চিকিৎসা সেবার নামে চলছে প্রতারণা

ডান্ডিবার্তা রিপোর্ট
নারায়ণগঞ্জে চিকিৎসা সেক্টরে টেস্ট বাণিজ্য চরমে। সেবার উদ্দেশ্য ছাড়াই নিছক বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যাঙের ছাতার মতো শহরের যত্রতত্র গড়ে উঠেছে ডায়াগনস্টিক সেন্টার, হাসপাতাল। মনগড়া রিপোর্ট তৈরির মাধ্যমে নিরীহ মানুষকে প্রতারিত করা হচ্ছে অহরহ। একই রোগ পরীক্ষায় একেকটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে একেক রকম রিপোর্ট দেয়া হয়। এসব রিপোর্ট নিয়ে রোগী ও তাদের স্বজনেরা চরম বিভ্রান্তিতে পড়ে থাকেন । একশ্রেণীর কমিশনখেকো ডাক্তাদের সহায়তায় ডায়াগনস্টিক সেন্টার মালিকদের রমরমা টেস্ট-বাণিজ্য চলছে বছরের পর বছর ধরে। অথচ ভ্রক্ষেপই করছে না সরকারি কর্তৃপক্ষ। সম্প্রতি চাষাড়া ল্যাবএইড লি: ডায়াগনস্টিক সেন্টারে এক ডাক্তার তার রোগীকে দেয়া টেস্টগুলো ডাক্তারের পছন্দ করা ল্যাবএইড এ না করায় সেই রোগীর সাথে অকথ্য ভাষায় কথা বলেন। এনিয়ে রোগীর পরিবারের সাথে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে পরবর্তিতে ল্যাবএইড’র কতৃপক্ষ বিষয়টি সমাধান করেন। এছাড়াও শহরের অলিগলিতে গড়ে উঠা ডায়াগনষ্টিক সেন্টারগুলোতে ভূয়া ডাক্তারের দৌরাত্ম্য বেড়ে গেছে। গত ৮ মে রাতে সিদ্ধিরগঞ্জের সানারপাড় রহিম মার্কেট (মৌচাক মোড়) এলাকায় অনুমোদনহীন হেলথ কেয়ার আধুনিক হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী দেখার সময় ভুয়া ডাক্তার মোঃ তানভীর আহমেদ সরকার (৩৪) ও উক্ত ক্লিনিকের ম্যানেজার আবুল বাশারকে (৩২) গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-১১ এর একটি টিম। পরে ভুয়া ডাক্তার মোঃ তানভীর আহমেদ সরকারকে ২ বছরের বিনাশ্রম কারাদন্ড এবং হাসপাতালের ম্যানেজার আবুল বাশারকে ১ বছরের বিনাশ্রম কারাদন্ড প্রদান করেন ভ্রাম্যমান আদালত। জানাগেছে, রোগী তার পছন্দমতো ডায়াগনস্টিক সেন্টারে টেস্ট করালে চলবে না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ডাক্তার অন্য রিপোর্ট গ্রহণ করে না। নির্ধারিত সেন্টার থেকে পুনরায় একই টেস্ট করিয়ে আনতে হবে, কমিশন নিশ্চিত হলে পরেই বাকি চিকিৎসা। পরীক্ষার ফি বাবদ ইচ্ছে মাফিক টাকা-পয়সাও আদায় করা হয়। একই ধরনের প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার জন্য একেক প্রতিষ্ঠানে ধার্য আছে একেক ধরনের ফি। স্বাস্থ্য অধিদফতর কর্তৃক রেট চার্ট মানে না নারায়ণগঞ্জের কোনো ডায়াগনস্টিক সেন্টারই। প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের রয়েছে নিজস্ব রেট চার্ট। অনেক ক্ষেত্রে টেস্টের টাকা পরিশোধ করেই সর্বস্বান্ত হয়ে চিকিৎসা না নিয়েই বাসায় ফিরতে হয় মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর রোগীদের। আবার বেশি টাকা দিয়ে টেস্ট করিয়েও সঠিক রোগ নির্ণয়ের নিশ্চয়তা পাচ্ছে না ভুক্তভোগীরা। এভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে অতিরিক্ত হিসেবেই হাতিয়ে নেয়া হয় কোটি কোটি টাকা। এ টাকার মোটা অংশ হিসেবে কমিশন চলে যায় ডাক্তারদের পকেটে। অনুসন্ধানে জানাগেছে, জেলায় ব্যাঙের ছাতার মত গড়ে উঠেছে অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগনষ্টিক সেন্টার । যার নাই স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয় সহ জেলা সিভিল সার্জনের অনুমোদন, প্রয়োজনীয় কাগজপএ, ডিপ্লোমাপাশ নার্স, ডিউটি ডাক্তার ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ান ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান । বিশেষ করে নারায়নগঞ্জ ৩শ শয্যা সহ ভিক্টোরিয়া জেনারেল হাসপাতাল সংলগ্ন গড়ে উঠেছে একাধিক ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার । ঐ সকল প্রতিষ্ঠানের মালিকেরা তাদের নিযুক্ত করা দালাল দিয়ে হাসপাতালথেকে রোগী বাঘিয়ে নিয়ে যায় বলে একাধিক অভিযোগ রয়েছে। তাছাড়া উভয় হাসপাতালে বিচরন করা বহিরাগত পুরুষ ও মহিলা দালালরা বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে রোগীদেরকে উন্নত চিকিৎস সেবার কথা বলে বিভিন্ন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে রোগীদের কাছ থেকে গলা কাটার মত টাকা আদায় করে থাকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিকরা। এতে করে ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকরা প্রতিনিয়ত ফায়দা লুটে যাচ্ছে। অপরদিকে বেশীরভাগই ক্লিনিক ডিপ্লোমা পাশ নার্স ও ডিউটি ডাক্তার ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি মানসম্মতের দিক দিয়ে ও অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে বলে একাধিক রোগীরা অভিযোগ করেন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়াই রয়েছে জাহান ক্লিনিক, মাতৃসেবা ক্লিনিক, মেডিনুর ক্লিনিক, মডার্ন ডায়াগনষ্টিক সেন্টার, নোভা ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ইউনিক ডায়াগনস্টিক , সংলগ্ন স¤্রাট জেনারেল হাসপাতাল, মেডি হোপ, প্রাইম জেনারেল হসপিটাল, কেয়ার জেনারেল হসপিটাল, শাহীন ক্লিনিক, নারায়ণগঞ্জ ডায়াগনস্টিক, শাহীন জেনারেল হাসপাতাল, পপুলার ডায়াগনস্টিক, মিতু ক্লিনিক, সিটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার, মডান ডায়াগনস্টিক সেন্টার, মুক্তি ডায়াগনস্টিক, রিজিয়া, শাপলা, মেডি প্লাজ, মেডি নোভা সহ শহরের আনাচে কানাচে গড়ে উঠেছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়াই ক্লিনিক ও ডায়াগনষ্টিক সেন্টার। এছাড়াও শহরের কালীর বাজারে অলিগতিতে গড়ে উঠেছে ডেন্টাল সেন্টার। যথাযথ কাগজপত্র ছাড়াই দাঁতের চিকিৎসা করছেন কতিপয় ভূয়া ডাক্তাররা। বিশ্লেষকরা বলছেন, নারায়ণগঞ্জে সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের দায়িত্বহীনতার কারণেই অতিতে গলিতে ব্যাঙের ছাতার মতো শহরের যত্রতত্র গড়ে উঠেছে ডায়াগনস্টিক সেন্টার, হাসপাতাল। যেখানে রোগীতের চিকিৎসা সেবার নামে চলছে প্রতারণা। মাঝে মাঝে বেশ কয়েকটি ভ্রাম্যমান আদালত অভিযান পরিচালনা করলেও তা শুধুই নামমাত্র অভিযান বলে মন্তব্য করেছেন সচেতন মহল।

About ডান্ডিবার্তা

View all posts by ডান্ডিবার্তা →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *