সদর ইউএনও’র হৃদয়স্পর্শী স্ট্যাটাস

ডান্ডিবার্তা রিপোর্ট

সদ্য ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) হওয়ার নেপথ্যে সন্তানসম্ভবা হওয়ায় নিজের অযোগ্যতাকে দায়ী করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি হৃদয়স্পর্শী স্ট্যাটাস দিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হোসনে আরা বীণা। কারন, বহুল প্রত্যাশিত যেই অনাগত সন্তানের অপেক্ষায় বছরের পর বছর অনেক কাঠখড় পোহাতে হয়েছিল তাকে, সদ্য প্রশাসনের এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তার তদবিরে এই ওএসডি হওয়ার সংবাদে মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে ৫ মাসের অন্ত:স্বত্তাকালীন সময়েই প্রিমেচিউর সন্তানের জন্ম দিতে হয়েছে ইউএনও বীণাকে। তবে তিনি না চাইলেও অনেকটা বাধ্য হয়েই নিজের ব্যাক্তিগত জীবনে সদ্য ঘটে যাওয়া হৃদয়স্পর্শী ঘটনা তুলে ধরে শুক্রবার রাতে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন তিনি। সদর উপজেলার বিদায়ী ইউএনও হোসনে আরা বীণা লিখেছেন, ‘আমি ব্যাক্তিগত বিষয়গুলো সাধারণত ফেসবুকে খুব একটা শেয়ার করি না। তবে আজ মনে হল এখন চুপ করে থাকাটাও অন্যায়। তাই আজ আর না, আজ আমি বলবো… আমি হোসনে আরা বেগম, উপজেলা নির্বাহী অফিসার নারায়ণগঞ্জ সদর, মাত্র ৯ মাস পূর্বে আমি এ পদে যোগদান করি। আমার দীর্ঘ ৯ বছরের দাম্পত্য জীবনে বহু চেষ্টা চিকিৎসার পরও আমরা কোন সন্তান লাভ করতে পারিনি। কিন্তু পাঁচ মাস পূর্বে আমি জানতে পারি আমি দুই মাসের সন্তানসম্ভবা। এ ঘটনা আমার জীবনে সৃষ্টিকর্তার অপার রহমত ছাড়া আর কিছুই নয় এ বিশ্বাস আমি প্রতিনিয়ত বুকে ধারণ করেছি। এ বিশ্বাস ও স্বপ্ন বুকে নিয়ে অনাগত সন্তানের আগমনের অপেক্ষায় দিন গুনছিলাম।’ তিনি আরো লিখেন, ‘আমি আমার বাবুকে পেটে নিয়েই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সহকারি রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে আমি নারায়ণগঞ্জ-৪ ও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের আংশিক নির্বাচন অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন করি। একজন নারী কর্মকর্তা হিসেবে অজুহাত ফাঁকিবাজী এই বিষয়গুলোকে কখনই পুঁজি করিনি। যখন যে পদে কাজ করেছি চেষ্টা করেছি শতভাগ নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করতে। সন্তানসম্ভবা হয়েও এর কোন ব্যতিক্রম আমি করিনি। অথচ আমি সন্তানসম্ভবা হয়েছি শোনার পর থেকেই একজন বিশেষ কর্মকর্তা, যার নাম বলতেও আমার রুচি হচ্ছে না, বিভিন্ন মহলে আমাকে অযোগ্য হিসেবে উপস্থাপন করে আমাকে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা থেকে বদলীর পাঁয়তারা করেই চলেছিল। আমার সন্তানসম্ভবা হওয়াটাকেই সে বিভিন্ন মহলে আমার সবচেয়ে বড় অযোগ্যতা হিসেবে উপস্থাপন করেছে। অথচ এই সন্তান পেটে নিয়েই আমি অত্যন্ত সফলভাবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সহকারি রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। এজন্য আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক এপ্রিসিয়েশনও পেয়েছি।’ বীণা বলেন, ‘আমার সন্তান প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ ছিল আগামী এপ্রিল। তেমন মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই আমি ছিলাম। কিন্তু গত ৪ ফেব্রুয়ারী বিকালে রেগুলার চেকাপ করতে আমি হাসব্যান্ড সহ স্কয়ার হাসপাতালে আসি, চেকআপ শেষে সন্ধ্যায় আমার হাসপাতালে অপেক্ষা করছি পরবর্তী পরীক্ষার জন্য। এমন সময় আমার একজন ব্যাচমেট ফোন করে জানায় আমার সদাসয় কর্তৃপক্ষ আমাকে ওএসডি করেছে অর্থাৎ আমাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ করেছে।’ তিনি বলেন, ‘আমার অপরাধ হলো আমি সন্তানসম্ভবা, আর তার চেয়েও বড় কারণ হল সেই তথাকথিত ক্ষমতাধর কর্মকর্তার উপরের মহল কর্তৃক তদবির। খবরটা শোনার পর আমি প্রচন্ড মানসিক চাপ সহ্য করতে পারিনি, উল্লেখ আমি এজমার রোগি। প্রচন্ড মানসিকচাপে আমার ফুসফুসে ব্লাড সার্কুলেশন অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়, ফলে আমার পেটের সন্তানের অক্সিজেন সাপ্লাই বন্ধ হয়ে যায় এবং হঠাৎ করেই আমার পেটের বাবু নড়াচড়া পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। তাৎক্ষনিক হসপিটালে ভর্তি করা হলে ডক্টর সেদিন রাতেই সিজার করে বাবু বের করে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে আমার পরিবারের সবার সিদ্ধান্তে পরদিন সকালে আমার মাএ ৩১ সপ্তাহ বয়সি প্রিমেচিউর বেবিকে সিজার করে বের করে ফেলা হয়। এখন সে স্কয়ার হাসপাতালের এনআইসিওতে বেঁচে থাকার জন্য প্রাণপন যুদ্ধ করে যাচ্ছে!!!’ সদ্য ওএসডি হওয়া এই ইউএনও ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ক্ষোভের সুরে লিখেন, ‘আমার এই নিষ্পাপ সন্তানটার কি অপরাধ ছিল? নাকি মা হতে চাওয়াটাই আমার সবচেয়ে বড় অপরাধ ছিল আমি জানিনা!!! তবে জানি একজন সব দেখেন তিনি আমার নিষ্পাপ মাসুম সন্তানের উপর এই জুলুমের বিচার করবেন। এই নিষ্ঠুর অমানবিকতার পৃথিবীতে কোন কর্তা ব্যাক্তিদের কাছে আমি এ অন্যায়ের বিচার চাই না, শুধু আমার সৃষ্টিকর্তা কে বলবো তুমি এর বিচার করো!!! আর যারা আমাকে একটুও ভালোবাসেন আমার নিষ্পাপ সন্তানটার জন্য দোয়া করবেন। ও সুস্থ হয়ে গেলে কোন কষ্টের কথাই আমার মনে থাকবে না।’ প্রসঙ্গত, নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলায় এবার নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে আসছেন নাহিদা বারিক। যিনি এরআগে ফতুল্লা সার্কেলের এসিল্যান্ড হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গিয়েছিলেন। গত ৪ ফেব্রুয়ারী ঢাকা বিভাগীয় অতিরিক্ত কমিশনার (সার্বিক) তারিকুল ইসলাম সাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে নাহিদা বারিককে নিয়োগের বিষয়টি জানানো হয়।

About ডান্ডিবার্তা

View all posts by ডান্ডিবার্তা →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *