সুবিধাভোগিরা চিন্তিত, স্বস্তিতে ভোক্তভোগীরা!

ডান্ডিবার্তা রিপোর্ট

নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার হিসেবে হারুন অর রশিদের বদলী হওয়ার পর থেকে ব্যবসায়ী মহল থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরে আসলেও অস্বস্তিতে রয়েছেন কিছু সুবিধবাভোগে মানুষ। যারা নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ীদের কথা চিন্তা না করে নিজেদের স্বার্থে হারুন অর রশিদের সাথে আতাঁত করে বিভিন্ন মানুষদের হয়রানি করেছেন তারা এখন নিশ্চুপ ভূমিকায় রয়েছেন। হারুন অর রশিদের সহযোগীতায় যারা সাধারণ মানুষদের হয়রানী, বিভিন্ন সেক্টর নিয়ন্ত্রন নেয়া অথবা নিয়ন্ত্রনের পরিকল্পনা ছিল তাদের নিয়ে জেলা জুড়ে চলছে সমালোচনা। অপরদিকে, যারা হারুন অর রশিদকে চাঁদা না দেয়ায় আক্রোশের শিকার হয়ে হয়রানি ও জেল খেটেছেন তারা স্বত্তিতে থাকলেও অতীতের এই কাল অধ্যায় ভুলার মত নয় বলে মন্তব্য করেছেন। দিনের বেলা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গিয়ে বলতেন, মাদক ব্যবসায়ী, ভূমিদস্যু, চাঁদাবাজ, গডফাদার, সন্ত্রাসী-মাস্তানদের রক্ষা নাই। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। আর রাতের বেলা চিহ্নিত বড় বড় অপরাধীদের বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন হারুন।  গত ৩ নভেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার হারুন আর রশীদকে পুলিশ হেড কোয়াটারে বদলী হওয়ার পর থেকেই হারুন অর রশিদের নানা বেআইনী কাজের তথ্য বেরিয়ে আসতে শুরু করে। এর আগে আম্বার গ্রুপের কর্নধার আজিজ অভিযোগ করেন, চাঁদা দিতে অস্বকৃতি জানানোর কারণে হারুন অর রশিদ তার উপর ক্ষিপ্ত ছিলেন। সে কারণে নারায়ণগঞ্জ থেকে এসে তার অনুপস্থিতিতে মধ্য রাতে তার স্ত্রী ফারাহ রাসেল ও ছেলে আনাফ আজিজকে তাদের গুলশানের বাসা থেকে উঠিয়ে নিয়ে যান। আম্বার গ্রুপের প্রতিষ্ঠান আম্বার ডেনিমের কাছে ৮ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন হারুন- এমন অভিযোগ করেন তিনি। এরপরই হারুনের নানা অপকর্মের করা বেরিয়ে আসে। জানাগেছে, হারুন অর রশিদকে ব্যবহার করে উৎসব পরিবহনের নিয়ন্ত্রন দখলের চেষ্টা করেছিল আওয়ামীলীগের অনুপ্রবেশকারী কামাল মৃধা। উৎসব পরিবহনের নিয়ন্ত্রনে নিতে হারুন অর রশিদের সাথে চুক্তিও করেছিলেন তিনি। আহুর অর রশিদকে ব্যবহার করে সুবিধা আদায়কারীরা প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, প্রয়োজনে এসপি হারুন অর রশিদকে নারায়ণগঞ্জে আন্দোলন করবো আমরা। অথচ হারুনের বদলী হওয়ার পর আন্দোলন করার ঘোষনাকারী ১৮নং কাউন্সিলর শফিউদ্দিন প্রধান ও জেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি আব্দুল কাদিরও ছিলেন নিশ্চুপ। পৃথক দুটি অনুষ্ঠানে শফি ও কাদির বলেছিলেন তার বদলী হলে আন্দোলন করা হবে। হারুন অর রশিদের সাথে আতাঁত করে গণমাধ্যম কর্মীদেরও বিরুদ্ধে কড়া সমালোচ না করেছেন নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সভাপতি মাহবুবুর রহমান মাসুম। এমনকি বৃহস্পতিবার হারুনের বিদায়ী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেও মাসুম বলেছিলেন, দৈনিক প্রথম আলো, ইত্তেফাকসহ গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়ে হারুন অর রশিদের প্রশাংসা করেন। যা নিয়ে শহরময় সমালোচনা সৃষ্টি হয়। নারায়ণগঞ্জে পুলিশ সুপার থাকা কালীন সময়ে সুবিধাবাদি অনেককেই হারুন সাথে দেখা গেলেও বিদায়ের দিন উল্লেখ যোগ্যদের মধ্যে শুধু জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেনই উপস্থিত ছিলেন। হারুনকে ম্যানেজ করে প্রকাশ্যেই চাঁদাবাজীর অভিযোগ রয়েছে শ্রমিক নেতা কাউছার আহাম্মেদ পলাশের বিরুদ্ধে। হারুন নারায়ণগহ্জে যোগদানের পর কাউছারকে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন, দাঁড়ি-টুপি ওয়ালা চাঁদাবাজরা নারায়ণগঞ্জে থাকতে পারবে না। অথচ পরে এই পলাশের সাথেই টাকার বিনিময়ে সুসম্পর্ক করেন হারুন। শহরে প্রকাশ্যে সরকারে কড়া সমালচনাসহ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে রফিউর রাব্বি আপত্তিকর মন্তব্য করলেও পুলিশ ছিল নীরব ভূমিকায়। এছাড়াও ঠিকাদার সুফিয়ানের সাথেও গোপনে আতাঁত ছিল হারুনের। হারুন অর রশিদ বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের চায়ের দাওয়াত দিয়ে চাঁদা দাবী করতেন। আর চাঁদা না দিলেউ রাতের আঁধারে তুলে আনা হত। তবে গত ১০ জানুয়ারী শহীদ মিনারে সংবাদ সম্মেলনের পর প্রধম টার্গেটই ছিল সাংসদ শামীম ওসমানের অনুসারিরা। শামীম অনুসারিদের টার্গেট করে একের পর এক অভিযান পরিচালনা করেন হারুন অর রশিদ। মহানগর আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহ নিজাম প্রথমে টার্গেট করা হলেও সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ১৭নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আব্দুল করিম বাবু। প্রতিষ্ঠিত এই ব্যবসায়ী প্রধান অপরাধই ছিল তিনি সাংসদ শামীম ওসমানের অনুসারি ছিলেন। এক সপ্তাহে তার বিরুদ্ধে আটটি মামলা হয়েছিল। বিগত দিনে যার বিরুদ্ধে থানা একটি সাধারণ ডায়েরীও হয়নি এমন ব্যক্তির নামে এক সপ্তাহে আটটি মামলা দায়ের নেপথ্যে ছিল হারুনের দাবীকৃত চাঁদা না দেয়ার কারণ। শুধু বাবুই নয়, তার ছেলে রিয়েনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল। হারুনের আক্রোশ থেকে বাবুর পুত্র রিয়েনও ছাড় পায়নি। স্থানীয়রা জানান, ওয়ার্ডবাসীর কল্যানে সব সময়ই নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন কাউন্সিলর বাবু। অথচ তাকেই মিথ্যা মামলা দিয়ে বার বার হয়রানি করেছে। হারুন পুলিশের পোষাকারে অপব্যবহার করেছে। এছাড়াও শামীম অনুসারি হওয়ায় হারুনের আক্রোশের শিকার হয়েছেন, মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক কাউন্সিলর দুলাল প্রধান, মীর হোসেন মীরু, টেনু গাজী, নাজিম উদ্দিন, ভিকিসহ বেশ হয়েকজন। তবে হারুনের টার্গেটে ছিল, শাহ নিজাম, শাহাদাৎ হোসেন ভূইয়া সাজনু, জাকিরুল আলম হেলাল, মীর হোহেল, কাউন্সিলর মতিউর রহমান মতি, কাউন্সিলর শাহ জালাল বাদলসহ আরো অনেকে। যাদের বেকায়দায় ফেলতে বিভিন্ন নকশা তৈরী করেছিলেন হারুন অর রশিদ। এছাড়াও শহরের টানবাজার, বিসিক, পঞ্চবটিসহ জেলার বিভিন্ন শিল্প এলাকায় অভিযানের নামে ব্যবসায়ীদের তুলে এনে তাদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়েরও অভিযোগ রয়েছে হারুনের বিরুদ্ধে। তাই হারুনের বদলীতে ব্যবসায়ী মহল থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি ফিরে এসেছে। তবে বিদায়ী অনুষ্ঠানে হারুন অর রশিদ, পারটেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান এম এ হাশেমের ছেলের কাছে চাঁদা দাবির অভিযোগের প্রসঙ্গ টেনে বলেছিলেন, ‘আমার কোনো সহকর্মীর দিকে কেউ পিস্তল তাক করবে সেটা তো হতে পারে না। তা ওই ব্যক্তি কত বড় সম্পদশালী বা শক্তিশালী সেটা দেখিনি। বিধি মোতাবেক চ্যালেঞ্জ করে তার গাড়ি আটকিয়ে মাদক ও গুলি পেয়েছি। সে অস্ত্রসহ পালিয়েছে। আইন মোতাবেক মামলা হয়েছে, পুলিশ রেইড দিয়েছে। ব্যবসায়ী আনিসুর রহমান সিনহাকে আটকের প্রসঙ্গ টেনে হারুন বলেছিলেন, ‘এর আগে আনিসুর রহমান সিনহাকে আটক করেছিলাম। তাঁর বিরুদ্ধে ৬৭টি মামলার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল। পরদিন তাঁকে আদালতে প্রেরণ করব। কিন্তু তিনি ব্যবসায়ী, ভিআইপি মানুষ। তাঁকে আদালতে পাঠানো হলে তাঁর সম্মান নষ্ট হবে। তিনি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কাটাতে এক সপ্তাহের সময় নিলেন। আমরা সম্মানিত ব্যক্তি বলে সেদিনই তাঁকে ছেড়ে দিই। তিনিও মুচলেকা দিয়েছিলেন এক সপ্তাহের মধ্যে তিনি সবগুলো মামলায় আদালতে হাজির হবেন।’ তবে অন্যান্যদের গ্রেফতারের বিষয় কিছু বলেননি হারুন অর রশিদ।

About ডান্ডিবার্তা

View all posts by ডান্ডিবার্তা →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *