জেলা কারাগারে বন্দীরা জামদানির নিপুণ কারিগর

ডান্ডিবার্তা রিপোর্ট

শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ জামদানির জন্য প্রসিদ্ধ। রূপগঞ্জের সেই জামদানি এখন তৈরি হচ্ছে নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারে। বন্দীরা নিপুণ হাতে জামদানি বুনছেন। নানা রং ও বাহারি নকশা তাঁরা ফুটিয়ে তুলছেন জামদানির জমিনে। বন্দীদের তৈরি জামদানির চাহিদাও ব্যাপক। ইতিমধ্যে এই জামদানি নেওয়ার জন্য কারাগারের সঙ্গে চুক্তি করেছে রাজধানীর প্রসিদ্ধ একটি ফ্যাশন ব্র্যান্ড। জামদানির নকশার কথা বললেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে শাড়ির পাড়ভর্তি রঙিন ফুল আর জ্যামিতিক ছাঁচ; জমিনের টানা ও পোড়েনের সুতায় রঙিন বুটি আর ছিডার জাল বা তেরছি। নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারের বন্দীদের বোনা জামদানিতে এসব বৈশিষ্ট্য রয়েছে।ইতিহাসবিদদের মতে, জামদানির নকশা একান্তভাবে বাংলার তাঁতিদের সৃজনশীলতার পরিচয় বহন করে। জামদানির নকশায় রয়েছে বাংলাদেশের পরিবেশ, প্রকৃতি, জীবজগৎ ও বৃক্ষলতাযুক্ত নকশার প্রাধান্য। তাঁদের ভাষ্য, একজন জামদানি-তাঁতি বস্ত্র বয়ন করতে গিয়ে চারপাশে যে দৃশ্য দেখেছেন, তা-ই উঠে এসেছে নকশায়। বন্দীদের জামদানি তৈরির কর্মযজ্ঞ দেখতে সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারে গিয়ে কথা হয় কারিগরদের সঙ্গে। কারাগারের ভেতরে একটি শান্ত নিরিবিলি জায়গায় প্রশিক্ষিত বন্দীরা বুনছেন জামদানি। আর কারাগারের বাইরেই বিক্রয়কেন্দ্রে বিক্রি হচ্ছে সেসব। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বন্দীদের তৈরি জামদানি কিনতে এসেছেন ক্রেতারা। জেলা কারাগার সূত্রে জানা গেছে, কারাগারে ১০টি জামদানি তাঁত রয়েছে। আর তৈরির সঙ্গে যুক্ত ৩০ জন কয়েদি ও হাজতি। তাঁরা আড়াই হাজার থেকে শুরু করে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দামের জামদানি শাড়ি তৈরি করছেন। আঙুল তেরছি, চালতা, শাপলা ফুল, গুটি ফুল, মদন, ফুল তেরছি, পাখি, আনারসসহ বিভিন্ন নকশার জামদানি তৈরি করছেন তাঁরা। এসব জামদানি কারাগারের সামনে বিক্রয়কেন্দ্রেই বিক্রি হচ্ছে। কারাগারের জামদানির প্রশিক্ষক সুমন মিয়া জানান, তিনি রূপগঞ্জ উপজেলার গন্ধর্বপুর এলাকায় জামদানি তৈরির কাজ করতেন। জোড়া খুনের মামলায় ১১ বছর ধরে তিনি কারাগারে। কারাগারে আসার পর থেকে জামদানি শাড়ি তৈরিতে সম্পৃক্ত হন। এখন বন্দীদের জামদানি শাড়ি তৈরির প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন তিনি। তিনি বলেন, জামদানিতে প্রচুর ধৈর্য লাগে। একটানা এক জায়গায় বসে থাকতে হয়। সুমন জানান, প্রতি মাসে তিনি জামদানি তৈরি করে ৫-৬ হাজার টাকা আয় করছেন। জামদানি তৈরির আয় থেকে প্রতি মাসে বাড়িতে ৩-৪ হাজার টাকা পাঠাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘কাজে থাকলে মনটা ভালো থাকে। কোনো দুশ্চিন্তা ও হতাশা কাজ করে না। বন্দীদের জামদানি তৈরির কাজ শেখাচ্ছি। দিনগুলো ভালোভাবে কেটে যাচ্ছে।’ আরেক জামদানি কারিগর মেহেদী হাসান হত্যা মামলায় দুই বছর ধরে জেল খাটছেন। কারাগারের প্রধান জামদানি প্রশিক্ষক সুমনের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নেন তিনি। মেহেদী বলেন, প্রথম দিকে একদমই নকশা বুনতে পারেননি। বারবার সুতা ছিঁড়ে গেছে। অনেক সময় ধৈর্য হারিয়ে ফেলতেন। প্রশিক্ষক সুমন ধৈর্য ও উৎসাহ দিয়ে কারিগর হিসেবে তৈরি করেছেন। এখন জামদানি শাড়ি বুনে প্রতি মাসে ৫-৬ হাজার টাকা আয় করছেন বলে জানান মেহেদী।  তিনি আরও বলেন, তাঁর আয়ের টাকা থেকে তিনি নিজের মামলার খরচ চালান। বাসা থেকে কোনো টাকা আনতে হয় না। কারাগারে নিজের প্রয়োজনে টাকা খরচ করেন এবং বাড়িতেও প্রতি মাসে কিছু টাকা পাঠান। কারাগারের সামনে বিক্রয়কেন্দ্রে জামদানি কিনতে এসেছেন শারমীন আক্তার। তিনি বলেন, ‘বন্দীদের জামদানির কাজ খুব সুন্দর। পাড় আর জমিনে সুতার কারুকাজগুলো চোখজুড়ানো। শাড়ির মান খুব ভালো। এ ছাড়া শহরের কাছে হওয়ায় আমাদের রূপগঞ্জে যেতে হয় না। আমি ও আমার আত্মীয়-স্বজন এখান থেকেই শাড়ি কিনি। এ ছাড়া এখান থেকে শাড়ি কিনলে বন্দীদের সহায়তা করাও হয়।’ বন্দীদের বোনা জামদানি-উৎকর্ষ নিয়ে কথা হয় রূপগঞ্জের নোয়াপাড়া এলাকার প্রবীণ জামদানি কারিগর দীল মোহাম্মদের সঙ্গে। তিনি বলেন, শীতলক্ষ্যার স্বচ্ছ পানি, শীতল হাওয়া জামদানি তৈরির জন্য উপযুক্ত। শীতল হাওয়ায় ঠা-া মাথায় সূক্ষ্ম জামদানি তৈরি করতেন আগের কারিগরেরা। মূলত এ কারণেই শীতলক্ষ্যা নদীতীরে রূপগঞ্জের জামদানি এত প্রসিদ্ধ। কারাগারের বন্দীরাও রূপগঞ্জের জামদানি কারিগরের প্রশিক্ষণ পেয়েছেন বলে তাঁরাও সূক্ষ্ম জামদানি তৈরি করতে পারছেন। জেলা কারাগারের তত্ত্বাবধায়ক সুভাস কুমার ঘোষ বলেন, ‘আমাদের কারাগারের জামদানির চাহিদা ব্যাপক। কারাগারের সামনে নিজস্ব বিক্রয়কেন্দ্র থেকেই সব জামদানি বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।’ তিনি জানান, গত মাসে আড়ংয়ের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। আড়ং এখান থেকে বন্দীদের তৈরি জামদানি শাড়ি নিয়ে তাদের শোরুমে এর পৃথক ব্র্যান্ডিং করবে। সূত্র: প্রথম আলো

About ডান্ডিবার্তা

View all posts by ডান্ডিবার্তা →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *