Home » প্রথম পাতা » পদ্মা সেতু জাতির আরেক বিজয়

সিদ্ধিরগঞ্জে রেন্ট-এ-কার স্ট্যান্ডে চাঁদাবাজির নয়া কৌশল

২১ মে, ২০২২ | ১০:১৪ পূর্বাহ্ণ | ডান্ডিবার্তা | 47 Views

ডান্ডিবার্তা রিপোর্ট

সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল মোড়ের রেন্ট-এ-কার স্ট্যান্ডটি দীর্ঘদিন থেকে চাঁদাবাজির উৎস স্থল হিসেবেই পরিচিত। সাত খুনের ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত আসামি নুর হোসেন অপরাধ জগতের এ সা¤্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। সাত খুনের ঘটনায় নুর হোসেন কারাগারে থাকলেও থেমে নেই এর চাঁদাবাজি। এরপর থেকে এর নিয়ন্ত্রন নিতে একাধিক সংঘর্ষ, হামলা মামলার ঘটনা ঘটেছে। এর আধিপত্য ধরে রাখতে নানা কৌশল অবলম্বন করছেন একাধিক সিন্ডিকেট। ক্ষমতাশীল দলের ছত্রছায়ায় থেকে তারা নামে বেনামে ওই সিন্ডিকেটের মূলহোতা সেজে জিম্মি করে রেখেছে গাড়ির মালিকদের। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে রেন্ট-এ-কার এর ব্যবসা পরিচালনার নামে প্রতিমাসে লাখ লাখ টাকা চাঁদা উত্তলন হচ্ছে। আর নিজেদের গাড়ি ভাড়ায় চালাতে বাধ্য হয়েই গাড়ির মালিকগন চাঁদাবাজদের চাঁদা দিচ্ছে। চাঁদার টাকা পুলিশ, ট্রাফিক ও প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। এদিকে বর্তমান রেন্ট-এ-কার পরিচলনা কমিটি নিয়ে উঠেছে নানা বিতর্ক। পূর্বের কমিটি বহাল থাকার পরও ক্ষমতাশীল দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ ও থানা পুলিশকে ম্যানেজ করে আরেকটি পরিচালনা কমিটি গঠন করে রেন্ট-এ-কার দখলে নেয় বর্তমান কমিটির জসিম, ফারুক ও খোরশেদ। এনিয়ে কয়েক দফা সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। পূর্বের কমিটির অভিযোগ তারা ক্ষমতাশীল দলের হলেও বর্তমানে অবৈধ এই কমিটির নেতৃবৃন্দ পুলিশ ও দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দদের অনৈতিকভাবে ম্যানেজ করে এই স্ট্যান্ডটি পরিচালনা করছে। যাদেরর কমিটি বৈধ তারা স্ট্যান্ড থেকে বিতাড়িত। এদিকে বর্তমান কমিটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন মো. জসিম উদ্দিন, মো. ফারুক হোসেন ও খোরশেদ আলম। তারা নিজদের এই কমিটির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে পরিচয় দিয়ে আসছেন। তাদের নেতৃত্ব নিয়েও গাড়ির মালিকদের রয়েছে নানা ক্ষোভ। গাড়ির মালিকরা নাম না প্রকাশের শর্তে বলছেন, এর আগের কমিটি তাদের জন্য মঙ্গল ছিলো। যদিও সবাই চাঁদা তুলতো। কিন্তু তারা গাড়ির মালিকদের কল্যানে কাজ করতো।  তাদের অভিযোগ পূর্বের কমিটি বিলুপ্ত না করে বর্তমানে নতুন করে একটি প্রস্তাবিত কমিটির অনুমোদনের জন্য জোর সুপারিশ করেছেন সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ¦ মজিবুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক আলহাজ¦ মো. ইয়াসিন মিয়া। তাদের প্রশ্ন ওই দুই নেতা কার কাছে জোর সুপারিশ করেছেন অনুমোদন দেয়ার জন্য। অদ্যবদি পর্যন্ত কেউ এ কমিটির অনুমোদন দেয়নি। অথচ যাদের গাড়ি, যারা মালিক কেউ এ বিষয়ে অবগত নন। কার অনুমোদনে  মো. জসিম উদ্দিন, মো. ফারুক হোসেন ও খোরশেদ আলমের কমিটি তাদের বৈধ দাবি করে। অপরদিকে থানা পুলিশের ভুমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তারা কিভাবে চাঁদাবাজদের অবৈধ কর্মকান্ড ও তাদের বৈধতা দিয়ে নিজেদের সাথে সম্পৃক্ত করে নিয়েছেন। সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ওসির সাথে প্রায় সময়ই দেখা যায় তাদের ঘনিষ্ঠতা। একটি ইফতার মাহফিলেও দেখা যায় সস্মুখ সারিতে পুলিশের কর্মকর্তাদের কাছাকাছি অথচ অনেক সিনিয়র ও গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ অবহেলিত ছিলো ওই অনুষ্ঠানে। সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের শীর্ষ ওই দুই নেতার জোর সুপারিশের সাক্ষর করা প্রস্তাবিত কমিটির একটি কপি এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। এই কমিটির মধ্যে সিদ্ধিরগঞ্জ আওয়ামী লীগের ৬ জন শীর্ষ নেতাকে উপদেষ্টা করে ১৫ সদস্যের একটি প্রস্তাবিত কার্যকরী কমিটি গঠন করা হয়েছে। এদিকে ১৫ সদস্য বিশিষ্ট কার্যকরী কমিটির সদস্যদের মধ্যে দু’জনের নাম পাওয়া যায়নি। তবে ওই প্রস্তাবিত কমিটিতে সাক্ষর করে জোর সুপারিশ করেন থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। থানা আওয়ামী লীগের শীর্ষ দুই নেতার জোর সুপারিশ করা ওই কমিটির কপি সাক্ষর করে রিসিভ করেন সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মশিউর রহমান। অনুসন্ধানে জানা গেছে, শিমরাইল মোড়ে অবৈধ রেন্ট-এ কারের ব্যবসা পরিচালনা করা হচ্ছে মহাসড়কের পাশে পানি উন্নয়ন বোর্ডের খালি জায়গাতে। একসময় এ জায়গাটিতে জলাশয় ছিল। সাত খুনের ঘটনায় ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত আসামী নুর হোসেন জোর করে কাউকে তোয়াক্কা না করেই এ জায়গাটিতে বালু ভরাট করে। বালু ভরাটের পর সেখানে নুর হোসেন ভাড়ায় চালিত বিভিন্ন ধরনের গাড়ির একটি প্রতিষ্ঠান তৈরী করে যার নাম দেয়া হয় রেন্ট-এ কার। সেই থেকেই এ রেন্ট-এ কার ষ্ট্যান্ডে ভর্তি বাবদ মোটা অংকের এককালীন অর্থ আদায়সহ প্রতিটি গাড়ি থেকে মাসিক চাঁদা আদায় চলছে।  বর্তমানে রেন্ট-এ কার থেকে প্রতি মাসে ২ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করছেন জসিম ফারুক গং। শিমরাইল মোড় এলাকায় সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে গাড়ির চালকরা ফারুককে চাঁদাবাজ ও থানা পুলিশের সোর্স হিসেবেই চিনেন। রেন্ট-এ কার স্ট্যান্ডে প্রতিদিন সন্ধ্যার পর থেকে তাস, লুডু থেকে শুরু করে আইপিএল ক্রিকেট জুয়া খেলা হয়। লেনদেন হয় মোটা অংকের টাকা। এমন অভিযোগ রেন্ট কার স্ট্যান্ডের গাড়ি মালিক ও চালকদের। অভিযোগ রয়েছে এই রেন্ট-এ কার স্ট্যান্ডের গাড়ি দিয়ে মাদক পাচারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। দেশের বিভিন্ন জেলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে এ স্ট্যান্ডের একাধিক গাড়ি মাদকসহ আটক হয়েছে। জানা গেছে এই রেন্ট-এ কারের কিছু গাড়ি চলছে অনিয়মিত নামসর্বস্ব দৈনিক পত্রিকা ও অনুমোদনহীন টিভি চ্যানেলের স্টিকার লাগিয়ে। যার শেল্টার দিয়ে থাকেন চাঁদাবাজ ফারুক। বিভিন্ন অপরাধীরা মিডিয়া স্টিকার লাগানো এসব গাড়ি ভাড়া নিয়ে চালকদের ম্যানেজ করে ছিনতাই ও মাদক পাচার করছে। বর্তমান কমিটি ও প্রস্তাবিত কমিটিকে ঘিরে শিমরাইল মোড় এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। সেখানে যে কোন সময় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশংঙ্কা করছেন গাড়ির চালক ও হেলপাররা। স্ট্যান্ড নিয়ন্ত্রন নিয়ে ইতি পূর্বে একাধিকবার দুই গ্রুপের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। তার পরও স্থানীয় প্রশাসন অবৈধ স্ট্যান্ড ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়নি। বর্তমানে প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাস প্রতি মাসে ৯০০ টাকা এবং হায়েক্স গাড়ি প্রতি ১ হাজার ৩০০ টাকা করে মাসিক চাঁদা নিচ্ছেন প্রস্তাবিত কমিটির নেতারা। পরিসংখ্যান মতে দুই শতাধিক গাড়ি থেকে মাসে দুই লক্ষাধিক টাকা চাঁদা আদায় করা হচ্ছে।  তবে প্রশাসনকে ম্যানেজের দায়িত্ব নিয়েছেন ফারুক। তবে এই চাঁদাবাজির টাকার মোটা অংকের একটি অংশ স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তি ছাড়াও প্রশাসনের কয়েকটি দপ্তরে যায় বলেও জানা যায়। এ বিষয়ে পূর্বের কমিটির সভাপতি আমিনুল হক রাজু জসিম ফারুকের কমিটি অবৈধ দাবি করে বলেন, এখন পর্যন্ত আমাদের কমিটি বৈধ। কেননা সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক আমাদের কমিটিকে অনুমোদন দিয়েছেন। অন্যদিকে জসিম-ফারুকের কমিটিকে অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করেছেন। যারা বিগত দিনে কমিটি অনুমোদন দিয়েছেন তারা কার কাছে কমিটি অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করেন তা আমার বোধগম্য নয়। এ বিষয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামীলীগের সভাপতি আলহাজ্ব মুজিবুর রহমান বলেন, তৎকালীন এক সময়ে ১৫ লাখ টাকা খরচ করে দলের নেতাকর্মীদের জন্য এটা করেছিলাম। কথা ছিলো প্রতি মাসে রেন্ট-এ কার থেকে আমাদের ১ লাখ টাকা করে ফেরত দিবে। আমরা আমাদের স্বেচ্ছাসেবক লীগের রাজুকে সভাপতি করে কমিটির অনুমোদন দেই। কিন্ত তারা আমাদের এ টাকা ফেরত দেয়নি। এরপর থেকে এ নিয়ে আমরা আর কিছু বলিনি। কিছুদিন আগে জানতে পারি আইনশৃংখলা বাহিনীকে আগে গাড়ি দিতো সেটিও বন্ধ করে দিয়েছে। তিনি আরও বলেন, কিছুদিন পূর্বে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ওসি রেন্ট-এ কারের একটি নতুন কমিটির কাগজ আমাদের কাছে পাঠায়। যেহেতু তারা পুলিশের কাজে সহায়তার জন্য গাড়ি দিবে বলে জানায় তাই আমরা সুপারিশ করেছি। যদিও কমিটির অনুমোদন আমরা দিয়ে থাকি। সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মশিউর রহমান বলেন, আমি এই কমিটির অনুমোদন দেওয়ার কেউ না। থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মজিবুর রহমান ও সাধারণ ইয়াসিন মিয়া অনুমোদন দিয়ে অবগত করার জন্য আমার কাছে পাঠিয়েছে তাই আমি রিসিভ করেছি। এখানে যেহেতু একটি ষ্ট্যান্ড রয়েছে তাই যেকোন কমিটি করলে আমাদের অবগত করা হয়। এর আগেও একটি কমিটি ছিলো কিন্তু কে এই কমিটির অনমোদন দেয় তা আমার জানা নেই। বর্তমান কমিটিকে বৈধ দাবী করে কমিটির সভাপতি জসিম উদ্দিন বলেন, থানার ওসি মশিউর রহমান, থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মজিবুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক হাজী ইয়াসিন মিয়া আমাদের এই কমিটির অনুমোদন দিয়েছেন। কমিটির বৈধতা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি জানান, আমাদের কমিটি বৈধ। পূর্বের কমিটির লোকজনই আমাদের বর্তমান কমিটিকে অবৈধ বলে দাবী করছেন। আমাদের কমিটি অবৈধ হলে তারা কেনো রেন্ট-এ কার ষ্ট্যান্ডে আসছেন না। এ বিষয়ে চাঁদাবাজির নেতৃত্বে থাকা বর্তমান কমিটির সাধারণ সম্পাদক ফারুক জানান, জোর করে কোন চাঁদা আদায় করা হচ্ছে না। নতুন করে আমরা একটা কমিটি গঠন করেছি। সেখানে চালক ও বিভিন্ন খরচ বাবদ টাকা উঠানো হয়। তবে জুয়া খেলার বিষয় অস্বীকার করে ফারুক বলেন, প্রাইভেটকার থেকে প্রতি মাসে ৯০০ টাকা ও মাইক্রোবাস থেকে ১ হাজার ৩০০টাকা করে চাঁদা আদায় করা হয়। এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক-সার্কেল) নাজমুল হাসান জানান, বিষয়টি আমার জানা নেই। পুলিশের নাম ভাঙিয়ে কেউ চাঁদাবাজি করলে তাকে ছাড় দেওয়া হবে না। এখন শুনেছি, তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। উল্লেখ্য, শিমরাইল মোড়ে কিছুদিন পর পর নারায়ণগঞ্জ সড়ক ও জনপদ বিভাগ (সওজ) লোক দেখানো উচ্ছেদ অভিযান চালালেও রহস্য জনক কারণে রেন্ট-এ কার স্ট্যান্ড থেকে যায় বহাল তবিয়তে।

Comment Heare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *