এতো বড় ধাক্কা কী করে সামলাবে নিহা?

ডান্ডিবার্তা রিপোর্ট
সানজিদা জামান নিহার বয়স সবে মাত্র ২০। এটুকুন বয়সে তার জীবনে এতো বড় একটি ধাক্কা কী করে সামলে উঠবেন তিনি? তাই ভেবে ভেবে অস্থির তার পিতা সামসুজ্জামান বাবুল ও মা সাফিয়া বেগম। বিয়ের পর নিহা সর্বসাকুল্যে মাত্র তিন মাস ছিলেন স্বামী সোহাগী তার মধ্যেই স্বামী হারানো এমন শোক! শোকে বিহ্বল নিহার গগণবিদারক চিৎকারে আকাশ পাতাল যেন কেঁপে উঠছে। আত্মীয় স্বজনেরা সান্ত¦না দিচ্ছেন। তাকে শান্ত থাকতে হবে। কারণ, তার গর্ভে তিন মাসের সন্তান। অন্তত অনাগত শিশুটির জন্য হলেও তাকে উত্তেজিত হতে বারণ করা হচ্ছে। কিন্তু বিয়ের বছর ঘুরতে না ঘুরতেই স্বামী হারানোর এমন শোক কী আর পড়শীদের সান্ত¦নায় বুঝ মানে। সদ্য বিবিএ পাস করেছিলো সানজিদা জামান নিহা। এরমধ্যেই ভালো ঘর থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসে। ছেলে ন¤্র, ভদ্র এবং শিক্ষিত হওয়াতে আপত্তি তুলেননি নিহার পিতা সামসুজ্জামান বাবুল ও তার স্ত্রী সাফিয়া। মহা ধুমধামে ২০১৭ সালের ২৯ ডিসিম্বের মেয়েকে বিয়ে দেওয়া হয় ফারুকের সাথে। বিয়ের অল্প কিছুদিনের মধ্যেই নিউজিল্যান্ডে চলে যান ওমর ফারুক।গেল বছরের ১৬ নভেম্বর ছুটিতে দেশে আসেন ফারুক। ছিলেন ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত। ওমর ফারুক ছুটি শেষে নিউজিল্যান্ডে পৌঁছার পরই জানতে পারেন তার স্ত্রী অন্তঃস্বত্বা। প্রথম বাবা হওয়ার খবরে যারপরনাই উদ্বেলিত সে। প্রতিদিনই যখন তখন ফোন দিতেন স্ত্রীকে। খবর নিতেন তার অনাগত সন্তানের। খুব শিগগিরই দেশে ফিরবেন। স্ত্রী সন্তান প্রসব করার সময় তিনি পাশে থাকবেন। এমন আরও অনেক কথাই ছিলো তার।বর্তমানে নিহার গর্ভে বেড়ে ওঠা ফারুকের সন্তানের বয়স তিন মাস। এরমধ্যেই বিশ্ব তোলপাড় করার মতো একটি ঘটনা ঘটে যায় নিউজিল্যান্ডে। দেশটির ক্রাইস্টচার্চ মসজিদে খৃস্টান দুই জঙ্গি বন্দুক হামলা চালায়। এতে নিহত হন ৫০ জন। তাদের মধ্যে একজন নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার রাজবাড়ি এলাকার ওমর ফারুক। যিনি সানজিদা জামান নিহার স্বামী। যার সাথে তার বিয়ে হয়েছে মাত্র এক বছর তিন মাস।জানা গেছে, ১৫ মার্চ নিউজিল্যান্ডের ওই বন্দুক হামলায় গুরুতর আহত হন ওমর ফারুক। আহতদের তালিকায় তার নাম দেখা গেলেওপরিবার তখনও কিছু জানতেন না। বন্দর থেকে নিউজিল্যান্ডে যোগাযাগ করার পরও খোঁজ মিলেনি তার। এরমধ্যে খবর ছড়ায় ওমর ফারুক চিকিৎসাধিন মারা গেছেন। কিন্তু কিছুতেই বিশ্বাস করছিলেন না তার পরিবার।ফারুকের স্ত্রী নিহা বারবারই বলছিলেন, তার স্বামী বেঁচে আছেন। পরিবারও বলছিলে তাই। মৃত্যুর যে খবর শোনা যাচ্ছিলো তা কিছুতেই তারা আমলে নিচ্ছেন না। কিন্তু অপ্রিয় সত্য মৃত্যু যা বাস্তবতা এবং এই নির্মম বাস্তবতাকেই বরণ করে নিয়েছেন ভাগ্য ফেরাতে নিউজিল্যান্ডে পারি জমানো ওমর ফারুক। লাশ হয়ে ফিরলেন নিজের বাড়িতে।২৬ মার্চ রাত রাত ১০ টা ২৫ মিনিটে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সে করে শাহাজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে এসে পৌঁছায় ওমর ফারুকের মরদেহ। ফারুকের পরিবারের পক্ষে তার স্ত্রী সানজিদা জামান নিহা ও ভগ্নিপতি সরোয়ার হোসেন মরদেহটি গ্রহণ করেন। আইনী প্রক্রিয়া শেষে ভোরের দিকে ওমর ফারুকের মরদেহ বন্দরে পৌছায়। বন্দরের সিরাজউদ্দোলা মাঠে ওমর ফারুকের জানাযা হয়। জানাযা শেষে ওমর ফারুকের বাড়ির পার্শ¦বর্তী চিতাশাল কবরস্থানে দাফন করা হয়। এসময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান মুকুল, বন্দর ওসি রফিকুল ইসলা, কাউন্সিলর সুলতান আহম্মেদ ভূইয়া প্রমূখ।এদিকে ওমর ফারুকের মরদেহ দাফনের পরেও তার বাড়িতে এখনও চলছে শোকের মাতম। শোকে বিহ্বল তার স্ত্রী প্রায় বাকরুদ্ধ। আর ওমর ফারুকের মায়ের আহাজারি যেন কিছুতেই থামছে না। তিনি বারবারই বলছিলেন, ‘পোলাডারে ক্যান পাডাইছিলাম নিউজিল্যান্ডে…আল্লহ, আমার যাদুধনরে ক্যান কাইরা নিলা… ’ বাবা মায়ের একমাত্র ছেলে ওমর ফারুক। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি তিনি। ভাগ্যের চাকা ঘুরাতে জীবিকার তাগিদে ২০১৫ সালে পাড়ি জমিয়েছিলেন সুদূর নিউজিল্যান্ডে। ভাগ্যক্রমে নিউজিল্যান্ডের সিটিজেনশীপও পেয়েছিলেন। সেখানে একটি কনস্ট্রাকশন কোম্পানিতে কাজ করতেন ওমর ফারুক। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে সবকিছু গুছিয়ে দেশে ফিরে বিয়ে করেন একই এলাকার সানজিদা জামান নিহারকে। বিয়ের কিছুদিন পরই ফিরে যান তিন। গত ১৬ নভেম্বর ছুটি নিয়ে আবারো দেশে আসেন। কিছুদিন বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে কাটিয়ে ১৮ জানুয়ারি নিউজিল্যান্ড ফিরে যান তিনি। তার স্ত্রী সানজিদা জামান নিহার বর্তমানে ৩ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। সুদূর নিউজির‌্যান্ডে গেলেও তার মন পরে থাকতো তার নিজ বাড়ি বন্দরের রাজবাড়িতে। দিন শেষে বাবা-মা, বোন ও অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেই কাটতো তার সময়। প্রতিদিন স্ত্রীকে তার নিজের ও তাদের অনাগত শিশুর যতœ নেয়ার জন্য কত কিছুই না বলতেন। অনাগত সন্তানকে নিয়ে দুজন মিলে বুনেছিলেন হাজারো স্বপ্ন। নিজের সন্তানের আগমনকে ঘিরে ছিলো কতনা কল্পনা। প্রতিদিনের মতো নিউজিল্যান্ড সময় শুক্রবার সকাল ৮টার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন ওমর ফারুক। স্ত্রীকে বলেছিলেন, সাবধানে চলাফেরা করতে, নিজের ও সন্তানের যতœ নিতে। কথা দিয়েছিলেন একসঙ্গে মুখ দেখবেন তাদের অনাগত নবজাতকের। কিন্তু অনাগত সেই সন্তানের মুখ আর দেখা হলোনা তার। এর আগেই লাশ হতে হলো তাকে। গত শুক্রবার নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ শহরের আল নুর মসজিদে জুমার নামাজ পড়তে গেলে এক শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসীর নৃশংস হামলায় নিহত হন তিনি। শুক্রবার সকালে কথা শেষে শনিবার বিকেলে গণমাধ্যমে দুই বাংলাদেশির লাশ শনাক্ত হওয়ার খবর জানতে পেরে স্বজনরা যোগাযোগ করেন নিউজিল্যান্ডে। সেখান থেকেই তারা ওমর ফারুকের নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হন। ওমর ফারুকের মৃত্যুর সংবাদে শোকের ছায়া নেমে এসেছে তার পরিবার ও এলাকাবাসীদের মাঝে। আগামী জীবন ও জন্মের আগেই পিতার ছায়া থেকে বঞ্চিত সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে দিশেহারা স্ত্রী সানজিদা জামান নিহার। ফারুককে হারিয়ে স্ত্রীসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা অকূল পাথারে পড়েছেন।

About ডান্ডিবার্তা

View all posts by ডান্ডিবার্তা →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *