বন্ধের পথে শহরের দুইটি সিনেমা হল

ডান্ডিবার্তা রিপোর্ট
দীর্ঘ ৫২ বছর যাবৎ শহরের গুলশান সিনেমা হলের সামনে টুকরিতে করে মোরব্বা, নারকেলি, বাদাম বিক্রি করছেন জিন্নাহ মিয়া। শুরুর দিকে দর্শকের হুড়োহুড়িতে টুকরি পড়ে যাবার মতো ঘটনা ঘটতো। হলের পাশেই সিনেমা দেখতে আসা দর্শকদের সারি সারি সাইকেল পার্ক করা থাকতো। কিন্তু এখনকার অবস্থা বর্ণনাতীত। সারা দিনে ৫০ টিকেটও বিক্রি হয়না। দর্শক না থাকাতে লোকসান গুণতে গুণতে হাল ছেড়ে দিয়েছেন হলের মালিক ফয়েজউদ্দিন আহমদ লাভলু। হল বন্ধ করে দিয়ে সেখানে বহুতল ভবন করার চিন্তা-ভাবনা তার। একই দশা শহরের নিউ মেট্রো সিনেমা হলের। হল বন্ধ করার জন্য আবেদনপত্র তৈরি রয়েছে; যেকোন সময় বন্ধ হয়ে যাবে এই হলটিও। নারায়ণগঞ্জের ছোট এই শহরে কয়েক বছর পূর্বেও সিনেমা হল ছিল ছয়টি। ডায়মন্ড ও হংস সিনেমা হল আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। হলের জায়গায় উঠেছে বহুতল বানিজ্যিক ভবন। সম্প্রতি ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে এক সময়ের দোর্দন্ড প্রতাপের সাথে চলা আশা ও মাসার সিনেমা হল। একই পথে শহরের বাকি দুইটি সিনেমা হল- গুলশান ও নিউ মেট্রো সিনেমা হল। গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ২টায় মাত্র ১২ জন দর্শক নিয়ে শহরের করিম মার্কেট সংলগ্ন গুলশান সিনেমা হলে চলছে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ প্রযোজনার চলচিত্র তুই শুধু আমার। ভেতরে ঢুকে দেখা যায় সুনশান নিরবতা। দর্শক নেই বলে হলের কর্মচারীরা গল্পগুজব করে সময় পার করছেন। হলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফয়েজউদ্দিন আহমদ লাভলু হলের গেটের সামনের একটি বেঞ্চে বসে আসেন। গুলশান সিনেমা হলের সামনে টুকরিতে মোরব্বা, নারকেলি বিক্রি করা ষাটোর্ধ্ব বয়সী জিন্নাহ মিয়া বলেন, এই হলের সামনে ৫২ বছর যাবৎ দোকানদারি করি। হলেরই একজন হয়ে গিয়েছিলাম। এক সময় ছবি দেখতে আসা লোকজন ধাক্কাইয়া আমার দোকান ফেলে দিতো। ভালোই বিক্রি হইতো তখন। আর এখন লোক হইলে না বেচা-কিনা হইবো। লোকই নাই। হলের সাথে সাথে কপাল পুড়েছে আমারও। হল মালিক ফয়েজউদ্দিন আহমদ বলেন, ঈশা খাঁর বাশের কেল্লা চলচিত্র দিয়ে এই হলের যাত্রা শুরু। ১০ বছর আগেও ব্যবসা সফল সিনেমা হইতো। অশ্রু দিয়ে লেখা চলচিত্র টানা ১০০ সপ্তাহ চলছে। আর এখন তো দর্শকই নাই। রাজ্জাক-শাবানার সাথে দর্শকও চলে গেছে। ২-৪ জন দর্শক নিয়েও হল চালাতে হয়। শুক্রবার ছাড়া কোন দর্শকই পাওয়া যায় না। সিনেমা হল বন্ধ হওয়ার কয়েকটি কারণ দেখান তিনি। তার মতে, এলিট শ্রেণির দর্শকরা হলে এসে সিনেমা দেখতে চায় না। একমাত্র গার্মেন্টসের লেবাররাই হলে আসে সিনেমা দেখতে। তারাও আবার এক শাকিব খানের ছবি দেখতে দেখতে বিরক্ত। অন্যদিকে ভারতের নায়কদের তারা ভালোমতো চেনে না। তার উপরে হলের অবকাঠামোগত কারণেও দর্শক কম বলে মন্তব্য করেন তিনি। হল চালিয়ে রোজ লোকসান গুণতে হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, এর চেয়ে গোডাউন দিয়ে রাখলেও ২৫-৩০ লাখ টাকা আসে। এভাবে আর চালানো যায় না। হল বাদ দিয়ে বহুতল ভবন করার চিন্তা-ভাবনা আছে। একই অবস্থা শহরের প্রায় ৬০ বছর বয়সী নিউ মেট্রো সিনেমা হলের। দুপুর গড়িয়ে তখন বিকেল অথচ টিকেট বিক্রি হয়েছে মাত্র ১২টি। গত এক বছর ধরেই এই করুণ অবস্থা বলে জানান হল মালিক পক্ষ। আগে ২০ জনের মতো কর্মচারী ছিল আর এখন মাত্র তিনজন। হলটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহিদ হোসেন বলেন, এক সময় দর্শকের জায়গা দেয়া যেতো না। আগে হোটেলে খাইতাম। আর এখন বাসা থেকে খাবার এনে খাই। গত ৫ বছর যাবৎ দর্শকপূর্ণ হল দেখলাম না। বর্তমান সরকার তো অনেক চেষ্টা করছে দেশের হলগুলোকে টিকিয়ে রাখার কিন্তু তাতো আর সম্ভব হচ্ছে না। চিঠি রেডি করে রাখছি। যেকোন সময় হল বন্ধ করে দেবো।

About ডান্ডিবার্তা

View all posts by ডান্ডিবার্তা →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *