নারায়ণগঞ্জে শান্তির দূত কি সেলিম ওসমান?

ডান্ডিবার্তা রিপোর্ট
হঠাৎ অস্থির হয়ে উঠা প্রাচ্যের ডান্ডি খ্যাত নারায়ণগঞ্জে অবশেষে শান্তির সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। এমনটাই আমরা বলে আসছি বেশ কয়েক বছর যাবত। দৈনিক ডান্ডিবার্তার সাথে সুর মিলিয়ে সাংসদ সেলিম ওসমান নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই নারায়ণগঞ্জের উন্নয়নে সকল পক্ষকে এক টেবিলে বসে সমস্যার সমাধান আলোচনার মাধ্যমে করার জন্য আহবান জানিয়ে আসছেন। মেয়র আইভীকে এ ব্যপারে একাধিকবার সাংসদ সেলিম ওসমান আহবান জানালেও এক টেবিলে বসতে নারাজ মেয়র আইভী। কি কারণে তিনি বসতে রাজি নন এটা নারায়নগঞ্জবাসীর পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যেও চলে আসছে আলোচনা। এরই মধ্যে হঠাৎ করেই আইন শৃঙ্খল্ াপরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে পুলিশ সুপার মাদক, ভ’মিদস্যু ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হলে একটি পক্ষ এই অভিযানকে সাংসদ শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে অভিযান বলে প্রচার করতে থাকে। আর এ নিয়ে সাংসদ শামীম ওসমান ও পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। যার অবসান ঘটে নববর্ষে। প্রভাবশালী দুই ব্যাক্তির মধ্যকার অদৃশ্য স্নায়ুযুদ্ধে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক পরিবেশ অশান্ত হয়ে উঠতে থাকে। এমতাবস্থায় সাংসদ সেলিম ওসমান উদ্যোগী হয়ে পুলিশ সুপারের সাথে আলোচনা কালে দুই জনের দুরত্বের মাঝে তৃতীয় পক্ষের ইন্ধন খুঁজে পান। যার পরিনতিতে নববর্ষে আওয়ামীলীগের এমপি শামীম ওসমান ও এসপি মো: হারুন অর রশীদ একত্রে মধ্যাহৃ ভোজের মধ্য দিয়ে উত্তেজনার সেই ভুল বুঝাবুঝির অবসান ঘটেছে বলে মনে করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এই ভুল বুঝাবুঝিকে কেন্দ্র করে এমপি, মেয়র, এসপি, ব্যবসায়ী সমাজ- চতুর্মুখী দ্বন্দে সম্প্রতি অস্থির হয়ে উঠেছিল নারায়ণগঞ্জ। জেলার ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগের প্রভাবশালী এমপি শামীম ওসমানের সাথে পুলিশ সুপার মো: হারুন অর রশীদ, পিপিএম, বিপিএম এর মধ্যকার যেন এক অদৃশ্য স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়েছিল। যেই যুদ্ধে চিরশত্রু শামীম ওসমানকে রাজনীতিতে কোনঠাসার লক্ষ্যে অন্তরালে থেকে কলকাঠি নাড়ার অভিযোগ উঠেছিল নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্রভাবশালী মেয়র ডা: সেলিনা হায়াত আইভীর বিরুদ্ধে। আর শেষমুহুর্তে এই যুদ্ধে সামিল হয়ে গিয়েছিল নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ। ফলশ্রুতিতে, চতুর্মুখী দ্বন্দে হঠাৎ করেই উত্তপ্ত হয়ে উঠে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি। যা এক পর্যায়ে শামীম ওসমান ও ব্যবসায়ী সমাজ বনাম পুলিশ সুপার ও মেয়র আইভীর মধ্যকার প্রতিদ্বন্দীতায় রূপ নেয়। এ অবস্থার অবসান ঘটেছে তা নারায়ণগঞ্জ ক্লাবে বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে পুলিশ সুপার নিজেই স্বীকার করেছেন। গত ২৭ মার্চ নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদ প্রাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা ও চেক প্রদান অনুষ্ঠানে শামীম ওসমান পুলিশ প্রশাসনের ইঙ্গিত করে বেশ কঠোরতার সাথে হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করে বক্তৃতা দেন।ওই অনুষ্ঠানের দুইদিন পরই ২৯ মার্চ শামীম ওসমানের আস্থাভাজন নেতা হিসেবে পরিচিত মহানগর আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহ নিজামের বিরুদ্ধে সরকার ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে মন্তব্যের অভিযোগে জিডি করেন ফতুল্লা মডেল থানার তৎকালীন ওসি শাহ মো: মঞ্জুর কাদের। এরপর গত ১ এপ্রিল রাতে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার পাগলায় মেরী এন্ডারসনে মদ ও বিয়ার উদ্ধারের ঘটনায় ক্রীড়া সংগঠক ও শামীম ওসমানের শ্যালক তানভীর আহমেদ টিটুকে জড়ানো হয়। টিটুকে মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত করার অভিযোগে নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্টি প্রতিবাদ সভা করে ৭ এপ্রিল জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদানের ঘোষণা দেয়। একই সাথে পুলিশ প্রশাসনও নগরীতে মহড়া দেয়াসহ শামীম ওসমানের অনুসারী নেতাদের আয়োজিত সভাকে কেন্দ্র করে সভাস্থলে জল কামান ও পুলিশ সদস্যদের মোতায়েন করে নেতাকর্মীদের মাঝে আতঙ্কের সৃষ্টি করেন। শুধু তাই নয়, শামীম ওসমানের ঘনিষ্টজন হিসেবে পরিচিত আওয়ামীলীগের একাধিক শীর্ষ নেতার মুঠোফোন ট্যাকিংয়েরও অভিযোগ উঠে পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে। এনিয়ে বেশ কয়েকদিন যাবত শামীম ওসমান অনুসারীদের মাঝে বেশ উদ্বেগ উৎকন্ঠা পরিলক্ষিত হয়েছিল। যার ফলে শামীম ওসমান ৬ মার্চ নেতাকর্মীদের নিয়ে জরুরী সভা করে তাদের ভয় না পেতে আশ^স্ত করেন। ঐদিন তিনি নাসিক মেয়র ডা: সেলিনা হায়াত আইভীকে উদ্দেশ্য করে শামীম ওসমান বলেছিলেন ‘নারায়ণগঞ্জে একজন মহিলা আছেন, ‘তার নাম আমি বলতে চাইনা। কারন আমি তার নাম বলে বলে তাকে হাইলাইট করে দিয়েছি। তার নাকি জামায়াতের সাথে কানেকশন রয়েছে। সেই মহিলা হুমকি দিয়েছিলেন মামলা করার। আমি বলতে চাই মামলার হুমকি দিলেন কিন্তু মামলা করলেন না ক্যান? সৎ সাহস থাকলে মামলা করেন।’ এরপর দিন পুলিশ সুপার এক সংবাদ সম্মেলনে পাল্টা হুঁশিয়ারী দেন, ‘মাদক, সন্ত্রাস ও ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে অভিযান চলবে। অপরাধী যত বড় আর শক্তিশালী হোক না কেন, তাকে ছাড় দেওয়া হবে না।’ তারপর টিটুকে মাদকের সাথে জড়ানোর প্রতিবাদে নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী সমাজ ক্ষুব্ধ হয়ে চেম্বার সভাপতি খালেদ হায়দার খান কাজল জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর নিকট স্মারকলিপি দেয়ার ঘোষণা দিলেও শেষতক উত্তপ্ত পরিস্থিতি প্রশমিত করে এসপির সাথে আলোচনার টেবিলে বসে শান্তির পথ প্রশস্থ করেন সদর-বন্দর আসনের এমপি ও বিকেএমইএ সভাপতি সেলিম ওসমান। পরবর্তীতে গত রবিবার পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষের দিন নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মো: হারুন অর রশীদের সরকারী বাস ভবনে বর্ষবরণের মধ্যাহৃ ভোজে যোগ দিয়ে রীতিমত সবাইকে চমক লাগিয়ে দেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি শামীম ওসমান। যার ফলে হঠাৎ উত্তপ্ত নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক পরিবেশ অবশেষে শান্ত হতে শুরু করে। নববর্ষে এসপি হারুনের সাথে এমপি শামীম ওসমানের যে চমকপ্রদ মিলন ঘটে। যার ফলে নারায়ণগঞ্জবাসী মনে করছে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে আইভী এক টেবিলে বসলে সকল সমস্যার সমাধানের পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জের উন্নয়ন তরান্নিত হবে।

About ডান্ডিবার্তা

View all posts by ডান্ডিবার্তা →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *