মুক্তিযুদ্ধে প্রথম শহীদদের যোগ্য মর্যাদা আজো পায়নি নারায়ণগঞ্জবাসী

 

বিশেষ প্রতিবেদন

হাবিবুর রহমান বাদল

দেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে প্রথম পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যে অঞ্চলের সাধারণ মানুষ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে গিয়ে নিহত হয়েছিলেন, সেটা ছিল নারায়ণগঞ্জ। ২৫শে মার্চ রাতে পাক বাহিনী বাঙ্গালীর উপর নির্মম হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। বিশ্ববিদ্যালয় গুলিতে চলে গণহত্যা। ঢাকা গণহত্যার শহরে পরিণত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা সহ আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পর তৎকালীণ ইপিআর প্রথম পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এরপর দেশের কোথাও মার্চ মাসে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়নি। ২৬মার্চ পাক হানাদার বাহিনী ঢাকার পাশের শহর নারায়ণগঞ্জে প্রবেশের চেষ্টা করে। এর আগেই ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পুরাতন সড়কের পাগলা থেকে চাষাঢ়া পর্যন্ত পথে পথে ট্রেনের বগি ফেলে ও বড় বড় গাছ কেটে রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। পাক বাহিনী ফতুল্লার মাসদাইর পর্যন্ত বিভিন্ন ভাবে ব্যারিকেড সরিয়ে আসতে পারলেও মাসদাইর বর্তমান পুলিশ লাইনের কাছে এসে বাধাপ্রাপ্ত হয়। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ তৎকালীন এমএলএ একেএম সামছুজ্জোহা ও আফজাল হোসেনের সামগ্রিক তত্বাবধানে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে লিপ্ত হয়। সম্ভবত পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে এটাই প্রথম সাধারণ মানুষের প্রতিরোধ যুদ্ধ। এখানে পাক বাহিনীকে ২৬ঘন্টার বেশী সময় আটকে রাখা হয়। আর এর ফলে পাক বাহিনী ৩৩জনকে নির্মমভাবে হত্যার পর ২৭মার্চ দুপুরে শহরে প্রবেশ করে। মূলত মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে এটাই ছিল দেশের প্রথম পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধ। এই প্রতিরোধ যুদ্ধে নিহতরা এখনও শহীদের মর্যাদা পায়নি বলে শহীদ পরিবারের সন্তান মোহাম্মদ হোসেন অভিযোগ করেন। তবে গত বছর নারায়ণগঞ্জ জেলা মুক্তিযুদ্ধা সংসদের নব নির্মিত ভবন উদ্বোধনকালে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ.ক.ম মোজাম্মেল হক এই প্রতিনিধির সাথে আলাপকালে জানান,শহীদদের প্রাপ্য মর্যাদাসহ তাদের পরিবারদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করা হবে। কিন্তু আজও তারা সেই মর্যাদা পায়নি। এদিকে সম্প্রতি এ সকল শহীদদের মর্যাদা ও নাম তালিকাভ’ক্ত করার জন্য এবং শহীদ পরিবারের স্বীকৃতি দেয়ার জন্য নারায়ণগঞ্জ মাসদাইর শহীদ পরিবার কল্যাণ সমিতির পক্ষ থেকে ৩৩ জন নিহতের স্মৃতিস্তম্ব করার দাকি জানিয়ে নাসিক মেয়রের কাছে স্বারকলিপি প্রদান করে। সেই প্রতিরোধকালীন সময়ের শেষে পাক হানাদার বাহিনী যে ৩৩জনকে বিভিন্ন স্থানে হত্যা করে তখন বর্তমানে কেরানীগঞ্জের পানগাওয়ে বসবাসকারী মোহাম্মদ হোসেন এই হত্যাকান্ডের একজন প্রত্যক্ষদর্শী। মোহাম্মদ হোসেন সেদিনের ঘটনা বলতে গিয়ে আবেগ আপ্লুত কন্ঠে বলেন, শহীদ পরিবারের সদস্য হয়েও আমরা কোন সম্মানী তো দুরের কথা আমাদের স্বীকৃতি পর্যন্ত দেয়া হয়নি। তার চাচাসহ পাঁচজনকে হত্যার সময় মোহাম্মদ হোসেন নিজেও গুলিবিদ্ধ হয়। পাক বাহিনী মোহাম্মদ হোসেন মারা গেছে ভেবে চলে যান। ৩দিন অজ্ঞান থাকার পর জ্ঞান ফিরে দেখেন সে লাশের পাশে পড়ে আছে। এরপর কেরাণীগঞ্জ চলে যান। এব্যাপারে মোহাম্মদ হোসেন জানান, পঙ্গু অবস্থায় দূর্বিষহ জীবন যাপন করলেও সেদিন পাক হানাদার বাহিনী কে প্রতিরোধ করার অপরাধে উত্তর মাসদাইরের ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার, তার গাড়ির চালক নুর ইসলাম, আশরাফুল ইসলাম, পূর্ব মাসদাইরের সাবেক মন্ত্রী মরহুম আব্দুস সাত্তারের পুত্র তৌফিক সাত্তার ও তার বন্ধ জালাল, পশ্চিম মাসদাইরের ভাষা সৈনিক খাজা জহিরুল হকের বোন হাসিনা হক, ভগ্নিপতি জসিমুল হক সহ দারোয়ান ও দুইজন বাড়ীর কাজের লোককে গুলি করে হত্যা করে। শুধু তাই নয় পাক হানাদার বাহিনীর হাত থেকে বাচঁতে গিয়ে একই এলাকার সাচ্চু, জিন্নাহ ও আকবর মসজিদে আশ্রয় নিলে নরপিশাচরা মসজিদে ঢুকে তাদেরকে গুলি করে হত্যা করে। এছাড়া গুলবদন নামের এক মহিলাকে পুড়িয়ে মারে। ব্যাংকার আব্দুস সাত্তার, জনৈক আনিছুল ইসলামের দুই মেয়ে সহ ৩৩ জনকে নির্মমভাবে ২৭শে মার্চ হত্যা করা হয় বলে সেদিনের প্রত্যক্ষদর্শী মো: হোসেন কান্নাজড়িত কন্ঠে জানান। বাংলাদেশের ইতিহাসে এরাই দেশের স্বাধীনতার জন্য প্রথম বেসরকারী শহীদ বলা চলে। সেই হত্যাযজ্ঞের প্রত্যক্ষদর্শী মো: হোসেন এখন কেরানীগঞ্জের পানগাওয়ে অবস্থান করছেন। পঙ্গু এই মুক্তিযোদ্ধার মো: হোসেন ক্ষোভের সাথে বলেন, স্বাধীনতার ৪৭ বছরেও মুক্তিযুদ্ধের কোন সুফল ভোগ করিনি। মুক্তিযোদ্ধার সম্মানটুকু অদ্যাবধি পাইনি। সরকারী সুযোগ-সুবিধা তো দুরের কথা কেউ এ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের সেই অবদানকে স্বরণ করে আমাদের স্বীকৃতিটুকুও দেয়নি। অথচ আমাদের বাড়িতেই আমার চাচা আব্দুস সাত্তার সহ মাসদাইর এলাকায় ৩৩জনকে হত্যা করে। মোহাম্মদ হোসেন গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ৩দিন অজ্ঞান থাকার পর জ্ঞান ফিরে আসলে মাসদাইর থেকে কেরানীগঞ্জে যান। অথচ সেই মোহাম্মদ হোসেন মুক্তিযুদ্ধের সনদটুকু পর্যন্ত পাননি। এমনকি তার অনেক সম্পত্তি বেদখল করে রাখা হয়েছে। বিগত বিএনপি সরকারের আমলে ২০০৩ সালে এর আনুষ্ঠানিক নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ওই সরকারের আমলেই শেষ হয় কাজ। শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এ স্তম্ভের অনেকটা বেহাল দশা। শহরবাসীর দৃষ্টি আকর্ষিত এ স্তম্ভের বিভিন্ন স্থানে বাতি লাগানো হলেও সেগুলো জ্বলে উঠেনি কখনো। বর্তমানে শহরের চাষাড়া শহীদ মিনারের চারপাশে স্থাপিত বাতিগুলোও বাতিলে পরিনত হয়েছে। ময়লা আবর্জনাতে প্রায় সময়েই থাকে অপরিস্কার। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পুরাতন সড়কের মাসদাইর কবরস্থান সংলগ্ন স্থানে তৈরী করা হয়েছে প্রতিরোধ স্তম্ভ। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালো রাত্রির পর ২৬ মার্চ বিকালে নারায়ণগঞ্জের দামাল ছেলেরা খবর পায় পরদিন তথা ২৭ মার্চ পাক বাহিনী নারায়ণগঞ্জ শহরে প্রবেশ করে। ওইদিন নারায়ণগঞ্জের মুক্তিকামীরা শহরের মাসদাইর এলাকা পৌর কবরস্থান শশ্মান ঘাট সংলগ্ন ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ (পাগলা) সড়ককে অবস্থান নেয়। সেখানে তারা পাক বাহিনীর প্রবেশে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং সড়কের পঞ্চবটি থেকে মাসদাইর পর্যন্ত গাছ কেটে সড়ক অবরোধ করে রাখেন। একই সময়ে পাক বাহিনী যাতে শহরে প্রবেশ করতে না পরে এজন্য শহরের চাষাড়ায় রেল গেইটে ট্রেনের বগি ফেলে রেখে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়। এ ঘটনা ছিল রাজধানীর বাইরে প্রথম কোন স্থানে প্রতিরোধ। গত বিএনপি সরকার এ স্থানে প্রতিরোধ স্তম্ভ নির্মাণ করে যা এখন অনেকটা অবহেলিত অবস্থায় বেদখল হয়ে আছে। অযতœ আর অবহেলার কারণে এর প্রকৃত সৌন্দর্য্য বিলীন হওয়ার পথে। আশেপাশের বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ইট-বালু ও আর নানা সামগ্রী দিয়ে স্তম্ভের স্থান দখল করে রাখা হয়েছে। নষ্ট হচ্ছে এর পবিত্রতা। মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাসে একাত্তরের ২৯ নভেম্বর দিনটি ছিল নারায়ণগঞ্জবাসীর জন্য বেদনা বিধুর দিন। ওই দিন ফতুল্লা থানার দুর্গম চরাঞ্চল বুড়িগঙ্গা নদী বেষ্টিত বক্তাবলীতে হত্যাযজ্ঞ চালায় পাক হানাদার বাহিনী। স্বাধীনতা যুদ্ধে নারায়ণগঞ্জে একসাথে এত প্রাণের বিয়োগান্ত ঘটনা দ্বিতীয়টি আর নেই। স্বজন হারানো ব্যথা ও কষ্ট নিয়েও শ্রদ্ধার সাথে প্রতিবছরই পালিত হয় এই দিবসটি। এটি নারায়ণগঞ্জবাসীর জন্য অত্যন্ত অর্থবহ একটি দিন। ২৯ নভেম্বর সকালে মুক্তিযোদ্ধাদের উপুর্যপরি আক্রমনের মুখে পাক হানাদাররা পিছু হঠতে শুরু করে। এসময় তারা রাজাকার, আল বদর, আল শামস বাহিনীর পরামর্শে তারা ১৩৯ জন নিরস্ত্র গ্রামবাসীকে ধরে এনে লাইন ধরিয়ে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করে। এতে নিহত হয় শাহিদ, ফারুক, অহিদ, মনির, শাহ আলম, রহমতউল্লাহ, সামছুল, আলম, সালামত, খন্দকার, সুফিয়া, আম্বিয়া, খোদেজা সহ ১৩৯ জন। পিছু হটার সময় হানাদার বাহিনী পেট্রোল ও গান পাউডার দিয়ে পুড়িয়ে দেয় বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী পার সংলগ্ন বক্তাবলী পরগনার, রাজাপুর ডিগ্রীর চর, মুক্তারকান্দি, গঙ্গানগর, রাম নগর, গোপাল নগর, রাধানগর সহ ২২ টি গ্রাম। বিগত বিএনপি সরকারের আমলে এ ওই স্থানে একটি স্তম্ভ নির্মাণ করা হয়। কিন্তু এ স্তম্ভটিও রয়েছে চরম অবহেলায়। অথচ মুক্তিযুদ্ধের সুবিধাভোগী যারা তারা এই ইতিহাস জানে কিনা এটাই নারায়ণগঞ্জবাসীর প্রশ্ন। নারায়ণগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধে বিশাল অবদান রাখা সত্বেও আজওবধি নারায়ণগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের দলিল পাওয়া যায় না। এ ব্যপারে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা ক্ষোভের সংগে বলেন, বর্তমান সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অনেক কিছু করছে কিন্তু আমরা চাই নারায়ণগঞ্জে প্রথম শহীদদের স্বীকৃতিসহ ভুয়া ও লুটেরা কথিত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রকাশ করা হউক। এ ব্যপারে গত বছর ৮ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ.ক.ম মোজাম্মেল হক নারায়ণগঞ্জে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স উদ্বোধনকালে এ প্রতিনিধির সাথে আলাপকালে বলেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সাথে নারায়ণগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস যাতে লিপিবদ্ধ হয় তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

About ডান্ডিবার্তা

View all posts by ডান্ডিবার্তা →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *