রূপগঞ্জে সেতু নিয়ে যত দুর্নীতি!

রূপগঞ্জ প্রতিনিধি
সড়ক নির্মাণ অগ্রধিকার থাকলেও রূপগঞ্জে যত্রতত্র নির্মাণ করা প্রায় অর্ধশত ছোট-বড় সেতু ও কালভাট বছরের পর বছর অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এসব সেতু নিমাণে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ব্যয় হওয়া প্রায় শত কোটি টাকা এখন অপচয় হিসাবে জনগণের কাছে বিবেচিত হচ্ছে। এছাড়া অনেক সেতু, কালভাট অপিরকল্পিতভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। সড়ক-জনপথ, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, ও টিআর-কাবিখার অধীনে নির্মিত এসব সেতু নিয়ে হয়েছে ব্যাপক দুর্নীতিও। সব মিলিয়ে এ উপজেলায় ছোট-বড় সেতু রয়েছে ৭’শর উপড়ে। এরমধ্যে অধিকাংশই অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। এমনও সেতু রয়েছে যার দু’দিকে কোন রাস্তা নেই। এদিকে, খাল ও নদের উপড় অপরিকল্পিতভাবে সেতু গড়ে উঠায় জীববৈচিত্র্য ঘটছে। শুধু বালু নদের রূপগঞ্জ অংশেই নিমাণ করা হয়েছে ৩ টি সেতু। এছাড়া একটি নিমাণের অপেক্ষায়, আরেকটি প্রস্তাবনায় রয়েছে। এ দুটি নিমাণ হলে ৫ টি সেতু হবে বালু নদের রূপগঞ্জ অংশে। অপরিকল্পিত সেতু নির্মাণ করা হলেও আবার এমন সেতু রয়েছে যেটির স্প্যান দাড়িয়ে আছে গত এক দশক ধরে। এটি নির্মাণের কোন অগ্রগতি নেই। আর ঝূকিপূর্ণ সেতুরতো কোন অভাবই নেই। সরেজমিনে সমগ্র উপজেলা, সওজ কাযালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস ও পাউবোর কাযালয় যোগাযোগ করে ও অনুসন্ধানে মিলেছে এমন চমকপ্রদ তথ্য। বাপ, মরণের আগে বুঝি এ বিরিজ (ব্রীজ) দেইহা যাইবার পারুম না। স্বাদীনের পর থেইক্যা হুইনাছি এহান দিয়া বিরিজ অইবো। বারডা বছর অইছে পায়া( স্প্যান ) বানাইয়া খাড়া কইরা থুইছে। আর বানানের খবর নাই। এইডা কি সরকারের অফচয় অয় নাই। এভাবেই বালু নদের সেতুর পাশে দাড়িয়ে ক্ষোভের সঙ্গে কথাগুলো বলেন তালাশকুর গ্রামের ষাটোধ্ব জয়নাল মিয়া। সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, প্রস্তাবিত রামপুরা-কায়েতপাড়া সড়কের বালু নদের উপড় তৃতীয় সেতুর প্রকল্প অনুমোদন হয় ২০০১ সালে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৬ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে এ সেতুর নিমাণ শুরু হয় ২০০৩ সালে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের তত্বাবধানে এক বছরের মধ্যে সেতুর নিমাণ কাজ সম্পন্ন করার দায়িত্ব পান তৎকালীন ঠিকাদার (বতমানে পলাতক) জাহিদ মিয়া। কিন্তু ২০০৪-২০০৫ অথবছরে বরাদ্দ মেলে ৫০ লাখ টাকা। এরপর আর কোনো বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। ফলে চারটি পিলার নিমাণের পর ব্রিজের নিমাণ কাজ থমকে যায়। অদ্ভুদ ব্যাপার! লুটপাটের একি চিত্র? নিজ চোখে না দেখলে অনেকেরই হয়তো বিশ্বাস হবে না। রূপগঞ্জের সদর ইউনিয়নের এলাকায় এক সেতু নিমাণ করা হয়েছে। যার পাশ দিয়ে চলে গেছে আকাবাকা রাস্তা। পাশে ক্যানেল খাল। এই খালের উপড়ই ঠায় দাড়িয়ে আছে সেতু। এ সেতু দিয়ে কেউ চলাচল করতে পারে না। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস সূত্রে জানা যায় , বতমান সরকারের আমলেই এ সেতু নিমাণ করা হয়েছে। যার ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। স্থানীয়রা বলেন, এটা কেমন সেতু। আর কি কারণেই বা বানালো। সেতুর পাশ দিয়া রাস্তা আছে। ছোট্র খালের উপড় তাল গাছের মতো দাড়িয়ে আছে। এ ব্যাপারে স্থানীয় চেয়ারম্যান, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসার ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নিবাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা কেউ এ বিষয়ে অবগত নন বলে জানান। একই চিত্র দেখা গেছে তারাবো পৌরসভার দক্ষিণ মাসাবো এলাকার পানি উন্নয়ন বোডের( পাউবো ) খালের উপড়। এখানে যে সেতুটি করা হয়েছে, সেটি বেড়ী বাধ থেকে শুরু। তবে সেতুর পশ্চিম পাশে কোন রাস্তা নেই। শুধু কাশফুল বন আর ইরি-বোরো জমি। আর সেতুর ডানে-বামে ফসলি জমির আইল। স্থানীয়রা বলেন, এ সেতু এলাকাবাসীর কোন কাজে আসে না। উপজেলার বিভিন্ন এলাকা সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, অসংখ্য ঝূকিপূণ সেতুর চিত্র। ঝূকিতে রয়েছে ৭৬ কোটি ২৮ লাখ টাকা ব্যয়ে নিমিত তারাব-ডেমরায় সুলতানা কামাল সেতু। সেতুর নিচে অবৈধভাবে বালুর ব্যবসা করায় সেতুটি এখন ঝূকিপূণ। সেতুর জয়েন্টে প্লাষ্টার কভার নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে দেখা দিয়েছে বিশাল সুড়ঙ্গ। এতে যে কোন সময় বড় ধরণের বিপদের আশঙ্কা রয়েছে। শীতলক্ষ্যা নদের উপড় কাঞ্চন সেতুও ঝূকিপূণ। ১৯৯২ সালে এক কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে বালু নদের চনপাড়া-ডেমরা সেতুর চারটি পিলারের পলেস্তারা খসে পড়েছে। ইছাপুরা-ডুমনী সেতুটিও খুবই ঝূকিপূণ। ১৯৯২ সালে এ সেতুটি নিমাণ করা হয়। এছাড়া নগরপাড়া খালের উপড়, কেওঢালা খালের উপড়, নিমেরটেক খালের, বিরাব খালের উপড়সহ প্রায় শতাধিক সেতু ঝূকির মধ্যে রয়েছে। অব্যবহৃত সেতুর পাশাপাশি অপরিকল্পিত সেতুর ছড়াছড়ি রয়েছে এ উপজেলায়। বিধান রয়েছে, যেকোনো ধরণের নিমাণকাজ করতে হলে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেওয়ার। এ নিয়মের বাইরে নয় সরকারের কোনো মন্ত্রণালয়। কিন্তু স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়( এলজিইডি), সড়ক ও জনপথ(সওজ) উপজেলার বিভিন্ন খাল ও নদের উপড় সেতু নিমাণের ক্ষেত্রে তোয়াক্কা করেনি সে নিয়মের। পরে দুই পাড়ে মাটি ফেলে অবৈধভাবে নদ সংকুচিত করা হয়। শেষে সেতু বরাবর নদের পাড় দখল করে নেয় প্রভাবশালীরা। সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ৫৫ টি সেতুর এ্যাপ্রোচ সড়ক নেই। তবে উপজেলা এলজিইডি অফিস সূত্রমতে, এ্যাপ্রোচ সড়ক নেই প্রায় ৭৭ টি সেতুর। সরেজমিনে দেখা যায়, দাউদপুর ইউনিয়নের হানকুর থেকে জিন্দা যাওয়ার রাস্তায় একটি সেতু নিমাণ করা হয়েছে ২১ লাখ টাকা ব্যয়ে। এ সেতুর এ্যপ্রোচ সড়ক নেই গত ৮ বছর ধরে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিমিত এ সেতুটি অহেতুক নিমাণ করা হয়েছে বলে স্থানীয়রা বলেন। স্থানীয়রা বলেন, ছোট একটা পাইপ লাইন দিলেই চলতো। শুধু শুধু সেতুটি নিমাণ করা হয়েছে। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসার মোহাম্মদ আবেদ আলী বলেন, নিয়ম মোতাবেক সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। এলাকাবাসীর চাহিদা আর জনপ্রতিনিধিদের তালিকার ভিক্তিতে এসব সেতু করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) নিবাহী প্রকৌশলী অলিউর রহমান বলেন, আমার জানা নেই। খোজ নিয়ে দেখবো। যেখানে সেতুর প্রয়োজন নেই সেখানে সেতু নির্মাণ করা উচিত নয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে রূপগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য ও পাট ও বস্ত্র মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী বলেন, সরকার জনগনের উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ দেয়। কেউ তার অপব্যবহার করলে বা নিয়ম না মানলে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

About ডান্ডিবার্তা

View all posts by ডান্ডিবার্তা →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *