News

নতুন বউ হয়ে এসেই ভাষা আন্দোলনে জড়ান রতœাগর্ভা নাগিনা জোহা

ডান্ডিবার্তা | 20 February, 2020 | 11:30 pm

ডান্ডিবার্তা রিপোর্ট
ইতিহাস প্রসিদ্ধ ও শিল্প সমৃদ্ধ নারায়ণগঞ্জ স্মরণাতীত কাল থেকেই রাজনীতিতে অনবদ্য ভূমিকা পালন করে আসছে। বলা হয়ে থাকে ‘নারায়ণগঞ্জ ইজ দ্য পলিটিক্যাল হান্টিং গ্রাউন্ড অব বেঙ্গল’। রাজধানী ঢাকার অতি সন্নিকটবর্তী হওয়ায় প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামের ঢেউ এসে আছড়ে পড়তো নারায়ণগঞ্জে। অথবা কোন কোন আন্দোলনের উৎসও ছিল নারায়ণগঞ্জ। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে হাল আমলের প্রতিটি জন সমর্থিত আন্দোলনে নারায়ণগঞ্জের ভূমিকা ছিল উলে¬খ করার মতো। ৫২’র ভাষা আন্দোলনেও নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি সচেতন মানুষ পালন করেছে উজ্জল ও সংগ্রামী ভূমিকা। সেময় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রামে যাঁরা সাহসী ভূমিকা পালন করেছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম মিসেস নাগিনা জোহা। ভাষা সৈনিক রত্মগর্ভা নাগিনা জোহা ২০১৬সালের ৭ মার্চ মৃত্যুবরণ করেন। নাগিনা জোহা ১৯৩৫ সালে অবিভক্ত বাংলার বর্ধমান জেলার কাশেম নগরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁদের পরিবারের পূর্ব পুরুষদের নামানুসারে গ্রামটির নামকরণ করা হয়। বাবা আবুল হাসনাত ছিলেন সমাজ হিতৈষী। বড় চাচা আবুল কাশেমের ছেলে আবুল হাশিম ছিলেন অল বেঙ্গল মুসলীম লীগের সেক্রেটারী ও এমএলএ। নাগিনা জোহা ১৯৫০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদালয়ের অধীনে মেট্টিক পাশ করেন। ১৯৫১ সালে নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবার ওসমান পরিবারের সন্তান রাজনীতিবিদ একেএম শামসুজ্জোহার সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। স্বামীর বাড়িতে নতুন বউ হিসেবে এসেই ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। তাঁর শ্বশুর তৎকালিন এমএলএ খান সাহেব ওসমান আলীর চাষাঢ়ার ঐতিহাসিক বাড়ি ‘বায়তুল আমান’ ছিল সকল আন্দোলন সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দু। মৃত্যুর আগে জীবদ্দশায় স্মৃতির পাতা আউড়িয়ে নাগিনা জোহা বলেন, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে নারায়ণগঞ্জের জনসাধারন ও ছাত্র সমাজ এক অনন্য ভূমিকা পালন করে। বস্তুত: ফেব্রুয়ারীর প্রথম থেকেই এখানে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। খান সাহেব ওসমান আলী, শামসুজ্জোহা, মফিজউদ্দিন আহমেদ, শফি হোসেন খান, আজগর হোসেন ভূঁইয়া, বজলুর রহমান, সুলতান মাহমুদ মলি¬ক, শামছুল হুদা, মোস্তফা সারোয়ারসহ আরো অনেকে এ কমিটিতে অন্তর্ভূক্ত হয়ে ঢাকার সাথে তাল মিলিয়ে রাষ্ট্রভাষা বাংলার জন্য রাজপথে আন্দোলন করতে থাকেন।
৪ ফেব্রুয়ারী ঢাকার ছাত্র ধর্মঘটের আহ্বানে নারায়ণগঞ্জের সমস্ত স্কুল কলেজে ধর্মঘট পালিত হয়। সেসময় আন্দোলন সংগ্রামের দিক নির্দেশনামূলক সভাগুলি বায়তুল আমানেই অনুষ্ঠিত হতো। যদিও আমি নববধূ তথাপি আগত নেতকর্মীদের আপ্যায়ণ ও কিছু বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নোট বা ড্রাফট করার দায়িত্ব আমার উপরই ছিল। সামসুজ্জোহার কোন চিরকুট লোক মারফত যথাস্থানে পৌছে দেওয়ার দায়িত্বও আমার উপর ছিল। যেহেতু বাবার বাড়িতে ছোট বেলা থেকেই রাজনৈতিক পরিমন্ডলে বড় হয়েছি আবার শ্বশুর বাড়িতে এসেও সেই পরিবেশ। তাই কোন কোন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আমার সাহায্য নেওয়া হতো। সে কারণে আমাদের বাড়ি বায়তুল আমান ছিল পুলিশী নির্যাতনের লক্ষ্যবস্তু। নাগিনা জোহা বলেন, ‘২১ ফেব্রুয়ারীর রাষ্ট্রভাষা দিবসকে সফল করতে নারায়ণগঞ্জের ছাত্র সমাজসহ আপামর জনতা ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করে। হ্যান্ডবিল বিতরণ করা হয়, হাতে লিখা পোস্টার লিখে দেয়ালে দেয়ালে সাটানো হয়। ওইদিন নারায়ণগঞ্জের সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পূর্ণ ধর্মঘট পালিত হয়। ঘরের চৌহদ্দি পেরিয়ে সেদিন আমরা কিছু মহিলাও রাজপথের বিক্ষোভ মিছিলে শরীক হয়েছিলাম।’ রাজপথের মিছিলে সম্মুখভাগে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন মফিজউদ্দিন আহমেদ, আজগর হোসেন ভূঁইয়া, বজলুর রহমান, সুলতান মাহমুদ মলি¬ক, শামছুল হুদা, মোস্তফা সারোয়ার, শফি হোসেন খাঁন, মমতাজ বেগম, মোস্তফা মনোয়ার, জানে আলম, আলমাছ আলী (বড়) প্রমুখ। বিকেলে রহমত উল্লাহ ক্লাবে জনসভা হয়। ঢাকায় গুলি করে ছাত্র হত্যা করা হয়েছে, শহীদ হয়েছে রফিক, বরকত, শফিক, জব্বারসহ বহু লোক এমন খবরে নারায়ণগঞ্জের মানুষও বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। সন্ধ্যার দিকে বায়তুল আমানে লোকজন জড়ো হতে থাকে পরবর্তী করণীয় কী তা জানার জন্য। এদিকে আমার স্বামী শামসুজ্জোহাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করার জন্য কিছুদিন ধরেই ওৎ পেতে ছিল। জোহাও এটা বুঝতে পেরে গা ঢাকা দিয়ে আন্ডারগ্রাউন্ডে থেকেই নেতাকর্মীদের আন্দোলন সংগ্রামের দিক নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছিলেন। পরে তাঁর বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করা হয়। তিনি বলেন, ‘২১ ফেব্রুয়ারী সন্ধ্যায় প্রচুর লোক মিটিং করছে এ খবর পেয়ে পুলিশ বায়তুল আমানে হামলা করে। পুলিশ আমাদের বাসায় এসে জোহাকে খুঁজতে থাকে গ্রেপ্তারের জন্য। তখন বাসায় জড়ো হওয়া অনেক নেতাকর্মীরা যে যেভাবে পেরেছে সটকে পড়েছে। একজন লোক আত্মরক্ষার জন্য গাছে উঠেছিল তাকে সিপাহীরা টেনে হিঁচড়ে নামিয়ে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। আমাদের পরিবারের সবাই বিশেষ করে শিশুরা ভয়ে তটস্থ। সে এক বিভৎস অবস্থা। আমরা ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে বসে আছি। এমন সময় প্রচুর সিপাহী এসে দরজা খুলতে বললে আমরা খুলিনি।’ যদিও নতুন বউ তথাপি রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হিসেবে মনে সাহস সঞ্চয় করে পরিবারের সবাইকে ছাদে চলে যেতে বললাম। আমি ও আমার শ্বশুর ওসমান আলী সাহেব দুজনে দরজা আগলে রাখলাম। শ্বশুর সাহেবকেও বলেছিলাম উপরে চলে যেতে কিন্তু তিনি আমাকে একা ফেলে যাননি। ওদিকে সিপাহীরা দরজায় বুট দিয়ে লাথি মেরে ভাঙার চেষ্টা করছিল। আমরা সেটাকে আগলে রাখার চেষ্টা করছিলাম। সবেমাত্র বিয়ে হয়েছে আমার হাতে স্বর্নের ও কাচের চুড়ি ছিল। দরজা যেন ভাঙতে না পারে তার জন্য শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে দরজার উপর শরীর ও বাহু চেপে রেখেছিলাম। উল্টাদিক থেকে বুটের জোরালো লাথির আঘাতে আমার চুড়িগুলি হাতের মধ্যে বিধে গিয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। একপর্যায়ে তারা দরজা ভাঙতে সক্ষম হয়। ভিতরে ঢুকে সিপাহীরা সমস্ত বাড়ি তল্লাশি করে তছনছ করে খান সাহেব ওসমান আলীকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। আমি একসময় উত্তেজিত হয়ে সিপাহীদের সাথে তর্কযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ি। তারা আমাকেও গ্রেপ্তার করতে চাইলে এক বাঙালি সিপাহীর অনুরোধে রেখে যায়। পরে নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে আমিও জোহার (স্বামী) সঙ্গে আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যাই। ৯ মাস আন্ডাারগ্রাউন্ডে থেকে স্বামীকে নিয়ে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে আত্মসমর্পণ করাই।

[social_share_button themes='theme1']

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *