা কথা, এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।’ তাহলে সত্য কোনটা? তাঁরা জানিয়ে দিয়েছেন, ‘ডিসি মহোদয় এবং ডিআইজির সঙ্গে কথা হয়েছে। এটা আমাদের মালিকপক্ষ দেখবে। এদের ক্ষতিপূরণ সম্পূর্ণ ম্যানেজমেন্ট দেবে।’ নাছোড়বান্দা তরুণ সাংবাদিক জানতে চান, তালা দেওয়া না থাকলে এতগুলো বডি এক জায়গায় পাওয়া গেল কীভাবে? মালিকপক্ষের উত্তর, ‘যখন নিচতলায় আগুনটা ধরেছে, তখন সবাই আতঙ্কে ওপরে চলে গেছে।’ তাই বোকা লোকগুলো পুড়ে কয়লা হয়েছে একসঙ্গে। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় এক উদ্ধারকর্মী কাঁদতে কাঁদতে জানান, চেনা যায় না কে নারী কে পুরুষ, কোনটা মাথা, কোনটা হাত। মৃতদেহগুলো আগুনে পুড়ে এমন অবস্থা হয়েছে যে নারী, পুরুষ কিংবা পরিচয়—কারও পক্ষে কোনো কিছুই চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। বিক্ষুব্ধরা বলছেন, চারতলায় ‘দরজা বন্ধ’ না থাকলে এত মৃত্যু হতো না। বিকেল পাঁচটায় আগুন লাগার পর অনেকেই মুঠোফোনে ফোন দিয়েছিলেন কাছের মানুষদের, কেউ মাকে, কেউ বাবাকে, স্ত্রীকে, স্বামীকে। জেনে গিয়েছিলেন, এটাই তাঁদের কেয়ামত, শেষ দিন। না হলে বাঁচার কথা ভুলে জীবনের ভুলত্রুটির জন্য শেষবারের মতো ক্ষমার আকুতি কেন জানাবেন? লাশ গণনা শেষ হওয়ার আগেই অনেক শ্রমিক আর মানবাধিকার সংগঠনের বিবৃতি পৌঁছে গেছে সংবাদপত্র আর টিভি চ্যানেলে। এসব বিবৃতিতে সস্তা শিশুশ্রমের অব্যাহত অপব্যবহার নিয়ে কিছু বলা হয়নি। প্রকারান্তরে মেনে নেওয়া হয়েছে মৃতের সংখ্যা। তাজরীন, রানা কি হা–মীম অথবা নরসিংদীর তোয়ালে কারখানা কিংবা গাজীপুরের চান্দনায় গরিব অ্যান্ড গরিব সোয়েটার কারখানা—কোথাও কি নিখোঁজের সব হিসাব কোনো দিন পাওয়া যাবে? অপেক্ষমাণ অভিভাবক আর জানে বেঁচে যাওয়া সহকর্মীদের কাছ থেকে যেসব নাবালক-নাবালিকার নাম পাওয়া গেছে, সেটাই এখন একমাত্র তালিকা। এসব সুরক্ষিত গারদ নামের কারখানায় চৌদ্দগুষ্টির নাম-ঠিকানা না লিখে কি ঢোকা সম্ভব? যাঁরা লাইসেন্স দেন, নবায়ন করেন, সেই সরকারি প্রতিষ্ঠান কলকারখানা পরিদর্শকের অফিস বলছে, ‘আমাদেরই ঢুকতে দেয়নি বারবার অনুরোধ করার পরও।’

Comment Heare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *