আজ: মঙ্গলবার | ৪ঠা আগস্ট, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ২০শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | ১৪ই জিলহজ, ১৪৪১ হিজরি | রাত ১২:২০

সংবাদের পাতায় স্বাগতম

সন্ত্রাসের জনপথ মদনপুরে ১৯ খুন!

ডান্ডিবার্তা | ১৫ জানুয়ারি, ২০২০ | ৮:৪৫

নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দরের উত্তরাঞ্চল খ্যাত মদনপুর জন সাধারনের কাছে এক আতংকের নাম। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, পরিবহন সেক্টর, জমি দখলসহ মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে প্রতিনিয়ত ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার মত ঘটনা এমনকি মানুষ হত্যা যেন স্বাভাবিক বিষয়ে পরিনত হয়েছে। এমন একটা সময় গেছে মদনপুরের মুরাদপুর, চাঁনপুর, ফুলহর, হরিপুর এলাকায় সাধারন মানুষ প্রবেশ করতে সাহস পেত না। ত্রাস, খুন, চাঁদাবাজিসহ নানা অপ্রিতিকর ঘটনার ফলে নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দরের উত্তরাঞ্চল সন্ত্রাসী ও অন্ধকার নগরীতে পরিনত হয়েছিল। নতুন করে সে মদনপুর আবার খবরের শিরোনামে এসেছে। ২০১৯ সালের শুরু থেকেই ক্রাইম জোন খ্যাত মদনপুর ফের উত্তপ্ত হয়। শ্রমিক শাকিল নিহত, পুলিশ সদস্য আহতসহ তৎময়ে বন্দর থানার অফিসার ইনচার্জ আজাহার হোসেনকে প্রত্যাহার করে নেয় জেলা পুলিশ সুপার। গত বছর হতে এ রির্পোট লেখা পর্যন্ত মদনপুরের নাম নিতে অনেকে আতকে উঠে। পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ ও এলাকায় একক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বন্দরের মদনপুরে ইউপি সদস্য খলিলুর রহমানকে কুপিয়ে জখম করার ঘটনার রেশ না কাটতেই তার বাহিনী মাদক ব্যবসায়ীকে ছাড়িয়ে নিতে পুলিশের উপর হামলা করে। গত বছরের ১২ জানুয়ারির সংঘর্ষের এই ঘটনায় পাল্টাপাল্টি গুলি বিনিময় হয়। এতে শাকিল নামের এক যুবক নিহত হয় ও বাবু নামের আরেকজন গুলিবিদ্ধ হওয়ায় চিকিৎসাধীন ছিল। এদিকে আহত পুলিশের দুই সদস্য দেবাসীশ ও মনোয়ার বন্দর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। দেবাসীশের মাথায়, মুখে ও শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। সন্ত্রাসী ও মাদক বিক্রেতাদের হাতে পুলিশ রক্তাক্ত জখম হলেও বহাল তবিয়তে ঘটনার মূলহোতা খলিল ওরফে বরকি খলিল মেম্বার। এককালের সন্ত্রাসের জনপদখ্যাত বন্দরের উত্তরাঞ্চল তথা মদনপুরে খলিল বাহিনীর উত্থানের পর পুনরায় আতংকের জনপথে পরিনত হয়েছে। কামু-সুরত আলী বাহিনীর অবসান হলেও নব্যগডফাদার রুপে নিজেকে জাহির করতে বেপোরয়া হয়ে উঠেছে খলিল মেম্বার ওরফে বরকি খলিল। খলিল মেম্বারদের দ্বন্দে লাভবান হচ্ছে চতুর প্রকৃতির ফেস্টুনধারী নেতা অহিদুজ্জামান অহিদ। দলীয় কোন পদ বা পদবী না থাকলেও বন্দর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এম এ রশিদের পরিচয় দিয়ে মদনপুরের অনেকাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। বর্তমানে শিল্পপতি এম জামাল উদ্দিনের কাছের লোক বলে অহিদ বেশ পরিচিত। এম জামাল উদ্দিন বিএনপির এমপি প্রার্থী ছিল। জামায়াত কানেকশন আছে বলেও অভিযোগ আছে। এম এ সালাম ইউনিয়ন পরিষদের ১ম বার চেয়ারম্যান হওয়ার পর এম জামাল উদ্দিনের সাথে বিরোধ দেখা দেয়। যে কারনে অহিদুজ্জামান অহিদকে কাছে নেন জামাল উদ্দিন। জানা গেছে,  গত বছরের ১২ জানুয়ারি সন্ধ্যায় মদনপুরে একটি রেষ্টুরেন্ট থেকে খলিল মেম্বারের মাদক সিন্ডিকেটের নূর নবী ও রিফাত নামের ২ জনকে পুলিশ গ্রেফতার করে। এ খবর স্থানীয়ভাবে ছড়িয়ে পড়লে খলিল মেম্বারের সহযোগী চাঁনপুর এলাকার মতিনের ছেলে সুজন, দিপু, মাইনুদ্দিন, সেলিম, মুকুল, হান্নান, মনির, কানা মতিন, মারুফ, আনোয়ারসহ ২৫/৩০ জন এসে পুলিশকে ঘিরে রাখে। তারা আটক দুইজনকে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। এসময় পুলিশ বাধা দিলে পুলিশের উপর হামলা করে মাদক ব্যবসায়ীরা। হামলাকারীরা পুলিশের কাছ থেকে ওয়ারলেস সেট ছিনিয়ে নেয়। পরে প্রচন্ড চাপের মুখে রাত সাড়ে ১০ টার দিকে খলিল মেম্বার উপস্থিত থেকে পুলিশের ওয়ারলেস সেট ফেরত দেয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দুই পাশে চাঁনপুর ও ফুলহর গ্রামের মদনপুর বাসস্ট্যান্ডের নেতৃত্বের লড়াইয়ে গত ১৯ বছরে দুইগ্রুপের মধ্যে দুই নারীসহ ১৯ জন খুন হয়েছেন। এই দুই গ্রামের মধ্যে প্রতিনিয়ত রক্তপাতের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। একসময়ে আতঙ্কের নাম ছিল মদনপুর। মদনপুরের নাম শুনলেই আঁৎকে উঠতো সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা। বন্দর উত্তরাঞ্চলের মদনপুর এলাকার ভয়ঙ্কর শীর্ষ সন্ত্রাসী বাহিনীর প্রধান কামরুজামান কামু ও সুরুত আলী মারা যাওয়ার পর গত ৫-৭ বছর এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকা- নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। মদনপুর এলাকার এক শিল্পপতির পৃষ্ঠপোষকতায় চাঁনপুর গ্রামের মৃত ইয়াসিন মিয়ার ছেলে কাবিলা এক সন্ত্রাসী বাহিনী গঠন করে। আস্তে আস্তে সে পরিবহন সেক্টর ও স্থানীয় রেলওয়ের জমিতে গড়ে ওঠা দোকানপাটের চাঁদাবাজি তার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। এসব সেক্টর থেকে প্রতিমাসে ৭০-৮০ লাখ টাকার চাঁদার ভাগ বসাতে খলিল মেম্বার চাঁনপুর এলাকায় এক বাহিনী গঠন করে। এরপর থেকে চাঁদার টাকা উত্তোলন নিয়ে দুইগ্রুপ মুখোমুখি অবস্থান নেয়। এ নিয়ে খলিল ও কাবিলা গ্রুপের মধ্যে একাধিকবার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। তারা দুইগ্রুপই ক্ষমতাসীন দলের আশীর্বাদপুষ্ট। খলিল মেম্বার মদনপুর ইউনিয়ন ৫নং ওয়ার্ডে দুইবার নির্বাচিত হন। তিনি ওই ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের স্ব-ঘোষিত সভাপতি। অন্যদিকে কাবিলা বন্দর উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান মুকুলের লোক বলে জানা যায়। এলাকাবাসী জানান, ২০০০ সালের আগে উপজেলার মদনপুর মুরাদপুর গ্রামের কামালউদ্দিনকে ট্রাক চাপা দিয়ে হত্যা করে প্রতিপক্ষ। এ হত্যাকা-ের পর থেকে কামালউদ্দিনের ছেলে কামরুজ্জামান কামু বদলা নিতে সন্ত্রাসী কার্মকা-ে জড়িয়ে পড়ে। এ কর্মকা-ে অতিষ্ঠ হয়ে প্রতিপক্ষ গ্রুপ সন্ত্রাসী কামুকে না পেয়ে তার মা ফুলবিবিকে কুপিয়ে হত্যা করে। পিতা ও মাতার হত্যার বদলা নিতে আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে কামু। তার সন্ত্রাসী কর্মকা-ে যোগ দেয় তার ছোট ভাই নুরুজ্জামান নুরা, মনিরুজ্জামান মনু, বড় ভাই বাবুল আক্তার ও আবুল হোসেন। পুরো মদনপুর এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। সন্ত্রাসী আধিপত্য বিস্তার ও পরিবহন সেক্টরের চাদাবাজির ভাগ বসাতে প্রতিপক্ষ হিসেবে অবস্থান নেয় চাঁনপুর গ্রামের স্বর্ণ মিয়ার ছেলে সুরুত আলী। এ নিয়ে কামু বাহিনী সুরুত আলীর ভাই দলিল লেখক বাতেনকে হত্যা করে। এরপর থেকে মদনপুর এলাকায় একের পর হত্যাকা- রক্তপাতের মধ্য দিয়ে সন্ত্রাসীদের এক রামরাজত্ব প্রতিষ্ঠা হয়। সুরুত আলী ও কামু দুই বাহিনীর মধ্যে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে। যাকে যেখানে পাওয়া যেত সেখানেই হত্যা করা হতো। সুরুত আলী বাহিনীর হাতে কামরুজ্জামান কামুর ছোট ভাই নুরুজ্জামান নুরা ও বড় ভাই বাবুল আক্তার খুন হয়। ওই হত্যাকা-ের কয়েক মাস পর কামুর বড় বোন নিলুফা বেগমকে তুলে নিয়ে হাত-পায়ের রগ কেটে নির্মমভাবে হত্যা করে লাশ ফেলে দেয় সুরুত আলী বাহিনী। এরপর কামুর ছোট বোন রেহানা বেগমকে তুলে নিয়ে লাশ টুকরা টুকরা করে নদীতে ভাসিয়ে দেয়। এখনো লাশের সন্ধান মেলেনি। এভাবে কামু বাহিনীর সদস্য ঘোড়া দেলোয়ার, ফুলহরের শাহজাহান ও তার ছেলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী মাসুদকেও খুন করা হয়। সর্বশেষ খুন করা হয়েছে ফুলহর গ্রামের ব্যবসায়ী রিপনকে। একইভাবে সুরুত আলী বাহিনীর সদস্য জুলহাস, সামছুল হক, সুমন ও তার ভাই দলিল লেখক বাতেনকে হত্যা করে কামু বাহিনী। এ ছাড়াও কামুর বড় ভাই আবুল হোসেন ও ফুলহর গ্রামের আলী আহম্মদের ছেলে মুকবুল পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছে। কামুর দুই ভাই ও দুই বোনের হত্যার প্রতিশোধ নিতে সুরুত আলীকে নয়াপুর এলাকায় প্রকাশ্যে হত্যা করে শরীর থেকে মাথা কেটে নিয়ে যায় কামুর বড় ভাই আবুল হোসেন। কামু স্বাভাবিক মৃত্যু ও সুরুত আলী নিহত হওয়ার পর মদনপুরের নেতৃত্ব চলে আসে চাঁনপুর এলাকার মৃত ইয়াসিন মিয়ার ছেলে বিএনপির সক্রিয় নেতা কাবিল ওরফে কাবিলার হাতে। কাবিলা উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান মুকুলের লোক বলে পুলিশ প্রশাসন থেকে রক্ষা পায়। সরকারী দলের ব্যানার সাটিয়ে খলিল ওরফে বরিশাইল্লা খলিল মেম্বার কাবিলার স্থলাভিষিক্ত হয়। কাবিলার পুরো বাহিনী খলিলের হয়ে কাজ করে। কাবিলা অর্ন্তরালে থাকলেও খলিল মেম্বার মদনপুরের পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি, মাদক পাঁচার ও বিক্রির সিন্ডিকেট, ডাকাতির একটি দলও গঠন করে। পুলিশের উপর হামলা চালিয়ে গত বছরের ১৮ নভেম্বর স্বর্ণের দোকানে লুটপাট করে প্রায় ২ কোটি টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে যায় খলিল বাহিনী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *