এসপি হারুনের বিদায়ের অনুষ্ঠান ছিল নিস্প্রাণ

ডান্ডিবার্তা রিপোর্ট

রাজধানী ঢাকার পাশ্ববর্তী জেলা হিসেবে বাণিজ্যিক, রাজনৈতিক সহ বিভিন্ন কর্মকান্ডে গুরুত্বপূর্ণ জেলা হিসেবে পরিচিত হয়েছে নারায়ণগঞ্জ। কোন না কোন ঘটনায় প্রতিনিয়ত আলোচিত হয়েছে নারায়ণগঞ্জ। আর তাই ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে বিরোধী দল বিএনপির অভিযোগে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার আনিছুর রহমানকে তাৎক্ষনিক প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। সুষ্ঠু নির্বাচনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে ২ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জে যোগদান করেন এসপি হারুন অর রশীদ। ফলে কোন অনুষ্ঠানিকতা ছাড়া কিংবা অভিনন্দন ছাড়াই নারায়ণগঞ্জের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। তবে আগমন যেমনই হোক বিদায়টা ‘সিংহাম’ উপাধি নিয়ে হলেও সিংহের মতো ছিল না। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে শহরের মাসদাইর এলাকায় পুলিশ লাইন্সে জেলা পুলিশ প্রশাসনের উদ্যোগে সদ্য পুলিশ হেড কোয়াটারে বদলী হওয়া এসপি হারুন অর রশীদকে ওই ভাবে বিদায় জানান ক্রেস্ট, ফুলের শুভেচ্ছা, ফুলের পাপড়ী ছিটিয়ে অশ্রুজলে। তবে এসবই ছিল অনেকটা নিস্প্রাণ। অনুষ্ঠানে সমাজের গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ কিংবা সমাজের বিবেক হিসাবে পরিচিত পেশাদার গণমাধ্যম কর্মীদের পদচারনা তেমন ছিল না। অনেককে একাধিকবার দাওয়াত দেয়া সত্বেও অনুষ্ঠানে তারা যাননি। মুষ্ঠিমেয় কয়েকজন অনুষ্ঠানে গেলেও একমাত্র এড. মাহবুবুর রহমান মাসুম তার বক্তব্যে হারুন অর রশিদকে একজন সৎ পুলিশ অফিসার হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। যদিও পেশাদার সাংবাদিকরা বলেছেন, এ বক্তব্য একান্তই মাহবুবুর রহমান মাসুমের। এখানে পেশাদার সাংবাদিকদের বক্তব্যের প্রতিফলন ঘটেনি। যে হারুন অর রশিদ বাসা থেকে ২শ’ গজ দূরে অফিসে আসার সময় সমস্ত পুলিশ কর্মকর্তারা তার পিছু পিছু থেকে তাকে অনুস্বরণ করত যেই হারুন অর রশিদ শহরে আসলে মন্ত্রীর চাইতেও বেশী প্রটোকল ব্যবহার করত সেই হারুন অর রশিদের বিদায় অনুষ্ঠানে কোন সংসদতো দূরের কথা কোন ইউপি চেয়ারম্যানকেও দেখা যায়নি। ছিলনা সমাজের গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। যা সিংহামের সেই উপাধীকে ম্লান করে নারায়ণগঞ্জ ছাড়তে হয়েছে। তবে সরেজমিনে দেখা যায়, ব্রিটিশ পথা অনুয়ায়ী একটি ইউনিটের প্রধানকে বিদায় জানানো হয় ফুলে সাজানো গাড়ি ও রশি টেনে গাড়ি বের করে দিয়ে। ঠিক সেই প্রথাকে অনুসরণ করে সাজিয়ে রাখা হয়েছিল কলো রঙের সরকারি গাড়ি। আর ওই গাড়ির সামনে রঙ বেরঙের রশি বাঁধানো। জেলা পুলিশের সদস্যরাও সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছিল রশি হাতে নিয়ে টেনে গাড়ি বের করে দেওয়ার জন্য। এর আগে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন এসপি হারুন। অশ্রুশিক্ত নিয়ে যখন সহকর্মী সহ সকলের কাছে ভুল ত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন তখনই সহকর্মী সহ উপস্থিত সদস্যদের নয়ন বেয়ে অশ্রু পড়তে থাকে। বক্তব্যে শেষ করতেই দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেন সহকর্মীরা। এর মধ্যেই কনস্টেবল সহ সহকর্মীরা ছবি তুলতে ব্যস্ত করে ফেলেন এসপি হারুনকে। চোখের জল মুছে আবারও হাসিমুখে সকলের সঙ্গে ছবিতে অংশগ্রহণ নেন ও দুপুরের খাবারে অংশগ্রহণ করেন। ওই অনুষ্ঠানে মঞ্চের সামনেই ‘সিংহাম’ উপাধি দিয়ে  ফেস্টুন রেখে দিয়েছিল ভক্তরা। যেখানে লেখা ছিল, ‘প্রিয় সিংহাম, তুমি শত্রুর সাথে করো গলাগালি ধরো মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা। তুমি জাহান্নামের আগুনে বসি হাসো পুষ্পের হাসি- সিংহাম ভক্তবৃন্দ’। এছাড়াও পাঠানটুলী পঞ্চায়েত আহবায়ক কমিটি ও এলাকাবাসীর ধন্যবাদ জানানে ফেস্টুনে লেখা ছিল ‘পাঠানটুলী গ্রাম পঞ্চায়েত বাসীকে সন্ত্রাস মুক্ত করার জন্য গ্রামবাসীর পক্ষ হতে আন্তরিক ধন্যবাদ শ্রদ্বেয় বিদায়ী এস.পি হারুন অর রশীদ।’ এগুলো ছাড়াও সহকর্মীরা যখনই বক্তব্য দিয়েছেন এসপি হারুনের সাফল্য কামনা করেন। কর্মক্ষেত্রে মুর্হূতগুলো উল্লেখ করে বলেন, ‘এগুলো ছিল শিক্ষা। যা আগামী দিনে সাহস দিবে।’  দুপুরের খাবারে অংশ নেন নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দিন, র‌্যাব-১১ এর অধিনায়ক (সিও) লে. কর্নেল কাজী শামসের উদ্দিন, নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন, নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি খালেদ হায়দার খান কাজল, নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি মাহবুবুর রহমান মাসুম, নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মনিরুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) আব্দুল্লাহ আল মামুন, নূরে আলম প্রমুখ। দুপুরের খাবার শেষ হতেই বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, ব্যবসায়ী সংগঠন, প্রশাসন সহ সহকর্মীদের জানানো ফুলের শুভেচ্ছা তোরা, ক্রেস্ট গুলো আগে থেকে সাজানো ফুলের গাড়িতে তোলা হয়। সবাই যখন বিদায় জানাতে পাপড়ি হাতে দাঁড়িয়ে থাকে তখনই সহকর্মীদের সঙ্গে বের হয়ে আসনে এসপি হারুন। গাড়িতে উঠতে আহবান জানানো হলেও তিনি গাড়িতে না উঠে কিছুটা হেঁটে যান। পুলিশের বিভিন্ন কিছু শেষ বারের মতো পরিদর্শন করেন এবং অসমাপ্ত কাজগুলো সমাপ্ত করার মতো দায়িত্ব সহকর্মীদের দেন। সব শেষে সকলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে গাড়িতে উঠেন এসপি হারুন। সামনে পিছনে পাহারা দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যান এসপি হারুনের গাড়ি। এর সঙ্গে বিদায় নেন এসপি হারুন। তবে এ বিদায়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না বন্ধু নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দিন সহ সহকর্মী ও অন্যান্য উপস্থিত অতিথিরা। আরো জাকজমক ভাবেই বিদায় জানাতে চেয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু এসপি হারুন বলেন, ‘এক ফোনে এসেছি আর সবাইকে ফোনে বলে চলে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু সহকর্মীদের জন্য আর হলো না।’ প্রসঙ্গত এর আগে ২০১৮ সালের ৪ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জের এসপি হিসেবে যোগ দেন হারুন অর রশিদ। ২০১৯ সালের ৩ নভেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার হারুন অর রশীদকে পুলিশ হেড কোয়াটারে বদলি করা হয়। তবে গত কয়েকদিনে তিনি দায়িত্ব বুঝিয়ে দেননি। বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মনিরুল ইসলাম।

About ডান্ডিবার্তা

View all posts by ডান্ডিবার্তা →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *