Home » প্রথম পাতা » সামসুলের বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ

ক্রিকেটার ডেবিডের হাতে অবৈধ অস্ত্র

২৫ নভেম্বর, ২০২১ | ৩:০২ অপরাহ্ণ | ডান্ডিবার্তা | 26 Views

ডান্ডিবার্তা রিপোর্ট

নারায়ণগঞ্জ বিএনপির রাজনীতিতে এক সময়ে অপরিহার্য নেতা মমিনউল্লাহ ডেভিডের মত নেতার আর জন্ম হয়নি মনে করছেন অনেকেই। ১৭ বছর আগে ক্রসফায়ারে মারা যান ডেভিড। কিন্তু প্রতিবার আন্দোলনে আসলেই অনুভূত হয় ডেভিডের। ভালো ক্রিকেট খেলতেন নারায়ণগঞ্জের মমিনউল্লাহ ডেভিড। ছিলেন শহর যুবদল নেতা। রাজনীতির পথে হাঁটতে গিয়ে ক্রিকেট ব্যাট ছেড়ে হাতে তুলে নেন অবৈধ অস্ত্র। পুলিশও তার কাছ থেকে রেহাই পায়নি। পুলিশকে মারধর ও গুলি ছিনিয়ে নেওয়ারও ঘটনা ঘটান এই ডেভিড। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি চলে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে। কোনোভাবেই তার লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছিল না। অবশেষে দল ক্ষমতায় থাকতেই র‌্যাবের ক্রসফায়ারে নিহত হন ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের সেই দানবে পরিণত হওয়া মোমিনউল্লাহ ডেভিড। পুলিশের হিসাবে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন থানায় খুন, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, হামলাসহ ডেভিডের বিরুদ্ধে ৩৩টি মামলা ছিল। ২০০৪ সালের ২৪ নভেম্বর রাতে ঢাকার মালিবাগ কমিউনিটি সেন্টারে সামনে ডেভিড গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন তথা র‌্যাবের দাবি ছিল, তাদের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধের এক পর্যায়ে ক্রসফায়ারে পড়ে ডেভিডের মৃত্যু ঘটে। ডেভিডের বাবার নাম বশিরউল্লাহ। সে এক সময়ে আদমজীতে চাকরি করতো। তার ৭ ছেলে ও ২ মেয়ে। তার মধ্যে ৩ জন মারা গেছে। তারা হলো কিরণ, মমিনউল্লাহ ডেভিড ও মনা। বেঁচে রয়েছে মাহবুব উল্লাহ তপন, রিপন, শাহাদাতউল্লাহ জুয়েল, রোমান। অপর ভাই শাহাদাতউল্লা জুয়েল বর্তমানে কারাবন্দী। ২০০৭ সালের ২৭ নভেম্বর শহরের মিশনপাড়ার বাসভবন থেকে জুয়েলকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-১১। জুয়েলের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ কার্যালয়ের সামনে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলার মামলায় তিনি সাজাপ্রাপ্ত। এছাড়া ২০০১ সালের ১৬ জুন শহরের চাষাঢ়ায় আওয়ামী লীগ অফিসে বোমা হামলার মামলায় তাকে অভিযুক্ত করে চার্জশীট দেওয়া হয়েছে। ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জ ক্রিকেট একাডেমিতে। ভালো ব্যাট করতেন। ফলো করতেন অস্ট্রেলিয়ান জনপ্রিয় ক্রিকেটার ডেভিড বুনকে। ডেভিড বুনের ব্যাটিং স্টাইল রপ্ত করেছিলেন ভালোভাবেই। ক্রিকেট একাডেমির কোচ তাকে ডেভিড বলেই ডাকতেন। সেই থেকে তার নাম হয় মমিনউল্লাহ ডেভিড। পরিচিতি পান ডেভিড নামে। এই ডেভিড ক্রিকেট খেলতে খেলতে এক সময় জড়িয়ে পড়েন সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে। ক্রিকেট ব্যাট চালাতে তিনি যেমন ছিলেন পারদর্শী, অস্ত্রও চালাতেন ঠিক তেমনি। এক সময় অস্ত্র আর ব্যাট দুই-ই চালাতে থাকেন। এক সময়ে তিনি হয়ে ওঠেন নারায়ণগঞ্জের অপরাধ জগতের ডন। ১৯৯০ সালে ডেভিড সন্ত্রাসের পথে হাঁটতে থাকলেও সেই সময়ে তিনি খুব একটা সুবিধা করতে পারেননি। সেই সময়ে বিএনপির দুইডজন সন্ত্রাসী বেপরোয়াভাবে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে জড়িয়ে ছিল। পরে আওয়ামী লীগ সরকার আমলে ওই অপরাধীরা গা ঢাকা দিলেও আড়ালে যাননি ডেভিড। এলাকায় থেকেই গা ঢাকা দেওয়া অপরাধীদের আস্তানাগুলো দখলে নিতে শুরু করে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৯১ হতে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া ও মিশনপাড়া এলাকার মধ্যে প্রায় সময়েই বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটতো। চাষাঢ়ায় এলাকায় ছিল আওয়ামী লীগের লোকজনদের আধিপত্য। আর মিশনপাড়া এলাকার বাসিন্দা ডেভিড স্থানীয় বিএনপি ক্যাডারদের নেতৃত্ব দিত। তখন থেকেই আলোচনায় আসে ডেভিড। সে সময়ে ডেভিড অনেক অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করলেও তার কোনটিই এখন পর্যন্ত উদ্ধার করা যায়নি। ১৯৯৬ সালে অসহযোগ আন্দোলনের সময়ে অনেক বন্দুকযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়ে ডেভিড স্থানীয় বিএনপি নেতাদের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়। ওই বছরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে নারায়ণগঞ্জ ছেড়ে পালিয়ে যায় ডেভিড। এ সময়ে সে ঢাকাতে ছিনতাইয়ের অভিযোগে গ্রেপ্তারও হয়। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ডেভিড আবারো এলাকাতে ফিরে আসে। তখন তাকে শহরের মিশনপাড়া এলাকায় দেওয়া হয় সংবর্ধনা। এতে এলাকার বিপুল সংখ্যক মানুষের সমাগম ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, সে সময়ে সরকারের এক প্রতিমন্ত্রী ও নদী খেকো খ্যাত এক এমপি ডেভিডকে ব্যবহার করতো। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী চাঁদাবাজ হিসেবে উত্থান ঘটে মমিনউল্লাহ ডেভিডের। বাঘা বাঘা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও অপরাধীরাও তার কাছে তখন নস্যি। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় ডেভিড দ্রুত এগিয়ে যান। তখন তিনি ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। খুন, চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে নারায়ণগঞ্জে অপরাধ সা¤্রাজ্যের মুকুটহীন স¤্রাটে পরিণত হন। তার কাছে অস্ত্র যেন একটি খেলনা দ্রব্য। প্রকাশ্যেই অস্ত্র নিয়ে দাপিয়ে বেড়াতেন শহরের এক মাথা আরেক মাথা। পুলিশ প্রশাসন থেকে শুরু করে সরকারি অফিস আদালতও তার কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছিল। কোনো কিছুতেই তার এই অগ্রযাত্রাকে রোধ করা যাচ্ছিল না। অত্যাধুনিক অস্ত্রের মজুদ গড়ে তোলেন তিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে। মূলত এরশাদ আমলে ১৯৮৮ সালে জোড়া খুনের মাধ্যমে আলোচনায় আসেন ডেভিড। চাষাঢ়ায় কালাম ও কামাল নামে দুই যুবককে হত্যা করে ডেভিড। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর কিছু করতে না পারলেও ২০০১ সালের পর তৎকালীন ছাত্রদলের এই নেতা দানবে পরিণত হয়। খুন, চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে নারায়ণগঞ্জের সব ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়েন তিনি। আওয়ামী লীগের অসহযোগ আন্দোলনে সশস্ত্র হামলা চালায় ডেভিড। এতে পান্ডা নামে এক যুবক নিহত হন। এ ছাড়া মিশনপাড়া এবং চাষাঢ়ায় গুলি করে হত্যা করে মনির নামে এক যুবককে। জানা গেছে, বিএনপি ক্ষমতায় থাকা সময়ে ২০০৪ সালের ২৪ নভেম্বর ডেভিডের মৃত্যুর ঘটনার পেছনে দলের শীর্ষ নেতাদের ব্যর্থতা আর ‘ব্যবহৃত’ রাজনীতিকেই দায়ী করা হয়েছিল। নারায়ণগঞ্জে গত দুই দশকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্রসফায়ারে অন্তত দেড়ডজন রাজনীতিক। কিন্তু তাদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল সাবেক যুবদল নেতা মমিনউল্লাহ ডেভিডের ক্রসফায়ারটি। এক সময়ের আলোচিত-সমালোচিত ও আলোচিত ক্যাডার মমিনউল্লাহ ডেভিডকে অনেকেই ভুলে গেছে। কিন্তু এ ডেভিডকে দিয়েই একসময়ে নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগকে প্রতিহত করতো বিএনপি-শহরে এমন খবর চাউর রয়েছে অনেক আগে থেকেই। বিশেষ করে ১৯৯৬ সালে অসহযোগ আন্দোলনের সময়ে নারায়ণগঞ্জ শহরে আওয়ামী লীগের ক্যাডারদের সঙ্গে সংঘর্ষের বেশীরভাগ সময়ে বিএনপির নেতৃত্বে ছিলেন ডেভিড। সে ছিল অস্ত্র চালানোয় দারুণ পারদর্শী। একজন দুর্র্ধষ সন্ত্রাসী হিসেবে তার খ্যাতি ছিল সর্বত্র। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর এ ডেভিডকে নিয়ে সংসদে কঠোর সমালোচনা করেছিল তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের এমপিরা। বহুল সমালোচিত ডেভিডকে কব্জা করতে সে সময়ের নারায়ণগঞ্জের বিএনপির শীর্ষ নেতাদের মধ্যে ছিল নীরব যুদ্ধ। তবে এও অভিযোগ রয়েছে, বিএনপির শীর্ষ নেতাদের বিরোধের কারণেই ডেভিডকে প্রাণ হারাতে হয়েছিল। ২০০১ হতে ২০০৬ সাল পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জের ৫টি আসনের এমপি ছিলেন সদর-বন্দর এ আবুল কালাম, ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জ আসনে গিয়াসউদ্দিন, সোনারগাঁ আসনে রেজাউল করিম, আড়াইহাজার আসনে আতাউর রহমান খান আঙ্গুর ও রূপগঞ্জ আসনে আবদুল মতিন চৌধুরী। তাদের মধ্যে রেজাউল করিম ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই সময়ে রেজাউল করিম ও গিয়াসউদ্দিনই মূলত ডেভিডকে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করেছিল এমন অভিযোগ ছিল। ডেভিডের জানাযাতে গিয়াসউদ্দিন ও আবুল কালাম উপস্থিত থাকলেও রেজাউল করিমকে দেখা যায়নি। ঘটনার দিন ড্রেজারের একটি টেন্ডারের সিডিউল জমা নেওয়া হয়। ডেভিডের অনুগতরা সিডিউল জমা দেয় দুপুর ১২টায়। এর পর সে মোটা অঙ্কের টাকা প্রদানের এক এমপির কাছে যায়। সেখানে টাকা দিয়ে রাতে ঢাকায় যাওয়ার সময়ে মালিবাগ এলাকায় র‌্যাবের কথিত ক্রসফায়ারে ডেভিডের মৃত্যু ঘটে। তার মৃত্যুর পর শহরের মিশনপাড়া এলাকায় জানাযা অনুষ্ঠিত হলেও তাতে জনরোষের ভয়ে উপস্থিত হতে পারেনি ওই দুইজন এমপি।

 

 

Comment Heare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *