আজ: বৃহস্পতিবার | ২৬শে নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ১১ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | ১১ই রবিউস সানি, ১৪৪২ হিজরি | রাত ২:২০

সংবাদের পাতায় স্বাগতম

দুর্নীতিমুক্ত চিকিৎসা সেবা চায় না’গঞ্জবাসী

ডান্ডিবার্তা | ২৩ জুন, ২০২০ | ২:০৮

হাবিবুর রহমান বাদল
বিশেষ প্রতিবেদন
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনার পরও দুই মাস সাংসদ শামীম ওসমান প্রধানমন্ত্রীর দফতরসহ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দৌড় ঝাপের পর অবশেষে নারায়ণগঞ্জ ৩শ’ শয্যার করোনা হাসপাতালে আইসিইউ’র বেড এসেছে। ইতিমধ্যে আইসিইউ’র যন্ত্রপাতি আসলেও বেডের অভাবে এরই মধ্যে নারায়ণগঞ্জ ও আশেপাশের এলাকার অনেকেই না ফেরার দেশে চলে যেতে হয়েছে। সোনারগাঁয়ের স্ত্রীকে নিয়ে রাজধানীর হাসপাতালের পর হাসপাতাল ঘুরে অবশেষে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে অসুস্থ্য স্ত্রীকে শান্তনা দেয়ার ছবি গণমাধ্যমে আলোচিত হয়েছে। শুধু আইসিইউ নয়, নারায়ণগঞ্জের এই হাসপাতালটির দুর্নীতির আখড়ায় পরিনত হয়েছে। আর এই দুযোর্গময় সময়ে কীট নিয়েও চলেছে প্রতারণা। একটি চক্র নারায়ণগঞ্জ হাসপাতাল চালুর পর থেকেই লুটেপুটে খেয়ে যাচ্ছে। অবস্থা এমন এক পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছিল যে, সাংসদ শামীম ওসমানকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দ্বারস্থ পর্যন্ত হতে হয়। শুধু তাই নয়, এই হাসপাতালের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি সাংসদ সেলিম ওসমান দুর্নীতি বন্ধে তদন্ত কমিটি গঠনসহ দুদকের দ্বারস্থ হওয়ার মত কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারন করে হাসপাতালের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার সাথে জড়িতদের চিহিৃত করার আহবান জানিয়েছেন। দেশব্যাপী এই অদৃশ্য শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রথম সারির যোদ্ধারা যখন অনেকটা সংগ্রামের মধ্যদিয়ে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন তখন নারায়ণগঞ্জে করোনা চিকিৎসায় জড়িত ডাক্তারদের আরাম আয়েশে থাকার জন্য নারায়ণগঞ্জ ক্লাব কর্তৃপক্ষ ক্লাবের গেষ্ট হাউজে সকল কক্ষ ছেড়ে দেন। সাংসদ সেলিম ওসমান নার্স ও স্বাস্থ্য সেবকদের জন্য থাকা খাওয়া এমনকি বিনোদনেরও ব্যবস্থা করেন। দুই সাংসদ এত কিছু করেছেন, শুধু মাত্র নারায়ণগঞ্জবাসী যেন এই দুযোর্গ মূহুর্তে স্বাস্থ্যসেবা পান। অথচ এই দুযোর্গকালীন সময়ে হাসপাতাল সুপারের অবসরে যাওয়া পিএ একটি চক্র তৈরী করে হাসপাতালটিকে লুটপাটের আখড়ায় পরিনত করেছে। হাসপাতালের যন্ত্রাংশ চুরিকালে সাংসদ সেলিম ওসমান তা আটকের পর সমস্ত হাসপতালের প্রবেশ পথে সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়। অথচ এই চক্রটি সেই সিসি ক্যামেরাগুলি অচল করে দেয়। সর্বশেষ কীট নিয়ে শুরু করে ষড়যন্ত্র। হাসপাতালে কীট নেই এই অযুহাতে পরীক্ষা বন্ধ হলেও নারায়ণগঞ্জেই বিশ কয়েকটি প্যাথলজিতে ৫/৬ হাজার টাকায় গত ৭দিন করোনার নমুনা পরীক্ষা চলেছে। এই ধরণের লুটপাটের ফলে নারায়ণগঞ্জবাসী শুধু চিকিৎসা বঞ্চিত হয়নি বরং বর্তমান সরকার ও সরকার প্রধান শেখ হাসিনার ইমেজকে ক্ষুন্ন করার ষড়যন্ত্রের সাথে এরা জড়িত বলে নারায়ণগঞ্জবাসী মনে করে। এতকিছুর পরও অবশেষে গতকাল সোমবার দুপুরে সেই কাঙ্খিত আইসিইউ বেড এসে পৌছলেও এর সেবা পেতে আরো সপ্তাহ খানেক সময় লাগবে বলে হাসপতাল সুপার ডা. গৌতম রায় জানান। নারায়ণগঞ্জে করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা সেবায় এতদিন ধরে নিবিড় পর্যবেক্ষন কেন্দ্র (আইসিইউ) সেবা না থাকায় অনেকেই ঢাকায় বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা নিয়েছেন আবার অনেকে মারাও গেছেন। দীর্ঘ সময়ে নারায়ণগঞ্জ করোনা হাসপাতালে আইসিইউ সেবা চালু করলে না পারলেও আগামী ৭ দিনের মধ্যেই সেই সেবা চালুর ঘোষণা দিয়েছেন। সাংসদ শামীম ওসমান জানান, নারায়ণগঞ্জের আরো দুটি প্রাইভেট ক্লিনিক যেখানে আইসিইউ সেবার ব্যবস্থা আছে কিন্তু এতদিন এসব স্থানে করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়নি, এ’দুটি ক্লিনিক আজ থেকে করোনা আক্রান্ত রোগীদের সেবা দিবেন বলে নিশ্চিত করেছেন। এর আগে দীর্ঘ দুই মাসের বেশি সময় ধরে আইসিইউ সেবা চালু করতে পারেনি নারায়ণগঞ্জ করোনা হাসপাতাল। এতে করোনা আক্রান্ত রোগীরা নানা সমস্যায় ভোগেন। আইসিইউ এর অন্যান্য সরঞ্জাম আসলেও বেডের অভাবে হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিট চালু করতে পারেননি কর্তৃপক্ষ। শামীম ওসমান বলেন, জাতির জনকের কন্যাই একমাত্র নেত্রী যিনি শুধু আওয়ামীলীগ নয় পুরো দেশের নেত্রী। তিনি এমন একজন মানুষ যিনি বলতে পারেন পুকুরের পাড় কেটেই পুরো পুকুর খননের বাজেট নেয়া হচ্ছে। আওয়ামীলীগের কয়েকজন সংসদ সদস্যসহ অনেকেই চলে গেছেন, জানিনা আমরা কতদিন থাকবো। করোনায় না হোক যেকোন ভাবে আমাদেরকে একদিন চলে যেতে হবে। তার আগে আমাদেরকে অবশ্যই এমন কাজ করে যেতে হবে যেন আমরা আল্লাহকে খুশি করতে পারি। শামীম ওসমান আরো বলেন, কোন ধরনের অভিযোগ শুনতে চাইনা। আমার ভাই সেলিম ওসমান ভালো মানুষ উনি হাসপাতালের ডাক্তার নার্সদের জন্য অনেক কিছু করেছেন। নিজ খরচে হাসপাতালের অনেক উন্নয়ন কাজ করেছেন। আমি শামীম ওসমান তার মতো করতে পারিনি আর আমি তার মতো না। সুতরং কেই দুই নাম্বারি যদি করেন তাহলে তিনি নারায়ণগঞ্জে থাকতে পারবেন না। নারায়ণগঞ্জে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তে স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগের মতে গত ১০৪ দিনে মৃত্যুর সংখ্যা ১০৭ জনে দাঁড়ালেও জেলার বিভিন্ন স্থানে করোনা উপসর্গে আরো অনেকের মৃত্যু ঘটেছে যার হিসাব স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে নেই। গতকাল সোমবার দিন ভর শহর ঘুরে মনে হয়নি নারায়ণগঞ্জ শহরে করোনা ভাইরাসের প্রার্দুভাব আছে। শহরের সর্বত্র শত শত মানুষের ভীড়ে যানবাহনের সংখ্যাধিক্য সেই সাথে সিংহভাগ মানুষকে কোন প্রকার স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলতে দেখা যায়নি। নারায়ণগঞ্জে মাত্র ৮০ দিন আগেও করোনায় আক্রান্ত হয়ে কোন মৃত্যু ছিল না। আক্রান্তের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩ জন। সেখানে ৮০ দিনের ব্যবধানে গতকাল ২২ জুন সোমবার করোনায় আক্রান্ত হয়ে ১০৭ জন মৃত্যুবরণ করেছে বলে জেলা সিভিল সার্জন ডা. ইমতিয়াজ নিশ্চিত করেছেন। একই সংগে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৭শ’ জনে। যদিও নারায়ণগঞ্জে করোনার নমুনা পরীক্ষা দেশের অন্যান্য এলাকার মত একই অবস্থা। এরই মধ্যে গত ৮০ দিনে লকডাউনের নামে সাধারণ ছুটি ভোগ করে সাধারণ মানুষ একের পর এক আক্রান্ত হয়েছে। আসলে নারায়ণগঞ্জে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা কত তা সঠিক ভাবে বলা যাচ্ছেনা কারণ সে পরিমাণ নমুনা পরীক্ষা হচ্ছে না। তবে নারায়ণগঞ্জে ভয়াবহ অবস্থা প্রথম থেকেই ছিল বলে শুরুতেই হটস্পট হিসাবে ঘোষনা করা হয়। এবারও নতুন করে রেড জোনের যে ১০ জেলার তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে নারায়ণগঞ্জ তার মধ্যে অন্যতম। নারায়ণগঞ্জে করোনা ভাইরাস ভয়াবহ রূপ নিতে থাকে তখন সাংসদ শামীম ওসমান ঢিলেঢালা লকডাউনের বদলে কঠোর লকডাউন দাবি করে নারায়ণগঞ্জবাসীকে ঘরে থাকার জন্য হাতজোর করে অনুনয় বিনয় করেন। মেয়র সেলিনা হায়াত আইভী একই দিন লকডাউন না দিয়ে কারফিউ দেয়ার দাবি জানিয়েছেন। লকডাউন সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে উল্লিখিত তিনটি বিষয়ে প্রস্তুত থাকতে হবে। জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করতে হবে। যাতে যেসব এলাকায় লকডাউন দেয়া হবে সেসব এলাকার লোকজন যাতে তার প্রয়োজনীয় সামগ্রী যথা সময়ে পাওয়াসহ সঠিক চিকিৎসা পান সে ব্যবস্থা করতে হবে। মোটকথা করোনা ভাইরাস মোকাবিলার ক্ষেত্রে রয়েছে সমন্বয়ের বড়ো ঘাটতি। এ কারণে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা করোনা রোগীর পাশে যান না। তারা মাস্ক ও পিপিইর মান নি¤œমানের কারণে ভয়ে আছেন। অনেক ডাক্তারও করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। যদিও নারায়ণগঞ্জে ডাক্তারসহ স্বাস্থ্য কর্মীদের থাকা খাওয়াসহ বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা ইতিমধ্যে করা হয়েছে। তারপরও সাধারণ মানুষ চিকিৎসা পাচ্ছেন না এমন অভিযোগ অহরহ শুনা যাচ্ছে। তবে নারায়ণগঞ্জবাসীর প্রত্যাশা নারায়ণগঞ্জ ৩শ’ শয্যা হাসপাতালে ১০টি আইসিইউ স্থাপনসহ হাসপতালের চিকিৎসার মান আরো বাড়বে পাশাপাশি ফতুল্লা, সোনারগাঁ, আড়াইহাজার ও বন্দরবাসীসহ সমগ্র নারায়ণগঞ্জ জেলাই শুধু নয় আশেপাশের জেলাবাসীও সুচিকিৎসা পাবে। পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ ৩শ’ শয্যা হাসপাতালটি জাপানী অনুদানে একটি বিশেষায়িত্ব হাসপাতাল নিমার্ণ করার পর অদ্যাবধি যারা বিভিন্ন কায়দায় লুটপাট করে হাসপাতালটিকে রোগীতে পরিনত করেছে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত পূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবে এমনটাই প্রত্যাশা করছে সমাজের বিবেকবান মানুষ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *