আলোচিত সমালোচিত এসপি হারুনের বদলীর নেপথ্যে

এই কাল এই সময়
নারায়ণগঞ্জের আলোচিত-সমালোচিত পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদকে বদলী করা হয়েছে। গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকার হেড কোয়ার্টাারে পুলিশ সুপার টিআর হিসেবে বদলীর আদেশ দেয়া হয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় থেকে। এদিকে অভিযোগ উঠেছে, দাবি করা ৮ কোটি টাকা চাঁদা না দেয়ায় গভীর রাতে বাসায় ঢুকে আম্বার গ্রুপের কর্ণধার শওকত আজিজ রাসেলের স্ত্রী ও পুত্রকে তুলে আনেন হারুন অর রশিদ। এছাড়া ঢাকা ক্লাব থেকে তার ব্যক্তিগত গাড়িটিও জব্দ করেন এসপি হারুন। গুলশান ও শাহবাগ থানা পুলিশ এ বিষয়ে কিছু জানে না। এর আগে শওকত আজিজ গণমাধ্যমকে জানান, চাঁদা দিতে অস্বকৃতি জানানোর কারণে হারুন অর রশিদ তার উপর ক্ষিপ্ত ঝিলেন। সে কারণে নারায়ণগঞ্জ থেকে এসে তার অনুপস্থিতিতে মধ্য রাতে তার স্ত্রী ফারাহ রাসেল ও ছেলে আনাফ আজিজকে তাদের গুলশানের বাসা থেকে উঠিয়ে নিয়ে যান। এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা ক্লাব থেকে তার গাড়িটে হারুন অর রশিদের লোকজন জোর পূবর্ক নিয়ে গিয়ে এই নাটক সাজাঁন। শওকত আজিজ রাসেল জানান, আম্বার গ্রুপের প্রতিষ্ঠান আম্বার ডেনিমের কাছে ৮ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন এসপি হারুন। এই চাঁদা না দেয়ায় গত শুক্রবার রাতে তার শুলশানের বাসভবনে গভীর রাতে তিনি হানা দেন। তার সঙ্গে ছিলেন ডিবির পোশাক পড়া, সাদা পোশাকধারী ও পুলিশের পোশাক পড়া ৬০ থেকে ৭০ জন। এ সময় তার বাসা তছনছ করা হয়। তাকে বাসায় না পেয়ে তার স্ত্রী ও পুত্রকে তুলে নিয়ে আনেন। তাদের গুলশান থানায় না রেখে কিংবা কোনো তথ্য না দিয়ে সরাসরি নারায়গঞ্জে আনা হয়। শওকত আজিজ রাসেলের বাসভবনে সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে এসপি হারুনের প্রবেশ এবং তার স্ত্রী-পুত্রকে তুলে আনার সিসিটিভি ফুটেজ একটি অনলাইনের হাতে আসার পর তা প্রকাশ করলে এ নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। ঐ অনলাইনের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, এসপি হারুন দলবল নিয়ে শওকত আজিজ রাসেলের বাসভবনের নিচতলায় ঢুকে সঙ্গীদের ওপরে যাওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন। লিফটে করে ১১তলায় তার বাসভবনে তিন দফায় প্রায় ২০ জন প্রবেশ করেন। এর কিছুক্ষণ পর তার সঙ্গে আসা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা রাসেলের স্ত্রী ও পুত্রকে বের করে নিয়ে আসেন। শওকত আজিজ রাসেল জানান, আগের দিন গত বৃহস্পতিবার রাতে গুলশান ক্লাব থেকে তার গাড়িটিও জব্দ করে নারায়ণগঞ্জে নিয়ে গেছেন এসপি হারুন। পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শওকত আজিজ রাসেলের বাসভবনে এসপির হারুনের এই বাহিনী নিয়ে প্রবেশের কথা জানে না গুলশান থানা পুলিশ কিংবা ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি। শওকত আজিজ রাসেলের স্ত্রী ফারাহ রাসেল মরহুম ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ইমতিয়াজ আহমেদ চৌধুরীর জ্যেষ্ঠ কন্যা। তাদের ২৩ বছরের দাম্পত্য জীবন। আর ছেলে আহনাফ আজিজ যুক্তরাজ্য থেকে পড়াশোনা শেষ করে সদ্য দেশে এসেছেন। অভিযোগ রয়েছে এসপি হারুন নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার হলেও রাজধানীর বিভিন্ন ব্যবসায়ীকে জিম্মি করে অর্থ আদায় করতেন। প্রতিমাসে তিনি এসব ব্যবসায়ীর কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিতেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিনি ঢাকায় এসে নিয়মিত গুলশানের লেকশোর হোটেলে বসেন। সেখানে বসেই চাঁদাবাজীর নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করেন এবং চাঁদার টাকা নিয়ে নারায়ণগঞ্জে চলে যান। উল্লেখ্য, এসপি হারুন নিয়মিতই নাম্বার প্লেটহীন গাড়িতে করে ঢাকায় চলাফেরা করেন। ১ নভেম্বর রাজধানীর শাহবাগ, মগবাজার ও গুলশান, বনানীতে স্থাপিত পুলিশের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে। অভিযোগ রয়েছে, বিশিষ্ট শিল্পপতি আম্বার গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শওকত আজিজ রাসেলের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই চাঁদা দাবি করে আসছেন এসপি হারুন। গত ৫ মে হারুনের বিরুদ্ধে পুলিশ মহাপরিদর্শকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন শওকত আজিজ রাসেল। পুলিশের কাছে দেয়া অভিযোগ থেকে জানা যায়, গত ৩ মে সন্ধ্যায় এসআই আজহারুল ইসলামের মাধ্যমে এসপি হারুন আম্বার ডেনিমের স্টোর ম্যানেজার ইয়াহিয়া বাবুর কাছে প্রথমে মোবাইলে এ চাঁদা দাবি করেন। সে সময় আজহার বলেন, “এসপি হারুন সাহেব এইমাত্র আমাকে ফোন করেছেন। উনি বলেছেন, আম্বার গ্রুপের চেয়ারম্যানের লোকজনকে ডাকাও। আমার টাকা লাগবে। তাড়াতাড়ি ৮ কোটি টাকা পাঠাও।” অভিযোগকারী সূত্রে জানা যায়, এর আগেও এসপি হারুণ দুই দফা এ চাঁদা দাবি করেন। অভিযোগপত্রে শওকত আজিজ রাসেল উল্লেখ করেন, “এসপি হারুন আমাকে গুলশান ক্লাবের লামডা হলে ও গুলশানের কাবাব ফ্যাক্টরি রেস্তোরাঁয় ডেকে নিয়ে দুইবার আমার কাছে চাঁদা দাবি করেন। ওই টাকা ডলারে আমেরিকায় এসপি হারুনের নির্ধারিত ঠিকানায় পাঠাতে বলেন। টাকা না দিলে আমার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান আম্বার ডেনিম ধ্বংস করে দেয়া হবে বলে হুমকি দেন।” অভিযোগে তিনি আরও উল্লেখ করেন, “টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আমার কোম্পানি আম্বার ডেনিম ফ্যাক্টরির ৪৫ জন কর্মীকে গভীর রাতে গাজীপুর থানায় ধরে নিয়ে যান। তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে জেলে পাঠান এসপি হারুন।” খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চাঁদা না দেয়ায় আম্বার গ্রুপের ওপর অসন্তুষ্ট হারুন। আম্বার গ্রুপের বিভিন্ন কর্মকর্তাকে নানা সময়ে ফোনে ও থানায় ধরে নিয়ে গিয়ে চাঁদার জন্য হুমকি দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে তদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি মাহবুবুর রহমান সে সময় বলেছিলেন, “আমি তো তদন্ত করছি। অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অপরাধ প্রমাণিত হলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।” কিন্তু এসপি হারুনের বিরুদ্ধে পুলিশের পক্ষ থেকে এ পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ফলে তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ও সিদ্ধিরগঞ্জে গড়ে উঠছে আম্বার গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। সেসব প্রতিষ্ঠানে ৫০০ থেকে ১০০০ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকেও মাসে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছেন এসপি হারুন। ওই চাঁদা না দেয়ায় তিনি আম্বার গ্রুপের কর্ণধারকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর চেষ্টা করছেন। দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে আটক বাণিজ্যসহ নানা ধরণের বেআইনি কার্যকলাপের মাধ্যমে আলোচনায় আসা এসপি হারুন বহাল তবিয়তে চাকরি করে যাচ্ছেন। ফলে যে কারো মনে হতেই পারে, তিনি অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী। যে ক্ষমতা দিয়ে তিনি ধরাকে সরা জ্ঞান করেন। আইনের হাত তার দিকে প্রসারিত হয় না। দীর্ঘদিন ধরেই তার বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় জমা থাকলেও কোনো কিছুকেই তিনি তোয়াক্কা করেননি। অদৃশ্য এক শক্তির ইশারায় তিনি পুলিশ প্রশাসনে নিজের অধিপত্য বজায় রেখে চলেছেন। সাধারণ মানুষ তো তার কাছে পাত্তাই পায় না। এমনকি সরকারি দলের লোকজন, এমপি-মন্ত্রীকেও তিনি তোয়াক্কা করেন না। এসপি হারুন আইন শৃংখলা কমিটির সভায় সবার পরে উপস্থিত হয়ে নিজের বক্তব্য রেখে চলে আসতেন। এছাড়া অভিযোগ রয়েছে ক্ষমতাসীন দলের লোকজনের বিরুদ্ধে স্থানীয় পত্রিকায় ভয়ভীতি দেখিয়ে সংবাদ প্রকাশ করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা করত। তার মুখপত্র হিসাবে পরিচিত সাজ্জাদ রুমানের মাধ্যমে স্থানীয় পত্রিকাগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করত যারা এসব করতে অস্বীকৃতি জানাতো তাদেরকে বিভিন্ন ভাবে মামলার ভয় দেখানো হতো। নারায়ণগঞ্জে ক্ষমতাসীন দলের কতিপয় নেতাকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে অন্যদের ঘায়েল করার চেষ্টা চালাতেন বলে স্থানীয় রাজনীতিবিদরা অভিযোগ করেন। এসব কারণে তার বিরুদ্ধে কোনোদিন কোনো ব্যবস্থা নেয়ার কথা শোনা যায়নি। উল্টো বিভিন্ন সময় তিনি পুরস্কৃত হয়েছে। অনুসন্ধানে আরো জানাগেছে, নারায়ণগঞ্জে যোগদানের পর গত ১০ জানুয়ারী চাষাড়া শহীদ মিনারে সংবাদ সম্মেলন করে পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ। তার ঐ সংবাদ সম্মেলনে সন্তুষ্টজনক বক্তব্যে নারায়ণগঞ্জবাসী খুশি হলেও কয়েকদিন পরই ব্যবসায়ীরা আতংকে পড়ে যান। বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের চায়ের দাওয়াতের নামে চাঁদাবাজীর অভিযোগ রয়েছে হারুন অর রশিদের বিরুদ্ধে। অভিযোগে আরো রয়েছে, দাবীকৃত মাসিক চাঁদা না পেয়ে বিভিন্ন থানার ওসিদের বদলী করিয়েছেন তিনি। ইন্সপেক্টর থেকে শুরু করে এসআই এমনকি কনেস্টবলদের কাছেও বদলীর হুমকি দিয়ে চাঁদাবাজী করেছেন। সিদ্ধিরগঞ্জ থানার সাবেক ওসি শাহীন শাহ পারভেজ হারুন অর রশিদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় তাকেও বদলী করা হয়। তার অত্যাচারে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের অনেক সহসী পুলিশ সদস্যও এতোদিন বেকায়দায় ছিলেন। বৈধ কাজের চেয়ে অবৈধ কাজই করতে এসপি হারুন। তাই তার বদলীতে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের সদস্যদের মাঝেও স্বস্তি ফিরে এসেছে।

About ডান্ডিবার্তা

View all posts by ডান্ডিবার্তা →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *