খাদ্যে ভেজাল: পথিক তুমি পথ হারাইয়াছ

জীবন বাঁচাতে আমরা খাদ্য খাই। কিন্তু খাদ্য যদি আমাদের খেয়ে ফেলে তবে বিষয়টা খুব বিপজ্জনক। বিষয়টাতে একটু অবাক লাগতে পারে কিন্তু মিথ্যে প্রমাণ করার কোনো উপায় নেই। আমাদের মনে হতে পারে খাদ্য তো আমরা খাই কিন্তু খাদ্যের তো ক্ষমতা নেই আমাদের খেয়ে ফেলার। খাদ্য একটা প্রাণহীন জড় পদার্থ। এই জড় আবার কবে থেকে জীব হলো! প্রশ্নটা মনকে তোলপাড় করলেও করতে পারে। হয়তো অনেকেই ভাবছেন লোকটা বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু হতে চায়।

বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু আমাদের জানিয়েছেন মানুষের মতো উদ্ভিদেরও প্রাণ আছে। উদ্ভিদ তাপ, শীত, আলো, শব্দ ও অন্যান্য অনেক বাহ্যিক উদ্দীপনায় সাড়া প্রদান করতে পারে। কেবল জানিয়ে তিনি ক্ষান্ত হননি, এই মহা সত্যটি প্রমাণের জন্য তিনি ক্রিস্কোগ্রাফ নামের যন্ত্রও আবিষ্কার করেন।

এই যন্ত্রের মাধ্যমে উদ্ভিদে উৎপন্ন আবেগ-অনুভ‚তিকে রেকর্ড করা যায়। বিস্ময়কর বিষয় হলো-এই যন্ত্রটি উদ্ভিদ কোষকে এদের সাধারণ আকার থেকে প্রায় ১০,০০০ গুণ বর্ধিত করে দেখাতে সক্ষম ছিল যেখান থেকে খুব সহজে উদ্ভিদ কোষের ওপর বাহ্যিক প্রভাবকের প্রভাবে সৃষ্ট স্পন্দন বা গতিকে প্রত্যক্ষ করা যেত। ভাবা যায় সারা পৃথিবীকে এই আবিষ্কারের মাধ্যমে এই বাঙালি বিজ্ঞানী তাকে লাগিয়ে দিয়েছিল। এত বড় মাপের একজন বিজ্ঞানীর কাছে আমি কিছুই না। উদ্ভিদের মতো খাদ্যেরও জীবন আছে তা প্রমাণ করার দুঃসাহসও আমার নেই।

আমি বলছি অনিরাপদ খাদ্যের কথা। সোজা বাংলায় ভেজাল খাদ্যের কথা। সবাই বলছে হায় হায় ভেজাল খাদ্যে দেশটা গেল গেল, রসাতলে গেল। কিন্তু এটা থেকে কিভাবে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে তার কোনো ভাবনা নেই। আছে কেবল দুঃখ, ক্ষোভ আর হাহাকার। সবাই যেন হতাশ হয়ে হাত পা ছেড়ে দিয়ে বসে আছে। কি সাংঘাতিক! সমস্যা প্রতিকারের চেয়ে আমরা সমস্যা নিয়ে আলাপ-আলোচনা আর আড্ডা দিতে বেশি পছন্দ করি। ‘খাদ্যে ভেজাল’ এই ইস্যুটা জিইয়ে রাখাটাই যেন আমাদের মূল উদ্দেশ্য হয়ে গেছে ।

এই সমস্যাটা যদি সমাধান হয়ে যায় তাহলে তো টকশোর টপিক পাওয়া যাবে না, পত্রিকায় অনুসন্ধানীমূলক প্রতিবেদন লেখা যাবে না, ভেজালবিরোধী অভিযান বন্ধ হয়ে যাবে, নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থার পরিকল্পনার কথা বলে লাখ লাখ টাকা জলে ভাসানো যাবে না, প্রতিবাদী মানুষদের মিটিং মিছিল, মানববন্ধন সব বন্ধ হয়ে যাবে। এসব কি মানা যায়?

নাহ, আমি মনে হয় খুব কঠিন কথা বলে ফেলেছি। একটা গভীর সত্য কথা জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে জেনেছি তাহলো- অনেক কথা জানলেও তা বলতে নেই। বোবা হয়ে থাকতে হয়। এ প্রসঙ্গে কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের কথা মনে পড়ে গেল। খুব ভালো একটা কথা বলেছেন তিনি- ‘জীবনে কিছু কিছু প্রশ্ন থাকে যার উত্তর কখনো মেলে না, কিছু কিছু ভুল থাকে যা শোধরানো যায় না, আর কিছু কিছু কষ্ট থাকে যা কাউকে বলা যায় না’। খাদ্যে ভেজাল কালের পরিক্রমায় এমনই একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ যেন সহজ কথা যায় না বলা সহজের মতোই।

এবার একটু ইতিহাস ঘাঁটব। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের প্রধানমন্ত্রী চাণক্যের মাধ্যমে বিষকন্যা হিসেবে অপূর্ব সুন্দরী আর প্রাণঘাতী ভারতীয় নারীদের কথা ইতিহাসে এসেছে। এদের কাজ ছিল কোনো একজন রাজার অনুগত থেকে তার প্রতিপক্ষ রাজাকে খাদ্যে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা। ৬-৮ বছর বয়সের মেয়েদের মধ্যে থেকে বিষকন্যাদের বাছাই করা হতো। এরপর এদের খাবারের সঙ্গে অল্প অল্প করে বিষ মেশানো শুরু হতো। এভাবে অল্প অল্প করে বিষ খাওয়ার ফলে তাদের শরীরে বিষের প্রতিষেধক তৈরি হয়ে যেত এবং দীর্ঘ সময় ধরে বিষ খাওয়ার ফলে পরে আর কোনো বিষই তাদের ওপর কাজ করত না। সাধারণ মানুষকে হত্যা করার মতো বিষ প্রয়োগের ক্ষমতা তৈরি হলে বিষকন্যাদের পাঠানো হতো প্রতিপক্ষ অন্যান্য রাজার দরবারে। প্রতিপক্ষের রাজারা তাদের রূপে আকৃষ্ট হয়ে পড়ত।

এরা ধীরে ধীরে রাজাদের বিশ্বাসভাজন হিসেবে নিজেদের তৈরি করত। তারপর রাজার খাবারে বিষ মিশিয়ে সেই একই খাবার নিজেও খেত সন্দেহ এড়ানোর জন্য। এর ফলে যেটি ঘটবার তাই ঘটত। রাজা বিষাক্ত খাবার খেয়ে মারা যেত অন্যদিকে বিষকন্যারা বেঁচে ফিরে আসত কোনো ধরনের সন্দেহ ছাড়াই। এছাড়াও বিষকন্যাদেরকে প্রতিপক্ষের কাছে পাঠানোর আগে তাদের দেহের ভিতরে বিষ ঢুকিয়ে দেয়া হতো যাতে বিষকন্যার দেহের সংস্পর্শে আসলে বিষের আক্রমণে মারা যায়।

এ তো এলো বিষকন্যাদের কথা। এবার চায়ের সঙ্গে বিষ মিশানোর ইতিহাস যেন চায়ের কাপে ঝড় তোলার মতো রুদ্ধশ্বাস ঘটনা। টাইম মেশিনকে একটু পিছনে নিয়ে গেলে রুশ গুপ্তচর আলেক্সান্ডার লিটভিনেনকোর কথা মনে পড়লেও পড়তে পারে। এই লোকটিকে চাকরি থেকে বহিষ্কার করা হলে তিনি দেশ ছেড়ে যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে কাজ করতে শুরু করেন। কাজটি ভালো না মন্দ হয়েছে তা বলতে চাই না। সেটি এখানে বলার মতো প্রাসঙ্গিকও নয়। তবে তার এই ভ‚মিকাকে রাশিয়া ভালো চোখে দেখেনি বরং অন্য চোখে দেখেছে।

কথিত আছে রাশিয়ার গুপ্তচরেরা ব্যবসায়ী সেজে যুক্তরাজ্যে এসে আলেক্সান্ডার লিটভিনেনকোর সঙ্গে বৈঠক করেন। এ সময় তার চায়ের সঙ্গে একজন মানুষকে হত্যা করতে যতটুকু বিষ দরকার তার থেকে ২০০ গুণ বেশি পোলোনিয়াম বিষটি মিশিয়ে দেয়া হয়। বিষ প্রয়োগের তিন সপ্তাহ পরই লিটভিনেনকো মারা যান। পোলোনিয়াম বিষটি গ্যাস চেম্বারে মৃত্যু কার্যকরে ব্যবহৃত হাইড্রোজেন সায়ানাইড থেকে ২৫০,০০০ গুণ বেশি শক্তিশালী। পোলোনিয়াম থেকে যে আলফা রশ্মি বের হয় তা দেহের অভ্যন্তরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গসমূহকে অকার্যকর করে দেয়।

অনেকে ভাবছেন লোকটা অযথা একটার পর একটা গল্প ফাঁদছেন। অনেকেই হয়তো বিরক্ত হয়ে ইতিমধ্যে বলেই ফেলেছেন ‘কিসের মধ্যে কি পান্তা ভাতে ঘি’।

ক্ষমা করবেন। এতটা দুঃসাহস আমি দেখাতে চাই না, তবে সমীকরণটা মেলাতে চাই। ছোট বেলায় পাটিগণিত করতে গিয়ে বলা হতো ‘সরল করো’। খুশিতে গদ গদ হয়ে ভাবতাম খুব সহজ। সরল মানে সহজ। কিন্তু সরল যে জটিল হতে পারে অংক করতে গেলেই তা বোঝা যায়। আমি সরলকে জটিল করছি না বরং জটিলকে সরল বানানোর চেষ্টা কিংবা অপচেষ্টা করছি।

ইতিহাস বা গল্প, কল্পনা বা বাস্তব যেটাই বলি না কেন উপরের ঘটনাগুলো থেকে আমরা একটা বিষয় বুঝতে পারছি তা হলো, মানুষ যখন মানুষের শত্রু হয় তখন খাদ্যে ধীরে ধীরে বিষ প্রয়োগ করে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে পারে। কিন্তু আমরা তো সবাই একই দেশের মানুষ। একই দেশের মানুষ হিসেবে আমরা একজন আরেকজনকে ভালোবাসব, শ্রদ্ধা করব, মিলে মিশে একটা সুখী সমৃদ্ধ দেশ গড়ব। অন্যের অপকার না করে কল্যাণ করব। বড় মনের মানুষ হব, উদার হব। আমাদের একজনের ভুলের কারণে অন্যদের যাতে ক্ষতি না হয় সেটি সব সময় ভাবব। কিন্তু কোথায় কি? এ ধরনের বিন্দুমাত্র প্রবণতা দেখছি না। যা ভাবছি ঘটছে তার ঠিক উল্টো। সবাই খাদ্যে ভেজাল মেশাতে ব্যস্ত।

আরে তাহলে দেশের সব মানুষ কি আজ খুনি কিংবা গুপ্তঘাতক হয়ে উঠেছে। কি বলব, বলার কিছু নেই যদি মানুষের মধ্যে বোধ শক্তি তৈরি না হয়। বিবেকটা যখন ভিতর থেকে বের হয়ে জলীয়বাষ্পের মতো উড়াল দেয় তখন মানুষ কি আর মানুষ থাকে। খাদ্যে ভেজাল দিয়ে আমরা যে দেশের মানুষ উজাড় করে দিচ্ছি সেটি ভাবার সময় কারো নেই।
কি বলব, লোভ আর লোভ। টাকা আর টাকা। আর কত দরকার?

যে লোকটা খাদ্যে ভেজাল দিয়ে পকেট ভারি করছে সে লোকটা একবারও ভেবে দেখছে না তার মতো আরো লোভী মানুষ তৈরি হয়েছে। সবাই ভাবছে আমি তো সুরক্ষিত, নিরাপদ দূরত্বে, অন্যকে ভেজাল খাইয়ে মেরে ফেললে আমার তো সমস্যা নেই। এর অর্থ কী, সবাই ভাবছে তারা নিরাপদ, খুব সুরক্ষিত কিন্তু কেউ নিরাপদ নয়। সবাই ডেঞ্জার জোনে। যারা ভেজাল দিচ্ছে তাদের পরিবারও অন্যদের ভেজাল দেয়া খাদ্য খাচ্ছে। এর ফলে সে মারছে অন্যকে আর তাকে মারছে অন্যরা। হায় হায় এভাবে ভেজাল চললে তো গোটা দেশ জনশূন্য হয়ে যাবে। উজাড় হয়ে যাবে।

পঙ্গপাল একধরনের ফড়িঙের মতো পোকা। পঙ্গপাল ফসলের পর ফসলের মাঠ উজাড় করে দেয়। দেশে দেশে দুর্ভিক্ষ আনে। মানুষেও মরতে থাকে। প্রাচীন মিসরীয়রা একসময় এদের দ্বারা এমনভাবে আক্রান্ত হয়েছিল যে তারা তাদের সমাধিতে পঙ্গপালের ছবি এঁকে দিয়েছিল। ভেজাল যারা দেয় তারা তো এক প্রকার পঙ্গপাল। ভেজাল খেয়ে ধুঁকে ধুঁকে মরার পর আমাদের যাতে ভেজাল ব্যবসায়ীদের ছবি সমাধিতে আঁকতে না হয়। কথাটা খুব সহজে বলেছি কিন্তু অর্থটা অনেক গভীর। ভেবে দেখবেন। তাহলে তথাকথিত সচেতন মানুষেরা কি আগামীর প্রজšে§র কথা ভাববেন না। বেশি মুনাফার লোভ কি একটা জাতিকে ধ্বংস করে দিবে। আমরা নিজেরাই কি নিজেদের খুন করে দেশ ধ্বংসের পাঁয়তারা করব ? এটা কি কেউ মানতে পারে, মেনে নেয়া যায়?

জানি না কথাটা কতদূর সত্য। কিন্তু যা রটে তা কিছুটা বটে এমন কথাও তো ফেলে দেয়া যায় না।আমাদের দেশে প্রক্রিয়াজাতকরণ খাদ্য তৈরির শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে। খুব ভালো কথা। ঘটছে দেশের উন্নয়ন, দশের উন্নয়ন। হায় হায় এখানেও শুনছি আজব ব্যাপার। এই শিল্পকারখানায় উৎপাদিত খাদ্য সামগ্রীর ভেজালমুক্ত ভালো মানের পণ্যটি বিদেশিদের জন্য পাঠানো হলেও, আমাদের জন্য নাকি ভেজালযুক্ত নিম্নমানের খাদ্য সামগ্রী রাখা হচ্ছে। কারণ বিদেশিদের খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আছে, আমাদের নেই। যা শুনেছি তা মিথ্যে হলেই ভালো। কিন্তু সন্দেহ একবার ঢুকলে তা দূর করা কঠিন। মাদক ভয়ংকর। তার থেকে ভয়ংকর খাদ্যে ভেজাল। মাদক একটা নির্দিষ্ট মানব সম্পদকে ধ্বংস করছে আর ভেজাল গোটা জাতিকে ধ্বংস করছে। এটা কি মেনে নেওয়া যায়, যেতে পারে?

ইউক্রেনের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির জেলেনস্কি তার দেশের প্রত্যেককে নিজের অফিসে তাদের সন্তানদের ছবি ঝোলানোর পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন ‘অফিসে নিজের সন্তানদের ছবি ঝুলান আর যেকোনো সিদ্ধান্ত নেবার সময় সেদিকে তাকান।’ মহামূল্যবান কথা। আমি দেশের সকল মানুষকে একইভাবে অনুরোধ করব, যে যেখানেই থাকুন না কেন নিজের সন্তানদের ছবি সেখানে ঝুলিয়ে রাখুন।

একবার তাদের মায়াবী মুখগুলোর দিকে তাকান। অন্য ছেলে মেয়েগুলোর কথা ভাবুন। এটি আপনাকে খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখবে। কারণ আপনার হাতেই আপনার সন্তানের ভবিষ্যৎ, দেশের ভবিষ্যৎ।
খাদ্যে ভেজাল বন্ধে আমরা নিজেরা সচেতন হই, অন্যদের সচেতন করি। এর সঙ্গে মানবিক বিষয়গুলো যুক্ত করি। তবেই দেশ ভেজালমুক্ত হবে। আর তা যদি না হয় তবে বঙ্কিম রচনাবলির কপালকুণ্ডলার মতো বিরস মনে বলতেই হবে পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছো। – লেখক: শিক্ষাবিদ, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

About ডান্ডিবার্তা

View all posts by ডান্ডিবার্তা →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *