শ্রীশ্রীজগন্নাথদেবের রথযাত্রার তাৎপর্য

তারাপদ আচার্য্য

শ্রীশ্রীজগন্নাথদেবের রথযাত্রার তাৎপর্য

“রথযাত্রা লোকারণ্য মহা ধূমধাম

ভক্তেরা লুটায়ে পথে করিছে প্রণাম।

পথ ভাবে আমি দেব, রথ ভাবে আমি,

মূর্তি ভাবে আমি দেব, হাসেন অন্তর্যামী।”

রথযাত্রাকে ঘিরে উৎসবে মাতোয়ারা সবাই। ভক্তরা ফুল, বেলপাতা, বাতাসা, নকুলদানা ও কাঁদি কাঁদি কলা নিয়ে সকাল থেকে উপস্থিত রথযাত্রায় অংশ নিতে। হাজার হাজার ভক্ত রথের রশি টেনে নিয়ে যাবেন। রথটানা শুরুর আগেই আকাশে ঘন কালো মেঘ জমে। রথটানা শুরু মাত্রই আশ্চর্যভাবে অনেকটা ভারাক্রান্ত ও বেদনাচ্ছন্ন হয়ে এসব ঘন মেঘ দুঃখী দুঃখী ভাব নিয়ে মাটির পৃথিবীতে ঝরে পড়ে। সেই বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে নেচে-গেয়ে মতোয়ারা হন সবাই। সেই সঙ্গে সমানতালে বাজতে থাকে ঘণ্টাবাদ্যি। একদিকে পুরুষেরা শঙ্খ, ঘণ্টা, কাঁসা, ঢাক, ঢোল বাজিয়ে পরিবেশ মুখর করে তোলেন অন্যদিকে নারীরা উলুধ্বনি ও মঙ্গলধ্বনির মাধ্যমে রথটানায় আনন্দচিত্তে সামিল হন। রথ থেকে রাস্তায় দাঁড়ানো দর্শনার্থীদের দিকে ছুঁড়ে দেয়া হয় কলা আর ধানের খৈ। শাস্ত্রে রয়েছে, ‘রথে চ বামনং দৃষ্টবা পুনর্জন্ম ন বিদ্যাতে’ অর্থাৎ, রথে চড়ে বামন জগন্নাথকে দেখতে পেলে জীবের আর পুনর্জন্ম হয় না। এ বিশ্বাস বুকে ধারণ করেই আজ সনাতন ধর্মবলম্বীদের এ মহা উৎসবের আয়োজন। রথযাত্রা বা রথদ্বিতীয়া একটি আষাঢ় মাসে আয়োাজিত অন্যতম প্রধান সনাতন ধর্মীয় উৎসব। কিন্তু আমাদের দেশে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই এ উৎসবের ভাগীদার। তবে ভারতের ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গে এই উৎসব বিশেষ উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। এছাদেশে বিশ্বের বিভিন্ন শহরে রথযাত্রা শুরু হয়। লন্ডন, মন্ট্রিল, প্যারিস, নিউ ইয়ার্ক, টরেন্টো, ভেনিস প্রভৃতি শহরে রথযাত্রা উৎসবের জনপ্রিয়তা পেয়েছে। দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর কৃষ্ণের বৃন্দাবন প্রত্যাবর্তনের স্মরণে এই উৎসব আয়োজিত হয়ে থাকে। পদ্মপুরাণে উল্লেখিত রথযাত্রায় শ্রীবিষ্ণুর মূর্তিকে রথারোহণ করানোর কথা বলা হয়েছে। আর পুরীর জগন্নাথদেবের মূর্তি যে শ্রীকৃষ্ণ তথা শ্রীবিষ্ণুরই আর একটি রূপ তা সবাই স্বীকার করেন। তবে স্কন্দপুরাণে কিন্তু প্রায় সরাসরিভাবে জগন্নাথদেবের রথযাত্রার কথা রয়েছে। সেখানে ‘পুরুষোত্তম ক্ষেত্র মাহাত্ম্য’ কথাটি উল্লেখ করে মহর্ষী জৈমিনি রথের আকার, সাজসজ্জা, পরিমাপ ইত্যাদির বর্ণনা দিয়েছেন। ‘পুরুষোত্তম ক্ষেত্র’ বা ‘শ্রীক্ষেত্র’ বলতে পুরীকেই বোঝায়। অতএব দেখা যাচ্ছে যে সেই পুরাণের যুগেও এই রথযাত্রার প্রচলন ছিল। ‘উৎকলখন্ড’ এবং ‘দেউল তোলা’ নামক ওড়িশার প্রাচীন পুঁথিতে জগন্নাথদেবের রথযাত্রার ইতিহাস প্রসঙ্গে বলা হয়েছে যে, এই রথযাত্রার প্রচলন হয়েছিল সত্যযুগে। সে সময় আজকের ওড়িশার নাম ছিল মালবদেশ। সেই মালবদেশের অবন্তীনগরী রাজ্যে ইন্দ্রদ্যুম্ন নামে সূর্যবংশীয় এক পরম বিষ্ণুভক্ত রাজা ছিলেন, যিনি ভগবান বিষ্ণুর এই জগন্নাথরূপী মূর্তির রথযাত্রা শুরু করার স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন। পরবর্তীকালে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন পুরীর এই জগন্নাথ মন্দির নির্মাণ ও রথযাত্রার প্রচলন করেন। এভাবে রথ তিনটি সমুদ্রোপকূলবর্তী জগন্নাথ মন্দির থেকে প্রায় দু’মাইল দূরে গুন্ডিচা মন্দিরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। সেখানে সাতদিন থাকার পর আবার উল্টোরথ অর্থাৎ জগন্নাথ মন্দিরে ফিরে আসে। এখন তিনটি রথ ব্যবহৃত হলেও আজ থেকে সাতশ’ বছর আগে রথযাত্রার যাত্রাপথ দু’টি ভাগে বিভক্ত ছিল। আর সেই দু’টি ভাগে তিনটি-তিনটি করে মোট ছ’টি রথ ব্যবহৃত হত। কেননা সে সময় জগন্নাথ মন্দির থেকে গুন্ডিচা আসার পথের মাঝখান দিয়ে বয়ে যেত এক প্রশস্ত নালা। নাম ছিল বলাগুন্ডি নালা। তাই জগন্নাথ মন্দির থেকে তিনটি রথ বলাগুন্ডি নালার পার পর্যন্ত এলে পরে জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার মূর্তি রথ থেকে নামিয়ে নালা পার করে অপর পারে অপেক্ষমান অন্য তিনটি রথে বসিয়ে ফের যাত্রা শুরু হত। ১২৮২ খ্রিস্টাব্দে রাজা কেশরী নরসিংহ পুরীর রাজ্যভার গ্রহণের পর তাঁর রাজত্বকালের কোনো এক সময়ে এই বলাগুন্ডি নালা বুজিয়ে দেন। সেই থেকে পুরীর রথযাত্রায় তিনটি রথ। জগন্নাথদেবের স্নানযাত্রা এবং রথযাত্রা সূর্যের অয়নপথ পরিক্রমার সাথে সংশ্লিষ্ট। সূর্যের দক্ষিণায়ন যাত্রার সঙ্গে বর্ষাগমনের সম্পর্ক স্বতঃসিদ্ধ। আর বর্ষারম্ভেরই উৎসব জগন্নাথদেবের ¯œানযাত্রা। সূর্য-সপ্তাশ্ব বাহিত রথে আকাশলোক পরিক্রমণ করেন। জগন্নাথদেবও রথে অরোহণ করে গুন্ডিচা যাত্রা করেন। অয়নপথে সূর্যের দক্ষিণ দিকে যাত্রা ও উত্তরে প্রর্ত্যাগমন জগন্নাথদেবের রথযাত্রার ইতিবৃত্ত। রথযাত্রা অনুষ্ঠান, রথ, রথে অরোহী সুভদ্রা-বলরাম-জগন্নাথদেব দর্শন এবং এ বিষয়ে যাবতীয় কিংবদন্তী রূপক ছলে ঈশ্বর দর্শন তথা আত্মদর্শনের উপায় মাত্র। সাধক নিজে দেহরথে ‘রথীকে’ দর্শন করতে সক্ষম। তখনই কেবল ‘রথেতু বামনং দৃষ্টা পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে’ এ বাক্যর যথার্থ সার্থকতা। শ্রীশ্রীজগন্নাথদেবের রথযাত্রার গভীর রহস্য উন্মোচনের মধ্য দিয়ে সবার শুভবুদ্ধির উদয় হোক। রথযাত্রার পুণ্যলগ্নে ধর্মবর্ণ সব ভুলে এক প্রাণতায় মিলন হোক। তিনি যেন বিশ্বের নির্যাতিত-নিপীড়িত আপামর জনগণকে সন্ত্রাসী ও সব ধরনের দুর্নীতির হাত থেকে রক্ষা করে বিশ্বকে শান্তি ধামে পরিণত করেন এবং মানব ধর্মের উন্মোচন হোক।

About ডান্ডিবার্তা

View all posts by ডান্ডিবার্তা →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *