Home » প্রথম পাতা » শ্রী কৃষ্ণের জন্মাষ্টমী আজ

টানবাজারে মৃত্যুর সাথে বসবাস

০৮ জুন, ২০২২ | ১২:৪১ অপরাহ্ণ | ডান্ডিবার্তা | 56 Views

ডান্ডিবার্তা রিপোর্ট

নারায়ণগঞ্জ শহরের টানবাজার এলাকায় আবাসিক ভবন থেকে কেমিক্যালের গোডাউন তিন বছরেও সরানো হয়নি। ফলে ঝুঁকিতে রয়েছেন ওই এলাকার কয়েক হাজার মানুষ। দেশের কেমিক্যাল ব্যবসার অন্যতম কেন্দ্র টানবাজার এলাকার কেমিক্যাল গোডাউন সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল ২০১৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। এরপর কেটে গেছে তিন বছরের বেশি সময়। দীর্ঘ সময়েও গোডাউন সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়নি। বিষয়টি নিয়ে এতদিন প্রশাসনের কোনো নজরদারি ছিল না, নীরব ছিলেন ব্যবসায়ীরাও। সম্প্রতি চট্টগ্রামের সীতাকু-ে কনটেইনার ডিপোতে ভয়াবহ বিস্ফোরণে ব্যাপক হতাহতের পর নারায়ণগঞ্জের টানবাজার এলাকার কেমিক্যাল গোডাউন নিয়ে নতুন করে আলোচনা হচ্ছে। টানবাজার এলাকার শত শত আবাসিক ভবনের ভেতরেই রয়েছে রং, সুতা আর নানা দাহ্য কেমিক্যালের গোডাউন। ঘনবসতিপূর্ণ অলিগলি ঘেরা পুরো এলাকায় এত বেশি কেমিক্যাল মজুদ রয়েছে যে, বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে ব্যাপক প্রাণহাণির সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টানবাজারে কেমিক্যাল গোডাউনে কস্টিক সোডা বা সালফারের মতো কিছু পদার্থ রয়েছে- যেগুলো আগুনের সংস্পর্শে আসার পর বাতাসকে বিষাক্ত করে বায়োহ্যাজার্ড বা জৈব বিপদ ঘটিয়ে দিতে পারে। অভিযোগ রয়েছে, জেলা প্রশাসন কিংবা বিস্ফোরক অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই বহু ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান শুধুমাত্র রং ও সুতার ট্রেড লাইসেন্স নিয়েই এখানে ব্যবসা করছেন বছরের পর বছর। এদিকে ব্যবসায়ীরা দাবি করেন, তারা নিয়মিত মাসোহারা দিয়ে এ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।  বাংলাদেশ টেক্সটাইল অ্যান্ড ডাইস কেমিক্যাল মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ ইয়ার্ণমাচের্ন্ট এসোসিয়েশনের সভাপতি একই ব্যক্তি থাকায় তড়িগড়ি করে ডাইস কেমিক্যাল এসোসিয়েশন গড়ে তোলা হলেও মূলত: দু’টি সংগঠনই নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন লিটন সাহা নামে এক ব্যবসায়ী। সাধারণ ব্যবসায়ীরা এ ব্যপারে মুখ খুলতে নারাজ। এমনকি লিটন সাহাকে একাধিকবার সন্ধ্যান করেও পাওয়া যায়নি। টানবাজার এলাকায় সুতা ব্যবসার পাশাপাশি যেভাবে আবাসীক এলাকায় কেমিক্যালের গুদামসহ এই ব্যবসা চলছে তাতে যে কোন সময় ভয়াবগ দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। নিমতলী বা চুড়িহাট্টার মতো ভয়াবহ অগ্নিকা-ের পর এসব কেমিক্যাল ব্যবসা নিয়ে প্রশাসন নড়েচড়ে বসলেও মাস না পেরুতেই আবার সবাই ‘চুপ’ হয়ে যান। খোঁজ জানা গেছে, স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকেই নগরীরর টানবাজার, মীনাবাজার, র‌্যালি বাগান এলাকায় গড়ে উঠে দেশের অন্যতম প্রধান রং, সুতা ও ডাইস কেমিক্যালের ব্যবসা কেন্দ্র। ২০১৯ সালে রাজধানীর চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকা-ের পর টানবাজার এলাকায় আবাসিক বাড়িতে দাহ্য কেমিক্যালের গোডাউন না রাখার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয় জেলা প্রশাসন। ওই বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি প্রশাসনের সেই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে কেমিক্যালের গোডাউন সরিয়ে নিতে ব্যবসায়ীরা ১০ দিনের সময় চান। কিন্তু বিগত তিন বছরেও এসব কেমিক্যাল গোডাউন সরানো হয়। এখনো দেদার চলছে কেমিক্যাল বিক্রি ও মজুদ। তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, টানবাজার এলাকার সাহাপাড়া, মীনাবাজার, রহমান ম্যানশন, সিটি করপোরেশনে মার্কেটের পেছনের ভবনে রয়েছে কেমিক্যালের গোডাউন। এছাড়া টানবাজার এলাকায় রয়েছে দেশি মদের বিক্রয় কেন্দ্র সেন অ্যান্ড কোম্পানি। এখানে অতিদাহ্য লুজ অ্যালকোহল মজুদ থাকে বিপুল পরিমাণে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, এই এলাকায় যেসব অতিদাহ্য কেমিক্যাল বিক্রি ও মজুদ রয়েছে সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- অ্যাসিটিক অ্যাসিড, সালফিউরিক অ্যাসিড, সালফিউরাস অ্যাসিড, হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড, সফ্টনার সল্ট (কাপড় নরম করার এক প্রকার দানা, যা প্রচ- দাহ্য), সোডিয়াম (পাউডার ও লিকুইড), সালফার, কাস্টিক সোডা (আয়রন সালফেট, পটাশিয়াম নাইট্রেট, সোডিয়াম হাইড্রো অক্সাইড)। সরকারি তোলারাম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের রসায়ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক সমাপ্ত কুমার সাহা বলেন, এসব কেমিক্যাল এতটাই দাহ্য যে, আগুনের ঘটনা ঘটলে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে  অতি অল্প সময়ে আশপাশের এলাকা পুড়িয়ে ছাই করে দিতে পারবে। এছাড়া এসব পদার্থের মধ্যে এমন কিছু কেমিক্যাল রয়েছে, যেগুলো আগুনে সংস্পর্শে আসলে বাতাসকে বিষাক্ত করে তুলতে পারে। তিনি বলেন, দাহ্য কেমিক্যালের ব্যবসা আবাসিক এলাকায় না করে কোনো পৃথক স্থানে করাটাই শ্রেয়। সরেজমিন দেখা গেছে, পুরো টানবাজার, মীনাবাজার এলাকায় কেমিক্যাল ব্যবসার পাইকারি ও খুচরা মিলিয়ে প্রায় দেড় শতাধিক দোকান রয়েছে। অধিকাংশ দোকানেই নেই পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা। এছাড়া আছে কেমিক্যাল মজুদ রাখার বড় বড় গোডাউন। সময়ের সঙ্গে এ ব্যবসায়িক কেন্দ্রকে ঘিরে এখানে তৈরি হয়েছে শতাধিক সুউচ্চ আবাসিক ভবন। আর জীবনের ঝুঁকি নিয়েই এসব ভবনে বছরের পর বছর বাস করছেন মানুষ। টানবাজারের পদ্ম সিটি প্লাজা, খালেক প্লাজাসহ আশপাশের বেশির ভাগ আবাসিক ভবনগুলোতে কেমিক্যালের দোকান রয়েছে। এসব দোকানেও স্বল্প পরিসরে মজুদ করে রাখা হচ্ছে ডাইস কেমিক্যাল, প্রিন্টিং কেমিক্যালসহ আরও কয়েক ধরনের পদার্থ। এর মধ্যে অ্যাসিড, নাইট্রেট, পার-অক্সাইড জাতীয় দাহ্য পদার্থও রয়েছে। লাইসেন্স ছাড়া এসব দাহ্য পদার্থ বিক্রি করার অনুমতি না থাকলেও আইনের তোয়াক্কা না করেই অনেক ব্যবসায়ী বিক্রি চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে টানবাজারে অতিমাত্রার কোনো দাহ্য পদার্থের (কেমিক্যাল) মজুদ বা গোডাউন নেই বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল অ্যান্ড ডাইস কেমিক্যাল মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহ-সভাপতি মোজাম্মল হক। তিনি জানান, আমরা প্রত্যেক ব্যবসায়ীকে চিঠি দিয়ে দাহ্য কেমিক্যালের মজুদ না করতে ও বিপুল পরিমাণে বিক্রি না করতে নিষেধ করেছি। মোজাম্মল হক বলেন, সালফিউরিক অ্যাসিডসহ অতিমাত্রায় দাহ্য অনেক কেমিক্যাল এখন টানবাজারে প্রবেশ নিষেধ। তার দাবি, প্রশাসনের সিদ্ধান্তের পর অনেকেই গোডাউন সরিয়ে নিয়েছেন বলে আমি জানি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, টানবাজারে এখনো এসব দাহ্য অ্যাসিডসহ নানা ধরনের কেমিক্যালের ব্যবসা চলছে। এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. মঞ্জুরুল হাফিজ জানান, আমরা বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ পেয়েছি। টানবাজারসহ আশপাশের এলাকায় কী পরিমাণ ও কী ধরনের কেমিক্যাল মজুদ রয়েছে তা তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী ব্যবসা হচ্ছে কিনা বা অতিদাহ্য কোনো কেমিক্যালের মজুদ আবাসিক ভবনে রয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হবে। তিনি আরও বলেন, টানবাজার এলাকাটি দেশের রং, সুতার অন্যতম পাইকারি ব্যবসা কেন্দ্র। এখানে প্রচুর আবাসিক ভবনও রয়েছে। যদি আগে আবাসিক ভবন বা অনুমোদিত কোনো স্থান থেকে কেমিক্যালের গোডাউন সরিয়ে নেওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে, তবে বিষয়টি অবশ্যই আমলে নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Comment Heare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *