Home » প্রথম পাতা » সামসুলের বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ

দুর্গতিনাশিনী দুর্গা

১২ অক্টোবর, ২০২১ | ৯:২৯ পূর্বাহ্ণ | ডান্ডিবার্তা | 181 Views

তারাপদ আচার্য্য

‘যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তি রূপেন সংস্থিতা।

নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ’

শরতের শারদীয় উৎসব। শারদীয় উৎসব মানেই দুর্গা পূজা। মাতৃরূপে, পিতৃরূপে, শক্তিরূপে, শান্তিরূপে, বিদ্যারূপে আবির্ভূতা এক মহাশক্তি। তিনি সম্মিলিত দেবশক্তির প্রতীক। অসুর অর্থাৎ অপশক্তি বিনাশে দেবতারা তাদের সম্মিলিত শক্তিতে সৃষ্টি করেন মহাশক্তি মহামায়া। পুরাণের মত অনুসারে, শিবের তেজে দেবীর মুখ, যমের তেজে কেশ, বিষ্ণুর তেজে বাহুসমূহ, চন্দ্র তেজে স্তনদ্বয়, ইন্দ্রের তেজে মধ্যভাগ, বরুণের তেজে জংঘা ও উরু, পৃথিবীর তেজে নিতম্ব, ব্রহ্মার তেজে পদযুগল।… মহাদেব দিলেন শূল, কৃষ্ণ দিলেন চক্র, শঙ্খ দিলেন বরুণ, অগ্নি দিলেন শক্তি… (দ্রঃ হংসনারায়ণ, ১৯৮০, ১৭৫) এই হলো বিপদনাশিনী দেবীমাতা দুর্গা। দুর্গতি হতে ত্রাণ করেন বলেই দেবীর নাম হয়েছে দুর্গা। রাজ্যভ্রষ্ট রাজা যুধিষ্ঠির বিপদ থেকে মুক্তিলাভ করার জন্য মা দুর্গার আরাধনা করেছিলেন বলে মহাভারতের বিরাট পর্বের ষষ্ঠ্যাধ্যায়ে উল্লেখ আছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে দেবী দুর্গা মহাশক্তিরই প্রতীক। সেই মহাশক্তিকেই তারা প্রতিমার মধ্য দিয়ে চিন্ময়ী ব্রহ্মশক্তিকে দর্শন করে। তাই এই পূজা প্রতিমাকে পূজা করা নয়, প্রতিমাতে পূজা করা। যুগাবতার শ্রীরামকৃষ্ণদেব বলতেন, চিকের আড়ালে দেবী সর্বদাই রহিয়াছেন। চিকের আড়ালে যিনি আছেন, তিনি মহাশক্তি দেবী দুর্গা। শাকম্বরী অবতারে তিনি দুর্গম নামের মহাশুরকে বধ করে দুর্গাদেবী নামে প্রসিদ্ধা হয়েছেন। আবার ভক্তদের অনুভবে ‘চিকের’ আড়ালে থাকা মহাশক্তি ভক্তদের দুর্গতি নাশ করেন, তাই তিনি দুর্গা। দুর্গা পূজা মূলত অনুষ্ঠিত হয় মার্ক-েয় পুরাণের ভিত্তিতে; দেবী পুরাণ, কালিকা পুরাণ, বৃহৎ নন্দিকেশ্বর পুরাণ, দুর্গাভক্তিতরঙ্গিনী, দেবী ভাগবত প্রভৃতি গ্রন্থের ভিত্তিতে। এই গ্রন্থগুলো অনেক পুরানো। তার থেকে নির্বাচিত সাতশ’টি শ্লোক নিয়ে যে সংক্ষিপ্ত মার্ক-েয় পুরাণ করা হয়েছিল তাকেই বলা হয় ‘দুর্গাশপ্তশতী’, কথ্য ভাষায় বলা হয় শ্রীশ্রীচ-ী। চ-ীর বর্ণনা অনুযায়ী, দুর্গম নামক অসুরকে বধ করায় মায়ের নাম হয়েছে দুর্গা। দুর্গম অসুরের কাজ ছিল জীবকে দুর্গতিতে ফেলা। দুর্গমকে বধ করে যিনি স্বর্গ বিতাড়িত দেবগণকে হৃতরাজ্য ফিরিয়ে দেন এবং জীবজগতকে দুর্গতির হাত থেকে রক্ষা করেন তিনি মা দুর্গা। এছাড়া মহিষমর্দিনী, শূলিনী, পার্বতী, কালিকা, ভারতী, অম্বিকা, গিরিজা, বৈষ্ণবী, কৈৗমারি, বাহারী, চ-ী, লক্ষ্মী, উমা, হৈমবতী, কমলা, শিবাণী, যোগনিদ্রা প্রভৃতি নামে ও রূপে মায়ের পূজা হয়ে থাকে। আশ্বিনের শুক্লাষষ্ঠী থেকে শুক্লানবমী পর্যন্ত দেবী দুর্গার পূজা হয়ে থাকে। দেবীর সঙ্গে যুক্ত হয় আসুরিক শক্তির বিরুদ্ধে বিদ্যাবিজ্ঞানদায়িনী দেবী সরস্বতী, সর্বৈশ্বর্য প্রদায়িনী দেবীলক্ষ্মী, সর্বসিদ্ধিদাতা গণেশ, বলরূপী কার্তিক এবং ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন ত্যাগ ও  বৈরাগ্যের মূর্তবিগ্রহ দেবাদিদেব মহাদেব। এ যেন একই সঙ্গে শক্তি, জ্ঞান, ঐশ্বর্য, সিদ্ধি, বল ও বৈরাগ্যের এক অপূর্ব সমাবেশ। ষষ্ঠীতে দেবীর ষষ্ঠাদিকল্প অর্থাৎ আবাহন, বোধন, আমন্ত্রণ, অধিবাস প্রভৃতি অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। যষ্ঠীতে সন্ধ্যাকালে দেবীর বোধন হয়। শাস্ত্রমতে, দেবীর বোধন হয় বিল্ববৃক্ষে বা বিল্বশাখায়। সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত প্রতিমায় দেবীর অর্চনা করা হয়ে থাকে। সপ্তমীতে অন্যতম অনুষ্ঠান নবপত্রিকা প্রবেশ কদলীবৃক্ষসহ আটটি উদ্ভিদ এবং জোড়াবেল একসঙ্গে বেঁধে শাড়ি পরিয়ে বধূর আকৃতির মতো তৈরি করে দেবীর পাশে স্থাপন করা হয়, প্রচলিত ভাষায় একে কলাবউ বলে। অষ্টমীতে বিশেষ অনুষ্ঠানÑ অষ্টমী ও নবমী তিথির সন্ধিতে আটচল্লিশ মিনিটে দেবীর বিশেষ পূজা ‘সন্ধিপূজা’। অষ্টমী তিথিতে কোনো কুমারী বালিকাকে পূজা করা হয়। নবমীতে হোমযজ্ঞের দ্বারা পূজার পুণ্যাহৃতি দেয়ার রীতি। দশমী তিথিতে হয় দেবীর বিসর্জন। এই দশমী তিথি বিজয়াদশমী নামে খ্যাত। সনাতন ধর্মের পূজা অনুষ্ঠানগুলোতে এবং বিভিন্ন প্রতিমার রূপ কল্পনায় মূলশক্তি হলো আত্মশক্তি। যাকে সংস্কৃততে বলে ‘আত্মানাং বিদ্ধি’ অর্থাৎ নিজেকে জান বা আত্মাকে জান। দুর্গা সাধকের নিজের এবং বিশ্বের মূল মহাশক্তি। ঋষি বেদব্যাস পরম ব্রহ্মের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে বলেছেন, তুমি রূপ বিবর্জিতা; আমি ধ্যানে তোমার রূপ কল্পনা করেছি। অপরূপকে রূপময়, অনির্বচনীয়কে বচনীয় এবং সর্বব্যাপীকে স্থানিক করা হয়েছে সর্বলোকের কল্যাণের জন্য। আমাদের ঋষিকবিরা মানুষের মধ্যকার সুরশক্তির ও অসুরশক্তির দ্বন্দ্বের কথা এবং পরিণামে অসুরশক্তির বিনাশ ও সুরশক্তির জয়ের কথা ধর্মগ্রন্থে রূপকে বর্ণনা করেছেন। সব দেবতার তেজরাশির সমনি¦ত শক্তিরূপই মহাশক্তি দুর্গা।

লেখক: সাধারণ সম্পাদক, সাধু নাগ মহাশয় আশ্রম, দেওভোগ, নারায়ণগঞ্জ।

 

Comment Heare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *