আজ: শনিবার | ২৪শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ৮ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | ৭ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪২ হিজরি | দুপুর ২:৪০

সংবাদের পাতায় স্বাগতম

শামীম ওসমানের চোখের জল ত্রাণকর্তা হলেন প্রধানমন্ত্রী

ডান্ডিবার্তা | ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০ | ৭:২৮

ডান্ডিবার্তা রিপোর্ট
ফতুল্লার তল্লায় মসজিদে বিস্ফোরণের পরদিনই ঘটনাস্থলে ছুটে যান স্থানীয় সাংসদ শামীম ওসমান। সেদিন তিনি ওই ঘটনায় নাশকতার শংকাও করেন। যদিও সবগুলো সংস্থার তদন্তে নাশকতার কোন প্রমাণ মেলেনি। তবে দাপুটে এ সাংসদের যে হৃদয় কেঁদেছিল সেটা সেদিন প্রতীয়মান হয়েছিল বক্তব্য দেওয়ার সময়ে প্রবল আবেগতাড়িত ও চোখের কোনে নোনা জলের দৃশ্যে। সে রাতেই একটি বেসরকারী টিভি চ্যানেলও এ সম্পর্কিত কথা বলতে গিয়ে রীতিমত জল ঝরান। পরে কয়েকদিন তাঁরই নির্দেশে নারায়ণগঞ্জ শহর যুবলীগের সভাপতি শাহাদাত হোসেন সাজনু ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ান ও খাবারের ব্যবস্থা করেন। ক্রমশ সেটা বন্ধ হয়ে যায়। কিছু সংগঠন ও ব্যক্তি অর্থনৈতিক সহযোগিতা করেন। এগিয়ে আসে মডেল গ্রুপ। এখন পর্যন্ত বেসরকারীভাবে সবচেয়ে বড় সহায়তাটি করেন তারা। প্রত্যেক পরিবারকে দেন ৫০ হাজার টাকা করে। স্থানীয়দের প্রতি কিছুটা ক্ষোভও আছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর। তারা সংবাদ সম্মেলন করেছেন। প্রতিনিয়ত জানাচ্ছেন আক্ষেপের কথা। কারণ যাদের পরিবারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত তাদের বেশীরভাগই নি¤œ আয়ের মানুষ। ধনী জেলা হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জ। কিন্তু এ জেলার ব্যবসায়ীরা তেমনভাবে এগিয়ে আসেন তল্লার ঘটনায়। ধনকুবেরা একেবারেই নীরব ছিলেন। যদিও নানা ক্ষেত্রে আবার তাদের ডোনেশন প্রদানের খবরও আসছে গণমাধ্যমে। কিন্তু এখন পর্যন্ত ৩৪ জনের মৃত্যু আর ২জন চিকিৎসাধীন থাকলেও ধনাঢ্যরা এগিয়ে আসেন। হাত থেকে বের হয়নি কোন টাকা। এ অবস্থায় আবারো ত্রাণকর্তা হয়ে এসব ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে এসে দাঁড়ালেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর ঘোষণাতেই সকলের মনে স্বস্তি। এক পরিবারের একজন সদস্য শুক্রবার স্পষ্টই বললেন, ‘সবাই শুধু রাজনীতি আশ্বাস দিলেন আর প্রধানমন্ত্রী আমাদের ত্রাণকর্তা হয়ে দাঁড়ালেন। ঘোষণা দিলেন ৫ লাখ টাকা করে প্রদানের। কিন্তু নারায়ণগঞ্জে কোটিপতিরা কিছুই করেনি। শুধু দূর থেকে দেখলেন। পোড়া গন্ধ তাদের নাকে যায়নি। কানে কড়া করে পৌছায়নি স্বজন হারানোদের আর্তনাদ। হৃদয় ছুয়েনি মানবেতর জীবন যাপনের নিষ্ঠুর গল্প।’ নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দিন বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পক্ষে আমি একটি আবেদন দিয়েছিলাম। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী পাঁচ লাখ টাকা করে দিয়েছেন। চেকগুলো আগামী রোববার দুপুরে হস্তান্তর করা হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ অনুদান প্রধানমন্ত্রী তার ব্যক্তিগত ত্রাণ তহবিল থেকে দেন। প্রধানমন্ত্রীর সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিঞা এ বিষয়ে ফাইল প্রস্তাব করেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষতিগ্রস্ত সকল পরিবারকে পাঁচ লাখ টাকা করে দেওয়ার জন্য আজ বিকেলে প্রধানমন্ত্রী এ সংক্রান্ত ফাইলে স্বাক্ষর করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিঞা পরে আমাকে জানিয়েছেন।’ ৪ সেপ্টেম্বর দুর্ঘটনার পরদিন ৫ সেপ্টেম্বর বাইতুস সালাত জামে মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনায় গভীর তদন্ত চেয়েছিলেন স্থানীয় এমপি শামীম ওসমান। তিনি বলেন, ‘এটা দুর্ঘটনা বা নাশকতা আমি কোনটিই বলবো না। কিন্তু আমি নাশকতার বিষয়টিকেও ফেলে দিচ্ছি না। আমার আশংকা করছি এটা।’ তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘ঘটনাটিকে তুচ্ছভাবে দেখার সুযোগ নাই। এটা ছোট কোন জিনিস না। শুধু গ্যাসের কারণেই এত বড় বিস্ফোরণ ঘটেছে এটাকেই প্রাধান্য দিয়েই শেষ করা যাবে না। কারণ এর আগেও আমাদের উপরেও ১৬ জুন বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। সে কারণেই আমি বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্তের জন্য সংশ্লিষ্টদের আহবান জানাচ্ছি।’তিনি বলেন, ‘আমি কোন এক্সপার্ট না। আমি সে কারণেই এক্সপার্টদের দিয়ে গভীরভাবে তদন্তের কথা বলছি। রাসায়নিক পরীক্ষা করতে পারে এ ধরনের লোকজনদের সম্পৃক্ত করা উচিত। এটা এসির বিস্ফোরণ কি না সেটাও তদন্ত করা উচিত। তবে সচরাচর এসির গ্যাস সিলিন্ডার থাকে বাইরে। সেটা ভেতরে বিস্ফোরণ কথা না। তাছাড়া গ্যাসের কথা বলা হচ্ছে। যদি এতই গ্যাসের রিজার্ভ থাকতো তাহলে সেটা তো মাগরিবের সময়ে কিংবা এশার আগে দরজা খোলার কারণে বের হয়ে যেত। আমি সরজেমিন এসব দেখে আমার মনের মধ্যে বার বার বিষয়টি উঠে আসছে যে গভীর তদন্ত প্রয়োজন। এক্সপার্টদের তদন্ত দরকার।’ শামীম ওসমান বলেন, ‘যেহেতু অনেক ঘটনা ঘটেছে। আমার উপর ১৬ জুনের বোমা হামলা হয়েছিল। হযরত শাহজালাল রহ. এর মাজারে হামলার পরিকল্পনা হয়েছিল। আমি বলছি না এর সঙ্গে যোগসূত্র রয়েছে। তবে আমি এর গভীর তদন্ত হতে হবে। কারণ এসির সিলিন্ডার থাকে বাইরে। বিস্ফোরণ ঘটলে বাইরে থাকবে। আর গ্যাসের লাইন বাইরে। আর ভেতরে থাকলেও কতটুকু গ্যাস জমে থাকলে এত বড় বিস্ফোরণ ঘটবে সেটা তদন্ত করে দেখা উচিত। আর আল্লাহর ঘরে তো কেউ সিগারেটে আগুন ধরায়নি। তাছাড়া অনেক প্রশ্নও সামনে চলে আসে। কারণ বিস্ফোরণ ঘটলে এক কোনায় ঘটতে পারতো। কিন্তু পুরোটায় ছড়ালো কিভাবে।’ তিনি বলেন, ‘দয়া করে এ ঘটনায় কোন পারসেপশন তৈরি করবেন না। প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন জরুরী।’ তেজদীপ্ত বক্তব্যে পরিপক্ক তিনি। সহজেই আবেগপ্রবণ হতে দেখা যায়নি তাঁকে। তবে এবার নিজ সংসদীয় আসনের একটি মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনার পর সরেজমিন পরিদর্শনের সময়ে নিহত ও আহতদের কথা স্মরণ করতে দিয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেনি। প্রভাবশালী এ এমপিকে থেমে যেতে হয়েছিল কয়েকবার। চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় পানি না ধরলেও চোখের কোন বেয়ে পড়েছিল ক’ ফোটা। পানিকে চোখ হয়ে উঠেছিল লাল বর্ণের। কথার জড়তায় বোঝা যাচ্ছিল ফেঁটে যাচ্ছে দোর্দান্ড এ প্রভাবশালীর গহীন হৃদয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তল্লায় মসজিদ ট্র্যাজেডিতে হতাহত পরিবারগুলোর প্রতি বাড়িয়ে দিলেন সহায়তার হাত। প্রতিটি পরিবারকে ৫ লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন। আর্তপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোটা বঙ্গবন্ধুর কন্যার কাছে নতুন যদিও নয়। তবুও নারায়ণগঞ্জবাসী প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। তল্লাবাসী ও নারায়ণগঞ্জের সুধীমহলের মতে, প্রধানমন্ত্রী শুরু থেকেই তল্লায় মসজিদ ট্রাজেডির ঘটনায় পোড়া রোগীদের খেয়াল রাখেন। উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দেন। বিনামূল্যে শেখ হাসিনা বার্ণ ইনস্টিটিউটে ৩৭ জন পোড়া রোগীর চিকিৎসা হয়েছে। শরীরের ৭০ শতাংশের বেশি পোড়া থাকায় ও শ্বাসনালী পুড়ে যাওয়ায় আধুনিক চিকিৎসা সত্ত্বেও এ যাবত ৩৪ জনের মৃত্যু ঘটেছে। একজন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে পেরেছেন। বাকী ২ জনের চিকিৎসা চলছে আইসিইউ ইউনিটে। ঘটনার পরপরই আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি তাঁদের আর্থিক সহযোগিতা করলেন। প্রধানমন্ত্রীর আর্থিক সহায়তার খবরে তল্লাবাসী তাদের প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। তিনি শত ব্যস্ততার মধ্যেও তল্লার আগুণে পোড়া রোগীদের খোঁজ খবর রেখেছেন। মহান সংসদে দাঁড়িয়েও ঘটনার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সারাক্ষণ বার্ণ ইনস্টিটিউটের পরিচালকের কাছে রোগীদের অবস্থা ও চিকিৎসার খবর নিয়ে বার বার উন্নত চিকিৎসার কথা বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী হাজারো কাজের ভিড়ে নারায়ণগঞ্জবাসীর সেন্টিমেন্টকে গুরুত্ব দিয়েছেন। এবার আর্থিক অনুদান দিলেন। যারা মারা গেছে তাদের লাশ কফিনবন্দি থেকে শুরু দাফন কাফনের ব্যবস্থাও করেছিলেন। এবং সে সময় লাশ নেয়ার জন্য স্বজনদের নগদ টাকাও দেয়া হয়েছিল। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কথা তিনি ভোলেননি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *