আজ: শনিবার | ২৪শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ৮ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | ৭ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪২ হিজরি | বিকাল ৩:০৪

সংবাদের পাতায় স্বাগতম

যেভাবে আত্মগোপনে ছিলেন মামুন

ডান্ডিবার্তা | ০১ অক্টোবর, ২০২০ | ৭:২৯

ডান্ডিবার্তা রিপোর্ট
পিতার সাথে রাগ করে বাড়ি থেকে পালান চাঁদপুরের মতলব থানা এলাকার মোঃ আবুল কালামের ছেলে মামুন। রাজশাহী ও নাটোর সহ বিভিন্ন জায়গায় ছোটখাটো কাজ করেছেন কিন্তু বাড়ি আসেননি। এদিকে তার বাবা আবুল কালাম বাদী হয়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানায় সদ্ধিগ্নদের নামে অপহরণ মামলা করে দেন। আর এই মামলায় জেল খেটেছেন ৬ জন। সেই সাথে দীর্ঘ ৪ বছর ধরে এই মামলার ঘানি টেনে চলছেন একটি পরিবার। এরই মধ্যে হঠাৎ করে বাড়িতে এসে তাকে অপহরণের দায়ে নারায়ণগঞ্জ ফতুল্লা থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। পরে তাদের আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতে হাজির হলেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। সৃষ্টি হয় তোলপাড়। গতকাল বুধবার নারায়ণগঞ্জ আদালতপাড়া এই ঘটনা ঘটে। এতদিন কোথায় ছিলেন কিভাবে ছিলেন বাড়ি থেকে কেন পালিয়ে গিয়েছিলেন জানতে চাইলে মামুন বলেন, কাজকর্মের কথা বলায় অভিমান করে বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিলাম। এত বছর বাড়িতে কোনো যোগাযোগ করি নাই। রাজশাহী নাটোর বিভিন্ন জায়গায় থেকে ছোটখাটো কাজ করছি। হোটেলে কাজ করেছি। আমি জানতাম না মামলা করা হয়েছে। বাড়িতে এসে শুনলাম মামলার কথা। যাদেরকে আসামী করা হয়েছে তাদের সাথে তেমন কোনো সম্পর্ক ছিল না। পাড়া প্রতিবেশি ছিল। মেয়ের সাথে কোনো সম্পর্ক ছিল না। এমনিতেই বান্ধবী ছিল। কি কারণে মামলা করেছে সেটা আমার পরিবার জানে। আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সালের ১০ মে মামুন অপহরণ হয়েছে অভিযোগ এনে দুই বছর পর ২০১৬ সালের ৯ মে ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা করেন বাবা আবুল কালাম। ওই মামলায় ৬ জনকে বিবাদী করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে মামুনকে অপহরণের পর গুমের অভিযোগ করা হয়েছিল। বিবাদীরা হলো তাসলিমা, রকমত, রফিক, সাগর, সাত্তার, সোহেল। মামলার পর পুলিশ অভিযুক্ত ৬জনকেই গ্রেপ্তার করে। তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। অভিযোগ রয়েছে রিমান্ডে থাকা সময়ে গ্রেপ্তারকৃত ৬ জনকে মারধর করা হয়। এবং ৬জনকেই ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী প্রদানের জন্য আদালতে পাঠানো হয়। কিন্তু তাদের কেউ আদালতে জবানবন্দী দেয়নি। ওই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন ফতুল্লা মডেল থানার এস আই মিজানুর রহমান। তিনি আদালতে আসামীদের রিমান্ড চাওয়ার সময়ে আর্জিতে উল্লেখ করেন, ‘খালাতো বোন তাসলিমা ২০১৪ সালের ১০ মে মামুনকে ডেকে নিয়ে কৌশলে অপহরণ করে বিষাক্ত শরবত পান করিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে লাশ শীতলক্ষ্যায় ফেলে দিয়ে গুম করেছে।’ পরবর্তীতে মামলাটি পুলিশের অপরাধ বিভাগ সিআইডিকে ন্যস্ত করা হয়। সিআইডি সহকারী পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ ২০১৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর মামলার চার্জশীট আদালতে দাখিল করেন। এতে মামলার এজাহারভুক্ত ৬জনকেই অভিযুক্ত করেন। সাক্ষী করা হয়েছিল ২১ জনকে। চার্জশীটে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৪ সালের ১০ মে খালাতো বোন তাসলিমাকে দিয়ে কৌশলে মামুনকে বাড়ি ডেকে আনা হয়। পরবর্তীতে মামনুকে বিয়ের প্রস্তাব দেয় তাসলিমা। কিন্তু বিয়েতে রাজী না হওয়াতে বিবাদী ৬ জন মিলে মামুনকে কোমল পানির সঙ্গে চেতনানাশক দ্রব্য খাইয়ে অচেতন করে সিএনজি চালিতা অটো রিকশা করে অপহরণ করে অজ্ঞাতস্থানে নিয়ে যায়। তবে কোথায় কিভাবে কি অবস্থায় রাখা হয়েছে সেটা জানা যায়নি।’ ঘটনার বিবরণে মামলার অন্যতম আসামী চাঁদপুরের মতলব থানা এলাকার রকমত আলীর মেয়ে তাসলিমা বলেন, ‘আমাকে একই এলাকার মোঃ আবুল কালামের ছেলে মামুন পছন্দ করতো। আমাকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু আমি সাড়া দেয়নি। পরে আমি আমার ভাইদের সাথে খালার বাড়ি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকায় চলে আসি। কয়েকদিন পর আমি বাড়ি চলে যাই। বাড়ি চলে যাওয়ার পর আমার বিয়ে হয়ে যায়।’ এদিকে মামুন তার পরিবারের সদস্যদের সাথে অভিমান করে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। কিন্তু মামুনের বাবা আবুল কালাম আমি সহ আমার খালু রকমত, ভাই রফিক, খালাতো ভাই সোহেল ও সাগর এবং আমার মামা সাত্তার আসামী করে মামলা দায়ের করে। আর এই মামলায় আমি ও আমার ভাই এক বছর ধরে জেল খাটে। বাকীরা সবাই এক মাস করে জেল কাটে। ‘‘জেলে থাকাবস্থায় আমাদের উপর অনেক নির্যাতন নিপীড়ন করা হয়। আমাকে গর্ভাবস্থায় জেল খাটতে হয়েছে। দফায় দফায় রিমান্ডে নিয়ে জবানবন্দী আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু আমরা জবানবন্দী দেয়নি। কারণ আমরা এই ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত না। এরই মধ্যে মামুন আদালতে উপস্থিত হয়েছে।’’ মামলার বিবাদী পক্ষের আইনজীবী সুপ্রীম কোর্টের অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ এমদাদ হোসেন সোহেল জানান, ফতুল্লা থানায় তাদেরকে রিমান্ডে নিয়েছে। ফৌজদারী ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী নেয়ার জন্য তাদেরকে বারবার চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে এবং মেরে রক্তাক্ত করেছে তৎকালিন কর্মকর্তা মিজানুর রহমান। কিন্তু জবানবন্দী আদায় করতে পারে নাই। পরবর্তীতে তারা জেলা ও দায়রা জজ থেকে জামিন নিয়েছে। তাসলিমা ও রফিক হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়েছে। একজন আইনজীবী হিসেবে আমার বক্তব্য হচ্ছে, একটা মিথ্যা মামলা করে সাধারণ মানুষকে দিনের পর দিন হয়রানী করলো। তদন্তকারী কর্মকর্তা একটা রিপোর্ট দিল। এই রিপোর্ট কিসের ভিত্তিতে দিল। দীর্ঘদিন ধরে এই গরীব মানুষগুলো জেল কাটল। আজ আদালতে গিয়ে দেখি ভিকটিম হাজির। আদালত ভিকটিমকে বাদীর আইনজীবীর জিম্মায় দিয়েছে। এই ধরনের ভুয়া মামলায় পুলিশ অফিসার ও তদন্তকারী কর্মকর্তারা যেন সতকর্তার সাথে যেন তদন্ত করে। এই মানুষগুলোর হয়রানীর জন্য আমি রাষ্ট্রপক্ষের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবী করছি। তদন্তকারী কর্মকর্তা রাষ্ট্রের একজন লোক। সেই সাথে মিথ্যা মামলার জন্য বাদীর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়ার দাবী জানাচ্ছি। বাদী পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. শেখ ফরিদ জানান, আমার মক্কেল কাউকে আসামী করে মামলা করেননি। একটি অজ্ঞাতনামা মামলা করেছিলেন। কিন্তু পরে তদন্তকারী কর্মকর্তা আসামী হিসেবে তাদের নাম যোগ করেন। মামলাটি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন ছিল। এরই মধ্যে ভিকটিম ফিরে আসেন এবং আমরা তাকে নিয়ে আদালতে হাজির। আদালত ভিকটিমকে আমার জিম্মায় দিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *