Home » শেষের পাতা » না’গঞ্জ থেকে কুমিল্লা যাবে রেললাইন

রোজিনার কারাবাসের নেপথ্যে কারা?

২১ মে, ২০২১ | ১০:৩৭ পূর্বাহ্ণ | ডান্ডিবার্তা | 428 Views

হাবিবুর রহমান বাদল

সুবিধাবাদি নেতাদের কারণে পেশাজীবী গণমাধ্যম কর্মীরা এখন অনেকটাই বিপাকে। প্রথম আলোর সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম গতকাল বৃহস্পতিবার আদালত থেকে জামিনে মুক্তিপাবে এমনটাই ধারণা ছিল পেশাদার গণমাধ্যম কর্মীদের। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের আকার ইঙ্গিত অনেকটা এমনটাই ছিল। কিন্তু গতকাল বৃহস্পতিবার রোজিনা ইসলামের জামিনের শুনানী হলেও আদেশ দেয়ার জন্য আদালত আগামী রবিবার দিন ধার্য করেছেন। অর্থাৎ আগামী রবিবার পর্যন্ত রোজিনাকে কারাবাস করতে হবে। সব সম্ভবের দেশ বাংলাদেশের জনগণের অর্থ আত্মসাত করে যারা কোটি কোটি টাকার মালিক বনেছে তাদের অবৈধ অর্থ আত্মসাতের তথ্য সংবাদপত্রে প্রকাশের আক্রোশে রোজিনা হাজতবাস করলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের সেইসব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা বহাল তবিয়তে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে দিন যাপন করছে। সারা দেশের সংবাদ কর্মীরা এই মিথ্যা অপবাদের প্রতিবাদে মাঠে নামলেও সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের টনক নড়েনি। আদালত রবিবার পর্যন্ত রোজিনার জামিনের আদেশ ঝুঁলিয়ে রেখেছে। খোদ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, এ বিষয়ে দেশ বিদেশে তাকে ব্যখ্যা দিতে হচ্ছে। বুধবার পর্যন্ত শীর্ষ পর্যায়ের সরকারের মন্ত্রীরা এমনকি ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক নিজেও বলেছেন, রোজিনা ইসলামের প্রতি আদালত নিশ্চয়ই সুবিচার করবে। দেশবাসী তথা গণমাধ্যম কর্মীরা আদালতের জামিনের আদেশ রবিবার পর্যন্ত ধার্য করায় অনেকটাই হতাশ। দেশের গণমাধ্যম কর্মীদের অনৈক্যের সুযোগে রোজিনার মত অনুসন্ধানী ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম কর্মীকে কারাবাস করতে হচ্ছে। এর আগে সচিবালয়ের মত গুরুত্বপূর্ন স্থানে রোজিনাকে ৫ ঘন্টারও বেশী সময় আটকে রেখে বিভিন্ন ভাবে হেনস্তা ও নির্যাতন চালানোর পরও আমাদের সাংবাদিক নেতারা অনেকটাই গা-ছাড়া ভাব দেখিয়েছে। বর্তমান প্রজন্মের গণমাধ্যম কর্মীরা মাঠ পর্যায়ে আন্দোলন সংগ্রামের পাশাপাশি সেচ্ছায় কারাবরণের আবেদন পর্যন্ত জানিয়েছে। সেক্ষেত্রে সাংবাদিক নেতারা তেমন কোন কার্যকর ভ’মিকা পালন করেননি। গত এক দশকে আমাদের দেশে গণমাধ্যম কর্মীদের কিছু অংশ দ্রুত স্বচ্ছল তথা ধনী হওয়ার প্রতিযোগিতায় এমন ভাবে কাজ করে চলেছে যে কারণে তাদের এখন আর গণমাধ্যম কর্মী বলা চলে না। সংবাদপত্রে কিংবা বিভিন্ন মাধ্যমে দিনের পর দিন কোন প্রকার সংবাদ না করেও অনেকেই এখন সাংবাদিক নেতা বনে কোটিপতি হয়েছে। অথচ এক সময় বিত্তবৈভব কিংবা অর্থের মোহে সাংবাদিক নেতাদের করায়ত্ব করা যেত না। যা এখন নিজেরাই প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে। দু:খজনক হলেও এইসব বিত্তবান হওয়ার প্রতিযোগি নেতাদের কারণেই রোজিনাকে হাজতবাস করতে হচ্ছে। এখনও সময় আছে বর্তমান সময়ের পেশাদার এই প্রজন্মের সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে এইসব নেতাদের বর্জন করে ঐক্যবদ্ধ ভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। অন্যথায় রোজিনার মত ভাগ্য বরণ করতে হবে আপোষহীন পেশাদার সাংবাদিকদের। এ ক্ষেত্রে বলা চলে স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরেও এমন ঘটনা দেখা যায়নি। তথাকথিত গোপন নথি চুরি করার অভিযোগে একজন সাংবাদিককে গলাটিপে ধরার ঘটনা নজিরবিহীন। তাও তিনি যদি একজন নারী সাংবাদিক হন। রোজিনা ইসলামকে যেভাবে হেনস্তা করা হয়েছে তা দেখে দেশের মানুষ হতবাক, বিস্মিত। নেটমাধ্যমে যেসব ছবি ঘুরে বেড়াচ্ছে তা দেখে বিবেকবান কোনো মানুষই বিচলিত না হয়ে পারেন না। তাই প্রতিবাদ উঠেছে দেশ-বিদেশে। বাংলাদেশে ইতিপূর্বে একজন সাংবাদিককে হেনস্তা বা গ্রেপ্তারের ঘটনায় এমন প্রতিবাদ, ধিক্কার আমার পঞ্চাশ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে দেখিনি। রাজনীতিতে এমন ঘটনা বিরল নয়। সিনিয়র সাংবাদিক রোজিনার অপরাধ কি? বলা হচ্ছে, তিনি নাকি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে নথি চুরি করার চেষ্টা করছিলেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের দাবী, রোজিনা করোনার টিকা নিয়ে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত চুক্তির গোপন নথিপত্র সরানোর চেষ্টা করছিলেন। এসময় একজন অতিরিক্ত সচিব ও একজন পুলিশ কর্মীর হাতে তিনি ধরা পড়েন। নেটমাধ্যমে দেখা গেল, মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মী কীভাবে রোজিনার গলা টিপে ধরছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেছেন, এসব নথিপত্র প্রকাশ পেলে নাকি রাষ্ট্রের বড় ক্ষতি হয়ে যেত। কি আছে এসব চুক্তিতে, যেটা প্রকাশ করলে রাষ্ট্রের ক্ষতি হয়ে যাবে? এটা কি কোনো গোপন চুক্তি? অন্য কোনো দেশে হলে রাষ্ট্র নিজেই প্রকাশ করে দিত। কী আর বলবো, এই রাষ্ট্রে আলু-পটল চাষের ফাইলেও ‘গোপনীয়’ লেখা থাকে। তর্কের খাতিরে মানলাম, রোজিনা নথি সরাচ্ছিলেন। তাই বলে তাকে মাটিতে ফেলে গলা টিপতে হবে কেন? আইন নিজের হাতে নেয়ার অধিকার তো রাষ্ট্র কাউকে দেয়নি। রাষ্ট্র এতোটা অমানবিক হবে কেন। শুনেছি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে যখন এই তা-ব চলছিল তখন ভেতর থেকেই প্রতিবাদ হয়েছে। অনেকেই তখন বলেছেন, এটা ভাল হচ্ছে না। আমি বুঝিনা, রোজিনাকে পাঁচঘণ্টা আটকে রেখে হেনস্তার খবর যখন চারদিকে জানাজানি হয়ে গেল তখনও সংশ্লিষ্টরা ঘুমিয়ে ছিলেন কেন। তাকে চিকিৎসা না দিয়ে রিমান্ডে নেয়ার আর্জি দেখে অবাক না হয়ে পারিনি। যাইহোক, বিচারক এতে সায় দেননি। জামিন দিলে হয়তো সর্বমহলে এমন প্রতিক্রিয়া হতো না। প্রশ্ন উঠেছে- এতে করে কার, কি প্রাপ্তি? সরকারের লাভ-ক্ষতিই বা কি? এক কথায় বলা যায়, সরকার কিছুই পায়নি, নিন্দা ছাড়া। মনে হচ্ছে, হিসেবে বড় গোলমাল হয়ে গেছে। কেউ কেউ বলছেন, একজন রোজিনাকে হেনস্তা করে অন্যদেরকে বার্তা দেয়া। দুর্নীতির খবর লিখতে আসলে এমন পরিণতিই হবে। রাজনীতিতে এমনটা হয়। সাংবাদিকরা এটা মানবেন না বোধ করি সংশ্লিষ্টরা এটা বুঝতে পারেননি। এটা বারবার প্রমাণিত হয়েছে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে গলাটিপে হত্যা করা যায় না। এমনিতেই বাংলাদেশে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্র ছোট হয়ে আসছে। অনেকেই বলছেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ করা উচিৎ। কেন তিনি পদত্যাগ করবেন? তিনিতো আর একাই এ কাজটি করেননি। তাছাড়া এদেশে পদত্যাগের ঘটনা হাতেগোনা। রোজিনা ইসলাম তার লেখনীর মাধ্যমে সরকারকে সহযোগিতা করতে গিয়ে আমলাদের চক্ষুশূল হয়ে হাজতবাস করছে। আমাদের সাংবাদিক নেতারা আকারে ইঙ্গিতে এই হাজতবাসকে অনেকটাই সমর্থন করছেন বলে সাধারণ মানুষ মনে করেন। এমতাবস্থায় সুবিধাভোগি মেরুদন্ডহীন সাংবাদিক নেতাদের বিরুদ্ধে পেশাদার সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদের মিছিলকে দীর্ঘায়িত করার এখনই সময়। অন্যথায় সৎ ও নিষ্ঠাবান পেশাদার সাংবাদিকদেরও সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে রোজিনার মত ভাগ্য বরণ করতে হতে পারে।

 

Comment Heare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *